বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

মুসলমানরা ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে কিছু কিছু এলাকায় সাম্প্রদায়িক আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়লেও খ্রিষ্টানদের পক্ষে সচরাচর তেমনটিও সম্ভব নয় ভারতে। সংখ্যায় তারা খুব অল্প। পাশাপাশি খ্রিষ্টানদের ৭৫ ভাগই জাতিগতভাবে দলিত-সমাজের অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষ। তারপরও তাদের ওপর শরীরী আক্রমণের নতুন তরঙ্গ উঠেছে। সঙ্গে আছে পরোক্ষ আক্রমণের নানান ধরনও। যেসব এনজিও খ্রিষ্টানদের মধ্যে উন্নয়নধর্মী কাজ করে, তাদের বিদেশি অর্থসহায়তায় আরোপ করা হয়েছে নানান বিধিনিষেধ। অনেক সংগঠনের রাষ্ট্রীয় সনদও বাতিল হয়েছে। অথচ আরএসএসের অঙ্গসংগঠনগুলো বিপুলভাবে বিদেশ থেকে অর্থ সংগ্রহ করছে যুগের পর যুগ। খ্রিষ্টানদের মধ্যে কাজ করা এনজিওগুলোর রেজিস্ট্রেশন বাতিলের পটভূমি তৈরি করতে বিজেপি কর্মীরা তাদের ‘মিশনারি মাফিয়া’ বলে প্রচার করছে বহুদিন।

ধর্মান্তরকরণ: প্রকৃত তথ্য এবং রাজনৈতিক প্রচারে বিশাল ব্যবধান
এ মুহূর্তে খ্রিষ্টানদের ওপর হামলার বড় অজুহাত হলো ধর্মান্তকরণ। দীর্ঘ প্রচারণার মাধ্যমে এমন একটা বিশ্বাস তৈরি করা হয়েছে যে ভারতে প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ ধর্মান্তরিত হচ্ছে। দেশটিতে প্রতিবছর ঠিক কী পরিমাণ মানুষ ধর্মান্তরিত হয়, সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া মুশকিল। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের দাবি, বছরে আট লাখ হিন্দু ধর্ম পাল্টাচ্ছে। তাদের এই দাবির পক্ষে কোনো রাষ্ট্রীয় সূত্র উল্লেখ করা হয় না এবং এই দাবির সঙ্গে বাস্তব চিত্রও মেলে না। ভারতের দুটি সংবাদমাধ্যমের (দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস) গুজরাট ও কেরালার এ-সংক্রান্ত দুটি প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, প্রায় ১০ কোটি বাসিন্দার এই দুই রাজ্যে বছরে গড়ে ৯০০ লোক ধর্ম পাল্টাতে আবেদন করছে। এই হিসাবে পুরো ভারতে বছরে ধর্ম পাল্টাতে চাওয়া মানুষের সংখ্যা ১২ থেকে ১৩ হাজার, যা দেশটির পুরো জনসংখ্যার .০০০০০৯৩ শতাংশ! এদের সবাই আবার হিন্দু থেকে অন্য ধর্মে যাচ্ছে, তা-ও নয়। সব ধর্ম মিলেই ও রকম পরিসংখ্যান।

নগণ্যসংখ্যক ধর্মান্তরিত হওয়ার এ ঘটনাই ভারতজুড়ে রাজনীতির বড় এক বিষয় করে তোলা হয়েছে সম্প্রতি। এই ভীতিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে রাজ্যে রাজ্যে ধর্মান্তরকরণবিরোধী বিল পাসের মাধ্যমে নাগরিকদের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে নেওয়া হচ্ছে চিরস্থায়ীভাবে। কেউ ধর্মান্তরিত হলেই অভিযোগ উঠছে তাকে জোরপূর্বক বিশ্বাস পাল্টাতে বাধ্য করা হয়েছে। বিশেষ করে কেউ বিদ্যমান আইনি প্রক্রিয়া মেনেই হিন্দুধর্ম ত্যাগ করতে চাইলে তাৎক্ষণিকভাবে আশপাশের খ্রিষ্টানরা আক্রমণের শিকার হচ্ছে।

নগণ্যসংখ্যক ধর্মান্তরিত হওয়ার এ ঘটনাই ভারতজুড়ে রাজনীতির বড় এক বিষয় করে তোলা হয়েছে সম্প্রতি। এই ভীতিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে রাজ্যে রাজ্যে ধর্মান্তরকরণবিরোধী বিল পাসের মাধ্যমে নাগরিকদের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে নেওয়া হচ্ছে চিরস্থায়ীভাবে। কেউ ধর্মান্তরিত হলেই অভিযোগ উঠছে তাকে জোরপূর্বক বিশ্বাস পাল্টাতে বাধ্য করা হয়েছে। বিশেষ করে কেউ বিদ্যমান আইনি প্রক্রিয়া মেনেই হিন্দুধর্ম ত্যাগ করতে চাইলে তাৎক্ষণিকভাবে আশপাশের খ্রিষ্টানরা আক্রমণের শিকার হচ্ছে।

বর্ণপ্রথা থেকে উদ্ধার পেতে বহু যুগ থেকে স্বেচ্ছায় দলিতদের বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও মুসলমান হওয়ার রেওয়াজ রয়েছে ভারতে। বিজেপি সেই প্রবণতা থামাতে চেষ্টা করছে। কারণ, এতে উত্তর ভারতে তাদের সামাজিক আধিপত্য কমার শঙ্কা রয়েছে। সে লক্ষ্যে বিভিন্ন আইনগত উদ্যোগের পাশাপাশি এখন সরাসরি সামাজিক বলপ্রয়োগকেও রক্ষাকবচ হিসেবে গ্রহণ করেছে তারা। প্রান্তিক এলাকার খ্রিষ্টান গ্রামগুলোকে ইদানীং সামাজিক বয়কটের মাধ্যমে চাপে ফেলারও কৌশল নেওয়া হয়েছে। মধ্যপ্রদেশে এমনও ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে, গ্রামে কেউ কোনো খ্রিষ্টানকে বাড়িতে ঢুকতে দিলে তাকে জরিমানার মুখে পড়তে হচ্ছে।

পাশাপাশি নতুন আইনে জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণের নজির মিললে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। প্রায় ১১টি রাজ্যে ইতিমধ্যে এ রকম আইন হয়েছে। আরও কিছু রাজ্যে করার প্রক্রিয়া চলছে। ২০২০ থেকে সবচেয়ে বড় রাজ্য উত্তর প্রদেশে চালু হওয়া এই আইনের বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায়, ছেলেমেয়েদের ভালোবেসে বিয়ে করতে গিয়ে ধর্ম পাল্টানোও এখন অজামিনযোগ্য ‘অপরাধ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মূলত, হিন্দু তরুণীদের অন্য ধর্মে বিয়ে ঠেকাতে সেখানকার ধর্মান্তরকরণ আইনে বহু ধরনের বিধি যুক্ত করা হয়েছে। ধর্মান্তরকরণ বন্ধ করার পাশাপাশি খ্রিষ্টান ও বিশেষভাবে মুসলমান জনসংখ্যা কমাতে জন্মনিয়ন্ত্রণকে আরও কঠোর করার প্রচারণাও চলছে প্রবলভাবে।

শুমারি দলিল নিয়ে পরিসংখ্যানের রাজনীতি
আরএসএস পরিবারের অনেক তাত্ত্বিকই মনে করেন, মিশনারিগুলো ভারতের জনবিন্যাস পাল্টে দিচ্ছে। তাঁরা উদাহরণ হিসেবে হাজির করেন নাগাল্যান্ড, অরুণাচল, মিজোরাম ইত্যাদি অঞ্চলের কথা। এসব রাজ্যে নাগরিকদের ধর্মীয় পরিচয়ে খ্রিষ্টানরা এগিয়ে থাকলেও এটা মানতে হবে, দেশটির খুব সামান্য জনসংখ্যার বাস পাহাড়িয়া উত্তর-পূর্বাঞ্চলে। ‘মিজোরামে ৮৭ ভাগ মানুষ খ্রিষ্টান’—এ কথার আড়ালে বড় সত্য হলো রাজ্যটি জনসংখ্যাই মাত্র ১২ লাখ। হিন্দুপ্রধান ২০ কোটি জনসংখ্যার উত্তর প্রদেশের মতো রাজ্যের কাছে সেটা কিছুই নয়। ভারতের যেগুলো বড় প্রদেশ, উত্তরের সেসব স্থানে খ্রিষ্টান জনসংখ্যা প্রায় নেই-ই। কিন্তু মিজোরাম, নাগাল্যান্ড ইত্যাদি রাজ্যের খ্রিষ্টান প্রাধান্যের তথ্য ছড়িয়ে সারা ভারতে তুমুল ধর্মীয় ভীতির এক আবহ ধরে রাখা হয় নিয়মিত।

গত ১৪ অক্টোবর আরএসএসের প্রধান মোহন ভগত যখন বার্ষিক ভাষণে ধর্মান্তরকরণের বিরুদ্ধে দেশবাসীকে সতর্ক করে দেন—ঠিক তিন দিন পরই মধ্যপ্রদেশে শুরু হয় ‘চাদরমুক্ত ও ফাদারমুক্ত’ দেশ গড়ার সামাজিক আন্দোলন। ‘চাদর’ বলতে আন্দোলনকারীরা বোঝাচ্ছিলেন মুসলমান নারীদের পর্দার কথা আর ‘ফাদার’ হলো গির্জার পুরোহিত। এরপরই গত নভেম্বর-ডিসেম্বরজুড়ে ভারতের বিভিন্ন স্থানে খ্রিষ্টানদের প্রার্থনাস্থলে, তাদের ধর্মীয় অন্যান্য কাজে ব্যাপক বাধা পড়ছে। গির্জা ভাঙচুর হচ্ছে। আক্রান্ত হচ্ছে ‘ফাদার’রা। যেহেতু উত্তর ভারতে অনেক রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায়, সে কারণে এসব অনাচারের ন্যায়বিচার চাওয়া-পাওয়া সংখ্যালঘুদের পক্ষে প্রায় অবিশ্বাস্য এক ব্যাপার।

খ্রিষ্টানদের ওপর আক্রমণের জন্য সামাজিক সমর্থন তৈরি করতে শুমারি দলিলগুলো অদ্ভুতভাবে ব্যবহারের চল শুরু হয়েছে। সর্বশেষ শুমারি দলিল ব্যবহার করে তৈরি দ্য হিন্দুর এ রকম একটা সংবাদ হিন্দুত্ববাদীরা ভারতজুড়ে প্রচার করে থাকে যে ‘ওডিশায় খ্রিষ্টান জনসংখ্যা গত ৫০ বছরে ৪৭৮ শতাংশ বেড়ে গেছে, অথচ হিন্দু জনসংখ্যা বেড়েছে ১৩০ ভাগ’ (২৯ মার্চ ২০১৬)। এ ধরনের হেডিং তাৎক্ষণিকভাবে হিন্দুপ্রধান-সমাজে উত্তেজনা ছড়াতে বাধ্য। কিন্তু বাস্তবতা হলো এই রাজ্যে খ্রিষ্টান জনসংখ্যা ১৯৬১ সালে ছিল ২ লাখ। ২০১০ সালে হয়েছে ১১ লাখ ৬১ হাজার। অথচ একই সময়ে হিন্দু জনসংখ্যা ১ কোটি ৭১ লাখ থেকে বেড়ে হয়েছে প্রায় ৪ কোটি। অর্থাৎ ওডিশায় হিন্দু জনসংখ্যা যে ২ কোটির বেশি বেড়েছে, সেটায় আলো না ফেলে সেখানে ৯ লাখ খ্রিষ্টান বাড়াকে বড় করে দেখানো হচ্ছে। এখনো এ রাজ্যে খ্রিষ্টানদের চেয়ে হিন্দু প্রায় ৩৫ গুণ বেশি। কিন্তু রাজনীতির প্রধান পণ্য হয়ে আছে মিশনারিরা ওডিশার জনমিতি পাল্টে দিয়েছে।

বিজেপির তাত্ত্বিকেরা অনেক সময় খ্রিষ্টান ও মুসলমানদের সংখ্যাবৃদ্ধিকে ‘জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী’ ঘটনা হিসেবেও তুলে ধরেন। তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গিকে ন্যায্যতা দিতে বিজেপি-সমর্থক কাগজগুলোয় প্রায়ই দেশের বিভিন্ন জেলায় অহিন্দু জনসংখ্যার ‘বিস্ফোরণ’ এবং হিন্দু জনশক্তি ‘শুকিয়ে মরা’ সম্পর্কে ‘অনুসন্ধানী প্রতিবেদন’ প্রকাশ পায়। কিন্তু দেশটির সর্বশেষ শুমারি দলিলের বিশ্লেষণে দেখা যায়, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার প্রায় সব সম্প্রদায়েই কমছে। হিন্দুদের প্রবৃদ্ধি যেখানে ৩ শতাংশ কমেছে, মুসলমানদের প্রবৃদ্ধি কমেছে ৫ শতাংশ। আগের দশকেও ঠিক একই প্রবণতা ছিল। খ্রিষ্টানদের ক্ষেত্রে জনসংখ্যার জাতীয় হিস্যাই কমে গেছে গত পাঁচ দশকে।

ঠিক একইভাবে ভারতে মুসলমান জনসংখ্যা বাড়ার বিষয়েও শুমারি দলিলের তথ্যকে আক্রমণাত্মকভাবে উপস্থাপন করে তাদের ওপর নিপীড়নের পটভূমি তৈরি করা হয়। আসামে এমন ঘটছে বিগত বছরগুলোয়।

বিজেপির তাত্ত্বিকেরা অনেক সময় খ্রিষ্টান ও মুসলমানদের সংখ্যাবৃদ্ধিকে ‘জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী’ ঘটনা হিসেবেও তুলে ধরেন। তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গিকে ন্যায্যতা দিতে বিজেপি-সমর্থক কাগজগুলোয় প্রায়ই দেশের বিভিন্ন জেলায় অহিন্দু জনসংখ্যার ‘বিস্ফোরণ’ এবং হিন্দু জনশক্তি ‘শুকিয়ে মরা’ সম্পর্কে ‘অনুসন্ধানী প্রতিবেদন’ প্রকাশ পায়। কিন্তু দেশটির সর্বশেষ শুমারি দলিলের বিশ্লেষণে দেখা যায়, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার প্রায় সব সম্প্রদায়েই কমছে। হিন্দুদের প্রবৃদ্ধি যেখানে ৩ শতাংশ কমেছে, মুসলমানদের প্রবৃদ্ধি কমেছে ৫ শতাংশ। আগের দশকেও ঠিক একই প্রবণতা ছিল।

খ্রিষ্টানদের ক্ষেত্রে জনসংখ্যার জাতীয় হিস্যাই কমে গেছে গত পাঁচ দশকে। ১৯৭১ সালে ভারতীয় লোকগণনায় খ্রিষ্টান হিস্যা ছিল ২ দশমিক ৫৩ শতাংশ, ১৯৯১ সালে এটা দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৪৩, আর সর্বশেষ ২০১১ সালে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৩০ শতাংশ। এসব উপাত্ত বিজেপির তাত্ত্বিকদের প্রচারণার সঙ্গে কোনোভাবে মিলছে না। কিন্তু তাঁদের প্রচারণায় ভারত উত্তাল।

রাজনীতি এবং শ্রেণি আধিপত্যও আক্রমণের বড় কারণ
উপমহাদেশের সব দেশই আন্তধর্মীয় সহিংসতার জন্য ঐতিহাসিকভাবে কুখ্যাত জায়গা। তবে ১৯৯৬ সালের আগে খ্রিষ্টানবিরোধী সহিংসতার নজির ভারতে বেশি ছিল না। ১৯৬৪ থেকে ১৯৯৬ সালের মধ্যে এ রকম সহিংসতা নথিভুক্ত হয়েছে মাত্র ৩৮টি। কিন্তু এর পর থেকে পরিস্থিতি আমূল পাল্টাতে থাকে। দেশটিতে এ সময়ই বিজেপির উত্থানেরও শুরু। এর মধ্যে ১৯৯৯ সালে ওডিশায় খ্রিষ্টান ফাদার গ্রাহাম স্টেইনকে তাঁর দুই পুত্রসহ গাড়িতে আটকিয়ে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার ঘটনায় বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদ ওঠায় গত দুই দশক খ্রিষ্টানদের ওপর নিপীড়ন কিছুটা কমেছিল। সম্প্রতি আবার তার নবতরঙ্গ দেখা যাচ্ছে। যেহেতু প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যাপক এবং ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির জোর কমছে, সে কারণে খ্রিষ্টানদের পক্ষে প্রত্যাশিত নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার পাওয়াও ক্রমে দুরূহ হয়ে উঠেছে। খ্রিষ্টান-সমাজ এ মুহূর্তে এক রাজনৈতিক দুষ্টচক্রেরও শিকার। তারা একদিকে হিন্দুত্ববাদীদের আক্রমণের শিকার, আবার ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিকে পছন্দের কারণে তাদের ওপর আক্রমণ বেড়েও যাচ্ছে।

পিউ রিসার্চের গত বছরের জুলাইয়ের জরিপে দেখা গেছে, প্রতি ১০ জন খ্রিষ্টানের মাত্র ১ জন বিজেপিকে ভোট দেন। তার মানে দাঁড়াচ্ছে, অবিজেপি রাজনৈতিক দলগুলো পাচ্ছে ৯ গুণ বেশি খ্রিষ্টান ভোট। গির্জা ভাঙচুরের পরোক্ষ উত্তর এখানেই লুকিয়ে আছে। এ অবস্থা বদলাতে আরএসএস কয়েক বছর ধরে ‘ভারতীয় খ্রিষ্টান মঞ্চ’ নামে অঙ্গসংগঠন গড়ে তুলেছে। মুসলমানদের মধ্যে কাজের জন্য ‘মুসলিম রাষ্ট্রীয় মঞ্চ’ নামে অনুরূপ সংগঠন রয়েছে তাদের। আরএসএসের এখনকার ৩৬টি অঙ্গসংগঠনের মধ্যে এ দুটি নবীন। জাতীয় ভোটে বিজেপি ব্যাপকভাবে এগিয়ে থাকার পরও এসব অঙ্গসংগঠন গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট যে আরএসএস পরিবার মুসলমান ও খ্রিষ্টান ভোটব্যাংককে গুরুত্ব দিচ্ছে। আইনি চাপ ও পেশিশক্তির ব্যবহারের পাশাপাশি তারা এই দুই জনগোষ্ঠীর মধ্যে অহিংস ধারার রাজনৈতিক কাজকে বাদ দিচ্ছে না।

কিন্তু খ্রিষ্টান ও মুসলমানদের মধ্যে ভারতজুড়ে রাজনৈতিক সচেতনতা যত বাড়ছে, তত দেশটি কার্যত ভেতর থেকে ভাগ হয়ে যাচ্ছে। তা ছাড়া গোয়া, কেরালা, মণিপুর ও অরুণাচলে বর্তমানে খ্রিষ্টান জনসংখ্যা গড়ে প্রায় ৩০ শতাংশ করে আছে। এদের পরিণতি যাতে নাগাল্যান্ড, মিজোরাম ও মেঘালয়ের মতো না হয়, সেটা আরএসএসকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। আরএসএস পরিবারের একই রকম উদ্বেগ আছে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান জনসংখ্যা নিয়ে।

মুসলমান ও খ্রিষ্টানদের সংখ্যা বাড়লে বিজেপির জন্য কী সংকট দাঁড়ায়, তার নজির কেরালা। প্রায় সমগ্র ভারত জয়ের পরও এই রাজ্যে বিজেপি জাতীয় নির্বাচনে কোনো আসন পায় না। কেরালায় এখনো হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। কিন্তু খ্রিষ্টান ও মুসলমান মিলে ৪৫ শতাংশ হওয়ার মধ্য দিয়ে সেখানে রাজনীতির গুণগত ও সাংগঠনিক সমীকরণ ভারতের অন্য অংশের চেয়ে আলাদা হয়ে গেছে। আরএসএস পরিবার ‘কেরালা মডেল’ দেশের অন্যত্র আর দেখতে চাইছে না।

ভোটের অঙ্কের বাইরে খ্রিষ্টানবিরোধী উত্তেজনা ছড়ানোর আরেক কারণ সামাজিক কর্তৃত্ব হারানো নিয়ে উচ্চবর্ণেও সামাজিক উদ্বেগ। দরিদ্র নিম্নবর্ণকে যদি খবরদারি করার জন্য হাতের কাছে না-ই পাওয়া যায়, তাহলে উচ্চবর্ণের সুখ থাকল কোথায় আর। খ্রিষ্টানবিরোধী চলতি সহিংসতাকে তাই প্রাচ্য সংস্কৃতির একরূপ শ্রেণিযুদ্ধ বলা যায়।

আলতাফ পারভেজ: দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস বিষয়ে গবেষক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন