হাসি-কান্না ও প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির গল্প

তালপাতার সেপাই ও অনান্য গল্প
তালপাতার সেপাই ও অনান্য গল্প

তালপাতার সেপাই ও অনান্য গল্প
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
প্রচ্ছদ: সব্যসাচী হাজরা
প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন
ফেব্রুয়ারি ২০১৫
১৬০ পৃষ্ঠা
দাম: ৩২০ টাকা।
সমসাময়িক বাংলাদেশি সাহিত্যে যে গুটি কয়েক গল্পকথক হাজার বছরের গল্পবলার ঐতিহ্যকে ধারণ করে গল্প লিখে থাকেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর সদ্য প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ তালপাতার সেপাই ও অন্যান্য গল্পও সেই গল্পবলার রীতিকে অবলম্বন করে লেখা। প্রসঙ্গত, একবার এক সাক্ষাৎকারে সৈয়দ ইসলাম বলেছিলেন, ‘গল্প বলা ও লেখার মাঝে একটা সূক্ষ্ম তফাত আছে। আমাদের বাংলা সাহিত্যে রয়েছে গল্প বলার ঐতিহ্য, লেখার নয়। আর পাশ্চাত্যে রয়েছে গল্প লেখার ঐতিহ্য। গল্প বলতে গেলে ভাষার মৌখিকতাকে প্রাধান্য দিতে হয়। এককথায়, সার্থক গল্প নির্মাণের জন্য গল্প বলা ও লেখা উভয় ঐতিহ্যের মিশ্রণ জরুরি।’
এবার তাঁর উপর্যুক্ত গল্পের বইয়ের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য নিয়ে একটু আলোচনা করি। প্রথমত, এ সংকলনের প্রায় গল্পেই গল্পকথকের একটি সরব কিংবা নীরব উপস্থিতি সহজেই টের পাওয়া যায়, যাকে উত্তরাধুনিক গল্প-উপন্যাসের একটি বৈশিষ্ট্য বললে অত্যুক্তি হবে না। দ্বিতীয়ত, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম কোনো একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে জীবনকে বন্দী করতে চান না; জীবনকে দেখেন নানা দৃষ্টিকোণ থেকে। তা ছাড়া তাঁর অধিকাংশ গল্পে জীবন-বাস্তবতার একটি অংশ হিসেবে ধরা দেয় কল্পনা। গল্পগুলো পড়লে সহজেই বোঝা যায়, গল্পকার আধুনিক লেখকদের মতো কেবল অতীত স্মৃতিকাতর না হয়ে শক্তি খোঁজেন অতীত থেকে। বিষয়টি আরেকটু ব্যাখ্যা করে বলতে গেলে, একজন আধুনিক-উত্তর গল্পকথকের মতো সৈয়দ ইসলাম অতীতে ফিরে যান চরিত্রগুলোর বোধের জায়গাগুলো শাণিত করার প্রয়াসে।
এ পর্যায়ে কয়েকটি গল্প আলোচনা করলে বোধ করি ওপরের কথাগুলো আরও স্পষ্ট হবে। সংকলনের শুরুর গল্প ‘কাঠপোকা’। গল্পটি পাঠোত্তর সচেতন পাঠক মাত্রই আসলামের বন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপক চরিত্রটির মধ্যে খুঁজে পাবেন লেখকের উপস্থিতি। গল্পের প্রথম ভাগের বর্ণনাকারী এই অধ্যাপক বন্ধু। আবার দ্বিতীয় ভাগে গল্প এগিয়ে যায় একজন সর্বজ্ঞ বর্ণনাকারীর হাত ধরে। এভাবে একই গল্পে পাওয়া যায় একাধিক বর্ণনাকারী। ফলে একজনের গল্প শুনতে গিয়ে পাঠক জানতে পারেন বিভিন্নজনের জীবনের নানা গল্প। তাই বলে মূল গল্পটি নষ্ট হয় না, বরং মূল আখ্যান ও নানা প্রতি-আখ্যান জীবন-উদ্যাপনের একাধিক দ্বার উন্মোচন করে দেয় পাঠককে।
এ তো গেল গল্পের বর্ণনাকৌশল। এবার বলি, একটি গল্প কী অন্তর্নিহিত বার্তা বহন করে সে সম্পর্কে। যেমন ‘কাঠপোকা’ গল্পে আসলাম কাঠপোকাদের করর্ করর্ ডাকের কারণে তিন রাত ধরে ঘুমাতে পারছে না। গল্পকারকে ধার করে বলতে হয়, কাঠপোকাদের ঘুম ভাঙানিয়া গানে ‘চিৎকার আছে, সুর নেই; ত্রাস আছে, নিস্তার নেই।’ বলা প্রয়োজন, আসলাম ব্যাংকের টাকা মেরে সম্পদশালী হয়েছে। সে ভাবে, তার বাবার আমলে তৈরি আলমারিতে ঘুণে ধরার কারণ বাবাকে কাঠ-ব্যবসায়ী দুই নম্বর কাঠ দিয়েছিল। কিন্তু লেখক ঘুণপোকাদের করর্ করর্ ডাককে একটি ভিন্ন প্রতীকায়নে নিয়ে গেছেন। তিনি দেখানোর চেষ্টা করেছেন, এই ডাক যেন আসলামকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে তার জালিয়াতি। ডাকটি আছড়ে পড়ছে তার বোধে। তাই আসলামের মনে হয়, এই ডাকের সঙ্গে তার মৃত বাবাও যেন সুর মেলাচ্ছেন।
সংকলনের একটি অসামান্য গল্প ‘উজানিবেলা’। গ্রামের স্কুলে গণিতের শিক্ষক হরেনবাবু। জীবনের পড়ন্ত বেলায়ও তারুণ্যের শক্তিতে বিশ্বাস করেন। মূলত তারুণ্যের শক্তিকেই তিনি অভিহিত করেছেন উজানিবেলা হিসেবে। ক্লাসে শিক্ষার্থীদের তিনি বলেন উজানিবেলার মানুষ হতে। কিন্তু স্কুলের হেডমাস্টারসহ অন্য শিক্ষকেরা অফুরান তারুণ্যে আস্থা রাখা এ মানুষটির বিপক্ষে দাঁড়ায়। একজন উজানিবেলার মানুষ কি শেষতক পারবেন এতগুলো ভাটির মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকতে? এমন একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে পাঠক ঢুকে যাবেন অনেকগুলো মানুষের হাসি-কান্না আর প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির গল্পে। আবার ‘একাত্তর’ গল্পে গ্রামের মানুষের পাশাপাশি একটা বাঘ কীভাবে কারও ডাক বা কোনো ট্রেনিংয়ের তোয়াক্কা না করে মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদারদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, সে কাহিনিও পাঠকমনে জাগাবে ভিন্ন অনুভূতি।
সব মিলিয়ে আলোচ্য সংকলনের গল্পসমূহ—গল্পের কিছু বিশেষ মুহূর্ত চেনা জগৎকে বদলে দেয়, ঘুচে দেয় বাস্তত-অবাস্তবতার পার্থক্য। আর গল্পকারের কৌতুকবোধ ও মেদহীন ভাষা গল্পগুলোকে দেয় ভিন্ন মাত্রা।