স্বাধীনতার পর তিনটি দলই ক্ষমতায় এসেছে কিংবা আছে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি। দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অতি ভঙ্গুর হয়ে থাকলে বা সুষ্ঠু নির্বাচন না হয়ে থাকলে তার দায়ও তাদের নিতে হবে। আরও কৌতুককর হলো বাংলাদেশে নির্বাচন নিয়ে যত বিতর্কই থাকুক না কেন, কোনো নির্বাচন বাতিল হয়নি। এমনকি উচ্চ আদালত সংবিধানের পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনী বাতিল করলেও সেই সময়ের অনেক বিধিবিধানও বহাল রেখেছেন। এরশাদ আমলে বিতর্কিত চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদ যখন সংসদ সদস্যদের বিনা শুল্কে গাড়ি কেনার সুযোগ দিয়েছিল, তখন আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ সব দলই এর কঠোর সমালোচনা করেছিল। পরে তারা ক্ষমতায় এসে সেই সুযোগ পুরোটাই নিয়েছে এবং এখনো সেই আইন বহাল আছে। আমাদের জনপ্রতিনিধিরা ভাবেন, সংসদ সদস্য হিসেবে তাঁদের বাড়তি সুবিধা থাকা উচিত। ফলে তাঁদের শুল্কমুক্ত গাড়ি দিতে হবে। অথচ যাঁরা তাঁদের নির্বাচিত করেছেন, জনগণ সেই সুবিধা পাবেন না। সংসদের স্থায়ী কমিটিগুলো নির্বাহী বিভাগের দোষত্রুটি ধরার চেয়ে বিদেশভ্রমণের সুযোগ নিতেই বেশি ব্যস্ত।

আওয়ামী লীগ উচ্চ আদালতের যে রায়ের দোহাই দিয়ে নির্দলীয় সরকারব্যবস্থা বাতিল করেছে, সেই রায়েও বলা হয়েছিল, সংসদ চাইলে দুটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার অধীনে হতে পারে; তবে বিচার বিভাগকে যুক্ত করা যাবে না। আজ তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার কথা শুনলে আওয়ামী লীগের নেতারা তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠেন। অথচ তঁারা একসময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিদেশে রপ্তানি করারও ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিলেন।

ব্রিটিশরা যে এ দেশে ‘ভাগ করো ও শাসন করো’ নীতি নিয়েছিল, তারা চলে যাওয়ার ৭৫ বছর পরও সেই নীতি অব্যাহত আছে। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে দমন করো এবং শাসন করো নীতি অনুসৃত হতে দেখা যাচ্ছে। ক্ষমতার বিচিত্র ছলনায় একদা পরম রাজনৈতিক মিত্ররা শত্রুতে পরিণত হন। আবার অতীতের শত্রুরা মিত্র হিসেবে আবির্ভূত হন।

সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদে বলা হয়, ‘প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকিবে, মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হইবে এবং প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হইবে।’ কিন্তু জেলা পরিষদ গঠিত হওয়ার পর আওয়ামী লীগ সরকার মাত্র একবারই নির্বাচন করেছে, ২০১৫ সালে। সম্প্রতি জেলা পরিষদগুলো ভেঙে দিয়ে ফের অনির্বাচিতদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া প্রায় সব সাবেককে বহাল করা হয়েছে নির্বাহীর আদেশে। এত দিন যাঁরা নির্বাচিত জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ছিলেন, তাঁরাই এখন সেই পরিষদের প্রশাসক। ব্যক্তি একই আছে, পদবি বদল হয়েছে মাত্র। সরকার যদি ‘প্রশাসনের সব পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে পরিচালিত হবে’—এই বিধান মেনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে থাকে, তাহলে জেলা পরিষদ কেন অনির্বাচিত ব্যক্তি দ্বারা চলছে?

বাংলাদেশের রাজনীতিকেরা তাঁদের সুবিধার জন্য আইন বানান ও বদলান। জনগণের কথা ভেবে আইন করেন, এ রকম নজির খুবই কম। তাঁরা নিজেদের সুবিধামতো কাউকে দেশদ্রোহী ও কাউকে দেশপ্রেমিক বানান। কেবল বাংলাদেশ নয়, উন্নয়নশীল প্রায় সব দেশেই ‘ষড়যন্ত্রতত্ত্ব’ বেশ জনপ্রিয়। যখন যাঁরা ক্ষমতায় থাকেন, তাঁরা এই অস্ত্র প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে থাকেন।

নব্বইয়ে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় তিন জোটের রূপরেখায় স্বৈরাচারের সহযোগীদের দলে নেবে না বলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি অঙ্গীকার করেছিল। পরবর্তীকালে আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে দেখলাম, দুই দল পাল্লা দিয়ে স্বৈরাচারের সহযোগীকে সঙ্গে রেখেছেন। মন্ত্রী-উপদেষ্টা করেছেন। তিন জোটের রূপরেখায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ পরিচালনার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু কোনো দলই কথা রাখেনি। আওয়ামী লীগ প্রচণ্ডভাবে সেনাশাসকের বিরোধী। কথায় কথায় জিয়াউর রহমানের সমালোচনা করে। কিন্তু এরশাদ ও তাঁর দলের বিষয়ে নমনীয়। কেননা, তারা জানে বিএনপি ও জাতীয় পার্টি এক হলে খবর আছে।

নির্বাচন সামনে রেখে রাজনীতিতে নতুন করে মেরুকরণ শুরু হয়েছে। ছোট দলগুলো নানা হিসাব-নিকাশ করছে। বিভিন্ন জোটে ভাঙা–গড়ার আলামত পাওয়া যাচ্ছে। সম্প্রতি কুমিল্লার চান্দিনায় এলডিপির একাংশের সাধারণ সম্পাদক রেদোয়ান আহমেদকে সভা করতে বাধা দেওয়া নিয়ে যা ঘটেছে, তার পেছনেও নির্বাচনী রাজনীতি কাজ করেছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রশ্নে এলডিপি দুই ভাগে বিভক্ত। অলি আহমদ-রেদোয়ানরা বিএনপির সঙ্গে আছেন। তাঁদের বিরোধী গ্রুপ সরকারি দলের দিকে ঝুঁকছে। নির্বাচনের আগে রাজনীতিতে আরও অনেক রদবদল, মতবদল ও পথবদলের ঘটনা ঘটবে।

ব্রিটিশরা যে এ দেশে ‘ভাগ করো ও শাসন করো’ নীতি নিয়েছিল, তারা চলে যাওয়ার ৭৫ বছর পরও সেই নীতি অব্যাহত আছে। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে দমন করো এবং শাসন করো নীতি অনুসৃত হতে দেখা যাচ্ছে। ক্ষমতার বিচিত্র ছলনায় একদা পরম রাজনৈতিক মিত্ররা শত্রুতে পরিণত হন। আবার অতীতের শত্রুরা মিত্র হিসেবে আবির্ভূত হন।

অতীতে আওয়ামী লীগ বিএনপি ও জাতীয় পার্টির বিরুদ্ধে ভোট কারচুপি-জালিয়াতির যেসব অভিযোগ আনত, সেই একই অভিযোগ এখন তাদের বিরুদ্ধে আনছে তারা। অর্থাৎ রাজপথে জন্ম নেওয়া আওয়ামী লীগও সেনাশাসনের গর্ভে সৃষ্ট বিএনপি-জাতীয় পার্টির কাতারেই চলে এল।

নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা না করা নিয়ে বিতর্ক চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরেই। সমস্যাটি আসলে ইভিএমের নয়। ইভিএমের পেছনের যে মানুষগুলো আছেন, তাঁরাই বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন। আমাদের দেশে কোনো বিষয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি একমত হতে পারে না। তবে শুল্কমুক্ত গাড়ির বিষয়ে শতভাগ ঐক্য আছে, থাকবে।

ভুয়া ভোটার ঠেকাতে আমরা ছবিযুক্ত ডিজিটাল ভোটার তালিকা করলাম। কিন্তু এখন তো ছবিযুক্ত ভোটার তালিকাও মানুষের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে পারল না। এ দায় কীভাবে এড়াবে আওয়ামী লীগ?

সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি

[email protected]