default-image

নারীর প্রতি পিতৃতান্ত্রিক সমাজের দৃষ্টিভঙ্গী কী তিনটি সাম্প্রতিক ঘটনায় তা চমৎকারভাবে দেখা যায়।

মা আছেন স্ত্রী নেই!

দেশের একজন প্রথিতযশা প্রবীণ অধিকারকর্মীর কাছ থেকে একটি ফোন পাই। তাঁর কৌতূহল প্রবেশন আইনে মাদক মামলার এক আসামির দণ্ড নিয়ে। তিনি মিডিয়া থেকে জেনেছেন, ওই আসামি বিচারিক আদালতে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড পেয়েছিলেন। সেই রায় হাইকোর্টের এক সদস্যের একটি বেঞ্চ শর্ত সাপেক্ষে স্থগিত করেছেন। শর্ত হলো, আগামী দেড় বছর দণ্ডিত ব্যক্তি প্রবেশন কর্মকর্তার পর্যবেক্ষণে থাকবেন। এই সময়ে তিনি তাঁর ৭৫ বছর বয়সী মায়ের যত্ন এবং যথাক্রমে ১৫ ও ৮ বছর বয়সী মেয়ে ও ছেলের পড়াশোনা চালিয়ে নেবেন। আদালত সন্তুষ্ট হলে তাঁর অবশিষ্ট কারাবাস মওকুফ হয়ে যাবে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, আদালতের আদেশে স্ত্রীর নাম নেই কেন?

প্রশ্ন শুনেই আমার প্রথমে মনে হলো, মাদক মামলায় যখন অভিযুক্ত, তখন তিনি হয়তো মাদকসেবীই হবেন। কিংবা এমন একটি জীবনযাপন এর আগে করছেন, যেখানে সংসারের প্রতি দায়িত্ব পালনে তাঁর অবহেলা রয়েছে। তাই প্রতীয়মান হলো, প্রশ্ন তো অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত।

তাহলে স্ত্রীর প্রতি কর্তব্য পালনের নির্দেশনা থাকাটাই সংগত। মনে হলো, হয়তো স্ত্রী বর্তমান না-ও থাকতে পারেন। তাই ঘটনা জানতে ফোন করি আসামির আইনজীবী শিশির মুনিরকে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মুনিরের সঙ্গে ফোনেই একধরনের যুক্তিতর্ক হয়ে গেল। তাঁর কাছ থেকেই জানলাম, তাঁর স্ত্রী বর্তমান। আদালতের অঙ্গনে স্বামীর সঙ্গে এসেছেন। স্বামীর প্রতি তাঁকে যথেষ্ট সহানুভূতিশীল দেখা গেছে। এ ছাড়া আসামির রয়েছে তিন সন্তান। বড় সন্তানের বয়স ১৯, যিনি কিনা বাবার কারাবাসের কারণে স্কুলের গণ্ডি আর পেরোতে পারেননি। মা-ও তাঁর সঙ্গেই থাকতেন। কারাগারে যাওয়ার কারণে শুধু কিছুদিনের জন্য গ্রামের বাড়িতে চলে গিয়েছিলেন।

বললাম, তাহলে তো তাঁর বিরুদ্ধে পরিবারের প্রতি দায়িত্বহীন আচরণের পূর্বাপর রেকর্ড নেই। আইনজীবী বলেছেন, না নেই। বললাম, তাহলে অনেকের কাছে প্রতীয়মান হবে যে বড় ছেলে ও স্ত্রীর প্রতি যত্নের কথা বাদ পড়ল কেন। বিশেষ করে আমি উল্লিখিত স্বনামধন্য নারীবাদীর মনে উদয় হওয়া প্রশ্নের কথা বললাম। অনেকের মনে প্রশ্ন আসবে, স্ত্রীর কথা উল্লেখ করা হয়নি কেন? আইনজীবী বললেন, এটা সাধারণভাবে এভাবে দেখা সমীচীন নয়। নির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে দেখতে হবে। আদালত যখন বলেছেন, পরিবারের প্রতি তাঁকে কর্তব্যপরায়ণ থাকতে হবে। সেখানে স্ত্রী এসে যান। আমি বললাম, এই যুক্তির পরও প্রশ্নটা থেকে যায়।

শরীয়তপুরের জাজিরার এই ব্যক্তি সপরিবার থাকতেন কেরানীগঞ্জে। সেখানেই তিনি আরও একজন সহযোগীর সঙ্গে গ্রেপ্তার হন। র‍্যাব তাঁর কাছ থেকে ৪১১টি ইয়াবা বড়ি উদ্ধার করে। অপর আসামি জামিনে বেরিয়ে নিরুদ্দেশ হয়েছেন। ১১ নভেম্বর তাঁর সঙ্গে ফোনে কথা বলি। তিনি আদালতে তাঁর দোষ স্বীকার করেছেন। কিন্তু মনে হলো তিনি মনে করেন, আসলে তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার। যা-ই হোক, তাঁর অকপট স্বীকারোক্তি হলো, জীবনে নানা সময়ে তিনি মাদক সেবন করলেও ইয়াবা নেননি। এই মামলায় পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড পেয়েছিলেন। হাজত ও কারাবাসে ২০ মাস কেটেছে। শেষ দিকে তিনি কারাগারে তাঁতের কাপড় বুননের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে তিনিও বললেন, লেখাপড়া করেননি। ছোটখাটো ব্যবসা করেন। বড় ছেলে নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছে। মেয়ে এসএসসি পরীক্ষার্থী। ছোট ছেলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে। মা এখন তাঁর সঙ্গেই বাস করছেন। স্ত্রীর সঙ্গে কখনো তাঁর মনোমালিন্য হয়নি বলে জানালেন।

বিজ্ঞাপন

১০০ কোটি টাকার মানহানি

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী একটি বাহিনীর পক্ষে একটি ব্যতিক্রমী মানহানির মামলা হয়েছে কক্সবাজারের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে। ১১ নভেম্বরের মিডিয়া রিপোর্ট অনুযায়ী ওই বাহিনীর পক্ষে মামলার বাদী হয়েছেন বাহিনীর দমদমিয়া তল্লাশি ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত নায়েব সুবেদার মোহাম্মদ আলী মোল্লা। অপর দিকে মামলাটিতে বিজিবির বিরুদ্ধে মানহানির অভিযোগ এনে আসামি করা হয়েছে বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা ব্লাস্টের এক নারী কর্মীর বিরুদ্ধে।

মামলার আরজিতে ‘মিথ্যা অভিযোগের’ গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে যেভাবে, সেটা কম লক্ষণীয় নয়। বলা হয়েছে, বাদী মামলার অভিযোগে উল্লেখ করেছেন, ‘বিজিবি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন্য লড়াই করে বিজয় ছিনিয়ে আনা একটি বাহিনী। এমন একটি বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে ওই এনজিও নারী কর্মী অহেতুক উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে গণধর্ষণের মতো মিথ্যা অপপ্রচার চালিয়েছেন, যাতে করে বিজিবির মতো একটি বাহিনীর ভাবমূর্তির ওপর মারাত্মকভাবে আঘাত এসেছে। এ জন্যই বিজিবি আইনি পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে।’ নায়েব সুবেদার সাহেব কী প্রক্রিয়ায় কতিপয় সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির পক্ষে সমগ্র প্রতিষ্ঠানকে টেনে আনলেন, তার ব্যাখ্যা পেলাম না। তবে ওই খবর পড়া শেষ না হতেই ঢাকায় ব্লাস্টের বিবৃতি পেলাম। তাতে তারা দাবি করেছে, ওই নারী কখনোই ধর্ষণের অভিযোগ করেননি। এর সপক্ষে কোনো প্রমাণ নেই।

আমি বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নিই। জানলাম, কক্সবাজারের টেকনাফের দমদমিয়া চেকপোস্টে সম্প্রতি একজন এনজিও কর্মী কথিত মতে যৌন হয়রানির শিকার হন। কিন্তু পরে কিছু অনলাইন পোর্টালে ওই নারীর বরাতে দাবি করা হয় যে চেকপোস্টে ওই নারী ‘ধর্ষণের শিকার’ হয়েছিলেন।

একজন স্থানীয় সংবাদদাতা, যিনি মিথ্যা অভিযোগের বিষয়ে সরেজমিনে ঘুরেছেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেছেন, তাঁর সঙ্গে বুধবার রাতে টেলিফোনে কথা বলি। তাঁর কথায়, ‘ওই নারীকে এমনভাবে তল্লাশি করা হয়, যাতে তিনি আহত বোধ করেন। পরে তিনি ধর্ষণের অভিযোগ আনেন।’ বলি: ওই নারী কোথায়, কখন, কার কাছে, কীভাবে অভিযোগ করলেন, তার কোনো রেকর্ড পেলেন কি না। তাঁর উত্তর, ‘না, সেটা পাইনি।’ তদন্তের আগে আপাত প্রতীয়মান হয় যে বাদী ও বিবাদী উভয়ে একমত, আর যা-ই হোক, ধর্ষণের কোনো ব্যাপার সেখানে নেই।

ধরে নিই এক নারী কথিত মতে ধর্ষণের মিথ্যা অভিযোগ এনেছিলেন উল্লিখিত বাহিনীর একটি চেকপোস্টে কর্মরত একজন বা কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে। ওই নারীর ব্যক্তিগত আয়সীমা সম্পর্কে আন্দাজ করা দুরূহ নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও নায়েব সুবেদার সাহেব কি যুক্তিতে ১০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করলেন? নারীর পক্ষে যদি অন্য কোনো ধরনের মিথ্যা অভিযোগ আনা হতো, তাহলেও কি ১০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হতো? অনুমান করি, এর উত্তর হবে, না।

তাহলে অনেকেই এই উপসংহারে পৌঁছাতে চাইবেন যে বাংলাদেশের সমাজে ধর্ষণকে কতটাই না খারাপভাবে দেখা হয়। একটি মামলা অনেক সময় অভিযুক্তকে শাস্তিই দেয় না। মীমাংসা করে। ধর্ষণকারী যদি কেউ সত্যিই কোনো বাহিনী বা সংগঠনের বলে প্রমাণিত হয়, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা নির্যাতিত নারীকে কতটা ক্ষতিপূরণ দেবে? টাকার অঙ্কটা কী হবে? ১০০-এর পরে কয়টি শূন্য বসবে?

নারীর নামে জয়

আফগানিস্তানে জাতীয় পরিচয়পত্রে মায়ের নাম যুক্ত হওয়ার বিষয় সে দেশের মন্ত্রিসভার সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত একটি মাইলফলক অগ্রগতি। সেখানে এমন একটি সময়ে নারীর নামে জয় এল, যখন নারীবিরোধী তালেবান নিজেদের ক্ষমতা যথেষ্ট সংহত করেছে। আফগানিস্তান খুব দূরের দেশ নয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এক ‘কাবুলিওয়ালা’তেই কেল্লাফতে। আমাদের সাংস্কৃতিক মনস্তত্ত্বে ‘মিনি’ নামের কন্যাসন্তানটি নিরন্তর ঘুরে বেড়ায়। এভাবেই সেই অচেনা আফগান কাবুলিওয়ালা চিরকালের জন্য আমাদের চিরচেনা। ভিন্ন প্রেক্ষাপটে হলেও সোভিয়েত ও যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রলম্বিত যুদ্ধ আফগানিস্তানের মাটি তামা করে দিয়েছে। সেই মাটিতে নারীর ক্ষমতায়ন ঘটছে। সম্প্রতি প্রখ্যাত মার্কিন অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলিনা জোলি নারী নির্মিত প্রথম আফগান ফিল্ম ‘হাভা, মরিয়ম, আয়েশা’র নির্মাণকে স্বাগত জানিয়েছেন।

আইনজীবী এলিনা খান মেয়ের জন্য গিয়েছিলেন পাসপোর্ট অফিসে। গিয়ে দেখলেন, সেখানে শুধু বাবা ও পাসপোর্ট গ্রহীতার নাম লিখতে হয়। অথচ তিনি জানতেন, জেলখানায় মায়ের নাম লেখা বাধ্যতামূলক, সেটা ব্রিটিশরা করে গেছে। তো তিনি পাসপোর্টে মেয়ের জন্য ফরম পূরণ করতে গিয়ে নিজের নাম লেখেন। সেটা পাসপোর্ট অধিদপ্তর নাকচ করে। সেই নাকচের বিরুদ্ধে তিনি রিট করেন। ঘটনাক্রমে, এর কিছুদিন পরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাসপোর্টসহ অন্যান্য ফরমে মায়ের নাম লেখার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন এবং তা কার্যকর হয়। তবে দেশে সব ধরনের ফরম বা পরিচয়পত্রে মায়ের নামের ব্যবহার এখনো নিশ্চিত হয়নি। সবশেষে বলব, বিচার বিভাগীয় ফরমগুলোতে মায়ের নাম লেখা হয় না। আসামি ধরতে পরোয়ানা জারি করা, কারও প্রতি সমন জারি করা বা সাক্ষির পরিচয় লিখতে মুদ্রিত ফরম এখনো সেকেলে। এসব ক্ষেত্রে আজও বাবার নাম লিখলেই চলে। মায়ের নাম লেখার জায়গা নেই।

মিজানুর রহমান খান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক

mrkhanbd@gmail.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0