হুদা কমিশনকে বাদ দিয়ে একটি নির্বাচন করলে কেমন হয়!

কে এম নূরুল হুদা কমিশনের অধীনে যতবারই নির্বাচন হয়েছে, তারা একটি মুখস্থ কথা বলেছে, দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া ভোট সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে। রোববার চতুর্থ দফায় ৫৫টি পৌরসভায় নির্বাচনের পরও এর ব্যতিক্রম হয়নি। মনে হয়েছে পুরোনো টেপ রেকর্ডটিই আবার বাজানো হয়েছে।

অথচ ভোটের আগের দিন নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছিল, এবারে নির্বাচনে কোনো অনিয়ম-বিশৃঙ্খলা সহ্য করা হবে না। কঠোর হাতে দমন করা হবে। দিন শেষে দেশবাসী বিস্ময়ের সঙ্গে দেখল, নির্বাচনী সংঘাতে আবারও প্রাণহানি ঘটল। আবারও যথেচ্ছ কেন্দ্র দখল, ব্যালট বাক্স ছিনতাই, ভোটারদের বাধাদানের ঘটনা ঘটল।

ভোটের আগে আওয়ামী লীগের নেতা-নেত্রীরা নির্বাচনী পরিবেশ সুষ্ঠু রাখতে যেভাবে নৌকার সমর্থক ছাড়া সব ভোটারকে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার ‘সুপরামর্শ’ দিয়েছিলেন, তাতে কবরের শান্তি ছাড়া অন্য কোনো শান্তি বজায় রাখা সম্ভব ছিল না। কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী দলের নেতা বা নেত্রী এ রকম আওয়াজ দেওয়ার পরও নির্বাচন কমিশনের নীরবতা পালন করাকে শ্রেয় মনে করেছিল। কেননা তাঁদের বিবেক আগেই বন্ধক হয়ে গেছে।

বিজ্ঞাপন

বলা হয়, বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের যে ক্ষমতা আছে, তা ভারত বা অন্য অনেক দেশের কমিশনের নেই। কিন্তু ক্ষমতা তো শুধু কাগজপত্রে লেখা থাকলে হবে না, প্রয়োগ করে দেখাতে হয়। নূরুল হুদা কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তারা আইন প্রদত্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করবে না, ক্ষমতাসীনদের কৃপা লাভে সচেষ্ট থাকবে। নির্বাচন কমিশন যদি সত্যি সত্যি নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হতো, তাহলে তারা অন্তত যেখানে নৌকার সমর্থক ছাড়া সব ভোটারকে এলাকা থেকে চলে যেতে বলা হয়েছে, সেখানে নির্বাচন স্থগিত করত। এর মাধ্যমে অন্যান্য এলাকার মানুষও একটি বার্তা পেয়ে যেতেন। এখন অন্য ধরনের বার্তা পেয়েছেন এবং নির্বাচনটি আবারও প্রহসনে পরিণত হয়েছে।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার একবার বলেছিলেন, ভোটাররা না এলে তাঁদের কী করার আছে। ভোটাররা না এলে তাঁদের কিছু করার নেই। কিন্তু ভোটাররা কেন আসেন না, কারা তাঁদের বাধা দিচ্ছে, সেই খবর কেন তিনি রাখলেন না? নির্বাচন কমিশন যখন পুতুল নাচের পুতুলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে, তখন মানুষ ভোটের কথাটিই ভুলে যেতে বসেছেন। তাঁরা দেখছেন, নির্বাচনের নামে প্রতিবার নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে। নাটকের কলাকুশলী অভিন্ন হলেও চরিত্র ভিন্ন। কোনো নির্বাচনে ভোটারের আকাল দেখা গেলে পরেরটিতে ৯২ শতাংশ ভোট পড়ে। কোনো কোনো কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়ার কৃতিত্বও দেখিয়েছে এই কমিশন।

কে এম হুদা কমিশনের ভোটের চালচিত্র দেখে নাসিরুদ্দিন হোজ্জার সেই গল্পের কথাই মনে পড়ে। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, এই শহরে কতটি কাক আছে। তিনি জবাব দিয়েছিলেন ৯ হাজার ৯৯৯টি। সেই সঙ্গে তিনি এ-ও বললেন, যদি গুনে দেখেন কাকের সংখ্যা এর চেয়ে কম, বুঝবেন অন্য শহরে বেড়াতে গিয়েছে। আর যদি দেখেন বেশি, বুঝবেন অন্য শহর থেকে কিছু কাক এখানে বেড়াতে এসেছে। হুদা কমিশনের কেরামতিতে ভোট প্রদানের হার একবার ৬ শতাংশের নিচে নেমে আসে, আরেকবার ৯২ শতাংশের ওপরে উঠে যায়।

সহকর্মী রিয়াদুল করিম প্রথম আলোয় লিখেছেন, ‘চতুর্থ ধাপের ভোটে অনিয়ম, সংঘাত হবে না বলে আশার বাণী শুনিয়েছিল নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বলা হয়েছিল, ভোটকেন্দ্রে গোপন বুথের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ভোটের আগে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী কর্মকর্তা, পুলিশ ও প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন নির্বাচন কমিশনাররা। তবে পরিস্থিতি বদলায়নি। সংঘাত, প্রাণহানি, ভোটকেন্দ্রে বিএনপির এজেন্ট ঢুকতে না দেওয়া, পছন্দমতো ভোট দিতে না পারা, গোপন বুথে নৌকা প্রতীকের সমর্থকদের অবস্থান নেওয়াসহ নানা অনিয়ম দেখা গেছে।’
কিন্তু বর্তমান ইসির কাছে সব অনিয়মই বিচ্ছিন্ন ঘটনা। কেন্দ্রে ভোটার আসুক না আসুক সেটাই বিশ্বের সেরা নির্বাচন।

বিজ্ঞাপন
কথায় বলে, যাঁর এক কান কাটা, তিনি রাস্তার এক পাশ দিয়ে হাঁটেন, আর যাঁর দুই কান কাটা তিনি রাস্তার মাঝখান দিয়ে হাঁটেন। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অবস্থা হয়েছে দুই কান কাটা মানুষের মতো। কোনো সমালোচনা, কোনো তথ্যই তাদের লজ্জিত করে না।

নির্বাচন সম্পর্কে দেশের মানুষ কী মনে করেন, দেশ-বিদেশের সংবাদমাধ্যম ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান কী কী তথ্য দেয়, সেসব নিয়ে তাঁদের মাথাব্যথা নেই। কথায় বলে, যাঁর এক কান কাটা, তিনি রাস্তার এক পাশ দিয়ে হাঁটেন, আর যাঁর দুই কান কাটা তিনি রাস্তার মাঝখান দিয়ে হাঁটেন। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অবস্থা হয়েছে দুই কান কাটা মানুষের মতো। কোনো সমালোচনা, কোনো তথ্যই তাদের লজ্জিত করে না।
পৌরসভা নির্বাচনের চতুর্থ দফা নির্বাচনের প্রতিক্রিয়ায় সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, নির্বাচনের অধঃপতনের যেটুকু বাকি ছিল, এবারের পৌর নির্বাচনে তা হয়ে গেছে। ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বিভিন্ন জায়গায় যেভাবে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েছেন, তার বিষয়ে ইসি কী ব্যবস্থা নিয়েছে? ইসির নিয়ন্ত্রণ থাকলে এগুলো হয় কী করে?

প্রধান নির্বাচন কমিশনার নূরুল হুদা দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেছিলেন ইভিএমে ভোট হলে দিনের ভোট রাতে হবে না একজনের ভোট আরেকজন দিতে পারবেন না। ( এর অর্থ ইভিএম ছাড়া তাদের আমলে রাতেও ভোট হয়েছে, একজনের ভোট আরেকজন দিয়েছেন) । আমরা প্রতিটি নির্বাচনে দেখছি ইভিএমে ভোটারের পেছনে দাঁড়িয়ে একজন বাটন টিপছেন কিংবা বাটন টিপতে নির্দেশ দিচ্ছেন। ইভিএম নিয়ে বিদেশে যত বিতর্কই থাকুক না কেন, বাংলাদেশে এটি ভোটের সুরক্ষা দিতে পারত, যদি নির্বাচন কমিশন ন্যূনতম দায়িত্ব পালন করত। ভোটার তালিকা থেকে ভুয়া ভোটার বাদ দিতে আমরা ছবিযুক্ত তালিকা করলাম। কিন্তু এখন ভোটাররা কেন্দ্রেই যেতে পারছেন না। তাহলে ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা কিংবা ইভিএম দিয়ে কি লাভ হলো?

ইসির তথ্য অনুযায়ী, চতুর্থ ধাপের পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে ভোট পড়েছে ৬৫ দশমিক ৬৮ শতাংশ। সর্বোচ্চ ভোট পড়েছে বরিশালের বানারীপাড়ায়, ৯২ দশমিক ৬০ শতাংশ। আর সবচেয়ে কম ভোট পড়েছে চট্টগ্রামের পটিয়ায়, ৪৬ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। এখানে নির্বাচনী সংঘাতে একজনের মৃত্যু হয়। এর আগে প্রথম ধাপে ৬৫ শতাংশ, দ্বিতীয় ধাপে ৬১ দশমিক ৯২ শতাংশ এবং তৃতীয় ধাপে ৭০ দশমিক ৪২ শতাংশ ভোট পড়ে। অথচ চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোট পড়েছে ২২ দশমিক ৫০ শতাংশ। এর অর্থ চট্টগ্রামের ভোটারদের চেয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলের ভোটাররা অনেক বেশি সচেতন। ইসি সত্যকে মিথ্যা দিয়ে ঢাকতে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলেছে।

নির্বাচনের অবিশ্বাস্য ফল ও ভোটের হার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন একজন কমিশনার। সিইসিসহ অন্য চার কমিশনার যখন ভোটের ফলাফলে আনন্দে ডগমগ, তখন মাহবুব তালুকদার বলেছেন, ‘পৌরসভা নির্বাচনের ফলাফল দেখে আমার ধারণা হচ্ছে, নির্বাচন নির্বাসনে যেতে চায়। নির্বাচন অর্থ অনেকের মধ্য থেকে ভোটের মাধ্যমে বাছাই। কিন্তু সে অবস্থা আজকাল পরিলক্ষিত হয় না। প্রশ্ন জাগে, নির্বাচন কি এখন পূর্বে নির্ধারিত? প্রায় সব নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে বলে আমরা তৃপ্তি বোধ করি। কিন্তু নির্বাচন বিষয়ে আমাদের সব দাবি জনগণের উপলব্ধির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।’
তিনিসহ পাঁচ কমিশনারই সেই অসংগতিপূর্ণ ও অবিশ্বাস্য নির্বাচনী ফল দেশবাসীকে উপহার দিয়ে আসছেন। একসময় নির্বাচনে কালোটাকা ও পেশি শক্তির বিতর্ক বড় ছিল। এখন যেহেতু নির্বাচনে ভোট ও ভোটার উপস্থিতির বিষয়টি গৌণ হয়ে গেছে, সেহেতু কালোটাকা ও পেশি শক্তির কথা ভেবে কেউ সময় নষ্ট করেন না।

সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদের ১ উপধারা অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছে। কিন্তু যেই কমিশন মানুষের ভোটাধিকার রক্ষা করতে পারে না, সেই কমিশনের প্রয়োজন কী। বর্তমান জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগ ও এর জোট মহাজোটের আসনসংখ্যা ৯৮ শতাংশ। তারা যদি সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন বিলোপ করে নির্বাচনের দায়িত্বটি সরাসরি নির্বাহী বিভাগের হাতে নিয়ে যায়, আমাদের বিশ্বাস এর চেয়ে খারাপ নির্বাচন হবে না। কেননা এর চেয়ে খারাপ নির্বাচন করার কোনো সুযোগ নেই।

এরশাদ আমলের ১৯৮৮ ও বিএনপির আমলের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের কথা মনে রেখেই কথাটি বলছি। আশা করি, ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার সিপাহ শালারেরা কিছু মনে করবেন না।


সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি
sohrabhassan55@gmail.com

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন