বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

একইভাবে ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর আগে প্রতিটি শহরে শাখা ছিল, এখন ই-ট্রাভেল কোম্পানির অনলাইনের ব্যবসা সামলাতে স্বল্পসংখ্যক কর্মী আর ছোট একটি অফিসেই কাজ হচ্ছে। অনলাইন কোম্পানিগুলো উৎপাদকের কাছ থেকে যখন পণ্য কেনে, তখন তারা অন্যান্য ছোট ও মাঝারি দোকানের চেয়ে কয়েক গুণ পণ্য একসঙ্গে কিনতে পারে। তাই তারা পাইকারি দামেও বড় ধরনের ছাড় আদায় করতে পারে। সুতরাং তারা সাধারণ ভোক্তার কাছে পণ্য বিক্রির সময়ে বড় ধরনের ছাড় দিতে পারবে, সেটাই তো স্বাভাবিক।

ই-বাণিজ্যের ধারণা ও চল—কোনোটিই নতুন নয়, বাংলাদেশে বরং এটি শুরু হয়েছে একটু দেরিতে। কিন্তু এখন বোঝা যাচ্ছে, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে এ ধরনের বাণিজ্যব্যবস্থার কোনো প্রস্তুতিই নেওয়া হয়নি। ই-বাণিজ্যের সুবিধা নিতে মানুষ কেন টাকা দিয়েছেন, সে জন্য প্রতারিত ভোক্তা নানা ধরনের অশ্রাব্য গালি শুনছেন। এ গঞ্জনা যে শুধু পরিবারের সদস্য বা বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে শুনছেন তা-ই নয়, এমনকি খোদ প্রতারকও ভোক্তাকে দায়ী করে বলছেন, মানুষের অতিরিক্ত লোভের কারণেই নাকি ই-বাণিজ্যের এ অবস্থা। ‘আনন্দের বাজার’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আহমুদুল হক খন্দকার পলাতক অবস্থায় ফেসবুক লাইভে বলেছেন, ‘আপনারা কেন ছাড়ে পণ্য নেন? কেন মোটরসাইকেল, ফ্রিজ নেন ছাড়ে? কেন ছাড় ছাড়া মাল কেনেন না? গ্রাহকেরা লোভী। তাঁদের কারণেই আজ এ অবস্থা।’ (গ্রাহকদেরই লোভী বললেন পলাতক ‘আনন্দের বাজার’-এর এমডি, প্রথম আলো, ৯ অক্টোবর ২০২১)

অবশ্য তার আগেই বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছেন, গ্রাহকেরা কম দামে পণ্য কিনতে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাঁর প্রশ্ন, গ্রাহকের ক্ষতির দায় সরকার নেবে কেন? বাণিজ্যমন্ত্রী বাজার অর্থনীতিতে আছেন, নাকি নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতিতে আছেন, বোঝা দায়। বাজার অর্থনীতির প্রতিযোগিতামূলক পণ্যমূল্যের বদলে তাহলে তো তাঁর মন্ত্রণালয়ের বেঁধে দেওয়া দামেই সবকিছু বিক্রি হওয়ার কথা। বাজারে যে এখন সব জিনিসের দাম আকাশ ছুঁয়েছে, তেমনটি তো তাহলে হওয়ার কথা নয়।

ইভ্যালির প্রতারণার খোলস খসে পড়া থেকে যে কাহিনির শুরু, তাতে এখন পর্যন্ত ডজনের বেশি কথিত ই-উদ্যোক্তার প্রতারণা প্রকাশ পেয়েছে। সব ক্ষেত্রেই গল্পটা একই। চটকদার ছাড়ে নানা ধরনের পণ্য ও সেবা বিক্রির বিজ্ঞাপনে ভোক্তারা সরল বিশ্বাসে টাকা দিয়ে প্রতিশ্রুত পণ্যের আশায় বসে দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ অপেক্ষা করেছেন, তারপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা গ্রাহকসেবার নম্বরে ফোন করে ফল না পেয়ে অফিস কামাই করে কোম্পানির অফিসে গিয়ে তাদের আসল পরিচয় টের পেয়েছেন।

অনলাইনে টাকা দেওয়ার সময় তাঁরা যৌক্তিকভাবেই ভেবেছেন, দেশে তো ব্যবসা-বাণিজ্যের আইন আছে, ভোক্তাস্বার্থ সংরক্ষণের আলাদা দপ্তর আছে, সরকার আছে। সরকার অনুমোদিত লেনদেনব্যবস্থায় তাঁরা টাকাও দিয়েছেন অনলাইন ব্যাংকিং অথবা মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থায়; কাঁচাবাজারে যেভাবে ব্যাগে ভরে নগদ নিয়ে সদাই করতে হয়, সে রকম সেকেলে কোনো ব্যবস্থায় নয়।

এতগুলো প্রতারণার ঘটনায় প্রমাণিত হচ্ছে অনলাইন ব্যবসার জন্য দেশে উপযুক্ত আইন, তদারকি ব্যবস্থা, প্রতিকার—এগুলোর কিছুই নেই। সরকার আছে, তবে তা দায় অস্বীকারের জন্য। বাণিজ্যমন্ত্রী যদিও বলেছেন, যেসব ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম-দুর্নীতি রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে সরকার কাজ করছে। বিষয়টি যেন এমন যে প্রতারকের বিচার করলেই গ্রাহকের দুঃখমোচন হবে।

অন্যান্য দেশে যেসব ব্যাংক বা কোম্পানি ক্রেডিট কার্ডের কারবার করে, তাদের আলাদা দায়িত্ব রয়েছে। গ্রাহক কার্ডের মাধ্যমে কেনা জিনিস না পেলে কিংবা গুণগত মানে সন্তুষ্ট না হলে সেটি ফেরত পাঠানোয় জটিলতা হলে ক্রেডিট কার্ড কোম্পানিকে জানালে গ্রাহক টাকা ফেরত পান। ক্রেডিট কার্ড কোম্পানি পরে ওই বিক্রেতাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেন সমন্বয় করে নেয়। ফলে অনলাইন বিক্রেতা প্রতারণার সুযোগ পায় না এবং গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হয় না।

২০১৯ সালের নভেম্বরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এ রকম একটি ব্যবস্থা ‘এসক্রো সেবা’ চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছিল, যাতে গ্রাহক পণ্য হাতে পাওয়ার পর টাকা পাবে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান। তার আগে টাকা জমা থাকবে বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের কাছে। সেই নির্দেশনা গত দুই বছরেও বাস্তবায়িত হয়নি বলেই জানা যাচ্ছে। আবার ইভ্যালির ক্ষেত্রে জানা যাচ্ছে আরও চমকপ্রদ কিন্তু অতীব রহস্যজনক তথ্য। সংবাদপত্রের অনুসন্ধানে যখন জানা গেল পণ্য কিনলেই অর্থ ফেরতের অস্বাভাবিক ‘ক্যাশব্যাক’ অফার দিয়ে যে ব্যবসা তারা করছে, তাতে মানি লন্ডারিং ঘটছে বলে সন্দেহ তৈরি হয়েছে, তখন তাদের সব ব্যাংক হিসাব এক মাসের জন্য স্থগিত করে দেয় বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। কিন্তু ইভ্যালির লেনদেনের বিস্তারিত অনুসন্ধান না করেই তাদের ব্যাংক হিসাব খুলে দেওয়া হয় এবং অনিয়মের খোঁজ মেলে আট মাস পর। এ সময়ে প্রতারিত হন আরও হাজার হাজার গ্রাহক (কার ইশারায় ইভ্যালির স্থগিত ব্যাংক হিসাব খুলে দেওয়া হয়েছিল? প্রথম আলো, ৭ অক্টোবর ২০২১)।

এতগুলো প্রতারণার ঘটনায় প্রমাণিত হচ্ছে অনলাইন ব্যবসার জন্য দেশে উপযুক্ত আইন, তদারকি ব্যবস্থা, প্রতিকার—এগুলোর কিছুই নেই। সরকার আছে, তবে তা দায় অস্বীকারের জন্য। বাণিজ্যমন্ত্রী যদিও বলেছেন, যেসব ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম-দুর্নীতি রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে সরকার কাজ করছে। বিষয়টি যেন এমন যে প্রতারকের বিচার করলেই গ্রাহকের দুঃখমোচন হবে। সরকারের তাড়া আছে দেশকে ডিজিটাল রাষ্ট্র হিসেবে দেখানোর। সুতরাং ই-উদ্যোক্তা বানানোর জন্য নানা রকম প্রণোদনাও আছে। অল্প দিনেই ই-বাণিজ্যের যে প্রসার ঘটেছে, তার কৃতিত্ব কার, প্রশ্ন করারও প্রয়োজন নেই। এর একমাত্র দাবিদার সরকার। কিন্তু আইনের দুর্বলতা ও তদারকির অভাবে ই-বাণিজ্য যখন সীমাহীন প্রতারণার হাতিয়ার হয়ে উঠছে, তখন দায় নিরীহ ক্রেতার। এত দিন ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষকে এ রকম দোষারোপের ব্যাপারটা ছিল শুধু শেয়ারবাজারে। এখন সবকিছুতেই দোষ শুধু কথিত পাবলিকের। এখন যারাই কর্তৃপক্ষ, তারাই মনে হয় দায় অস্বীকারের সংস্কৃতিকে বেশ রপ্ত করে নিয়েছে।

কামাল আহমেদ সাংবাদিক

মতামত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন