ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের চেষ্টায় ভেঙে যাবে ন্যাটো

ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলে নিতে চাওয়ার বিরুদ্ধে সেখানকার অধিবাসীদের বিক্ষোভছবি: এএফপি

২০২৫ সালজুড়ে ট্রাম্প প্রশাসনকে ঘিরে ইউরোপীয় নেতাদের লক্ষ্য ছিল একটাই—যুক্তরাষ্ট্রকে ইউরোপের নিরাপত্তাকাঠামো, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ন্যাটোর সঙ্গে যুক্ত রাখা। তাঁরা চেয়েছিলেন ওয়াশিংটন যেন হঠাৎ করে ইউরোপীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা থেকে নিজেকে সরিয়ে না নেয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যদি ডেনমার্কের আধা স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড দখলের চেষ্টা করে, তাহলে ২০২৬ সালে সেই লক্ষ্য অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যেতে পারে। ইউরোপীয় কূটনীতিকদের আশঙ্কা, হোয়াইট হাউস ধীরে ধীরে সেদিকেই এগোচ্ছে।

ইউরোপের চোখে যুক্তরাষ্ট্র এখন আর নিছক মিত্ররাষ্ট্র নয়, বরং একটি শিকারি শক্তি। ট্রাম্প প্রশাসন ইউরোপজুড়ে কট্টর ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলছে, যাদের অনেক ইউরোপীয় নেতা গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হিসেবে দেখেন। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন ইউক্রেনকে নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বদলে ভূখণ্ড ছাড় দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে এবং রাশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথ খুঁজছে।

তবু ইউরোপ এই বাস্তবতা মেনে নিতে পারছে না। এর প্রধান কারণ হলো ইউরোপ এখনো নিজের নিরাপত্তার জন্য ব্যাপকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। সামরিক পুনর্গঠনের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তা বিশ্বাসযোগ্য হতে তিন থেকে পাঁচ বছর লাগবে। এই সময় পর্যন্ত ইউক্রেনকে টিকিয়ে রাখতে ইউরোপকে মার্কিন অস্ত্র, সরঞ্জাম, গোয়েন্দা সহায়তা ও কৌশলগত সক্ষমতার ওপর নির্ভর করতেই হবে। একইভাবে রাশিয়াকে চাপে রাখতে ন্যাটোর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তাদের নির্ভরতা থেকেও যাবে। ট্রাম্প প্রশাসন ইউরোপের এই দুর্বলতা দেখছে এবং তা কাজে লাগাচ্ছে।

আরও পড়ুন

গত বছর তারা ইউরোপকে চাপ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির ওপর ১৫ শতাংশ শুল্ক মেনে নিতে বাধ্য করেছিল, যাতে ট্রাম্পকে ক্ষুব্ধ না করা হয় এবং ইউক্রেন ও ন্যাটো থেকে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা সরে যাওয়ার ঝুঁকি না বাড়ে। এবারও একই ধরনের চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। কিন্তু গ্রিনল্যান্ড দখলের চেষ্টা হলে যুক্তরাষ্ট্র যে এখনো ইউরোপের বন্ধু—এই ধারণা ভেঙে পড়বে।

ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং হোয়াইট হাউসের শীর্ষ কর্মকর্তারা গ্রিনল্যান্ড নিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁদের যুক্তি হলো, আর্কটিকে রাশিয়া ও চীনের প্রভাব মোকাবিলা, চীনের নতুন সামরিক সক্ষমতা সীমিত করা, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা জোরদার, যুদ্ধের সময় ওই অঞ্চলে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ এবং নৌবাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানো। তাঁরা মনে করেন, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড এসব নিরাপত্তা চাহিদা পূরণে যথেষ্ট কার্যকর নয়।

অবশ্য ডেনমার্কের যুক্তি অনুযায়ী, তারা ছোট দেশ হলেও ২০২৫ সালে প্রতিরক্ষায় জিডিপির প্রায় ৩ শতাংশ ব্যয় করেছে এবং আর্কটিকে নজরদারি, জাহাজ, ড্রোন ও অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, গ্রিনল্যান্ড ন্যাটোর ভূখণ্ডের অংশ; তাই সেখানে সার্বভৌমত্ব নিয়ে চাপ তৈরি হলে শুধু কোপেনহেগেন নয়, পুরো জোটের বিশ্বাসযোগ্যতাই প্রশ্নের মুখে পড়বে। এ কারণেই অনেক ইউরোপীয় রাজধানীতে বিষয়টি ‘সীমান্ত বদলের রাজনীতি’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইউরোপীয় নেতাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের চাহিদা সহজেই পূরণ করা সম্ভব: দ্বীপটিতে আরও মার্কিন ঘাঁটি স্থাপনে আপত্তি নেই, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতেই নিশ্চিত, আর ১৯৫১ সাল থেকেই যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডে উল্লেখযোগ্য সামরিক প্রবেশাধিকার ভোগ করছে। অর্থনৈতিক আগ্রহ থাকলে দ্বীপটির খনিজ ও বিরল খনিজ সম্পদ আহরণও ইতিমধ্যে মার্কিন বিনিয়োগকারীদের জন্য উন্মুক্ত।

এই কারণেই ইউরোপ আশঙ্কা করছে, আসল লক্ষ্য নিরাপত্তা নয়, বরং ভূখণ্ড সম্প্রসারণ। সরাসরি সেনা পাঠানোর বদলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে গ্রিনল্যান্ডের ৫৭ হাজার বাসিন্দাকে প্রভাবিত করা হতে পারে, এমনকি একটি গণভোটের মাধ্যমেও।

এভাবে যুক্তরাষ্ট্র এগোলে ইউরোপের হাতে কার্যকর বিকল্প সীমিত। তারা ‘ইউরোপীয় ন্যাটো’ গড়ার কথা ভাবতে পারে, চীনের সঙ্গে ঝুঁকি কমানোর নীতি ধীর করে নতুন সমীকরণ খুঁজতে পারে বা সবচেয়ে বাস্তবসম্মতভাবে কোপেনহেগেনকে চাপ দিতে পারে যেন হোয়াইট হাউসের সঙ্গে কোনো সমঝোতায় পৌঁছায়।

ডেনমার্ক ইতিমধ্যে কৌশল বদলেছে। প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন বলেছেন, ন্যাটোর কোনো সদস্যকে যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে আক্রমণ করলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তাব্যবস্থা থেমে যাবে। যুক্তরাষ্ট্র যদি ডলার দিয়ে হলেও গ্রিনল্যান্ড দখল করে, তা ইউরোপের জন্য চরম অপমান হবে—জোটের শেষ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওপর অপূরণীয় ক্ষতি।

  • মুজতবা রহমান ইউরেশিয়া গ্রুপের ইউরোপ অঞ্চলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক

    টাইম ম্যাগাজিন থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত