বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ইদানীং চীনকে নিয়ে উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্র। উদ্বিগ্ন এ কারণে যে বিশ্বের প্রধান একটি অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে চীনের সাম্প্রতিক উত্থানে একধরনের অস্বস্তিতে ভুগতে হচ্ছে মার্কিন নেতৃত্বকে। এর পেছনে মূল কারণ হলো, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে গত প্রায় তিন দশকে বিশ্বের মোড়ল রাষ্ট্র হিসেবে জগৎজুড়ে যা কিছু করে বেড়ানোর যে খেলায় যুক্তরাষ্ট্রকে জড়িত থাকতে দেখা যাচ্ছে, সেই খেলায় শক্ত কোনো নতুন প্রতিদ্বন্দ্বীর হঠাৎ আবির্ভাব কর্তৃত্ব ফলানোর অনেক হিসাব-নিকাশ হয়তো ভন্ডুল করে দিতে পারে। এ জন্য যেভাবেই হোক রুখতে হবে নতুন এই সম্ভাবনার আবির্ভাবকে। আরও বলতে হয় যে এ রকম হিসাব–নিকাশে দলগত কোনো বিভাজন যুক্তরাষ্ট্রে একেবারেই নেই। রিপাবলিকানরা এক হাত এগিয়ে গেলে ডেমোক্র্যাটরা বলে ওঠে, আমরাও পিছিয়ে থাকার নই। সঙ্গে সঙ্গে একই হুক্কা হুয়া অন্যদিকে প্রতিধ্বনিত হতে শুরু করে শ্বেতাঙ্গ অ্যাংলো-স্যাক্সন জাতিসত্তার আধিপত্য বজায় থাকা বলয়জুড়ে। এটা যেন তাই অনেকটা বর্ণগত অবস্থান থেকে চালানো লড়াই।

রুডইয়ার্ড কিপলিং ইংরেজের বিশ্বজুড়ে আধিপত্য ধরে রাখার সময়ে বিশ্বকে সভ্য করে তোলায় সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটেনের ছড়ি ঘুরিয়ে যাওয়াকে ‘হোয়াইট ম্যানস বার্ডেন’ বা সাদা মানুষের দায় আখ্যায়িত করেছিলেন। সেই দায় মনে হয় অ্যাংলো-স্যাক্সন জাতিসত্তা এখন আবারও স্বেচ্ছায় নিজের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। আর সে কারণেই নতুন এই লড়াইয়ে হাতিয়ার হিসেবে চাবুক কিংবা বন্দুক নয়, বরং কখনো ব্যবহার করা হচ্ছে মানবাধিকার নামের এক অস্ত্র, কখনো আবার টেনে আনা হচ্ছে গণতন্ত্রকে।

চীন গণতান্ত্রিক দেশ নয়। বেইজিং নিজেও দাবি করে না যে গণতন্ত্র হচ্ছে দেশটির অনুসৃত মূল নীতিমালা। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র না হয়েও গত চার দশকে দেশের জনগণের জন্য অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার সুফল ভোগের যে সুযোগ চীন করে দিয়েছে, অনেক গণতান্ত্রিক দেশেও তা অনুপস্থিত। অন্যদিকে অর্থনৈতিক সাফল্য চীনকে অনেক বেশি আত্মনির্ভরশীল করে তুলেছে। একদিকে উন্নয়নশীল বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে উদার হাতে সাহায্য করা এবং অন্যদিকে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির মধ্যে দিয়ে বেইজিং এখন চাইছে রাজনীতির আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের বলিষ্ঠ উপস্থিতির জানান দিতে। এটাই এখন অনেকের মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠছে। এরা চাইছে চীন যেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনের নেতৃস্থানীয় এক খেলোয়াড় হয়ে উঠতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে।

এ কারণেই গত প্রায় এক দশক ধরে পশ্চিমের বিভিন্ন দেশের সরকারের পাশাপাশি সেই সব দেশের সংবাদমাধ্যম বেইজিংয়ের মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বাক্‌স্বাধীনতা হরণ করার পাশাপাশি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি অবজ্ঞা-প্রদর্শন করা নিয়ে কঠোর ভাষায় কথা বলতে শুরু করেছে। পাশাপাশি সামরিক শক্তির দিক থেকেও চীনকে যেন দাবিয়ে রাখা যায়, সে জন্য শুরু হয়েছে কোয়াডসহ সামরিক কিছু জোট গড়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া। বেইজিং অলিম্পিক নিয়ে পশ্চিমের হঠাৎ হইচই জুড়ে দেওয়াও হচ্ছে সেই খেলার ভিন্ন একটি অংশ।

চীনের নারী টেনিস খেলোয়াড়ের টুইটারে করা যৌন নিপীড়নের অভিযোগ প্রকাশ হওয়ার পর থেকে এটাকে নিয়ে রীতিমতো তোলপাড় শুরু হয়। আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির সভাপতি টমাস বাখ নিজে যখন অনলাইনে সরাসরি আলোচনায় সেই টেনিস তারকার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নিশ্চিত হয়েছেন যে ওই নারী নিরাপদে আছেন এবং ভালো আছেন। এরপরও পশ্চিমারা বলছে, তাঁর ভালো থাকার প্রমাণ তাঁরা পাননি। আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি এভাবে বাগড়া দিয়ে বসায় টেনিস তারকাকে নিয়ে পশ্চিমারা কিছুটা বিপাকে পড়ে যাওয়ার ঠিক পরপরই উঠে এসেছে অলিম্পিক বর্জনের প্রসঙ্গটি।

মূলত দুটি অভিযোগ অলিম্পিক কূটনৈতিকভাবে বর্জন করার সপক্ষে যুক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্ররা তুলে ধরছে। একটি হলো, চীনের নারী টেনিস তারকার ওপর যৌন নিপীড়ন চালানোর সেই অভিযোগ এবং অন্যটি হচ্ছে দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের শিনজিয়াং প্রদেশের মুসলিম সংখ্যালঘু উইঘুর জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার লঙ্ঘিত হওয়া। পশ্চিমা জোট বলছে, চীনে মানবাধিকার এতটা নগ্নভাবে লঙ্ঘিত হওয়া বন্ধ করতে হলে অলিম্পিক বর্জন করা দরকার। তবে সেই বর্জন বলতে এখানে আবার নিজের দেশের পদকপ্রত্যাশী ক্রীড়াবিদদের মধ্যে যেন হতাশা কিংবা ক্ষোভ দেখা না দেয়, তা নিশ্চিত করে নিতে ঠিক খেলার মাঠের বর্জন নয়, বরং কূটনৈতিক বর্জনের কথা বলা হচ্ছে। তবে কথা হচ্ছে, খেলাধুলার বেলায় কূটনৈতিক বর্জন বলতে কিছু নেই। কেন নেই সেটার ব্যাখ্যা মনে হয় দেওয়া প্রয়োজন।

খেলাধুলাকে বরাবর রাজনীতির বাইরে রাখার কথা বলা হলেও শক্তিশালী দেশগুলোকে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে সেরকম ডাকে কেবল নিজেদের সুবিধামতো সাড়া দিতে। জটিল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে এটা যেমন আরও বেশি সংকটাপন্ন করে তুলতে পারে, সেই সঙ্গে খেলাধুলার সার্বিক উন্নয়নের পথেও এটি বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণে সেরকম বর্জনের ডাক যারা দেয়, তাদের শুভবুদ্ধি যেন জাগ্রত হয়।

খেলাধুলার যেকোনো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করে থাকে খেলার সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কিংবা আঞ্চলিক সমিতি, বিশ্বের সব দেশই সাধারণত সেসব সমিতির সদস্য। ফুটবলের বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়দায়িত্ব যেমন ফুটবলের বিশ্ব ফেডারেশন ফিফার হাতে। প্রতিটি দেশের ফুটবল সমিতি হচ্ছে ফিফার সদস্য, সেসব দেশের রাজনৈতিক কিংবা কূটনৈতিক নেতারা নন। সদস্যরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে বিশ্বকাপের ভেন্যু থেকে শুরু করে সময়সূচি সবকিছু নির্ধারণ করে থাকে।

অলিম্পিক কিংবা বিশ্বকাপ ফুটবল সার্বিক অর্থে বৈশ্বিক আকারের প্রতিযোগিতা হওয়ায় খেলা চলার দিনগুলোতে একক কিংবা সমষ্টিগতভাবে কোনো দেশের রাজনৈতিক কিংবা কূটনৈতিক নেতাদের সেখানে আমন্ত্রণ জানানো হয় না, যদিও কিছু ব্যতিক্রম এই ক্ষেত্রে আছে। যেমন বিশ্বকাপ ফাইনাল যেদিন অনুষ্ঠিত হয়, সেই আয়োজনে উপস্থিত থাকার জন্য পরবর্তী স্বাগতিক দেশের সরকার কিংবা রাষ্ট্রপ্রধানকে আমন্ত্রণ জানানোর নিয়ম প্রচলিত আছে। অলিম্পিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতাও এই একই নিয়ম অনুসরণ করে।

এ ছাড়া প্রতিযোগিতার আয়োজনের সঙ্গে অন্যভাবে সম্পর্কিত দেশের নেতাদেরও সেরকম আয়োজনে আমন্ত্রণ জানানো হতে পারে। যেমন ২০১৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত শীতকালীন অলিম্পিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল ২০২০ গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকের স্বাগতিক দেশ জাপানের সরকারপ্রধান হিসেবে। এর বাইরে অন্য কোনো দেশের নেতা অলিম্পিকে যোগ দিতে চাইলে তাঁরা অনায়াসেই যোগ দিতে পারেন, তবে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে নন, বরং ব্যক্তিগত উদ্যোগে। ফলে নিজে থেকে যোগ দিতে চাওয়া কোনো নেতা যদি হঠাৎ বলে ওঠেন, আমি সেখানে যাব না, কেননা সেই আয়োজন আমি বর্জন করছি— সেই যুক্তি তাহলে ধোপে টেকার নয়।

আন্তর্জাতিক মানের বিভিন্ন খেলাধুলার বিশ্ব পর্যায়ের নানা রকম প্রতিযোগিতার আয়োজনে একই রীতি অনুসরণ করা হয় বলে কূটনীতিক কিংবা রাজনৈতিক নেতাদের সেসব আয়োজনে যোগ দেওয়া অধিকার হিসেবে গণ্য হতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা বেইজিং শীতকালীন অলিম্পিক নিয়ে ঠিক এই ভুলটি করে বসে আছেন। অলিম্পিকের সার্বিক বর্জন অবশ্য সরকারি সিদ্ধান্ত। সে ক্ষেত্রে ক্রীড়াবিদদের কেউই দেশের পতাকা হাতে নিয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারেন না, যদিও সেখানে বর্জনের ডাক এড়িয়ে গিয়ে নিজ দেশের অলিম্পিক কিংবা অন্য কোনো ক্রীড়া সমিতির পতাকা বহন করে তাঁরা যোগ দিতে পারেন, যেমনটা দেখা গিয়েছিল ১৯৮০ সালের মস্কো ও ১৯৮৪ সালের লস অ্যাঞ্জেলস অলিম্পিকে।

যুক্তরাষ্ট্রের ডাকে দেশটির ঘনিষ্ঠ মিত্রদের সবাই যে আগ্রহ নিয়ে সাড়া দিচ্ছে, তা অবশ্য নয়। ফ্রান্স ইতিমধ্যে ঘোষণা করেছে যে মন্ত্রিসভার একজন সদস্যের নেতৃত্বে দেশটি বেইজিং শীতকালীন অলিম্পিকে যোগ দেবে। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক প্যারিসে অনুষ্ঠিত হবে এবং এ কারণে ফ্রান্সের নেতৃত্বকে ২০২২ শীতকালীন অলিম্পিকে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। জার্মানিসহ ন্যাটো জোটভুক্ত আরও কিছু দেশ এখনো স্পষ্ট করে বলেনি তারা কি করতে যাচ্ছে।

অন্যদিকে এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র জাপান বলেছে, মন্ত্রিসভার কোনো সদস্য বেইজিং অলিম্পিকে যোগ না দিলেও দেশের অলিম্পিক সমিতির নেতার অধীন শীতকালীন অলিম্পিক দলটিকে জাপানের পতাকা বহন করেই বেইজিং পাঠানো হবে। দক্ষিণ কোরিয়া অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের অন্য এশীয় অন্য মিত্রদের চেয়ে ভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করে বলেছে বেইজিং অলিম্পিকের কূটনৈতিক বর্জনের কথা দেশটি ভাবছে না।

খেলাধুলাকে বরাবর রাজনীতির বাইরে রাখার কথা বলা হলেও শক্তিশালী দেশগুলোকে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে সেরকম ডাকে কেবল নিজেদের সুবিধামতো সাড়া দিতে। জটিল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে এটা যেমন আরও বেশি সংকটাপন্ন করে তুলতে পারে, সেই সঙ্গে খেলাধুলার সার্বিক উন্নয়নের পথেও এটি বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণে সেরকম বর্জনের ডাক যারা দেয়, তাদের শুভবুদ্ধি যেন জাগ্রত হয়, সেই প্রত্যাশা করার বাইরে এখনকার সংঘাতময় এই বিশ্বে আমাদের করার আর কিই–বা আছে।

মনজুরুল হক জাপান প্রবাসী শিক্ষক ও সাংবাদিক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন