বাংলাদেশের ফুটবলের এ কেমন হালহকিকত

বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ। দেশীয় ফুটবলের পেশাদার প্রতিযোগিতা। কিন্তু আয়োজনের দিক থেকে খুবই অপেশাদার। একদম হতশ্রী অবস্থায় হচ্ছে এবারের লিগ। টঙ্গীর আহসান উল্লাহ মাস্টার স্টেডিয়ামের অবস্থা বলার অযোগ্য। বৃষ্টির পানি মাঠে জমে যায়। ভরাট বালু ফেলে মাঠ সমান করার চেষ্টা করা হয়েছে।

মাঠের অনেক জায়গায় ঘাস নেই। মাঠের এক পাশে টিনের বেড়া। বেড়ার পাশেই উড়ালসড়ক নির্মিত হচ্ছে। মাঠের পাশ দিয়ে অনবরত গাড়ি যাচ্ছে। চারদিকে গাড়ির হর্নের প্যাঁ পোঁ আওয়াজ। মুন্সিগঞ্জের মাঠের অবস্থাও একই রকম। মাঠের বাইরেও অবিশ্বাস্যরকম এক তামাশা করেছে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)। স্টেডিয়ামেই খেলোয়াড়দের মেঝেতে তোশক বিছিয়ে থাকার অবস্থা করা হয়েছে।

এ-ই হচ্ছে দেশের পেশাদার লিগের এবারের আয়োজনের মোটামুটি চিত্র। আমাদের ফুটবল সবদিক থেকেই পিছিয়ে পড়ছে। ফুটবল নিয়ে বাস্তব কোনো পরিকল্পনা নেই। নীতিকৌশল নেই। আছে শুধু বাগাড়ম্বর। দেশের ফুটবল যখন তলানিতে এসে ঠেকেছে, গাম্বিয়া তখন আফ্রিকান নেশনস কাপের (আফকন) কোয়ার্টার ফাইনাল খেলে ফেলল, প্রথমবার খেলতে এসেই বাঘা বাঘা সব দলের সঙ্গে টক্কর দিয়ে। হুট করে গাম্বিয়ার কথা কেন টেনে আনলাম? গাম্বিয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করার কারণ হচ্ছে গাম্বিয়ার কোচ টম সেইন্টফিট একসময় আমাদের জাতীয় দলের কোচ ছিলেন।

আরও পড়ুন

বাবরি চুলের ফ্রেঞ্চ কাট দাড়ি রাখা এই কোচের আমলে বাংলাদেশ ভুটানের কাছে হেরেছিল। বাফুফে এটা মেনে নিতে পারেনি। তাই পত্রপাঠ টমকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। টমের যোগ্যতা নিয়ে বাফুফের মনে হয়তো সন্দেহ ছিল। কিন্তু ফুটবলের যাঁরা খোঁজখবর রাখেন এবং এবারের আফকনে গাম্বিয়ার খেলা দেখেছেন, তাঁদের ভুল ভাঙতে বেশি সময় লাগেনি। গাম্বিয়া খুবই গোছানো ও পরিকল্পিত ফুটবল খেলেছে। স্বাগতিক ক্যামেরুনের সঙ্গে সমানতালে পাল্লা দিয়ে লড়ে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নিয়েছে। গাম্বিয়া আফ্রিকার ফুটবলে বড় কোনো শক্তি নয়। সাধারণ মানের দল।

কিন্তু টমের অধীন রীতিমতো বাজিমাত করেছে গাম্বিয়া। দল হিসেবে গড়ে উঠছে।
অথচ দারিদ্র্যের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়তে হয় গাম্বিয়ানদের। পশ্চিম আফ্রিকার এই দেশে অর্থনীতির চাকা হচ্ছে কৃষি। ৭৫ শতাংশ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। এ ছাড়া দেশটিতে বনজ, খনিজ বা প্রাকৃতিক সম্পদ তেমন বেশি নেই। শিল্পায়নও হয়নি উল্লেখযোগ্যভাবে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুসারে গাম্বিয়া নিম্ন আয়ের দেশ। ২০২০ সালে মাথাপিছু আয় ছিল ৭৫০ ডলার।

আরও পড়ুন

দারিদ্র্যের মধ্যেও গাম্বিয়ার ফুটবল উঠে আসছে আফ্রিকার অন্য দেশগুলোর মতোই। জাতীয় দলের বেশির ভাগই ইউরোপের বিভিন্ন লিগে খেলে থাকেন। বড় তারকা ইতালির রোমার ইব্রাহিমা দারবো। গাম্বিয়ায় নিয়মিত লিগ হয়। সারা গাম্বিয়ায় আটটি ফুটবল খেলার মাঠ আছে। অর্থনৈতিক অবস্থার বিবেচনায় মাঠগুলোর অবস্থা বেশ ভালো বলেই বিভিন্ন গণমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে। ইউরোপের ক্লাব ফুটবলে ল্যাটিনোদের সঙ্গে ক্রমেই আফ্রিকানদের সংখ্যাও বাড়ছে। বোঝাই যাচ্ছে, আফকনের সাফল্য গাম্বিয়ান ফুটবলারদের প্রতি ইউরোপর ক্লাবগুলোকে আরও বেশি করে আগ্রহী করবে।

ফুটবলকে মাঠে ফেরাতে বাফুফের কর্তাব্যক্তিদের বাস্তবের জমিনে নেমে আসতে হবে। কাজী সালাউদ্দিন একবার বলেছিলেন, ২০২২ বিশ্বকাপে খেলার লক্ষ্য বাংলাদেশ দলের। ২০২২-এ আমরা দাঁড়িয়ে আছি। বাংলাদেশ ফুটবল দল এখন কোথায়?

আর আমাদের দেশে এখন ফুটবল খেলার প্রয়োজনীয় ভালো মাঠও নেই। অর্থনীতির সূচকে গাম্বিয়ার থেকে আমরা অনেক এগিয়ে। শুধু গাম্বিয়া নয়, আফকন জিতে নেওয়া সেনেগালও আমাদের থেকে অনেক পিছিয়ে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে এই মুহূর্তে আমাদের মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৫৯১ ডলার আর জিডিপির পরিমাণ ৩২৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার।

ওদিকে সেনেগালের মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৪৩০ ডলার। জিডিপির আকার ২৪ দশমিক ৯ বিলিয়ন। অবশ্য জনসংখ্যা আমাদের তুলনায় একেবারেই কম। ১ কোটি ৭০ লাখ মানুষ বাস করে সেনেগালে। আর গাম্বিয়ার জনসংখ্যা ২২ লাখ। অল্প কিছু মানুষ আর সীমিত সম্পদের মধ্য থেকেই উঠে আসছে সাদিও মানে, এদুওয়ার্দ মেন্দি, কুলিবালির মতো ইউরোপ মাতানো তারকারা।ইব্রাহিমারা মাঠে আলো ফোটানোর অপেক্ষায়। বলা হচ্ছে, আগামীর সময়টা হবে আফ্রিকার।

আমরা ফুটবলে কোনোভাবে এগোতে পারছি না। আমাদের সংকট অর্থের অপ্রতুলতা নয়। সংকট পরিকল্পনায়। বর্তমান বাফুফে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। অন্তত আমাদের এখন ফুটবল খেলার উপযোগী মাঠ না থাকার কথা নয়। দেশে ক্রিকেটের জন্য আন্তর্জাতিক মানের ১১টি স্টেডিয়াম আছে। ক্রিকেটের মাঠগুলো জাতীয় ক্রীড়া নিয়ন্ত্রণ পরিষদ (এনসিসি) তৈরি করেছে।

বিসিবি এগুলো পরিচালনা করে। এনসিসি বিসিবির চাহিদা অনুসারে মাঠগুলো তৈরি করে দেয়। চট্টগ্রামের সাগরিকা বা সিলেটের ক্রিকেট স্টেডিয়াম দুটি পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। বিসিবি ক্রীড়া পরিষদ দিয়ে নিজেদের মতো করে তৈরি করিয়ে নিয়েছে। দেশের প্রতিটি জেলায় একটি করে স্টেডিয়াম আছে। এগুলো সংস্কার করে আধুনিক স্টেডিয়ামে পরিণত করা সম্ভব। এনসিসি বিসিবির জন্য মাঠ তৈরি করে দেয়, বাফুফের জন্য করে দিচ্ছে না কেন?

এবড়োখেবড়ো মাঠে এখনো ফুটবল খেলার কোনো কারণ নেই। হয় বাফুফে এনসিসিকে বোঝাতে পারছে না অথবা বাফুফের প্রতি এনসিসির আস্থা নেই। তাই তাদের জন্য নতুন মাঠ তৈরি বা পুরোনোগুলো সংস্কার করে দিচ্ছে না।

মাঠ তৈরি বা খেলোয়াড় তৈরির দিকে মনে হচ্ছে বাফুফের তেমন আগ্রহ নেই। বাফুফের কর্মকর্তাদের কাজ হচ্ছে নির্বাচন আর কোচ বদল করা। ডিডো, ক্রুসিয়ানি, জর্জোভিচ, টম, ক্রুইফ, জেমি—অনেক কোচ এনেছি। আর বিদায় করেছি। বাফুফের না আছে নতুন পরিকল্পনা, না আছে তাদের পরিকল্পনা তৈরির মতো মেধা ও যোগ্যতা।

যোগ্যতার পরীক্ষায় বাফুফে, আরও স্পষ্ট করে বললে বাফুফের সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন ডাহা ফেল করেছেন। বাফুফে আর কিছু পারুক না পারুক, মাস্তানি করতে পারে। টঙ্গীর স্টেডিয়ামটি আর্চারি ফেডারেশনকে দিয়েছিল এনসিসি এশিয়ান গেমস, এশিয়া কাপ ও বিশ্বকাপের প্রস্তুতির জন্য। এই মাঠ থেকে আর্চারি ফেডারেশনকে জোর করে বের করে দিয়েছে বাফুফে।

ফুটবলের এই বন্ধ্যা অবস্থা থেকে বের হয়ে আসা জরুরি। প্রথমেই ফুটবলের সাংগঠনিক ও অবকাঠামোর পরিবর্তন করতে হবে। ফুটবলকে গুলিস্তানের স্টেডিয়াম থেকে বের করে সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে হবে। ফুটবলের এতই দুরবস্থা যে এখন বিনা টিকিটেও দর্শকেরা স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে যান না। কারণ হচ্ছে, পাতানো খেলার অভিযোগ। অথচ পাড়ার ফুটবলে এখনো কয়েকজন মানুষ মাঠে পাশে দাঁড়িয়ে খেলা দেখেন।

পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রথম ও প্রধান কাজটি হচ্ছে দেশে কমপক্ষে ১০-১২টি স্টেডিয়ামকে সংস্কার করে আধুনিক ফুটবলের উপযোগী করতে হবে। কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কুমিল্লা, সিলেট, বরিশাল, ময়মনসিংহ, রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া, রাজশাহী, যশোর, খুলনা, ফরিদপুরের জেলা স্টেডিয়ামগুলোতে সংস্কার করে আধুনিক ফুটবল মাঠে পরিণত করতে হবে। প্রতিটি মাঠের সঙ্গে আবাসিক ব্যবস্থা যুক্ত করতে হবে। পেশাদার লিগের দলগুলো এই মাঠকে নিজেদের মাঠ হিসেবে ব্যবহার করবে এবং লিগের সময় এখানেই আবাসিক ক্যাম্প করবে।

দলগুলোর নিজস্ব মাঠ বছর বছর পরিবর্তন করা যাবে না। ধরা যাক, বসুন্ধরা কিংস ময়মনসিংহের মাঠটি বরাদ্দ পেল। তখন তাদের নাম হবে বসুন্ধরা ময়মনসিংহ এবং বসুন্ধরা হোম ম্যাচগুলো নিয়মিত খেলবে। পেশাদার লিগের পাশাপাশি এই মাঠগুলোতে স্থানীয় লিগেরও আয়োজন করা হবে। সপ্তাহে দুটি করে খেলা হবে মাঠে। একটি পেশাদার লিগের খেলায়, আরেকটি স্থানীয় জেলা লিগের। এ ছাড়া জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নিয়মিত লিগ আয়োজন করতে হবে।

ফুটবলকে মাঠে ফেরাতে বাফুফের কর্তাব্যক্তিদের বাস্তবের জমিনে নেমে আসতে হবে। কাজী সালাউদ্দিন একবার বলেছিলেন, ২০২২ বিশ্বকাপে খেলার লক্ষ্য বাংলাদেশ দলের। ২০২২-এ আমরা দাঁড়িয়ে আছি। বাংলাদেশ ফুটবল দল এখন কোথায়? আকাশকুসুম কল্পনা বাদ দিয়ে সঠিক ও বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। না হলে কোচ আসবে, কোচ যাবে, টম গাম্বিয়াকে আফকনের কোয়ার্টার ফাইনালে নিয়ে যাবেন। অটো ফিস্টার টোগোকে বিশ্বকাপে নেবেন। আর আমরা পেছাতেই থাকব।

ড. মারুফ মল্লিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক