পাশেই দাঁড়ানো ছিলেন আছির উদ্দীন আর তাঁর স্ত্রী। তাঁর স্ত্রীর কোলে বছর দুয়েকের একটি সন্তান। আছির উদ্দীনের স্ত্রীর কাছে জানা গেল, গত বছর নদীতে সব বিলীন হওয়ার পর তাঁদের মেয়ে তিন সন্তানকে রেখে ঢাকা গেছেন কাজের খোঁজে। মেয়ের স্বামী পালিয়েছেন অনেক দিন আগেই। ঢাকায় তাঁর মেয়ে কাজ করে ১১ হাজার ৪০০ টাকা জমিয়েছিলেন। মোবাইল অ্যাকাউন্টে সেই টাকা ছিল। সেই টাকা কে তুলে নিয়েছে জানেন না। আছির উদ্দীন বললেন, ‘মেয়েটা ফোন দিয়া খালি কান্দে। টাকার অভাবে আইসপার পারিল না।’ আছির উদ্দীন স্ত্রী ও মেয়ের তিন সন্তানকে নিয়ে অন্যের বাড়িতে আশ্রিত।

‘এবার হামার সোগ শ্যাষ। তিস্তার আবাদ বাদাম, পেঁয়াজ, মরিচ, রসুন, ডুবি গেইচে। মানুষ আধা পাকা ধান কাটি আনি গরুক খোয়াইতেছে।’
তিস্তা ভাঙনের শিকার বেলাল নামের এক ব্যক্তি

কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার গতিয়াশাম নামক এলাকায় তিস্তা নদীর পাড়ে গত ৩০ এপ্রিল কফিল উদ্দীনদের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। আছির উদ্দীন-কফিল উদ্দীনদের মতো তিস্তাতীরবর্তী লাখ লাখ মানুষের দীর্ঘশ্বাসে সেখানকার বাতাস ভারী হয়ে আছে।
গতিয়াশামে আছে সরিষাবাড়ী বাজার। তিস্তা থেকে ১০০ গজ উজানে। তিস্তায় যাওয়ার সময় বৃষ্টি শুরু হলে সরিষাবাড়ীর একটি চায়ের দোকানে বসি। সেখানে বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয়। বেলাল নামের একজন মুখোমুখি বসে ছিলেন। তিনি বলেন, ‘এবার হামার সোগ শ্যাষ। তিস্তার আবাদ বাদাম, পেঁয়াজ, মরিচ, রসুন, ডুবি গেইচে। মানুষ আধা পাকা ধান কাটি আনি গরুক খোয়াইতেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘হামার বাড়ি নদীত চলি গেইচে। এলা খুব অভাব। ছয় মাসেও এক দিন মাংস কিনি না।’

default-image

এ কথা শুনে পাশে বসে থাকা শামসুল হক বলেন, ‘বছরে দুবার মাংস খাওয়া অনেক মানুষ আছে। দুই ঈদোত দুবার মাইনষের দেওয়া মাংস খায়।’ শামসুলের বাড়িও নদীতে বিলীন হয়েছে। চার শতক জমির ওপর জামাইকেও আশ্রয় দিয়েছেন। তাঁর আশঙ্কা, এবারও বাড়ি তিস্তায় চলে যাবে। বাড়ি তিস্তায় চলে গেলে ঢাকা চলে যাবেন বলে জানালেন তিনি।

কথায় আরও যোগ দেন জিয়ারুল ইসলাম। তাঁর বাড়ি ভেঙে গেছে তিস্তায়। আশ্রয় নিয়েছিলেন শ্বশুরের বাড়িতে। শ্বশুরবাড়িও তিস্তায় বিলীন। এখন বাঁধের ওপর ঘর তুলে আছেন। তিস্তা নদী থেকে অবৈধ বালু তোলার কারণে ভাঙন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বালু তোলার কথা সবাই জানে। পুলিশও দেখে। হামরা কিছু কই না। কইলে বিপদ হইবে।’ পাশেই একজন দাঁড়িয়ে কথা শুনছিলেন। তাঁকে দেখিয়ে দিয়ে সাইফুল বললেন, ‘এর ১৫০ হাত পাকা ঘর ছিল। অনেক জমি ছিল। এলা আর কিচ্ছু নাই। অন্যের বাড়িত থাকে এলা। চিন্তায় চিন্তায় শুকি কাঠ হইচে।’

default-image

আমার সঙ্গে ছিলেন হামিদুল ইসলাম। তিনি একটি পরিবারের কথা বলছিলেন। গত বছর বাড়ি ভেঙে সেই পরিবারের চার ভাই সবাই তাঁদের শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন।

তিস্তা নদীর ভাঙনদুর্গতদের ঘরে ঈদের কোনো আনন্দ নেই। তিস্তাপাড়ে কেউ নিঃস্ব হয়েছেন আর কেউ নিঃস্ব হওয়ার আশঙ্কায় প্রহর গুনছেন। গত বছর শুধু গতিয়াশামে দেড়-দুই হাজার বাড়ি ভেঙেছে। চারটি গ্রাম নদীগর্ভে। তবু ভাঙন প্রতিরোধে সরকারের কোনো পদক্ষেপ নেই। এ বছরও ভাঙছে। যখন ভাঙন ভয়াবহ রূপ নেবে এবং প্রলয়ংকরী হয়ে উঠবে, তখন কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে বালুর বস্তা ফেলা হবে। যে বালুর বস্তা ফেলামাত্রই নদীতে ভেসে যাবে। কে জানে, এতেই হয়তো একশ্রেণির মানুষের লাভ বেশি!

সরিষাবাড়ীতেই দেখলাম একটি পরিবার চর থেকে ঘর তুলে নিয়ে আসছে। বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ছাত্র লেখাপড়ার পাশাপাশি পার্টটাইম চাকরি করে কিছু টাকা জমিয়ে জমি কিনেছেন। গত বছর ভেঙেছে বাড়ি আর এখন ক্রয়কৃত জমিতে নেওয়া হচ্ছে ঘর।

তিস্তাপাড়ে হাজার হাজার মানুষ এখনো অন্যের বাড়িতে আশ্রিত। তাঁদের অনেকেই সুদের মহাজনদের কাছ থেকে কিংবা বেসরকারি সংস্থা থেকে টাকা ধার নিয়ে ফসল ফলিয়েছিলেন। সেই ফসলও পাওয়া গেল না। গত ফেব্রুয়ারি মাসে হঠাৎই পানি বাড়ে নদীতে। এই পানি বন্যা হওয়ার মতো নয়। যেহেতু নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে আছে, তাই সামান্য পানিতে বন্যা হয়। এই বন্যার পর থেকে তিস্তায় পানি বাড়ছে। ফলে এখনো ডুবছে লাখ লাখ হেক্টর জমির ফসল। যাঁরা স্বপ্ন দেখেছিলেন ফসল তুলে ঋণ শোধ করে লাভের টাকায় জমি কিনবেন, তাঁদের মাথার ওপর ঋণের বোঝা আরও ভারী হচ্ছে।

তিস্তাপাড়ের মানুষ দিশেহারা। সরকারের পানে তাঁরা চেয়ে আছেন। সরকারি কোনো উদ্যোগ না দেখে উপায়ান্তর না পেয়ে গত বছর আল্লাহর দরবারে তাঁরা দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন। এ বছরও ইফতার করে আল্লাহর দরবারে আবেদন জানিয়েছেন তিস্তার ভাঙন থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য।

তিস্তাপাড়েই কথা হচ্ছিল তোফাজ্জল নামের এক মাঝবয়সীর সঙ্গে। তিনি বলছিলেন, ‘উত্তরের মানুষের দিকে সরকারের নজর নাই। থাকলে তিস্তাত কোনো না কোনো কাম হইতো!’ অপ্রিয় হলেও তোফাজ্জল হোসেনের কথাই সত্যি।

তিনি নিজের জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা দিয়ে এটি উপলব্ধি করেছেন। আমাদের সরকারের উচ্চপদস্থ কর্তা যাঁরা আছেন, তাঁরা কি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে তোফাজ্জল হোসেনের উচ্চারণের সত্যতা উপলব্ধি করতে পারেন? তরতর করে বাড়ছে দেশের অর্থনৈতিক সামর্থ্য। এই উন্নতির নিচে চাপা পড়া দুই ঈদে মানুষের দেওয়া মাংস খাওয়া কিংবা ঘরবাড়িহীন মানুষগুলোর খোঁজ কে নেবে? বছরের বড় বড় উৎসবে কি তাঁদের দুঃখ আরও প্রগাঢ় হবে?

তুহিন ওয়াদুদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং নদী রক্ষাবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক
[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন