default-image

সরকার নিজ থেকে জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ না নেওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে অংশীজনদের কোনো উদ্বেগ চোখে পড়েনি। তাঁরা সম্ভবত ধরেই নিয়েছিলেন, সরকারের দিক থেকে ঠেলা না আসা পর্যন্ত তাঁরা হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকবেন। যত দায়িত্ব, তা সব সরকারের। অ্যাটকো করেছেন তাঁদের বাণিজ্য-স্বার্থ নিয়ে কথা বলতে। এখনো তাঁদের দাবি হলো সম্প্রচার কমিশন গঠন করা। সরকার তা না করলেও তাঁদের কাজ বাড়বে না।
আর বর্তমান সরকার, যারা একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে জবরদস্তি ক্ষমতায় দীর্ঘ মেয়াদে টিকতে চাইছে, তাদের মূল অভিসন্ধি হলো সমালোচনা ও নিন্দা থেকে নিজেদের রক্ষা করা। সে জন্য তারা নীতিমালা নামের একটি বর্ম তৈরি করেছে। তবে সম্প্রচারমাধ্যম রেগুলেশনে রাষ্ট্র ও সরকারের উদ্বেগ যুক্তিসংগত ও সংবিধানসম্মত। যদিও নীতিমালার মাত্র কয়েকটি বেশ বিপজ্জনক, তবে মনে হচ্ছে এগুলো আমদানি করাই ছিল তাদের লক্ষ্য।সরকার মিডিয়াকে কন্ট্রোল করতে চাইছে। কিন্তু কন্ট্রোল ও রেগুলেশন এক নয়। কন্ট্রোল মানে স্বাধীনতা হরণ। আর রেগুলেশন হলো বিধি অনুসরণ।
কোনো শূন্যস্থানই অপূরণীয় থাকে না। অ্যাটকো যদি দায়িত্বশীল হতো, তাহলে তাঁরা এত দিনে অন্তত একটি যুক্তিসংগত বাধানিষেধ আরোপ করতেন। নাগরিকের বাক্স্বাধীনতা বিরাট বিপদে। কারণ, অ্যাটকো ও সরকার উভয়ই কমবেশি দায়িত্বহীন আচরণ করেছে। অ্যাটকোর উচিত ছিল স্ব-আরোপিত আচরণবিধি প্রস্তুত করতে উদ্যোগী হওয়া। কিন্তু তারা নিষ্ক্রিয় ছিল। এখন তারা কমিশন চাইছে। কিন্তু সরকারকে তারা সমষ্টিগতভাবে এটা বলতেও অনুৎসাহী বা অপারগ যে কী করে স্বাধীন কমিশন হবে। নীতিমালা বলেছে, ‘একটি স্বাধীন সম্প্রচার কমিশন গঠিত হবে।’ তার মানে দাঁড়াল, কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন হবে। দুদককেও ‘স্বাধীন ও স্বশাসিত’ লেখা হয়েছিল। আমাদের মানবাধিকার কমিশনকেও আইন বলেছে, এটি হবে সংবিধিবদ্ধ স্বাধীন সংস্থা। সরকারের করা অনুসন্ধান কমিটিই এই কমিশন করবে। এমনই কমিটি দিয়ে আমরা ইতিহাসের প্রথম নির্বাচন কমিশন পেয়েছিলাম। তাদের স্বাধীন তৎপরতা দেশবাসী হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। এর চেয়ে ভিন্ন কিছু হয়তো হবে না। কিন্তু মিডিয়াকে একটা লড়াই করতে হবে।
সম্প্রচার নীতিমালা নিয়ে ডামাডোলের মধ্যে রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলে নতুন চেয়ারম্যান নিযুক্ত করেছেন। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের গ্রামীণ ব্যাংক মামলায় সরকারের পক্ষে রায় দিয়ে বিচারপতি মমতাজউদ্দীন আহমেদ মিডিয়ায় আলোচিত হয়েছিলেন। তিনি গত সপ্তাহে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিয়েছেন। তাঁর কাছ থেকেই জানলাম, গত ফেব্রুয়ারি থেকে প্রেস কাউন্সিল মেয়াদোত্তীর্ণ। এতে আমাদের সরকার ও মিডিয়া মোগল কারও অসুবিধা হয়নি। চেয়ারম্যানসহ ১৫ সদস্যের একটি আধা বিচারিক সংস্থা প্রেস কাউন্সিল। যে দেশে প্রেস রেগুলেটরি সংস্থাকে টানা পাঁচ মাস অস্তিত্বহীন করে রাখা যায়, সে দেশের সরকার নিজেকে মিডিয়ার অপব্যবহার থেকে নাগরিকের রক্ষী বলে দাবি করতে পারে না। এক দেশে দুই আইন চলে না। সম্প্রচার ও মুদ্রণমাধ্যমের নীতিমালা দুই রকম হতে পারে না। যা বলা যাবে না, তা লেখা যাবে, এটা হতে পারে না। প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান জানালেন, তিনি প্রেস কাউন্সিল অ্যাক্টে সংশোধন আনার বিষয়ে মনোযোগ দেবেন। আমি বলি, প্রস্তাবিত কমিশন গঠনের দরকার নেই। প্রেস কাউন্সিলকেই ঢেলে সাজানো যেতে পারে। কমিশনের দায়িত্ব-কর্তব্য তারাই পালন করতে পারে। খামোখা দুটি সচিবালয় নিষ্প্রয়োজন। প্রেস কাউন্সিলের নাম বদলে রাখা যেতে পারে বাংলাদেশ মিডিয়া কাউন্সিল।
যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচ কমিশনারের ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন (এফসিসি) রেডিও-টিভির নজরদারি করে। পাঁচ বছর মেয়াদে প্রেসিডেন্ট কমিশনারদের নিয়োগ দেন। সিনেটই যথারীতি তা নিশ্চিত করে। কোনো একটি দল থেকে অনধিক তিনজন কমিশনার হন। তবে শর্ত হলো, কমিশন-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কমিশনারদের কারও কোনো অর্থনৈতিক স্বার্থ থাকতে পারবে না। আমাদের প্রস্তাবিত কমিশনকে স্বাধীন বলা হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্র তো গড়া হয়নি। একে আরও নষ্টভ্রষ্ট করা হয়েছে। সরকার ও সংসদকে আলাদা করা যায় না। তাই প্রশ্ন, সে কার থেকে স্বাধীন থাকবে?
২০০৩ সালে ব্রিটেনে গঠিত দি অফিস অব কমিউনিকেশনসকে সরকার থেকে স্বাধীন করলেও তাকে জবাবদিহি রাখা হয়েছে সংসদের কাছে। বাংলাদেশে যা সংসদ, তা-ই সরকার। প্রস্তাবিত কমিশনের সদস্যরা কার কাছে জবাবদিহি করবেন? রাষ্ট্রপতির কাছে? সরকার থেকে তাঁর কি কোনো আলাদা সত্তা আছে? ২০০৫ সালে গঠিত অস্ট্রেলিয়ান কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া অথরিটি একটি সরকারি সংস্থা। কিন্তু তাদের দায়িত্বের মধ্যে লেখা আছে, এই সংবিধিবদ্ধ সংস্থা রেডিও-টিভিকে সেলফ রেগুলেশনে উৎসাহিত করবে। ফ্লোর ক্রসিং-সংক্রান্ত ৭০ অনুচ্ছেদের দেশ আয়ারল্যান্ড। এই জিনিসের তুলনা কেবল এ পর্যন্ত আয়ারল্যান্ডেই পেলাম, তারা ২০০৯ সালে এ-সংক্রান্ত দুটি কমিশন বিলোপ করে ব্রডকাস্টিং অথরিটি অব আয়ারল্যান্ড করেছে। নয় সদস্যের এই সংস্থায় তথ্যমন্ত্রীর মনোনয়নে পাঁচজন ও সংসদের যৌথ কমিটির প্রস্তাবে চারজন সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
উন্নত গণতন্ত্রে মিডিয়া রেগুলেশন সরকারের প্রতি অন্যায্য সমালোচনা ঠেকাতে হয় না। সরাসরি কণ্ঠরোধে তাদের কারও কোনো এজেন্ডা নেই। এর প্রমাণ তাদের করা নীতিমালা বা বিধিবিধানে আওয়ামী লীগের বর্তমান কাণ্ডের কোনো ছাপ নেই। আসলে প্রস্তাবিত নীতিমালায় এমন কিছু বিষয়ের অবতারণা করা হয়েছে, যা একান্ত বাংলাদেশি শাসকগোষ্ঠীর নিজস্ব চিন্তা বা বিকারপ্রসূত। যেমন টক শোতে সব পক্ষের যুক্তি সমানভাবে তুলে ধরতে হবে। যেসব আমলার কাছে দণ্ডদানের ক্ষমতা আছে, তাঁদের কটাক্ষ করা যাবে না। অনেকেই সন্দেহ করবেন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও শাসনশাস্ত্রের প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক তরিকা বদলাতে সরকার মরিয়া হয়ে উঠল কেন। বিশ্ব এতকাল কেবল আদালত অবমাননা আইন শুনেছে। বাংলাদেশ মানব-ইতিহাসে সম্ভবত এই প্রথম আদালত অবমাননার বাইরে একটি নাটকীয় বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আমলা অবমাননা আইন শুনছে। সরকারবিরোধী সম্ভাব্য আন্দোলন প্রতিহত করার অংশ হিসেবে এই নীতিমালা জারি করা হয়েছে কি? হরতাল-পিকেটিং পচিয়ে দিতে নির্বাহী হাকিমেরা যখন পাইকারি জেল-জরিমানা করবেন, তখন তা নিয়ে বঙ্কিম কটাক্ষও করা যাবে না; তাঁদের কুর্নিশ করতে হবে। সশস্ত্র বাহিনীর মর্যাদা রক্ষার বর্তমান আওয়ামী আকুতি একটি অভিনব পাকিস্তানি ব্যাধি। তফাত হলো পাকিস্তান লিখেছে সংবিধানে। হাসানুল হক ইনু লিখলেন নীতির ভূর্জপত্রে। আগেই বলেছি, সরকার চাইলে এই অপবাদ থেকে মুক্ত হতে পারে। কারণ, আজগুবি বিধান, যার কোনো তুলনা তারা কোনো গণতান্ত্রিক দেশ থেকে দেখাতে পারবে না, সেগুলো তারা ছেঁটে ফেললেই পারে।
ভারত এ বিষয়ে যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছে, তা আমাদের জন্য বেশ প্রণিধানযোগ্য। কারণ, মনমোহন সিং এবং তাঁর তথ্যমন্ত্রী রেড্ডি প্রথমে আওয়াজ তুলেছিলেন, বিধিনিষেধ আরোপ করা দরকার। ২০০৭ ও ২০০৮ সালে সংসদে তাঁরা বিলও এনেছিলেন। কিন্তু তা যেকোনো মূল্যে পাস করানোর ব্রত তাঁরা নেননি। তথ্যমন্ত্রী ৩৯ অনুচ্ছেদের আওতায় নীতিমালা করার যে দাবি করেছেন, তা অসত্য ও অগ্রহণযোগ্য, তারও প্রমাণ ভারতের অভিজ্ঞতা থেকেই দেওয়া যায়। কারণ, আমাদের ৩৯ অনুচ্ছেদটি ভারতের ১৯ অনুচ্ছেদের অবিকল অনুলিপি। সেখানেও বলা আছে, আইন দিয়ে ‘যুক্তিসংগত বাধানিষেধ’ আরোপ করা যাবে। তবে বিল আনতেই ভারতের সম্প্রচার মোগলদের কানে পানি গেল। তাঁরা দ্রুততার সঙ্গে সেলফ রেগুলেশনে গেলেন। আমাদের মোগলদের ‘সেলফি’তেও অনীহা। তাঁরা তাই সরকারের কাছেই কমিশন চাইছেন। আগে নীতিমালার জন্যও ধরনা দিয়েছেন। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতি জি এস ভার্মা, যিনি নামজাদা আইনবিদ হিসেবে বিশেষভাবে নন্দিত, তাঁকে চেয়ারম্যান করে তাঁরা একটি কমিশন করলেন। তাদের সুপারিশেই গঠিত হলো নয় সদস্যের নিউজ ব্রডকাস্টিং স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটি (এনবিএসএ)। দিল্লি হাইকোর্ট এবং ভারতের সুপ্রিম কোর্টও সেলফ রেগুলেশনের পক্ষে মত দিলেন। ভারতে বর্তমানে এনবিএসএ সরকারের নিগড়মুক্ত থেকে কাজ করছে।
আমি মনে করি, বাংলাদেশে সেলফ রেগুলেশন থাকবে। আবার একটি সরকারি নজরদারিও থাকবে। সে জন্য প্রেস কাউন্সিলের কাঠামো ও তার ক্ষমতার বিন্যাস বদলানো যায়। সরকার একে অকার্যকর করে রাখছে। কারণ, তারা যখন যাকে শাস্তি দিতে হয়, তা বিভিন্ন উপায়ে দিয়ে চলছে। তাদের আটকানো যাচ্ছে না। আটকাতে হলে মিডিয়া মোগলদেরই সক্রিয় হতে হবে। স্বশাসনের সামর্থ্য তাঁদের অাছে, তার প্রমাণ দিতে হবে। নইলে আক্ষেপ করা বৃথা। এটা সুখকর যে বর্তমানের বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের ১৪ সদস্যের মধ্যে নয়জনই আসতে পারছে সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকে। তবে ভারতের মডেল অধিকতর গ্রহণযোগ্য। প্রসঙ্গক্রমে বলি, সবকিছুতেই অনুভব করি; দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ দরকার। সোমবার মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রী অভিশংসন বিল ফের আনার কথা বলেছেন। কিন্তু এর অনুষঙ্গ দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, তা নিয়ে কথা নেই। ভারতের প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যানকে রাজ্যসভার চেয়ারম্যান, যিনি ভারতের ভাইস প্রেসিডেন্ট, লোকসভার স্পিকার এবং খোদ কাউন্সিলের এক সদস্য নিয়ে গঠিত অনুসন্ধান কমিটি বাছাই করে। ভারতের প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান বিচারপতি মারকান্দি কাজু সম্প্রচার মোগলদের স্বশাসনের কট্টর সমালোচক। সরকারি খবরদারিরও বিরোধী। তিনি মিডিয়া কাউন্সিল করে ইলেকট্রনিক মিডিয়াকেও একই ছাতার নিচে আনার প্রস্তাব করেছেন। তাঁর সেই অভিমতের আলোকেই প্রস্তাবিত কমিশন না করে বাংলাদেশ মিডিয়া কাউন্সিল করার সুপারিশ করছি।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0