পল্লবীর শিশুটির বাবা কী কারণে বিচার চাইবেন

যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতি ওয়ারেন ই. বার্গারের একটি ঐতিহাসিক বক্তব্য আছে: ‘একটি স্বাধীন জাতির স্বাধীনতার ভিত্তি টিকিয়ে রাখতে আদালতের ওপর আস্থা অপরিহার্য। আর এই আস্থা তখনই ভেঙে পড়ে, যখন দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিচার বঞ্চিত হয়।’

পাঠক এবার এ বক্তব্যের সঙ্গে মঙ্গলবার (১৯ মে ২০২৬) রাজধানীর পল্লবীতে ঘটা শিশুটির হত্যাকাণ্ডের পর তার বাবার বক্তব্য মেলান। তিনি বলেছেন, মেয়ে হত্যার বিচার তিনি চান না। নাগরিক হিসেবে তাঁর ও আমাদের স্বাধীনতার ভিত্তিটা আসলে কতটা অটুট আছে?

একটা রাষ্ট্রের আইনের শাসন ও বিচারব্যবস্থার ওপর কতটা অনাস্থা তৈরি হলে সন্তানের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে একজন বাবা এমনটি বলতে পারেন। কিন্তু এমন ঘটনা তো এ দেশে এই প্রথম নয়। এর আগেও আরও ঘটনায় স্বজনদের বিচার না চাওয়ার অসহায়ত্ব আমরা দেখেছি। তাতেও কি কিছু যায়–আসে আমাদের? রাষ্ট্র বা সরকারের কর্ণধারদের?

পল্লবীর সেই শিশুকে এখন সবাই চেনে। কয়েক দিন পর অবশ্য ভুলে যাওয়ারই কথা। তার বাবাও তেমনটি বললেন। শিশুটিকে সবাই চেনে, কারণ সে এখন আর নেই। কীভাবে নেই?

সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। বড় বোনের সঙ্গে স্কুলে যাবে সে। কিন্তু কোথায় ছোট বোন? অনেক খোঁজাখুঁজির পর পাশের বাসার দরজার সামনে তার স্যান্ডেল পাওয়া গেল। কিন্তু দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। ধরে নেওয়াই যায়, অন্যান্য সময়ের মতো প্রতিবেশীর বাসায় হয়তো খেলতে গেছে। কিন্তু এ সময় তো তার স্কুলে যাওয়ার কথা। অনেক সময় ধরে দরজা ধাক্কাধাক্কি করার পর যে ঘটনা প্রকাশ পেল, তা আমাদের স্তম্ভিত করে দেয়। সেই দরজা খোলার সঙ্গেই বেরিয়ে এল আমাদের সমাজের অন্য পিঠে লুকিয়ে থাকা ভয়াবহ এক রূপ।

সংবাদমাধ্যমের সূত্রে আমরা যা জানতে পারছি তা একজন সুস্থ মানুষের পক্ষে মানসিকভাবে তা সহ্য করার মতো না। পাশের বাসার সেই ফ্ল্যাটের একটি কক্ষে শিশুটির মস্তকবিহীন মরদেহ পড়ে ছিল। আরেকটি কক্ষের ভেতরে একটি বালতির মধ্যে রাখা ছিল মাথা। দরজা ধাক্কাধাক্কিতে লাশ লুকানোর সময় পায়নি ঘাতক। জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যায় সে। পরে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার সামনে থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ বলছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ঘাতক ঘটনার দায় স্বীকার করেছে।

আরও পড়ুন

পরিবার ও পুলিশের বক্তব্যে এটি স্পষ্ট যে শিশুটি যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছিল। এ ঘটনার আরও ভয়াবহ বিষয় হচ্ছে, ওই ফ্ল্যাটে ঘাতকের সঙ্গে তার স্ত্রীও সেখানে উপস্থিত ছিল। যদিও স্ত্রীর দাবি, তিনি ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমাচ্ছিলেন। কিন্তু স্বামীকে পালিয়ে যেতে এবং লাশ লুকাতে তিনি সহযোগিতা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ অভিযোগ সত্য হলে এটাই বলতে হয়, আমাদের শিশুদের নিরাপত্তাহীনতা আসলে কোথায় গিয়ে ঠেকেছে!

শুধু তাই নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুটির শাড়ি পরা ছবি প্রকাশের পর এর নিয়ে এক শ্রেণির মানুষের বিকৃতিরুচির যে বহিঃপ্রকাশ দেখা গেল, তাতেও আমাদের শঙ্কিত হতে হয়। আমাদের সমাজের অনেক মানুষের কাছে কি ন্যুনতম মূল্যবোধও আর অবশিষ্ট নেই? আমাদের ধর্ম ও নৈতিকতার চর্চায় কি এতটাই ফাটল ধরেছে যে নৃশংসভাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার একটি শিশু ‘ভিক্টিম ব্লেমিং’ থেকে রেহাই পাবে না?

আরও পড়ুন

শিশুটি স্থানীয় একটি স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ত। তার বাবা একটি রিক্রুটিং এজেন্সিতে চাকরি করেন। পরিবারটি প্রায় ১৭ বছর ধরে পল্লবীতে বসবাস করে আসছেন। মেয়েকে হারিয়ে আহাজারি করতে থাকা তার বাবার কিছু বক্তব্য সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

তিনি বলছেন, ‘আমি বিচার চাই না। কারণ, আপনারা বিচার করতে পারবেন না। আপনাদের বিচার করার কোনো রেকর্ড নেই। আপনারা বিচার করতে পারবেন না। আমার মেয়েও আর ফিরে আসবে না। আপনাদের বিচারের কোনো উদাহরণ নেই। এটা বড়জোর ১৫ দিন চলবে, আবার কোনো ঘটনা ঘটবে। এরপর এটা ধামাচাপা পড়ে যাবে।’

অনেক ঘটনায় দেখা যাচ্ছে মামলা হচ্ছে, আসামি ধরা পড়ছে, আদালত বসছেন, শুনানি হচ্ছে, সাজাও হচ্ছে—কিন্তু এতে কি আসলে কোনো বিচার হচ্ছে? প্রায় সময় আমরা দেখি ঘটনা বা মামলার এক দশক বা এক যুগ পর কারও সাজা হচ্ছে। রায় হতে হতে মামলার বাদী মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। এমন ঘটনাও নতুন নয়, জামিনে বের হয়ে অভিযুক্ত ধর্ষক হুমকি দিতে থাকে ভুক্তভোগীর পরিবারকে। এ কারণে বিচারব্যবস্থা নিয়ে একটি প্রতিষ্ঠিত প্রবাদই আছে—জাস্টিস ডিলেইড ইজ জাস্টিস ডিনাইড।

একজন বাবার এমন বক্তব্যে নির্মম বাস্তবতা উঠে এলেও একটি বিষয়ে তিনি আসলে ভুলই বলেছেন। শিশুটিকে হত্যা নিয়ে এই ‘মাতামাতি’ আসলে ১৫ দিনও থাকবে না। কয়েকদিনেই হারিয়ে যাবে। এমনই তো হয়ে আসছে আসলে। নিত্যদিন একের পর এক ইস্যু আসে, তুমুল তর্কবিতর্ক বা আলোচনা-সমালোচনা ভুলে আরেকটা ইস্যু নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যেতে আমাদের একটুও দেরি হয় না। নতুন কোনো ইস্যুর জন্যই যেন আমরা মুখিয়ে থাকি!

ফলে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো এ ধরনের চাঞ্চল্যকর অনেক ঘটনায় আন্দোলনের মুখে সরকারের কর্তাব্যক্তিরা দ্রুত বিচার করার, এমনকি টাইমফ্রেম বেঁধে দিয়ে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরও সেগুলো অল্প কয়েক দিনেই আমাদের মনোযোগ থেকে হারিয়ে যায়।

প্রশ্ন হচ্ছে, শিশুটির বাবা আসলে কেন বিচার চাইবেন? এ উত্তর তো আমাদের জানাই আছে। এরপরও পরিসংখ্যান কী বলছে দেখেন।

আরও পড়ুন

২ মে ২০২৬ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পদ্ধতিগত প্রতিবন্ধকতা এবং উক্ত প্রতিবন্ধকতাসমূহ নিরসনের কার্যকর উপায় চিহ্নিতকরণ’ শীর্ষক একটি গবেষণা উপস্থাপন করা হয়।

সেখানে বলা হয়েছে, দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় সাজার হার মাত্র ৩ শতাংশ। এর বিপরীতে প্রায় ৭০ শতাংশ মামলায় খালাস পাচ্ছে আসামিরা। গবেষণায় দেখা যায়, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইন, ২০০০ অনুযায়ী ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বিধান থাকলেও বাস্তবে একটি মামলা শেষ হতে গড়ে ৩ বছর ৭ মাস সময় লাগছে। প্রতিটি মামলায় গড়ে ২২ বার শুনানির তারিখ পড়ছে।

ডেইলি স্টারের ১৪ মার্চ ২০২৫ সালে প্রকাশিত এক পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৫ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দশ বছরে ৫ হাজার ৬০০ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয় ৩১৬টি শিশু।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বলছে, চলতি বছরের (২০২৬) গত ১ জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত ১১৮টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে ৪৬টি শিশু। ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে ৪৬টি শিশু এবং ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে হত্যা করা হয়েছে তিন শিশুকে। ধর্ষণের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছে দুই শিশু।

এসব পরিসংখ্যানেই যেন স্পষ্ট হয় আমাদের শিশুদের নিরাপত্তা ও বিচারব্যবস্থার ভেতরের কী হালত! বছরে একটা কি দুইটি ঘটনায় প্রতিবাদ–বিক্ষোভে রাস্তায় নামছে মানুষ কিন্তু অসংখ্য ঘটনার ক্ষেত্রে আমরা সত্যিকার অর্থেই বেখবর। চাঞ্চল্যকর অনেক ঘটনাও আমাদের কাছে প্রায়ই গুরুত্বহীন।

অনেক ঘটনায় দেখা যাচ্ছে মামলা হচ্ছে, আসামি ধরা পড়ছে, আদালত বসছেন, শুনানি হচ্ছে, সাজাও হচ্ছে—কিন্তু এতে কি আসলে কোনো বিচার হচ্ছে? প্রায় সময় আমরা দেখি ঘটনা বা মামলার এক দশক বা এক যুগ পর কারও সাজা হচ্ছে। রায় হতে হতে মামলার বাদী মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। এমন ঘটনাও নতুন নয়, জামিনে বের হয়ে অভিযুক্ত ধর্ষক হুমকি দিতে থাকে ভুক্তভোগীর পরিবারকে।

এ কারণে বিচারব্যবস্থা নিয়ে একটি প্রতিষ্ঠিত প্রবাদই আছে—জাস্টিস ডিলেইড ইজ জাস্টিস ডিনাইড। এর সরল বাংলা হচ্ছে, যে বিচারে দীর্ঘ সময় পার হয়ে যায়, তা আসলে কোনো বিচারই নয়।

বিচার না পাওয়ার যন্ত্রণাকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রকাশ করেছিলেন এভাবে—‘বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে।’ কিন্তু পল্লবীর শিশুটির বাবার আহাজারি শুনে যে কারও মনে হতে পারে, বিচারের বাণী আসলে এখন আর নিভৃতেও কাঁদে না। তাঁর কান্নাও যেন ফুরিয়ে গেছে।

  • রাফসান গালিব প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী

    ই–মেইল: [email protected]