বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সরকার এবং তার সমর্থকেরা বারবার বলছেন, দেশ উন্নয়নের মডেলে পরিণত হয়েছে। এ অবস্থায় একজন শহর বানু তো প্রশ্ন করতেই পারেন, তাঁর ভাগ্যের কী উন্নয়ন হলো? চোখের সামনে বিশাল আকারের সব অবকাঠামো গড়ে উঠছে, উন্নয়নের কথিত সূচক জিডিপির হিসাবে প্রবৃদ্ধি বাড়ছে, কিন্তু এর সঙ্গে তাঁর কী সম্পর্ক, সে কথা নিশ্চয় নাগরিকেরা জানতে চাইতেই পারেন।

শহর বানুর এ প্রশ্ন আপনাদের আসলেই যা দেখিয়ে দেয়, তা হচ্ছে কোন উন্নয়নের মডেল হচ্ছে বাংলাদেশ। এ উন্নয়নের মডেলে যাঁরা দরিদ্র, তাঁরা আরও দরিদ্র হচ্ছেন—এটা কেবল কথার কথা নয়। ২০১০ ও ২০১৬ সালের খানা জরিপে দেখা যায়, সর্বনিম্ন ৫ শতাংশ জিডিপি অর্জনকারী খানাগুলোর হাতে ছিল মোট জিডিপির শূন্য দশমিক ৭৮ শতাংশ, ২০১৬ সালে তা দাঁড়িয়েছে শূন্য দশমিক ২৩ শতাংশ; অন্যদিকে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ জিডিপি অর্জনকারী খানাগুলোর ভাগ ২৪ দশমিক ৬১ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ। সহজ ভাষায়, বাংলাদেশে ১০০ টাকা আয়ের ২৮ টাকা যাচ্ছে ধনী ৫ শতাংশ পরিবারে, আর মাত্র ২৩ পয়সা পাচ্ছে সবচেয়ে গরিব ৫ শতাংশ পরিবার। শহর বানু সেই ৫ শতাংশের একজন। আয়ের এই বৈষম্য ভোগের ক্ষেত্রে বৈষম্য তৈরি করে। ভোগের ক্ষেত্রেও ২০২০ সালে বৈষম্য বেড়েছে—গিনি সূচক শূন্য দশমিক ৩৫, যা ২০১৬ সালে ছিল শূন্য দশমিক ৩২। এ হিসাব অতিমারির অনেক আগের। এ অবস্থার আরও অবনতি হয়েছে, সে কথা সবাই জানেন।

ফলে এ প্রশ্ন তোলাই দরকার—কার জন্য উন্নয়ন হচ্ছে? উন্নয়নের সুবিধাভোগী শ্রেণি যে একটি আছে, তা তো চারপাশে তাকালেই দেখা যায়। বাংলাদেশে গত দেড় দশকে এক নতুন ধনিকশ্রেণির উত্থান ঘটেছে, যারা দেশের বাইরে টাকা পাচার করছে অবলীলায়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি (জিএফআই) বলছে, ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে ৪ হাজার ৯৬৫ কোটি ডলার পাচার হয়েছে। প্রতি ডলার ৮৮ টাকা ধরে স্থানীয় মুদ্রায় যা ৪ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়ায়। এ হিসাব ২০১৫ সাল পর্যন্ত; সরকার এর পরের হিসাব জিএফআইকে দেয়নি। দিলে অবস্থাটা আরও স্পষ্ট হতো।

কারা এই উন্নয়নের সুবিধা পাচ্ছে? রেহমান সোবহানের কথায় সেটা এসেছে—প্রথমেই ‘রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া এলিট শ্রেণি’। আরও স্পষ্ট করে বললে যারা ক্ষমতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, সেই এলিট শ্রেণি। কেননা, ক্ষমতার অংশীদার না হলে এ আচরণ করা অসম্ভব। ব্যাংকিং খাত থেকে অর্থ লুট করে নেওয়াই একমাত্র কৌশল নয়; আরও অনেক পদ্ধতিই আমরা দেখতে পাই।

সরকারের এ তথ্য না দেওয়ার উদ্দেশ্য কী, সরকার তাদের সুরক্ষা করতেই উৎসাহী? এ কথা মনে হচ্ছে, কেননা অন্যত্র আমরা দেখতে পাই এই শ্রেণির মানুষের রক্ষা করা, তাদের হাতে জনগণের অর্থ তুলে দিতে সরকার মোটেই কুণ্ঠিত নয়। উদাহরণ হিসেবে খেলাপি ঋণ অবলোপনের বিষয়টি দেখা যেতে পারে। সহজ ভাষায় অবলোপন মানে হচ্ছে কাগজে-কলমে টাকার হিসাব বাদ দেওয়া। যাঁরা টাকা নিয়ে দেননি, তাঁদের আর এই টাকা ফেরত দিতে হবে না। গত চার বছরে ব্যাংকগুলো রাইট অফ বা অবলোপন করেছে ৯ হাজার ৩৭৭ কোটি টাকার মন্দ মানের ঋণ; এগুলো এখন আর ব্যাংকের ব্যালান্সশিটে নেই, যাঁরা এই অর্থ নিয়ে ফেরত দিলেন না তাঁদের কোনো দায় নেই, জবাবদিহি নেই। অধ্যাপক রেহমান সোবহান এ অবস্থার একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে, ‘রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া এলিট শ্রেণি ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করার রীতি চালু করেছে। পুঁজিবাদের অর্থনীতি থেকে এলিট শ্রেণি সুবিধা পেয়েছে। তারা প্রচুর অর্থসম্পদ স্থানান্তর করেছে।’

এটাই হচ্ছে উন্নয়নের মডেল, আর ওই যে অবলোপিত অর্থ, তার মধ্যেই শহর বানুর ‘উন্নয়ন’ লুকিয়ে আছে। ওই যে পাচার হয়ে যাওয়া অর্থ, তার মধ্যেই শহর বানুর ‘উন্নয়ন’ পাচার হয়ে গেছে।

কারা এই উন্নয়নের সুবিধা পাচ্ছে? রেহমান সোবহানের কথায় সেটা এসেছে—প্রথমেই ‘রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া এলিট শ্রেণি’। আরও স্পষ্ট করে বললে যারা ক্ষমতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, সেই এলিট শ্রেণি। কেননা, ক্ষমতার অংশীদার না হলে এ আচরণ করা অসম্ভব। ব্যাংকিং খাত থেকে অর্থ লুট করে নেওয়াই একমাত্র কৌশল নয়; আরও অনেক পদ্ধতিই আমরা দেখতে পাই। যেমন ভর্তুকি। মার্চ মাসে জানা গেছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বা বিপিডিবি ৩৭টি বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ ১৩ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র বছরের অধিকাংশ সময় অলস বসে ছিল। এই যে দেওয়া টাকা, তার পরিমাণ আগের বছরের চেয়ে ২১ শতাংশ বেশি। প্রচলিত প্রবাদ হচ্ছে, এগুলো গৌরী সেনের টাকা। এখন সময় এসেছে এটা বলার যে এগুলো শহর বানুর টাকা। সরকারি তথ্য–উপাত্ত বিশ্লেষণ করেই ‘বাংলাদেশ ওয়ার্কিং গ্রুপ অন এক্সটারনাল ডেবট’ বা বিডব্লিউজিইডি এ হিসাব দিয়েছে। যে ৩৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্র এই সুবিধা পেয়েছে, তার তালিকাও দিয়েছে এ সংগঠন। এ তালিকা ভালো করে দেখলেই বোঝা যাবে এদের সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের যোগাযোগটা কোথায়।

ব্যাংকের টাকা নিয়ে না দেওয়া আর সরকারি ভর্তুকিই এই শ্রেণির অর্থের উৎস নয়। দুর্নীতির এক মহোৎসব ঘটেছে করোনা অতিমারির এ সময়ে। সময়ে সময়ে এ নিয়ে গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। গত ১০ মার্চ স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, টিকা কার্যক্রমেই মোট ব্যয় হয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকা। ঠিক কীভাবে এই টাকা খরচ হয়েছে, এর বিস্তারিত কিছু বলেননি স্বাস্থ্যমন্ত্রী বা মন্ত্রণালয়।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) তাদের সাম্প্রতিক গবেষণায় বলেছে, প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকার হিসাব পাওয়া যায়নি। এ নিয়ে আলোচনায় সরকারের হয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আহমদ কায়কাউস, তাঁর প্রতিক্রিয়ায় ক্ষোভ আছে, কিন্তু হিসাব নেই।

একার্থে শহর বানু উন্নয়নের হিসাবের দাবিই করেছেন। এ হিসাব চাওয়া নাগরিকের কর্তব্য।

আলী রীয়াজ যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর, আটলান্টিক কাউন্সিলের অনাবাসিক সিনিয়র ফেলো এবং আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন