ডানপন্থী পপুলিজম: সামরিক শক্তির ভাষাকে কারা ব্যবহার করতে চায়

ডানপন্থী পপুলিস্ট রাজনীতি এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে পারে, যেখানে বেশি সামরিক শক্তিকে দেশপ্রেমের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। ডানপন্থী পপুলিজম নিয়ে লিখেছেন আসিফ বিন আলী

আসিফ বিন আলী

বিশ্বের ডানপন্থী পপুলিস্ট রাজনীতির দিকে তাকালে একটা বিষয় প্রায়ই চোখে পড়ে। শক্তিশালী রাষ্ট্র, শক্তিশালী সীমান্ত, শক্তিশালী সামরিক বাহিনী—এই শব্দগুলো ডানপন্থী পপুলিস্ট রাজনীতির রাজনৈতিক ভাষায় খুব পরিচিত। সঙ্গে থাকে শত্রু, জাতীয় অপমান, প্রতিশোধ, হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আমেরিকাকে আবার মহান করতে হবে’ থেকে নরেন্দ্র মোদির শক্তিশালী ভারতের ভাষা, ইউরোপের বিভিন্ন ডানপন্থী পপুলিস্ট দলের রাজনীতিতেও এ সুর কমবেশি পাওয়া যায়।

তাহলে কি ডানপন্থী পপুলিজম স্বাভাবিকভাবেই যুদ্ধপ্রিয়? প্রশ্নটা এভাবে করলে বিষয়টা অতিরিক্ত সরল হয়ে যায়। গবেষণাগুলোও সরাসরি তা বলে না। ডানপন্থী পপুলিজমের সঙ্গে সামরিকতাবাদের একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে যুদ্ধ করতেই হবে। কিন্তু শক্তি দেখাতে হবে, শত্রুকে ভয় দেখাতে হবে, প্রয়োজনে আঘাত করার সক্ষমতা প্রদর্শন করতে হবে আর সামরিক শক্তিকে জাতীয় মর্যাদার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হিসেবে তুলে ধরতে হবে। এই রাজনৈতিক ভাষা ডানপন্থী পপুলিজমের কেন্দ্রীয় ভাষা।

আরও পড়ুন

এটা অবশ্য একেবারে নতুন কোনো রাজনীতি নয়। ইউরোপের বিংশ শতাব্দীর ইতিহাসে জাতীয় অপমান, হারানো গৌরব এবং সামরিক শক্তির মধ্যে সম্পর্ক আমরা আরও ভয়াবহভাবে দেখেছি। এখানে একটা পার্থক্য শুরুতেই পরিষ্কার করা দরকার। আজকের ডানপন্থী পপুলিজমকে ফ্যাসিবাদের সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক হবে না। দুটো এক জিনিস নয়। কিন্তু ইতিহাসে জাতীয় পুনর্জাগরণের রাজনীতি কীভাবে সামরিক শক্তির সঙ্গে যুক্ত হয়, সেটা বোঝার জন্য ফ্যাসিবাদী ইতালি বা নাৎসি জার্মানি খুব গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

মুসোলিনির রাজনীতির একটা বড় অংশ ছিল ইতালিকে আবার একটি মহান শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। ১৮৯৬ সালে আদওয়ার যুদ্ধে ইথিওপিয়ার কাছে ইতালির পরাজয় জাতীয় অপমানের স্মৃতি হিসেবে রয়ে গিয়েছিল। ১৯৩৫ সালে মুসোলিনি ইথিওপিয়া আক্রমণ করেন। সেই যুদ্ধকে ইতালির হারানো সাম্রাজ্যিক মর্যাদা ফিরে পাওয়ার প্রকল্প হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। 

► নিরাপত্তা, সীমান্ত, প্রতিরক্ষা কিংবা পররাষ্ট্রনীতি—সবই জটিল হিসাবের বিষয়। সেখানে সামরিক সক্ষমতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, কূটনীতিও গুরুত্বপূর্ণ; ঝুঁকি যেমন আছে, ব্যয়ও আছে; কখনো প্রতিরোধ দরকার, কখনো আপসও দরকার। ► ডানপন্থী পপুলিজমের বিপদ তাই শুধু যুদ্ধ শুরু হওয়ার মধ্যে নয়; বরং বিপদ শুরু হয় অনেক আগেই, যখন যুদ্ধের ভাষা স্বাভাবিক হয়ে যায়, সামরিক শক্তি যুক্তির পাশাপাশি আবেগ ও আত্মমর্যাদার বিষয় হয়ে ওঠে।

একইভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির পরাজয় এবং ভার্সাই চুক্তির অপমানকে নাৎসি রাজনীতি খুব কার্যকরভাবে ব্যবহার করে। ১৯৩৬ সালে হিটলার ভার্সাই ও লোকার্নো ব্যবস্থার শর্ত অমান্য করে রাইনল্যান্ডে জার্মান সেনা পাঠান।

ঘটনাটি সামরিক দিক থেকে তখন খুব বড় যুদ্ধ ছিল না, কিন্তু রাজনৈতিক দিক থেকে ছিল বিশাল। বার্তাটা ছিল, আগের দুর্বল রাষ্ট্র যে অপমান মেনে নিয়েছিল, নতুন শক্তিশালী নেতৃত্ব সেটা আর মানবে না। এই জাতীয় অপমান থেকে জাতীয় পুনর্জন্ম এবং জাতীয় পুনর্জন্ম থেকে সামরিক শক্তি প্রদর্শন, এটা ইতিহাসে নতুন নয়।

আরও পড়ুন

ইতিহাসের শিক্ষা নিশ্চয়ই এটা নয় যে আজকের প্রত্যেক ডানপন্থী পপুলিস্ট শেষ পর্যন্ত হিটলার বা মুসোলিনি হয়ে উঠবেন। এ আলাপে তাই আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। বাস্তবতা হলো, জাতীয় অপমানের গল্প, হারানো গৌরবের গল্প এবং সামরিক শক্তির গল্প যখন একসঙ্গে মিশে যায়, তখন অস্ত্র শুধু নিরাপত্তার উপকরণ থাকে না। সেটি নিজেই রাজনৈতিক ভাষায় পরিণত হতে পারে।

পপুলিজমের মূল গল্পের সঙ্গেও এই ভাষা খুব সহজে খাপ খায়। একদিকে থাকে ‘প্রকৃত জনগণ’, অন্যদিকে দুর্নীতিগ্রস্ত বা বিশ্বাসঘাতক এলিট। পপুলিজমের সমর্থকেরা বলেন, জনগণকে ঠকানো হয়েছে, দেশকে দুর্বল করা হয়েছে, আগের শাসকেরা মাথা নত করেছেন। ডানপন্থী পপুলিজমের সঙ্গে যখন অতি জাতীয়তাবাদ যুক্ত হয়, তখন শত্রুর তালিকাও দেশের ভেতরে আটকে থাকে না। সেখানে বিদেশি শক্তি আসে, প্রতিবেশী আসে, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান আসে। রাজনৈতিক যুক্তিটা তখন মোটামুটি এমন: ‘আমাদের দুর্বলতার সুযোগ সবাই নিয়েছে। কারণ, আমাদের নেতৃত্ব দুর্বল ছিল; এখন এমন রাজনীতি ও নেতা দরকার, যিনি কাউকে ভয় পাবেন না।’

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নরেন্দ্র মোদি

রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গবেষক মিননি জু, ব্র্যান্ডন বোল্টে, নগুয়েন হুইন, ভিনিতা যাদব ও বুম্বা মুখার্জি ২০২৫ সালে জার্নাল অব কনফ্লিক্ট রেজোল্যুশন-এ প্রকাশিত গবেষণায় ১৮৮৬ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বিশ্বের পপুলিস্ট নেতাদের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, ডানপন্থী পপুলিস্ট নেতারা যখন জাতীয় অপমান, প্রতিশোধ এবং অতি জাতীয়তাবাদের ভাষা ব্যবহার করেন, তখন মানুষের মধ্যে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সমর্থন বাড়তে পারে। অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রে এই নেতাদের সামরিক বিরোধ শুরু করার প্রবণতাও তুলনামূলক বেশি পাওয়া গেছে। 

এখানে জনমতের ফলটি এসেছে ভারত ও জাপানে করা সার্ভে এক্সপেরিমেন্ট থেকে; আর ১৮৮৬-২০১৪ সালের বৈশ্বিক ডেটাসেটটি ব্যবহার করা হয়েছে ডানপন্থী পপুলিস্ট নেতাদের সামরিক বিরোধ শুরু করার প্রবণতা যাচাই করতে। এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ডানপন্থী নেতার নিজের রাজনৈতিক ভাষার ফাঁদ।

একজন নেতা প্রথমে জনগণকে বোঝান যে দেশ অপমানিত হয়েছে। এরপর বলেন, তিনি সেই অপমানের জবাব দেবেন। কোনো বাস্তব সংকট তৈরি হলে তিনি তখন শুধু রাষ্ট্রীয় স্বার্থের হিসাব করছেন না, নিজের তৈরি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির সঙ্গেও লড়ছেন। বহুদিন ধরে শক্তির ভাষা ব্যবহার করার পর হঠাৎ সংযম দেখানো রাজনৈতিকভাবে কঠিন হয়ে পড়ে। সেখান থেকেই রাজনীতি আপস, মীমাংসা ও সহাবস্থানের দিকে না গিয়ে একগুঁয়েমি ও সংঘর্ষের দিকে এগিয়ে যায়।

আরও পড়ুন

সামরিক শক্তির আরেকটি বড় রাজনৈতিক সুবিধা আছে: এটি দেখা যায়। যেমন ধরুন, একটা ভালো বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করতে ১০ বছর লাগতে পারে। স্বাস্থ্যব্যবস্থা সংস্কারের ফল পেতে আরও বেশি সময় লাগতে পারে। প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হলে তার ছবি দিয়ে খুব বেশি রাজনৈতিক নাটক তৈরি করা যায় না। কিন্তু যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রদর্শন করা যায়। সামরিক মহড়া করা যায়। সীমান্তে সেনা পাঠানো যায়। এগুলোর ছবি আছে, নাটকীয়তা আছে, সঙ্গে অনেক হাততালিও পাওয়া যায়।

ডাফনে শ্যারোট ২৩টি ইউরোপীয় ন্যাটো দেশের ২০০০ থেকে ২০২০ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে ‘ডিফেন্স স্টাডিজ’-এ দেখিয়েছেন, যেসব দেশে ডানপন্থী পপুলিস্ট দল বেশি ভোট পেয়েছে, সেখানে মোট সামরিক ব্যয় এবং সামরিক সরঞ্জামে ব্যয়ের অনুপাত বেশি হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক পাওয়া যায়। তবে গবেষক এখানে সতর্ক করেছেন যে এই সম্পর্ক সরাসরি কারণ-ফল প্রমাণ করে না। তবে গবেষণাটির মূল প্রশ্ন ছিল, আশ্রয়প্রার্থী মানুষের সংখ্যা ও প্রতিরক্ষা ব্যয়ের সম্পর্ক।

তবে একটি সতর্কতা আমাদের মনে রাখা জরুরি। সব প্রতিরক্ষা ব্যয় খারাপ নয়। শক্তিশালী সামরিক বাহিনী থাকাও সামরিকতাবাদের প্রমাণ নয়। রাষ্ট্রের বাস্তব নিরাপত্তা প্রয়োজন আছে। সমস্যা অন্য জায়গায়। যখন অস্ত্র কেনা নিজেই দেশপ্রেমের প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায় আর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি কিংবা প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার প্রশ্নকে তুলনামূলকভাবে ‘দুর্বল’ রাজনীতি হিসেবে দেখানো শুরু হয়, তখন নিরাপত্তানীতি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক প্রদর্শনীতে পরিণত হয়।

ডানপন্থী রাজনীতি সামরিকতাবাদকে এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তাকে একটি প্রায় পবিত্র অঞ্চল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। এ ক্ষেত্রে যেকোনো প্রশ্ন করলেই প্রশ্নকারীর দেশপ্রেম নিয়ে সন্দেহ করা হয়। কত অস্ত্র দরকার, কেন দরকার, কোন হুমকির জন্য দরকার, সেই টাকা কোথা থেকে আসবে, ব্যয় কত—এসব প্রশ্ন তখন অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে।

ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও যুক্তরাজ্যের ৭ হাজার ৭৮৮ জনের ওপর পিয়েরাঞ্জেলো ইসেরনিয়া, ম্যাথিয়াস মাডার, সেরজিও মার্তিনি, বোগদান রাদু ও হারাল্ড শ্যোন যৌথভাবে একটি গবেষণা করেন। এ গবেষণা প্রকাশ করেছে ইউরোপিয়ান পলিটিক্যাল সায়েন্স রিভিউ

গবেষণাটি দেখিয়েছে, পপুলিস্ট মনোভাব যাঁদের মধ্যে বেশি, তাঁরা একদিকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি জড়িয়ে থাকার ব্যাপারে বেশি অনাগ্রহী, আবার একই সঙ্গে সামরিক শক্তি ও প্রয়োজনে বল প্রয়োগের ব্যাপারে তুলনামূলকভাবে বেশি ইতিবাচক। 

তবে এটাও উল্লেখ্য, গবেষণাটি ডানপন্থী পপুলিস্টদের আলাদা করে পরীক্ষা করেনি; বরং এটি সাধারণ পপুলিস্ট অ্যাটিচিউডস মেপেছে। অর্থাৎ অনেক সময় পপুলিস্ট ডানপন্থীরা বলতে পারেন, ‘আমাদের খুব শক্তিশালী সেনাবাহিনী দরকার, কিন্তু অন্যের যুদ্ধে গিয়ে বছরের পর বছর পড়ে থাকতে চাই না।’ ট্রাম্পের ‘শক্তির মাধ্যমে শান্তি’ ধরনের রাজনীতি এই বৈপরীত্য বোঝার একটা উদাহরণ। এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় আলাপ থাকে: ‘আমরা যুদ্ধ চাই না, কিন্তু আমাদের শক্তি এত বেশি হবে যে কেউ আমাদের চ্যালেঞ্জ করার সাহস করবে না। আর কেউ করলে তার ভয়াবহ মূল্য দিতে হবে।’

এ অবস্থান নিজের মধ্যে অসংগত নয়। সমস্যা তৈরি হয় যখন শক্তি প্রদর্শনকে রাজনৈতিক সাহসের প্রধান মানদণ্ড বানানো হয়। একটি সমাজকে যদি দীর্ঘদিন ধরে শেখানো হয়, শক্তি দেখানো মানেই সাহস, তাহলে সংযমকে দুর্বলতা বলা খুব সহজ হয়ে যায়।

ডানপন্থী রাজনীতি সামরিকতাবাদকে এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তাকে একটি প্রায় পবিত্র অঞ্চল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।
ছবি: এএফপি

ডানপন্থী পপুলিজমের আরেকটি পুরোনো রাজনৈতিক প্রয়োজন হলো ‘শত্রু’ আবিষ্কার। শুধু দেশের ভেতরের শত্রু নয়, বাইরের শত্রুও। ডেভিড ক্যাডিয়ের ২০২৪ সালে ফরেন পলিসি অ্যানালাইসিস-এ প্রকাশিত গবেষণায় দেখিয়েছেন, পপুলিস্ট সরকারগুলো পররাষ্ট্রনীতিকে দেশের ভেতরের রাজনৈতিক লড়াইয়ের ধারাবাহিকতা হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা দেখায়।

পূর্ববর্তী সরকারকে দুর্বল বলা, বিরোধীদের বিদেশি শক্তির সহযোগী হিসেবে দেখানো আর বাইরের বিরোধকে দেশের ভেতরে সমর্থক সংগঠনের কাজে লাগানো—এগুলো পপুলিস্ট পররাষ্ট্রনীতির পরিচিত কৌশল। তবে এটি বিভিন্ন দেশের তুলনামূলক পরিসংখ্যানভিত্তিক পরীক্ষা নয়; ক্যাডিয়ের একটি তাত্ত্বিক কাঠামো তৈরি করে মূলত পোল্যান্ডের উদাহরণ দিয়ে সেটি ব্যাখ্যা করেছেন।

এর রাজনৈতিক ফল খুব পরিচিত। সীমান্ত বিরোধ আর শুধু সীমান্ত বিরোধ থাকে না, সেটি দেশপ্রেমের পরীক্ষা হয়ে যায়। কোনো আন্তর্জাতিক সমঝোতা তখন শুধু নীতিগত প্রশ্ন থাকে না; কে দেশপ্রেমিক আর কে বিশ্বাসঘাতক, সেই লড়াইয়ের অংশ হয়ে ওঠে। সমালোচনা মূলত এখানেই। নিরাপত্তা, সীমান্ত, প্রতিরক্ষা কিংবা পররাষ্ট্রনীতি—সবই জটিল হিসাবের বিষয়। সেখানে সামরিক সক্ষমতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, কূটনীতিও গুরুত্বপূর্ণ; ঝুঁকি যেমন আছে, ব্যয়ও আছে; কখনো প্রতিরোধ দরকার, কখনো আপসও দরকার। এই জটিলতাকে শুধু নৈতিক নাটকে প্রকাশ করলে বাস্তব হিসাবের জায়গাটা দ্রুত ছোট হয়ে যায়।

গবেষক সান্দ্রা দেশত্রাদি ও ইয়োহানেস প্লাগেমান ২০২৪ সালে ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স’-এ ভারত, বলিভিয়া ও ফিলিপাইনের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিরোধ বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, পপুলিস্ট সরকার ক্ষমতায় এলেই সংঘাত বাড়ে না। কিন্তু কোনো আন্তর্জাতিক বিরোধ যদি দেশের ভেতরে রাজনৈতিক সমর্থন তৈরির বড় হাতিয়ার হয়ে যায় এবং একই সঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণ একজন নেতার হাতে খুব বেশি কেন্দ্রীভূত হয়, তখন সংঘাত বাড়ার ঝুঁকি বাড়ে।

এ গবেষণা থেকে আমরা দুটি বিষয়ে ধারণা পাই। প্রথমত, ডানপন্থী পপুলিস্ট মানেই যুদ্ধ, এটা সত্য নয়। কিন্তু আমরা এ–ও জানতে পারি যে ডানপন্থী পপুলিস্টরা এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করেন, যেখানে একজন নেতা সব সময় শক্তিশালী দেখাতে বাধ্য।

ধরা যাক, ডানপন্থী পপুলিস্টরা ১০ বছর ধরে বলে যাচ্ছেন, ‘আমরা কাউকে ভয় পাই না, আগের সরকার মাথা নত করেছে, আমার সময়ে কেউ আমাদের অপমান করতে পারবে না।’ বাস্তব কোনো সংকটের মুহূর্তে তাঁর সামনে তখন কেবল নিরাপত্তা বা জাতীয় স্বার্থের হিসাব থাকবে না। নিজের রাজনৈতিক চরিত্রটাও বাঁচাতে হবে। পিছু হটা তখন শুধু কৌশল বদলানো নয়, নিজের তৈরি গল্পকে অস্বীকার করা। এটি গণতান্ত্রিক রাজনীতিকে হুমকির মুখে ফেলে।

ডানপন্থী রাজনীতি সামরিকতাবাদকে এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তাকে একটি প্রায় পবিত্র অঞ্চল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। এ ক্ষেত্রে যেকোনো প্রশ্ন করলেই প্রশ্নকারীর দেশপ্রেম নিয়ে সন্দেহ করা হয়। কত অস্ত্র দরকার, কেন দরকার, কোন হুমকির জন্য দরকার, সেই টাকা কোথা থেকে আসবে, ব্যয় কত—এসব প্রশ্ন তখন অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে।

অথচ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সামরিক বাহিনী শক্তিশালী হবে কি না, শুধু এটুকুই প্রশ্ন নয়। কতটা শক্তিশালী, কোন উদ্দেশ্যে, কী ধরনের হুমকি মোকাবিলার জন্য এবং কোন জবাবদিহির মধ্যে—এগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সমস্যাটা এই নয় যে ডানপন্থী পপুলিস্টরা সবাই যুদ্ধ করতে চান। ডানপন্থী পপুলিস্ট রাজনীতি এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে পারে, যেখানে বেশি অস্ত্রকে বেশি দেশপ্রেমের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। তারা রাজনৈতিক আপসকে সন্দেহের চোখে দেখে। সংযমকে দুর্বলতা বলে চালিয়ে দেয় আর শত্রুকে আঘাত করার কল্পনা জাতীয় গৌরবের অংশ হিসেবে প্রচার করে।

বাস্তবতা হলো, যুদ্ধবিমান এবং সৈনিকের কুচকাওয়াজের ছবি তোলা যায়। কিন্তু যুদ্ধ এড়িয়ে যাওয়ার সাফল্য খুব কমই দৃশ্যমান। শক্তির প্রদর্শন অনেক সময় জনপ্রিয়, কিন্তু সংযমের রাজনৈতিক পুরস্কার খুব কম। ডানপন্থী পপুলিজমের বিপদ তাই শুধু যুদ্ধ শুরু হওয়ার মধ্যে নয়; বরং বিপদ শুরু হয় অনেক আগেই, যখন যুদ্ধের ভাষা স্বাভাবিক হয়ে যায়, সামরিক শক্তি যুক্তির পাশাপাশি আবেগ ও আত্মমর্যাদার বিষয় হয়ে ওঠে।

আসিফ বিন আলী যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ডক্টরাল ফেলো

*মতামত লেখকের নিজস্ব