প্রবল উন্মত্ততা আর আত্মবিনাশের সময়গুলো একসময় থিতু হয়ে আসে। ঘৃণা ও নৃশংসতার বলি হয় দুই তরুণ। এমন তুচ্ছ বিষয়ে এমন করে তরুণদের জীবনহানি আর কোথাও কি ঘটতে পারে? ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠন করলেই কেন এমন বোধশূন্য নৃশংস হয়ে ওঠে তরুণেরা? ২০ বছরের তরুণ নাহিদ, যাঁর বিয়ে হয়েছিল কয়েক মাস আগে। প্রিয়তমা স্ত্রীর হাত থেকে মেহেদির রংই শুকায়নি, রামদা দিয়ে কুপিয়ে তাঁকে হত্যা করা হলো। আরেক তরুণ মুরসালিন। ২৪ পেরিয়েছিলেন। দুই শিশুকন্যা। তাঁর শরীরেও অসংখ্য আঘাতের ক্ষত। দুজন ছাত্র গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। কমবেশি আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন দুই পক্ষের কমপক্ষে ২০০ জন। এই রক্তক্ষয় ও সংঘাতের মধ্য দিয়ে অর্জনটা কী হলো? তরুণদের মধ্যে এই সর্বনাশা হিতাহিত বোধশূন্যতা, বিভাজন-ঘৃণা আর নৃশংসতার যে সংস্কৃতি দানা বেঁধেছে, তারই কারণ কী? যে ছাত্ররা বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে একসময় পথ দেখিয়েছে, তাদেরই একদল উত্তরসূরি দুই দোকানকর্মীর মধ্যেকার ঝগড়ায় ভাড়াটে হিসেবে গেছে মাস্তানি করতে। এর থেকে নৈতিক পচন, সর্বনাশা অধঃপতন আর কী হতে পারে?

দুই বা তিন প্রজন্ম আগে যে তরুণেরাই নিজেদের ত্যাগ, মননশীলতা, সংবেদনশীলতা দিয়ে একটা জাতিরাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছিল, সেই দেশেই তরুণেরা আজ দিশেহারা। নিজেদের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় তারা সীমাহীন অপচয়ের মধ্য দিয়ে কাটিয়ে দিচ্ছে। ছাত্ররা ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী তরুণদের প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবছে। অন্যদিকে, শ্রমজীবী তরুণেরা ছাত্রদের প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবছে। ছাত্র আর শ্রমজীবী তরুণদের বন্ধন আর আত্মত্যাগে আমরা একটা স্বাধীন দেশ পেয়েছি। অথচ স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে পরিকল্পিত বিরাজনৈতিকীকরণের নিষ্ঠুর শিকার আমাদের তরুণেরা।

১৯৪৭ থেকে শুরু করে নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থান পর্যন্ত প্রতিটি মানুষ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ছাত্র-তরুণদের সঙ্গে কৃষক-শ্রমজীবীদের অভূতপূর্ব সংহতি আমরা দেখেছি। ছাত্রদের কিছু হলে শ্রমজীবীরা দলে দলে রাস্তায় বের হয়ে তার প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ১৯৫২ সালের আমাদের যে গৌরবজনক ভাষা আন্দোলন, আমাদের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সূচনাবিন্দু, তাতে ছাত্রদের সঙ্গে কৃষক ও শ্রমজীবীরা যুক্ত হওয়ায় অভ্যুত্থানের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। একই ধারাবাহিকতা আমরা দেখেছি উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে।

কিন্তু এরপরে সমাজে গভীর যে বিদ্বেষ ও বিভাজনের ক্ষত তৈরি হয়েছে, তার পেছনে গত তিন দশকের আর্থরাজনৈতিক ব্যবস্থার দায় কতটুকু, সে প্রশ্ন করা জরুরি। বিশেষ করে গত এক যুগে দেশে যে এককেন্দ্রিক রাজনৈতিক চর্চা, সামাজিক অসহিষ্ণুতার পেছনে তার প্রভাবটা খুঁজে বের করা সবার জন্যই মঙ্গলজনক। সমাজে নানা মত, নানা পথ থাকবে। সেটাই স্বাভাবিক। নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চার সুযোগ থাকলে স্বাভাবিক রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তরুণেরা নিজেদের চিন্তা চর্চার সুযোগ পায়। কিন্তু তাদের যদি অবরুদ্ধ করে রাখা হয়, ঠেসেঠুসে একটা রাজনৈতিক চিন্তার মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তার ফলাফল ভয়াবহই হতে পারে।

নিউমার্কেট এলাকার সংঘাতের পেছনে চাঁদাবাজির ভাগবাঁটোয়ারা, রাজনৈতিক স্বার্থ, দোকানকর্মীদের খারাপ ব্যবহার, ঢাকা কলেজের রাজনৈতিক শিক্ষার্থীদের বছরের পর বছর ধরে করে আসা মাস্তানি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকজারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা ও ষড়যন্ত্র—এ রকম হাজারটা কারণ আমরা খুঁজতে পারি। কিন্তু এগুলোর কোনোটাই অসুখ নয়, অসুখের লক্ষণ।

সমাজমনস্তত্ত্বে সহিংসতার ঘটনা বেশি ঘটে বিশেষ কোনো অঞ্চল এবং অপেক্ষাকৃত সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে। বাংলাদেশের তরুণেরা এখন সমাজে সবচেয়ে নাজুক ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী। জনমিতির দিক থেকে তরুণদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হওয়া সত্ত্বেও অর্থনীতি, রাজনীতি কিংবা সামাজিক কর্মকাণ্ডে তাদের হিস্যা একেবারে শূন্যের কোঠায়। সমাজ ও রাষ্ট্রে কোথাও তারা কর্তারূপে নেই। বেকারত্ব, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও আশাহীনতা তরুণদের মধ্যে জেঁকে বসেছে। এই বঞ্চনা ও ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটছে সহিংসতায়। তরুণদের বাদ দিতে দিতে আর তাদের মধ্যে বিভাজন ও বিভক্তির বীজ বুনে দিতে দিতে আত্মঘাতী করে তোলা হয়েছে। তাদের জন্য গালভরা আশ্বাস আছে, কিন্তু তাদের শিক্ষা–দীক্ষা, জ্ঞানে–বিজ্ঞানে এগিয়ে নেওয়ার জন্য কোনো বাস্তবসম্মত নীতি ও উদ্যোগ নেই। শ্রমবাজারে খুব কমসংখ্যক তরুণের সম্মানজনক জীবিকা জুটছে। পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকেই সাজানো হয়েছে সংখ্যাগরিষ্ঠ তরুণ যাতে দেশ ও বিদেশের সস্তা শ্রমের জোগানদার হিসেবে গড়ে ওঠে।

দুই বা তিন প্রজন্ম আগে যে তরুণেরাই নিজেদের ত্যাগ, মননশীলতা, সংবেদনশীলতা দিয়ে একটা জাতিরাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছিল, সেই দেশেই তরুণেরা আজ দিশেহারা। নিজেদের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় তারা সীমাহীন অপচয়ের মধ্য দিয়ে কাটিয়ে দিচ্ছে। ছাত্ররা ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী তরুণদের প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবছে। অন্যদিকে, শ্রমজীবী তরুণেরা ছাত্রদের প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবছে। ছাত্র আর শ্রমজীবী তরুণদের মৈত্রী আর আত্মত্যাগে আমরা একটা স্বাধীন দেশ পেয়েছি। অথচ স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে পরিকল্পিত বিরাজনৈতিকীকরণের নিষ্ঠুর শিকার আমাদের তরুণেরা। কিন্তু তরুণদের রাজনৈতিকভাবে ধারণের ক্ষেত্রে, তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে রূপায়ণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলো চরমভাবে ব্যর্থ। ক্ষমতাসীনদের কাছে তরুণদের ‘হেলমেট বাহিনী’ হিসেবে ব্যবহার ছাড়া আর কি কোনো গুরুত্ব আছে? এর আগে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে হেলমেট বাহিনীকে ব্যবহার করা হয়েছিল কিশোর শিক্ষার্থীদের দমাতে।

আমাদের তরুণেরা গ্লাডিয়েটর খেলার গ্লাডিয়েটর নিশ্চয়ই থাকবে না চিরদিন।গ্লাডিয়েটরের মধ্যেই কিন্তু স্পার্টাকাসের জন্ম হয়। ইতিহাস কখনো সরলরৈখিক নয়।

মনোজ দে প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন