বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

দেশে এসেছি দিন কয়েক হলো। একটা লম্বা সময় দেশে না থাকাতে পরিচিত মানুষদের ‘পরিচিত’ কাউকে খুঁজতে দেখে একটু অবাক লেগেছে। হয়তো দীর্ঘদিন দেশে না থাকাতে ‘পরিচিত’ থাকার এই সংস্কৃতির সঙ্গে আমার একটা ব্যবধান হয়ে গিয়েছে। কারণ, ইউরোপের ছোট্ট যে দেশে আমি থাকি; সেখানে কোথাও কোনো কাজের জন্য যেতে হলে আমাদের ‘পরিচিত’ কাউকে খুঁজে বের করতে হয় না। পরিচয় যাই হোক; সবার সমান অধিকার। সবাই সমান সুযোগ পায়। তাই কেউ কোথাও গিয়ে নিজের পরিচয় দেয় না। কেউ কারও পরিচয় জানতেও চায় না।

দেশে এসে চুল কাটাতে সেলুনে গিয়েছি। নাপিত ভদ্রলোক বললেন বসতে। আরেকজনের চুল কাটা হয়ে গেলেই আমার চুল কাটবেন। আমি বসে পত্রিকা পড়ছি। এর মাঝে আরেক ভদ্রলোক সেলুনে ঢুকতে না–ঢুকতেই চুল কাটতে বসে গেলেন। আমি অবাক হয়ে দেখলাম তিনি আমার পরে এসেও আগে সিরিয়াল পেয়ে গিয়েছেন! ভদ্রলোক চলে যাওয়ার পর আমার পালা। আমি নাপিতকে জিজ্ঞাসা করলাম, সিরিয়ালে তো আমার আগে চুল কাটার কথা। আপনি ওনাকে কেন আগে কেটে দিলেন? উত্তরে তিনি যা বলেছেন এর জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না, ‘উনি বড় অফিসার। আগে কেটে না দিলে উনি মাইন্ড করবেন!’

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই নাপিত ভদ্রলোক কি করে জানলেন তিনি বড় কর্মকর্তা? নিশ্চয়ই ওই কর্মকর্তা নিজ থেকেই তাঁর পরিচয় দিয়েছেন। কিংবা বড় কর্তা হলেই–বা কেন তাঁকে আগে সিরিয়াল পেতে হবে? তাঁর পেশাগত পরিচয় তাঁর পেশার জায়গায়। চুল কাটতে গেলে, বাজার করতে গেলে, হাসপাতালে গেলে কিংবা ব্যাংকে গেলে কেন তাঁকে তাঁর পরিচয় বলতে হবে কিংবা পরিচয়ের কারণে আলাদা সুবিধা পেতে হবে?

আমি যে শহরে থাকি, এটি উত্তর-পূর্ব ইউরোপের ছোট্ট দেশ এস্তনিয়ার রাজধানী তালিন। আমাদের এই শহরে গণপরিবহন ফ্রি, শহরের সব নাগরিকের জন্য। অর্থাৎ বাস, ট্রেন, ট্রাম সবকিছুতেই আমরা বিনা পয়সাতেই চড়তে পারি। সেবার যখন প্রচণ্ড শীত পড়েছে। শহরের তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে নেমে গিয়েছে। শেষ বিকেলে একটা ক্লাস নিতে হয়েছে। ক্লাস শেষ করেই ইউনিভার্সিটির পাশের বাসস্টপে দৌড়ে গিয়ে বাসে উঠেছি। মধ্য বয়সী একজন ভদ্রলোক পাশে বসে আছেন। এখানে সাধারণত বাস-ট্রামে কেউ কারও সঙ্গে খুব একটা কথা বলে না। সেদিন কেন যেন পাশের ভদ্রলোককে বলে বসেছি, খুব ঠান্ডা পড়েছে এই বছর। সেও মাথা নেড়ে উত্তর দিয়েছে, হ্যাঁ। এরপর নানান বিষয় নিয়ে কথা হয়েছে আমাদের। আমার বাসার স্টপে নেমে যাওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে তাঁকে জিজ্ঞেস করেছি, আপনি কী করেন? উত্তরে তিনি হেসে বলেছেন, আমি এই শহরের মেয়র। শুনে আমার চোখ কপালে ওঠার জোগাড়! শহরের মেয়র বাসে উঠে আর সবার মতো অতি সাধারণভাবে বসে আছেন। আশপাশের কেউ তাঁর দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না!

সব জায়গায় আমরা ‘পরিচিত’ কেউ আছে কি না খুঁজে বেড়াই! কেন খুঁজে বেড়াই? কারণ, পরিচিত কেউ থাকলে যেকোনো কাজ সহজে করা যায় কিংবা আলাদা সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়। আমার ধারণা এসব করতে করতে আমরা নিজেরাই আর বুঝে উঠতে পারছি না এই পুরো ব্যাপারটাই একটা অনিয়ম ও সভ্যতা–বিবর্জিত কাজ।

এই মেয়র চাইলে প্রথম পরিচয়েই নিজের ‘পরিচয়’ আমার কাছে দিতে পারতেন। তিনি একবারের জন্যও নিজের পরিচয় দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি। এমনকি আকার–ইঙ্গিতেও সেটি বোঝাতে যাননি। যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছি, তিনি পরিচয় নিয়ে কিছুই বলেননি। তাঁর কাছে মনে হয়েছে এর কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ, পরিচয় দিয়ে দেশটিতে কেউ আলাদা ফায়দা নেয় না। নেওয়ার চেষ্টাও করে না। এই সংস্কৃতিই সেখানে গড়ে ওঠেনি।

আর বাংলাদেশ? সব জায়গায় আমরা ‘পরিচিত’ কেউ আছে কি না খুঁজে বেড়াই! কেন খুঁজে বেড়াই? কারণ, পরিচিত কেউ থাকলে যেকোনো কাজ সহজে করা যায় কিংবা আলাদা সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়। আমার ধারণা এসব করতে করতে আমরা নিজেরাই আর বুঝে উঠতে পারছি না এই পুরো ব্যাপারটাই একটা অনিয়ম ও সভ্যতা–বিবর্জিত কাজ।

যেকোনো জায়গায় গিয়ে নিজের পেশাগত পরিচয় কেন দিতে হবে? এর তো কোনো প্রয়োজন নেই। নিজের পেশাগত জায়গার বাইরে আমরা সবাই সমান। আমাদের সবার অধিকারও সমান। একজন দরিদ্র কৃষক, রিকশাচালক কিংবা বড় কর্তা; সবার অধিকার সমান। সবাই একই সুযোগ-সুবিধা পাবে। আর এই সংস্কৃতি গড়ে তোলার জন্য ধনী রাষ্ট্র হওয়ার দরকার হয় না। দরকার স্রেফ নিয়মশৃঙ্খলা এবং এই সংস্কৃতি গড়ে তোলার মানসিকতা। একদম সবার উঁচু থেকে নিচু পর্যায়ের সব পদের, সব পেশার মানুষকে মনে রাখতে হবে, নিজ পেশার বাইরে তিনি সমাজের অন্য সব জায়গায় আর দশজন সাধারণ মানুষের মতোই। তার অধিকারও অন্য আর সবার সমান। আর এ জন্য প্রয়োজন একটি নাম-পরিচয়হীন সমাজ গড়ে তোলা। যেখানে কেউ কাউকে বলবে না আপনার কী অমুক জায়গায় ‘পরিচিত’ কেউ আছে!

আমিনুল ইসলাম সিনিয়র লেকচারার, ক্রিয়েটিভিটি অ্যান্ড ইনোভেশন বিভাগ
এস্তনিয়ায়ন এন্টারপ্রেনারশিপ ইউনিভার্সিটি। [email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন