বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
‘ইউনাইটেড নেশনস ইলেকটোরাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিপোর্ট অব দ্য সেক্রেটারি জেনারেল’-এ দেখা যায়, মহাসচিব বলেছেন, ২০১৭ সালের ১ আগস্ট থেকে ২০১৯ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত জাতিসংঘ বিশ্বের ৫০টি দেশে নির্বাচনে বিভিন্নভাবে সহায়তা দিয়েছে। দেশগুলোর যে তালিকা প্রতিবেদনে সংযোজিত হয়েছে, তাতে বাংলাদেশও রয়েছে। তবে বাংলাদেশে কী ধরনের সহায়তা জাতিসংঘ দিয়েছে, তার কোনো বিবরণ প্রতিবেদনে নেই।

কথাগুলো স্মরণ করছি এ কারণে যে জাতিসংঘ মহাসচিবের এক প্রতিবেদনে দেখছি, ওই ভোটের জন্যও সরকার জাতিসংঘের সাহায্য নিয়েছিল। জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের জন্য সরকার জাতিসংঘের সাহায্য নেওয়ার পরও ভোটাররা ভোট দেওয়ার সুযোগ পাননি। কেননা, রাতের আঁধারে প্রশাসনের সহযোগিতায় ক্ষমতাসীন দলের লোকজন ব্যালট বাক্স ভরে ফেলেছেন। ২০১৯ সালের ৬ আগস্ট প্রকাশিত ‘ইউনাইটেড নেশনস ইলেকটোরাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিপোর্ট অব দ্য সেক্রেটারি জেনারেল’-এ দেখা যায়, মহাসচিব বলেছেন, ২০১৭ সালের ১ আগস্ট থেকে ২০১৯ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত জাতিসংঘ বিশ্বের ৫০টি দেশে নির্বাচনে বিভিন্নভাবে সহায়তা দিয়েছে। দেশগুলোর যে তালিকা প্রতিবেদনে সংযোজিত হয়েছে, তাতে বাংলাদেশও রয়েছে। তবে বাংলাদেশে কী ধরনের সহায়তা জাতিসংঘ দিয়েছে, তার কোনো বিবরণ প্রতিবেদনে নেই। জাতিসংঘ সদস্যদেশগুলোয় নির্বাচনে সহায়তা দেয় দুই কারণে—১. কোনো দেশ সাহায্য চাইলে, অথবা ২. কোনো দেশে নির্বাচন পরিচালনার জন্য নিরাপত্তা পরিষদ বা সাধারণ পরিষদ সিদ্ধান্ত নিয়ে দায়িত্ব অর্পণ করলে।

বোঝাই যাচ্ছে, বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধেই জাতিসংঘ ২০১৮ সালের নির্বাচনে সহায়তা দিয়েছে। এই সহায়তা কমিশনের সামর্থ্য ও সক্ষমতা তৈরির জন্য কৌশলগত সহায়তা। বিস্ময়ের বিষয় হচ্ছে, নির্বাচন আয়োজনের জন্য সহায়তা নিলেও সরকার জাতিসংঘকে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের সুযোগ ও অনুমতি দেয়নি। এর আগে ২০০৮ সালের নির্বাচনেও জাতিসংঘ বাংলাদেশকে সহায়তা দিয়েছিল এবং ইউএনডিপির তত্ত্বাবধানেই তৈরি হয়েছিল নতুন ভোটার তালিকা ও ভোটারদের ছবিযুক্ত পরিচয়পত্র। সেই নির্বাচন পর্যবেক্ষণেও তাদের ভূমিকা ছিল।

জাতিসংঘের প্রসঙ্গটি একেবারে উপেক্ষণীয় নয়। ইতিমধ্যেই নতুন রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ গণ অধিকার পরিষদ আগামী নির্বাচন জাতিসংঘের অধীন করার দাবি জানিয়েছে। একদা আওয়ামী লীগ, পরে গণফোরাম করা রেজা কিবরিয়া এবং সাবেক ডাকসু ভিপি নুরুল হকের নতুন দল গণ অধিকার পরিষদ এই দাবি জানিয়ে বলেছে, যেসব দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে, সেসব দেশে জাতিসংঘ অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে তাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে সুষ্ঠু-অবাধ-নিরপেক্ষ নির্বাচন করে দিচ্ছে। দল হিসেবে তারা হয়তো এখনো তেমন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেনি, কিন্তু তাদের বক্তব্য কি একেবারে অযৌক্তিক? বিশেষ করে জাতিসংঘের সহায়তা নিয়ে নির্বাচন আয়োজন করে তাদের আড়াল করে যখন দেশের মানুষের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছে, তখন বিশ্বাসযোগ্য ভোট আয়োজনে তাদের বাড়তি সহায়তায় আপত্তি কিসের?

আগামী নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য, স্বচ্ছ ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিতর্কের যে খুব একটা অবকাশ নেই, তা রাষ্ট্রপতির আধা বর্জনের সংলাপেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিএনপি, সিপিবি, বাসদ ও ইসলামী আন্দোলনের মতো যে দলগুলো সংলাপে অংশ নিচ্ছে না, তারা বলেছে, ২০১৬ সালের সংলাপে তারা যেসব দাবি ও সুপারিশ জানিয়ে এসেছে, সেগুলো পূরণ না হওয়ায় তাদের নতুন কিছু বলার নেই। এদের মধ্যে বিএনপি নির্বাচনের জন্য নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিকেই প্রাধান্য দিচ্ছে বেশি। সরকারবিরোধী এই দলগুলোর অবস্থানে কোনো চমক নেই।

সরকারের সমর্থক, অর্থাৎ কথিত মহাজোটের অংশীদারদের কথায় অবশ্য চমক আছে। যেমন সাবেক মন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়ার সাম্যবাদী দল বলেছে, ‘আইন ছাড়া গঠিত নির্বাচন কমিশন সরকারের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।’ ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন জানিয়েছেন, তিনি রাষ্ট্রপতিকে বলেছেন, ‘আমরা একটা কার্যক্ষম নির্বাচন কমিশন চাই।’ তাঁরাও বারবার সংলাপে এসে একই কথা বলতে হয়েছে বলে তাঁদের অস্বস্তি বা অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। বোঝাই যায়, সরকারের শরিকেরাও বিশ্বাস করেন নির্বাচন কমিশন শুধু ক্ষমতাসীন জোটের প্রধান দল আওয়ামী লীগের আজ্ঞাবহ হিসেবে কাজ করছে।

বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধেই জাতিসংঘ ২০১৮ সালের নির্বাচনে সহায়তা দিয়েছে। এই সহায়তা কমিশনের সামর্থ্য ও সক্ষমতা তৈরির জন্য কৌশলগত সহায়তা। বিস্ময়ের বিষয় হচ্ছে, নির্বাচন আয়োজনের জন্য সহায়তা নিলেও সরকার জাতিসংঘকে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের সুযোগ ও অনুমতি দেয়নি।

তাঁদের কথায় অন্য যে সত্যটি বেরিয়ে এসেছে, তা হলো কথিত সংলাপের মাধ্যমে অনুসন্ধান (সার্চ) কমিটি গঠন করে যে দুটি নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছিল, তারা সরকারের প্রতি পক্ষপাত করেছে। নিরপেক্ষ ও স্বাধীন কমিশনের কার্যকর ভূমিকা নিতে পারেনি। অথচ ১৯৯০ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত কোনো ধরনের সার্চ কমিটি ছাড়াই যে চারটি কমিশন (আজিজ কমিশন ছাড়া) গঠিত হয়েছিল, তাঁরা সামান্য ত্রুটিবিচ্যুতি সত্ত্বেও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করতে পেরেছিলেন। কেননা, ওই নির্বাচনগুলো দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে কাজ করেছে। এমনকি, আবু হেনা ও এম এ সাঈদের কমিশন যথাক্রমে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার সরকার-মনোনীত হলেও দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সমর্থনের কারণে তাঁরা স্বাধীনভাবে পক্ষপাতমুক্ত নির্বাচন করতে পেরেছেন।

সংলাপে অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশই কমিশন গঠনের জন্য আইন তৈরির পক্ষে কথা বলেছেন। সাংবিধানিক পদে আসীন ব্যক্তিদের নিয়ে অনুসন্ধান বা বাছাইপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করার বিধান সেই আইনে যুক্ত করার প্রস্তাব এসেছে। যেসব সাংবিধানিক পদের কথা বলা হয়েছে, তার কোনোটিই যে দলীয়করণ থেকে রেহাই পেয়েছে, এমনটি দাবি করা যাবে না। এমনকি ওই কমিটিতে বিরোধী দলের নেতার অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাবও এখন বিতর্কের জন্ম দিতে বাধ্য। কেননা, বর্তমান সংসদীয় বিরোধী দল গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়েই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে এবং প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তেই তারা সরকারের অংশ না হয়ে বিরোধী দলের আসনে আসীন। সরকার যদি তড়িঘড়ি করে এমন কোনো আইন করে, যাতে সরকারের আসল প্রতিপক্ষ বিএনপির মতপ্রকাশের কোনো সুযোগই থাকবে না, তাহলে সেই বাছাই বা নিয়োগ গ্রহণযোগ্য হবে কীভাবে?

কমিশন গঠনের জন্য আইন করতে পর্যাপ্ত সময় এখন নেই বলে মন্তব্য করার সময় গত রোববার আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, ‘এই আইনটা এমন একটা আইন হওয়া উচিত, যেটা গ্রহণযোগ্য হবে সবার কাছে। শুধু এক দলের কাছে গ্রহণযোগ্য হলে তো এটা সর্বজনীন আইন হলো না।’ (সংলাপ শেষে রাষ্ট্রপতির পদক্ষেপ দেখার জন্য অপেক্ষা করতে বললেন আইনমন্ত্রী, ২ জানুয়ারি, প্রথম আলো অনলাইন।) আমরাও চাই এক দলের জন্য যেন আইন না হয়, এক দলের জন্য যেন নির্বাচন কমিশন না হয়, নির্বাচনও যেন এক দলের জন্য না হয়। উপলব্ধিটা অবশ্য কয়েক বছর আগে হলে ভালো হতো।

নির্বাচন কমিশন গঠনে আইনের প্রয়োজন যতটা, তার চেয়ে সব পক্ষের আস্থা কোনো অংশেই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। নির্বাচন ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানের গঠন ও নিয়োগ বিষয়ে কমনওয়েলথ ইলেকটোরাল নেটওয়ার্ক ওয়ার্কিং গ্রুপের পরামর্শ এখানে উদ্ধৃত করা যায়। তাদের কথায়: নির্বাচন ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান শুধু তাঁদের নিয়েই গঠিত হওয়া উচিত, যাঁদের প্রতি পুরো সমাজের আস্থা আছে। রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা তাঁদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তবে তার জন্য তাঁদের রাজনৈতিক দল থেকে আসা আবশ্যক নয়, স্বার্থান্ধ দলীয় স্বার্থ থেকে প্রক্রিয়াটিকে যথাসম্ভব মুক্ত রাখা প্রয়োজন। দলীয় স্বার্থ থেকে মুক্ত প্রক্রিয়ার জন্যই প্রয়োজন বৃহত্তর রাজনৈতিক সমঝোতা, যা অর্জনের কোনো আলামত এখনো দেখা যাচ্ছে না।

  • কামাল আহমেদ সাংবাদিক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন