default-image

চার দশক আগে নির্মল সেন দাবি জানিয়েছিলেন, ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই’। এত বছর পরেও এই দাবি পূরণ হয়নি। কিন্তু এটাই তো একটি সভ্য গণতান্ত্রিক সমাজের নাগরিকদের ন্যূনতম দাবি। আমাদের নাগরিকদের অস্বাভাবিক মৃত্যুর বহু পথ চালু রেখেছে এ দেশের ক্ষমতাবানেরা। হরতাল, অবরোধ বা রাজনৈতিক সহিংসতা ছাড়াও তার কমতি নেই। কিছুদিনের মধ্যে একটি কারখানায় আগুন লেগে ১৩ জন মানুষ পুড়ে মরলেন, গার্মেন্টসে পানি খেয়ে অসুস্থ হলেন শতাধিক, কতজন মরেছেন তার হিসাব নেই, কাজের খোঁজে বেপরোয়া হয়ে বিদেশে যাওয়ার পথে ট্রলারডুবি হয়ে মরেছেন, হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় শিশুসহ জানা-অজানা অকালমৃত্যু ঘটেছে, নিরাপত্তাহীন নির্মাণশ্রমিক মরেছেন, বস্তিতে আগুন লেগে মরেছেন। আগুন লেগে আর ভবনধসে বাংলাদেশের শ্রমিকদের লাশের সারি এখন বিশ্বজোড়া খবর। ফিটনেস ছাড়া বাস-ট্রাক দুর্ঘটনায় অকালমৃত্যু তো অবিরাম। আর ধর্ষণ-হত্যা? তারও বিরতি নেই। সীমান্তবর্তী মানুষের নিয়মিত অকালমৃত্যুর শিকার হতে হচ্ছে ভারতীয় সীমানারক্ষী বাহিনীর হাতে। কয়েক দিন আগে দেশের অভ্যন্তরে ঢুকে স্ত্রীর আনা ভাত মুখে দেওয়ার সময় বিএসএফের গুলি খেয়ে মরতে হয়েছে বাংলাদেশের কৃষককে।
এসবের সঙ্গে গত ৬ জানুয়ারি থেকে যোগ হয়েছে পেট্রলবোমা। আর তাকে মোকাবিলার কথা বলে নতুন উদ্যমে চলছে গ্রেপ্তার এবং ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধ’। ৬ জানুয়ারি থেকে ৩৯ দিনে রাজনৈতিক সহিংসতার বলি হয়েছেন মোট ৮৭ জন। এর মধ্যে পেট্রলবোমা ও আগুনে দগ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন ৫২ জন। এঁদের মধ্যে শিশু, নারী, তরুণ, বৃদ্ধ, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, পেশাজীবী, শ্রমজীবী—সব ধরনের মানুষই আছেন। সংঘর্ষ ও ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছেন ৩৫ জন। এর মধ্যে ক্রসফায়ারে বা বন্দুকযুদ্ধের নামে পুলিশ বা র্যাবের গুলিতে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯। গ্রেপ্তারের সঠিক সংখ্যা বলা কঠিন। সম্ভাব্য গ্রেপ্তারের সংখ্যা অগণন। কেননা, একেকটি মামলায় যতজনের নাম দেওয়া হয়, তার থেকে বেশি থাকে অজানা। সুতরাং যে কেউ সেই মামলায় গ্রেপ্তার হতে পারেন। পত্রপত্রিকার বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে ধারণা করা যায়, এর সংখ্যা ১৭ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
তবে গ্রেপ্তার করা ব্যক্তিদের কেউ কেউ এর মধ্যে ছাড়াও পেয়েছেন, টাকার বিনিময়ে ছাড়া পাওয়ার অভিযোগ আছে। গ্রেপ্তার এবং রিমান্ড-বাণিজ্যের কথা আগেও আমরা শুনেছি। এখন আরও বেশি বেশি শোনা যাচ্ছে। সুতরাং বিভিন্ন বয়সের মানুষের এখন একদিকে বিএনপি-জামায়াতের হরতাল-অবরোধে পেট্রলবোমার আশঙ্কার মধ্যে চলাফেরা করতে হচ্ছে, অন্যদিকে গ্রেপ্তার বা ক্রসফায়ারের আশঙ্কাও মাথায় নিয়ে ঘুরতে হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস আর দলীয় সন্ত্রাসের মুখে বাংলাদেশের মানুষ।
বিএনপির মূল দাবি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন। ৪৪ বছর হতে চলেছে এ দেশ স্বাধীন হয়েছে। এখন পর্যন্ত রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়ার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দাঁড়ায়নি, যে কারণে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রতিবারই অশািন্ত ও সহিংসতা তৈরি হয়। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার দাবির আন্দোলনকে কেন্দ্র করেই সৃষ্ট সহিংসতায় নিহত হয়েছিলেন ৮২ জন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ২০০১ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরে ৯৬ জন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে সৃষ্ট সহিংসতায় ২০০৬ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরে ৩২ জন এবং ২০১৩ সালের ২৫ নভেম্বর থেকে ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫৯ জন নিহত হন (প্রথম আলো, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৫)। এ ছাড়া জখম ও সম্পদ ধ্বংসের সব হিসাব পাওয়াও প্রায় অসম্ভব। নির্বাচন, ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় এলেই কেন মানুষ বিপদাপন্ন হবে? কেন তাকে জীবন দিতে হবে? জীবন দেয় মানুষ, সরকার বদলায় কিন্তু মানুষের স্বাভাবিক জীবনের গ্যারান্টি আসে না।
৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে খোদ সরকারেরই সন্তুষ্ট থাকার কথা নয়। আওয়ামী লীগ, যার জনভিত্তি সবচেয়ে বেশি, সাংগঠনিক কাঠামো সবচেয়ে বিস্তৃত এবং ঐতিহাসিক কারণে বিদ্বৎসমাজের মধ্যে যার সমর্থন বেশি, সেই দলের পক্ষে এ রকম ভোটারবিহীন নির্বাচন করে ক্ষমতায় থাকা সম্মানজনকও নয়। এই আওয়ামী লীগ দুই দফা ১৯৯৬ ও ২০০৬ সালে বিএনপির বিরুদ্ধে কঠিন আন্দোলন করেছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের সঙ্গী ছিল জামায়াতে ইসলামী। দুটোরই ফলাফল আওয়ামী লীগের পক্ষে গেছে। দুটো সময়েই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করেছে। এখন আওয়ামী লীগ বলছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বেমানান। এর পক্ষে ÿযথেষ্ট যুক্তি আছে। কিন্তু তার জন্য দরকার হবে নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করা এবং স্বাধীনভাবে তার কাজ করার ক্ষেত্র তৈরি করা। সরকার তো সে পথেই যেতে পারে।
অনেকেই এসব বিষয় সমাধানের জন্য সংলাপের কথা বলছেন। এর প্রস্তাব দিয়ে কতিপয় ‘বিশিষ্ট নাগরিক’-এর পক্ষে একটি প্রস্তাব জমাও দেওয়া হয়েছে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও খালেদা জিয়ার কাছে। সরকার এটাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রধানমন্ত্রীর পুত্র ও উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় সংলাপের প্রস্তাবকদের পাগল বলে অভিহিত করেছেন। বস্তুত কাজ হলে সংলাপের দরকারও হয় না। উদ্যোগ নিতে হবে তাদেরই, যারা এই পরিস্থিতি তৈরি করেছে। আগেও বলেছি, এখনো বলছি, বর্তমান সংকট দূর করতে তিনটি কাজ অপরিহার্য—প্রথমত, বিএনপি জোট কর্তৃক অবরোধ-হরতাল প্রত্যাহার, সন্ত্রাসী তৎপরতা বন্ধ করা। পেট্রলবোমা, আগুন, চোরাগোপ্তা হামলা বন্ধ করে সভা-সমাবেশে আসা। এটি নিশ্চিত করার জন্য। দ্বিতীয়ত, সরকারের দমন-পীড়ন বন্ধ করা, ঘোষিত-অঘোষিত সব অগণতান্ত্রিক বিধিনিষেধ প্রত্যাহার, ‘ক্রসফায়ার’, গ্রেপ্তার-বাণিজ্য বন্ধ করা। আর তৃতীয়ত, নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন ও শক্তিশালী কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলে এই বছরের মধ্যে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ব্যবস্থা করা; যাতে যুদ্ধাপরাধী, সন্ত্রাসী ও লুটেরা বাদে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
এই করণীয়গুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো নিজ নিজ উদ্যোগ গ্রহণ করলেই পরিস্থিতির উন্নতি হবে, আনুষ্ঠানিক সংলাপ না করলেও চলবে। কিন্তু সেই পথে না গিয়ে একদিকে হরতাল-অবরোধ-সহিংসতা আর অন্যদিকে দমন-পীড়নের পথ অব্যাহত রাখলে তা শুধু পাগলামি হবে না, তা হবে জনগণের বিরুদ্ধে ভয়ংকর অপরাধও।
এত দিনে এতটুকু পরিষ্কার যে এ যাবৎ সরকারের গৃহীত পথ ও পদ্ধতিগুলো পরিস্থিতির ভয়াবহতা দূর করতে কাজে আসছে না। কিন্তু তা সত্ত্বেও মন্ত্রী ও সরকারের নেতাদের কথাবার্তায় উসকানি ও দমনমূলক কথাবার্তার কমতি নেই। পুলিশ ও র্যাবের কর্মকর্তাদের মুখেও এখন কঠিন হুমকির কথাই শোনা যায়। আমরা বহুবার শুনেছি, সব সন্ত্রাসীর তালিকা করা হয়েছে, িশগগিরই সব দমন করা হবে। দেখামাত্র গুলির কথা তাঁরাও বলেছেন। পুলিশের ডিআইজি সবাইকে স্তম্ভিত করে ৭ ফেব্রুয়ারি বলেছেন, অপরাধীদের শুধু নয়, তাদের বংশধরদেরও নিশ্চিহ্ন করা হবে। ‘দেখামাত্র গুলি’তে মানুষ মরছে, নির্বিচারে গ্রেপ্তার হচ্ছে, দমন-পীড়ন অব্যাহত আছে, কিন্তু চোরাগোপ্তা হামলা কমছে না। পথঘাটে পেট্রলবোমা হামলার শিকার যেমন সাধারণ মানুষ, সঙ্গে সঙ্গে নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও দমন-পীড়নের শিকারও সাধারণ মানুষই।
রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস দিয়ে অচলাবস্থা কাটবে না। বরং তাতে আত্মঘাতী জমিন তৈরি হবে, নিরপরাধ মানুষের জীবনে বিপন্নতাই বাড়বে। সন্ত্রাসীদের ভিত টলবে না। নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনায় যখন র্যাবের কর্মকর্তার যুক্ত থাকার খবর প্রকাশিত হলো, তখন এই বাহিনীর উচ্চতর এক কর্মকর্তা বলেছিলেন, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উত্থাপিত হলেই তা প্রমাণিত হয় না। তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই প্রকৃত দোষী শনাক্ত হবে। খুবই ঠিক। আমরা সেটাই বারবার বলতে চাই। কিন্তু এই যুক্তি কেন বাংলাদেশের সব নাগরিকের জন্য প্রযোজ্য হবে না? বিএনপি-জামায়াত আমল থেকে ১২ বছর ধরে হার্টঅ্যাটাক, ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ, এনকাউন্টার ইত্যাদি নামে বহু মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। তাদের অনেকের নামে কোনো অপরাধের প্রমাণও নেই। তদন্ত-বিচার ছাড়া তাদের নামের সঙ্গে সত্য-মিথ্যা সন্ত্রাসী শব্দ লাগিয়ে দিলেই, ধরে নিয়ে মিথ্যা গল্প বানিয়ে প্রেস বিজ্ঞপ্তি পাঠালেই, হত্যা করা জায়েজ?
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক কর্মকর্তা বলেছেন, আমরা কি অস্ত্র নিয়ে হাডুডু খেলব? নিশ্চয়ই না, অস্ত্র নিয়ে কেন হাডুডু খেলবেন? তবে মনে রাখবেন, আপনার হাতের অস্ত্র আপনার বা আওয়ামী লীগ-বিএনপির নেতা–নেত্রীদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এই অস্ত্র, গোলাবারুদ, পোশাক, গাড়ি, বেতন-বোনাস, নানা সুযোগ-সুবিধা এমনকি সরকারের প্রতিমুহূর্তের সব ব্যয়, পুরোটাই বাংলাদেশের জনগণের টাকায়। তাদের জীবনও হাডুডু খেলার বস্তু নয়।
আমরা প্রতিদিনের আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার মধ্যে নির্মল সেনের স্বাভাবিক মৃত্যুর দাবি স্মরণ করি। কিন্তু মানুষের জীবন যেখানে তুচ্ছ, যেখানে মানুষের স্বাভাবিক জীবনের গ্যারান্টি নেই, সেখানে কী করে স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি থাকবে? আসলে স্বাভাবিক জীবনের গ্যারান্টি নিশ্চিত করতে গেলে রাজনীতির মানচিত্র বদলাতে হবে।
আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
[email protected]

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন