বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এর আগে ২০১৮ সালের ২৪ থেকে ২৫ মে রাতে ঘূর্ণিঝড় মেকুনু আঘাত হেনেছিল ওমানের সালালাহ শহরে। ৩ মাত্রার সেই ঝড়ে অনেক হতাহত মানুষের মধ্যে বাংলাদেশিরাও ছিলেন। ২০১০ সালের ঘূর্ণিঝড় ‘ফেত’ ওমানের পূর্ব উপকূল তছনছ করে দিলেও ২০০৭ সালের সুপার সাইক্লোন ‘গনু’তে হতাহত মানুষের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি আর তার একটা বড় অংশ ছিল বাংলাদেশিসহ প্রবাসী শ্রমিক। তাদের প্রকৃত সংখ্যা আর হালসাকিন কোনো দিন জানা যাবে না।
কেন বাংলাদেশিরা মরে বারবার

বাংলাদেশের হাতিয়া-সন্দ্বীপ এলাকার ৫০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি জেলে ওমান সাগরে ভাসমান জীবন কাটান। এটা আনুমানিক হিসাব, প্রকৃত হিসাব আল্লাহ জানেন। এক দিন আমির হয়ে দেশে ফিরে আসার অসম্ভব আশা বুকে নিয়ে ঘরবাড়ি, গরু–মহিষ বেঁচে, ধারকর্জ করে ওমানে যাওয়া মানুষগুলো প্রতারিত প্রবাসী।

উচ্চ আয়ের দেশে উড়নচণ্ডী বেদেজীবন বড় বেমানান। জীবিকার জন্য কেন তাঁরা ছুটে বেড়াবেন? তাঁবুতে তাঁবুতে জীবন কাটাবেন? যখন তেল ছিল না, আয়রোজগারের ঠিক ছিল না, তখন কথা অন্য ছিল। এখন টাকা হয়েছে, এখন কেন বেদেজীবন? বেদুইনরা মরুর বেদে। বেদুইনদের ভ্রাম্যমাণ জীবন থেকে থিতু জীবন তথা ‘সভ্য জীবন-জীবিকা’য় ফিরিয়ে আনার নানা ফন্দি আঁটে ওমান সরকার। ডাঙার বেদুইনদের সম্মানজনক জীবিকার জন্য জলে ভাসিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা হাতে নেয়। হাজার বছর ধরে মরুভূমি আর ভেড়া–বকরির পেছনে ছুটে বেড়ানো বেদুইনদের জন্য বিকল্প পেশা ঠিক করা হয় মাছ ধরা। বিনা মূল্যে দেওয়া হয় ছোট–বড় নানা আকারের মাছ ধরার নৌকা, জাল ইত্যাদি। সত্তর দশকে তেলচুকচুকে হওয়ার আগে ওমানের আয়রোজগারের একটা প্রধান পথ ছিল সাগরের মাছ ধরা আর মাছের ব্যবসা। সেই ঐতিহ্যের সুবাদে হয়তো এ বিবেচনা। সরকার শর্ত দেয়, বেদুইনজীবন ত্যাগ করতে হবে, মাছ নিজেদের ধরতে হবে।

বাস্তবে সেটা হয়নি। ওমানি বেদুইনরা নৌকা–ইঞ্জিন–জাল ইত্যাদি পেয়ে রাতারাতি ‘কফিল’ বনে যান। সস্তা শ্রমিক দিয়ে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহের শর্ত পূরণের চেষ্টা করেন। অনেক ভারতীয় আর পাকিস্তানি ব্যবসায়ী বেদুইনদের কাছ থেকে নৌকা ইজারা নিয়ে কফিলের পক্ষ থেকে ব্যবসা ফাঁদেন। সরকার নিয়ম করে দেয় মাছ ধরার কাজে কেউ বিদেশ থেকে শ্রমিক আমদানি করতে পারবে না। তবে দোকান কর্মচারী বা গৃহকর্মী অথবা ভুয়া অফিসকর্মী, এমনকি পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসাবে নিয়ে বেদুইনদের হাওলা করে দেওয়ার ঘটনা আকছার ঘটছে। ধারদেনা করে অনেক স্বপ্ন নিয়ে দেশ ছাড়া এ নিরুপায় মানুষের ক্রীতদাসের জীবন মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। পাচারের শিকার অনেকে করাচি হয়ে চোরা নৌপথে ওমানে গিয়ে আটকে গিয়েছেন মাছ ধরার জালে।

ফরাসি গবেষক ড. মেরি প্যেকো (ল্যাবরেটরি অব আরবান অ্যানথ্রোপোলজি, ফ্রেঞ্চ ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর সায়েন্টিফিক রিসার্চ), বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়ে যাওয়া আর মানবেতর জীবনে বাঁধা পড়া—এসব ‘জাল–ক্রীতদাস’–এর করুন কাহিনি তুলে ধরেছেন তাঁর গবেষণা গ্রন্থে মাইগ্রেশন অ্যাজ আ রিস্কি গ্যামবেল: প্লেসেস অ্যান্ড নেটওয়ার্কস অব ডিপারচার টু দ্য গালফ অব বাংলাদেশি ফিশারম্যান।

অভিবাসীদের টাকায় চলা একটা দেশের আমলাতন্ত্রের নীতিমালা কেন অভিবাসীবান্ধব হবে না? বৈধ ও অবৈধের বাহাস বড় না তাঁদের জীবন রক্ষার প্রচেষ্টা বড়। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, তাঁদের পয়সায় আমাদের বেতন হয়। বঙ্গবন্ধু যেমন বলেছিলেন তাঁর দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাকে। এ কথাই আমাদের সব সময় মনে রাখতে হবে।

বেদুইনদের নৌকায় যেকোনো বিদেশি সে দেশের আইনের চোখে অপরাধী। তাই তাঁদের ডাঙায় এসে স্বাভাবিক চলাফেরা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। জাল–ক্রীতদাসদের মজুরির কোনো ঠিকঠিকানা নেই। মাছ পেলে মজুরি, না পেলে নেই। মাছ পেলে মজুরি ঠিক হয় সেদিন বাজারে ওই মাছের দরের ওপর। যেহেতু নৌকা আর সাগরপাড়ের অস্থায়ী ঝুপড়ি ছাড়া এই জাল–ক্রীতদাসেরা পুলিশের ভয়ে কোথাও যেতে পারেন না, তাই বাজারের হালহকিকত দর-বেদর তাঁদের জানা হয় না। মালিক যে দর এলান করেন, সেটাই মজুরদের মেনে নিতে হয়। লিজ নেওয়া ভারতীয়-পাকিস্তানিদের ভিড়ে দু-একজন বাংলাদেশি ভাগ্যবান ক্যাপ্টেনও আছেন। তবে নিষ্ঠুরতা আর প্রতারণায় কেউ কারও থেকে কম নয়।

আমাদের ওমান দূতাবাস ধরা খাওয়া এসব মানুষের অস্তিত্বই স্বীকার করে না। পুলিশের হাতে ধরা পড়লে আইনি সহযোগিতা দূরে থাক, হাসপাতাল বা জেলখানায় গিয়ে দেখা করা বা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলার কোনো রেওয়াজ মেরি প্যেকোর চোখে পড়েনি। দূতাবাসের কর্মকর্তাদের মতে, যেহেতু কাগজে-কলমে জেলে হিসেবে ওমান বাংলাদেশ থেকে কোনো জনশক্তি আমদানি করে না, তাই সেখানে কোনো জেলে থাকতে পারেন না বা নেই। কেউ থাকলে তিনি বেআইনি অভিবাসী। তাঁরা কেন অবৈধদের দায়িত্ব নিয়ে দেশের মান খোয়াবেন? এমন ধরনের যুক্তি তাঁদের কাজ সহজ করে দিলেও অসহায় বাংলাদেশিদের কোনো কাজে লাগে না। অন্যদিকে, ভারত বা পাকিস্তানি দূতাবাস তাদের নাগরিকদের পুলিশের হাত থেকে ছাড়িয়ে বিচারপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে যথেষ্ট তৎপর থাকে।

বৈধ কাগজপত্র হাতে না থাকায় পুলিশের ভয়ে ঝড়ের সময়ও নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য কোথাও যেতে পারেন না তাঁরা। মালিকেরা নৌকা নিয়ে ভাবলেও জাল–ক্রীতদাসদের নিয়ে ভাবেন না। তাঁদের উপকূলের পলিথিনের অস্থায়ী কুঁড়েঘরে থাকতে হয় চরম ঝুঁকি নিয়ে। এ রকম বিষণ্নতার কথা ভেবে পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে মেকুনু সাইক্লোনের সময় (মে ২০১৮) ভারত তার জেলেদের উদ্ধারের জন্য মুম্বাই থেকে দুটি উদ্ধারকারী জাহাজ (আইএনএস দীপক ও আইএনএস কচি) ওমান উপকূলে পাঠিয়েছিল, উদ্ধারও করেছিল অনেককে।

অভিবাসীদের টাকায় চলা একটা দেশের আমলাতন্ত্রের নীতিমালা কেন অভিবাসীবান্ধব হবে না? বৈধ ও অবৈধের বাহাস বড় না তাঁদের জীবন রক্ষার প্রচেষ্টা বড়। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, তাঁদের পয়সায় আমাদের বেতন হয়। বঙ্গবন্ধু যেমন বলেছিলেন তাঁর দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাকে। এ কথাই আমাদের সব সময় মনে রাখতে হবে।

গওহার নঈম ওয়ারা লেখক ও গবেষক। [email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন