বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

একপর্যায়ে সেই তালেবানকে উচ্ছেদ করেই মার্কিন প্রশাসন গত ২০ বছরে আফগানিস্তানে সেনাশাসন চালিয়েছে শতাধিক সামরিক প্রাইভেট ঠিকাদারের মাধ্যমে। সঙ্গে ছিল ন্যাটো। বিবাহ অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে কত নিরীহ নিরস্ত্র মানুষকে তারা হত্যা করেছে, তার পরিষ্কার হিসাব নেই। ব্যবসা, নির্মাণকাজ, কনসালট্যান্সি, ‘সাহায্য’ ইত্যাদি ক্ষেত্রে যে হাজার হাজার কোটি টাকা এসেছে, তার বেশির ভাগ মার্কিন ও ইউরোপীয় বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, কনসালট্যান্টরাই পেয়েছে। কাজেই অনেকেরই লক্ষ্য পূরণ হয়েছে, এটা ঠিক। এবার সমঝোতার মাধ্যমেই বিদায় কিংবা আরেকভাবে থেকে যাওয়া। এখন এ দেশে নতুন ব্যবসার জন্য মার্কিন, চীন, রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত ও পাকিস্তান তাকিয়ে আছে তালেবানেরই দিকে। মার্কিনদের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের পর চীনের সঙ্গেও দরবার করেছেন তালেবান নেতারা। রাশিয়ার সঙ্গেও যোগাযোগ আছে।

আফগানিস্তানের এসব ঘটনা নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের আগ্রহ যথেষ্ট, তার প্রভাবও কম নয়। তবে মুজাহিদিন তালেবান পর্বের আগপর্যন্ত আফগানিস্তান সম্পর্কে এ দেশে সাধারণভাবে প্রচলিত ধারণাগুলোর উৎস ছিল মূলত তিনটি: ১. এ দেশে ভ্রাম্যমাণ মহাজন ব্যবসায়ী হিসেবে আফগানিস্তান থেকে আসা ব্যক্তিদের সম্পর্কে সত্য-মিথ্যা, ঠিক-অতিরঞ্জিত কাহিনি, ২. রবীন্দ্রনাথের কাবুলিওয়ালা এবং ৩. সৈয়দ মুজতবা আলীর দেশে-বিদেশে

এই তিনটিই বিশ শতকের প্রথমার্ধের চিত্র ও রচনা, কিন্তু এগুলোই নানা গল্পে-কাহিনিতে ছড়িয়ে আফগানিস্তান এবং সে দেশের মানুষের সম্পর্কে একটি ভাবমূর্তি এ দেশের মানুষের মনোজগতে স্থায়ী আসন তৈরি করেছে। এর সূত্র ধরে আফগানদের নিয়ে কৌতুকও কম তৈরি হয়নি এ দেশে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাবুলিওয়ালা এই পেশা সম্পর্কে প্রচলিত ধারণার নিষ্ঠুর চরিত্রের বিপরীতে এক ‘রহমত’-এর মধ্য দিয়ে মমতাময় এক মানুষের চিত্র উপস্থিত করে। সৈয়দ মুজতবা আলীর দেশে-বিদেশের খণ্ডাংশ পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে বছরের পর বছর এ দেশের লাখো শিশু-কিশোর পাঠ করেছে। আর পুরো দেশে-বিদেশে পাঠ আফগানিস্তানের এক অসাধারণ ব্যাখ্যানের সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটায়। বিশের দশকে একজন বাঙালি মুসলিম লেখক ‘দুর্গম গিরি’ পার হয়ে অপরিচিত এক দেশে বসবাস ও শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে সেই সমাজকে যেভাবে দেখেছেন, আফগানিস্তানের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব তাঁর লেখায় যেভাবে এসেছে, এর সাহিত্যমূল্য তো বটেই, ঐতিহাসিক মূল্যও অপরিসীম।

যে সময় মুজতবা আলী আফগানিস্তানে, সে সময় সেই দেশের ভেতরে ও বাইরে দুই ক্ষেত্রে বড় দুটি পরিবর্তনের উত্তর-পর্ব চলছে। বাইরে রুশ বিপ্লবের মতো একটি বড় ঘটনা ঘটেছে, ভেতরে বাদশাহ আমানুল্লাহ ব্রিটিশ আধিপত্যের বিরুদ্ধে আফগানিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন এবং অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ইস্যুতে নানা রকম সংস্কার খাতে তিনি হাত দিয়েছেন।

১১ সেপ্টেম্বরের পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বিশ্বব্যাপী ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের’ নামে সন্ত্রাসী যে যুদ্ধ উন্মাদনা তৈরি করা হয়েছে, সেখানে ব্রিটিশ শক্তির যে অতি সক্রিয় ভূমিকা দেখি, তার একটা সূত্র এই ইতিহাস থেকে পাওয়া সম্ভব। ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন নিশ্চিত হওয়ার পর আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য ব্রিটেন চেষ্টা করেছে একটানা, কিন্তু বারবারই শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে, জারের রাশিয়াও আফগানিস্তানের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ স্থাপনের চেষ্টা করেছে বহুবার। তারাও তাতে সফল হতে পারেনি। কিন্তু এই ঔপনিবেশিক চাপ, আগ্রাসন ও চক্রান্ত আফগানিস্তানে কখনোই স্থিতি আসতে দেয়নি। রুশ বিপ্লব, জার সাম্রাজ্য উচ্ছেদ করার মাধ্যমে আফগানিস্তানে একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টাকে আনুকূল্য প্রদান করে।

১৯১৯ সালের পর বাদশাহ আমানুল্লাহ যে ব্রিটিশদের থেকে স্বাধীনভাবে শিক্ষা, ভূমিব্যবস্থাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেন, তাতে সোভিয়েত ইউনিয়নের সহযোগিতা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কিন্তু ব্রিটিশ শক্তি তখন হাত মেলায় সংস্কারবিরোধী সামন্ত শক্তির সঙ্গে, যারা সংস্কারক আমানুল্লাহকে ‘কাফের’ ও ‘ইসলামবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে নানা অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা শুরু করে। এরই একপর্যায়ে এদের প্রতিনিধি বাচ্চা সাকাও ক্ষমতা দখল করে এবং সব সংস্কার বাতিল ঘোষণা করে। ঠিক প্রায় একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি আমরা দেখি এই শতকের আশি ও নব্বইয়ের দশকে, যখন মার্কিন প্রশাসন শিক্ষা, ভূমিব্যবস্থাসহ নানামুখী সংস্কারে নিয়োজিত সোভিয়েত-সমর্থিত সরকার উচ্ছেদ করে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য প্রথমে পৃষ্ঠপোষকতা দেয় মুজাহিদিন ও পরে তালেবানকে। আফগানিস্তানের ব্রিটিশ-মার্কিনদের আধিপত্য স্থাপনের চেষ্টায় বরাবরই সে দেশের জাতিগত পার্থক্য, ধর্মীয় বিভিন্ন বিভেদকে কাজে লাগানো হয়েছে। মুসলিম ধর্মাবলম্বী সে দেশে ৯৯ শতাংশের বেশি। তার মধ্যে সুন্নি প্রায় ৮৫ শতাংশ এবং শিয়া প্রায় ১৫ শতাংশ। আফগানিস্তানে যেসব জাতিগোষ্ঠী আছে, তার মধ্যে পশতুনই সংখ্যাগরিষ্ঠ—প্রায় ৪০ শতাংশ। এ ছাড়া তাজিক ২৫ শতাংশ, হাজারা ১৯ শতাংশ ও উজবেক ৬ শতাংশ।

সাইক্লিস্ট (১৯৮৮) ও কান্দাহার (২০০১) চলচ্চিত্র নির্মাতা মোহসেন মাখমালবাফ বলেন, মাতৃভূমি ত্যাগ না করা পর্যন্ত একজন আফগান তার আফগান সত্তা টের পায় না। আফগানিস্তানের ভেতরে তারা শুধুই পশতুন, হাজারা, উজবেক, নয়তো তাজিক। তাজিক আর হাজারাদের সঙ্গে পশতুনদের সংঘাত এত বেশি যে পরস্পরকে তারা সবচেয়ে বড় শত্রু মনে করে। একে অন্যের মসজিদে নামাজ পড়ে না, দুই জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিয়ে খুব কঠিন বিষয়। আফগান লেখক খালিদ হোসেইনির লেখা দ্য কাইট রানার (২০০৩) উপন্যাসে এই ভয়াবহ বিদ্বেষের ভেতর মানুষের টিকে থাকার লড়াইয়ের বিস্তৃত আখ্যান পাওয়া যায়। তালেবান ও মুজাহিদিনের মধ্যকার বিরোধ বস্তুত এই জাতিগত বৈরিতার ওপরই দাঁড়ানো, মার্কিনপক্ষ যা কাজে লাগিয়েছে।

মাঝখানে মার্কিন আধিপত্যের ২০ বছর পর তালেবান থেকে তালেবান শাসনে এখন আফগান জনগণের কী হবে? এ দেশে যারা শিশু, তাদের থেকে শুরু করে বয়স্ক পর্যন্ত কোনো আফগান নাগরিক এই দেশকে নিরাপদ, স্থিতিশীল, মর্যাদাপূর্ণ, গণতান্ত্রিক ভূমি হিসেবে দেখতে পারেনি। নারীর নিরাপদ সম্মানজনক স্বাধীন অস্তিত্ব বারবার হুমকির মধ্যে পড়েছে। জীবন-জীবিকার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা, শিল্পকলা, সংগীত, চলচ্চিত্র, নাটক, খেলাধুলা, এমনকি প্রাচীন ঐতিহ্যের ওপরও বারবার হামলা এসেছে। আশঙ্কা করার যথেষ্ট যুক্তি আছে, আফগান মানুষের আরও বহু অশান্তি ও সহিংসতা মোকাবিলার শক্তি সঞ্চয় করতে হবে। আফগান নারী-পুরুষসহ সব শ্রেণির মানুষের নিরাপদ, সম্মানজনক, গণতান্ত্রিক, সমতা ও শান্তিপূর্ণ জীবনের স্বপ্ন ও লড়াই শক্তিশালী হোক।

আনু মুহাম্মদ অর্থনীতিবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং সর্বজনকথা পত্রিকার সম্পাদক [email protected]

মতামত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন