ভেনেজুয়েলার ‘ঘৃণিত শাসনব্যবস্থা’র প্রধানকে অপসারণের পর, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন তাঁর একবিংশ শতাব্দীর সাম্রাজ্য বিস্তারের প্রকল্পের জন্য নতুন ভূখণ্ড খুঁজছেন।
প্রথম মেয়াদে ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আগ্রহকে অনেকেই ঠাট্টা হিসেবে দেখেছিলেন। এটি ছিল এমন এক প্রেসিডেন্টের আরেকটি বেপরোয়া উচ্চারণ, যিনি মানুষকে চমকে দিতে ভালোবাসেন।
এমনকি গত বছরও, যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র তাঁর বাবার বিমানে করে বিশাল দ্বীপটিতে যান এবং পরে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ক্ষণিক সফরে সেখানে হাজির হন, তখনো বিষয়টি নিয়ে ঠাট্টা তামাশা হয়েছে। কিন্তু এখন আর কেউ হাসছে না।
ইউরোপীয় নেতারা (যারা মঙ্গলবার গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব ও ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত এই ভূখণ্ডের ওপর তাদের দাবিকে পুনর্ব্যক্ত করেছেন) ট্রাম্পের হুমকিকে এখন গুরুত্বের সঙ্গেই নিচ্ছেন।
এটি আশ্চর্যের নয়। কারণ ভেনেজুয়েলায় ‘সাফল্য’-এর পর আত্মম্ভরিতায় ভর করে ট্রাম্প প্রশাসন এখন পুরো পশ্চিম গোলার্ধকেই কার্যত নিজের এলাকা বলে দাবি করছে।
ট্রাম্পের শীর্ষ সহযোগী স্টিফেন মিলার সোমবার সিএনএন-এ সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এমন এক বিশ্বব্যবস্থার ‘লৌহকঠোর আইন’ অনুসরণ করছে, যা শক্তি, বলপ্রয়োগ ও ক্ষমতা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযানের পর মার-আ-লাগোতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন হোয়াইট হাউসের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলার।
ট্রাম্পের প্রকাশ্য যুক্তি—জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রকে গ্রিনল্যান্ড দখল করতেই হবে, যদিও প্রথম থেকেই সে যুক্তি পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য ছিল না।
আর মঙ্গলবার হোয়াইট হাউস যখন উৎকণ্ঠিত ন্যাটো মিত্রদের সামনে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন এই যুক্তি আরও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে।
এক কৌশলগত রত্ন
প্রেসিডেন্ট তাঁর জায়গা থেকে ঠিকই বলেছেন। কারণ গ্রিনল্যান্ড কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর গুরুত্ব আরও বাড়ছে।
ইতিহাসজুড়েই গ্রিনল্যান্ড মধ্য আটলান্টিক অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবিন্দু ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ‘গ্রিনল্যান্ড এয়ার গ্যাপ’ নামে পরিচিত সমুদ্রপথ (যা স্থলভিত্তিক বিমানের আওতার বাইরে ছিল) নাৎসি সাবমেরিনগুলোর জন্য মিত্রশক্তির বাণিজ্যিক কনভয় ধ্বংসের এক ভয়ংকর হত্যাক্ষেত্রে পরিণত হয়।
ভবিষ্যতে কোনো বড় যুদ্ধে গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ মানেই আটলান্টিকের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের কর্তৃত্ব। আর সেখানে অবস্থিত একটি মার্কিন ঘাঁটি ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র আগাম সতর্কতা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আট দশক পর, বরফ গলে যাওয়ায় গ্রিনল্যান্ড এখন ভূরাজনৈতিকভাবেও ‘উষ্ণ’ হয়ে উঠছে। বিশ্বের ছাদের ওপর নতুন নৌপথ খুলে যাচ্ছে।
চীন ও রাশিয়াও ট্রাম্পের মতোই জানে এই দ্বীপটি কতটা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
ট্রাম্প বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য গ্রিনল্যান্ড দরকার। কিন্তু বাস্তবে যদি সত্যিই নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকে, তাহলে গ্রিনল্যান্ড দখল না করেও যুক্তরাষ্ট্র নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।
কারণ গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের অধীন হলেও সেটি ন্যাটোরই একটি অংশ, আর ডেনমার্ক যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র।
গ্রিনল্যান্ডের বিশাল জনশূন্য এলাকা সহজেই নতুন সেনাঘাঁটি, সামরিক ঘাঁটি ও হাজার হাজার সৈন্য মোতায়েনের সুযোগ দেয়।
প্রশাসনের নেতারা যদিও বিদ্রূপ করে বলেন, ডেনমার্ক নাকি কুকুরের স্লেজ দিয়ে দ্বীপটি রক্ষা করছে; তবু বাস্তবতা হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও কোপেনহেগেনের মধ্যে এমন একটি চুক্তি রয়েছে যা মার্কিন বিমান অবতরণ-উড্ডয়ন, নোঙর, বন্দর, আবাসন ও অন্যান্য ঘাঁটি ব্যবহারে ব্যাপক স্বাধীনতা দেয়।
গ্রিনল্যান্ডে এখনো পুরোপুরি কাজে না লাগানো তেল ও গ্যাসের বিশাল ভান্ডার রয়েছে। বরফ গলে গেলে বিরল খনিজ সম্পদের উত্তোলন আরও সহজ হবে। এটি ভবিষ্যতের প্রযুক্তি ও অস্ত্রশিল্পের জন্য অপরিহার্য।
যদি ট্রাম্পের আগ্রহ বিরল খনিজে হয়, তাহলে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড—উভয় পক্ষই অংশীদারিমূলক চুক্তির বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। কিন্তু ট্রাম্প যে ভাগাভাগির পথে হাঁটছেন—তার কোনো লক্ষণ নেই।
গ্রিনল্যান্ডে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে এখনো ডেনিশ পতাকার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা উড়ছে। অথচ এই প্রশাসন বরং স্টিফেন মিলারের স্ত্রী কেটি মিলারের ভাবনার কাছাকাছি—যিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুরো গ্রিনল্যান্ডকে লাল-সাদা-নীল রঙে ঢেকে দেওয়া একটি ছবি পোস্ট করেছিলেন।
এক সাম্রাজ্যবাদী প্রেসিডেন্ট
গত কয়েক দিনে পৃথিবী বদলে গেছে। ট্রাম্পের দাবি, তিনি ভেনেজুয়েলা ‘চালাচ্ছেন’ এবং মাদুরো ধরা পড়ার পর তিনিই সেখানে কর্তৃত্ব করছেন। এটি ইঙ্গিত দেয়, তিনি এখন আর কেবল বাগ্মিতার সাম্রাজ্যবাদী নন; তিনি বাস্তব প্রয়োগে নেমেছেন।
মঙ্গলবারের ঘোষণায় বলা হয়, ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রকে নিষেধাজ্ঞাধীন সর্বোচ্চ ৫ কোটি ব্যারেল তেল দেবে। আমেরিকান ও ভেনেজুয়েলার জনগণের ‘কল্যাণে’ এই তেল বিক্রি হবে এবং এর আয় ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। এতে আশঙ্কা আরও বেড়েছে যে তিনি সার্বভৌম রাষ্ট্র থেকে সম্পদ আহরণে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
পশ্চিম গোলার্ধের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এই আগ্রাসী আকাঙ্ক্ষা ট্রাম্পের ব্যক্তিগত উত্তরাধিকার নির্মাণের নেশার সঙ্গেও মিলে যাচ্ছে। হোয়াইট হাউসে বিশাল বলরুম নির্মাণ, কিংবা ওয়াশিংটনের কেনেডি সেন্টারের ওপর নিজের নাম বসানোর পরিকল্পনা তার উদাহরণ।
ট্রাম্প হয়তো ইতিহাসে নিজেকে টমাস জেফারসনের পাশে দেখতে চান, যিনি ১৮০৩ সালে ১৫ মিলিয়ন ডলারে লুইজিয়ানা কিনে যুক্তরাষ্ট্রের আয়তন দ্বিগুণ করেছিলেন। কিংবা ট্রাম্প আরেক ‘নায়ক’ উইলিয়াম ম্যাকিনলিকে (যিনি ১৮৯৮ সালে হাওয়াই দখল করেছিলেন) অনুসরণ করতে চান। ট্রাম্প সম্ভবত আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে নতুন বরফঢাকা ভূখণ্ডের নাম নিজের নামে রাখতে চাইবেন।
আজ তা অবিশ্বাস্য শোনালেও, বিশ্ব এখন ট্রাম্পকে গ্রিনল্যান্ডের জন্য হুমকি হিসেবে দেখতে শুরু করেছে।
এত দিন সবাই ভেবেছিল, ন্যাটোর জন্য হুমকি আসবে মস্কো বা বেইজিং থেকে; মিত্র জোটের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ থেকে নয়।
এখনো ট্রাম্প যে সামরিক অভিযান শুরু করতে যাচ্ছেন, এমন কোনো তাৎক্ষণিক প্রমাণ নেই। কিন্তু তা হলে তাত্ত্বিকভাবে এমন এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে, যেখানে মার্কিন সেনারা ন্যাটো মিত্রদের দিকেই অস্ত্র তাক করবে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আইনপ্রণেতাদের বলেছেন, ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড কিনতে চান, যদিও গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্ক বারবার জানিয়েছে, এটি বিক্রির জন্য নয়।
কিন্তু সময়টা উন্মত্ত। ট্রাম্প কী করবেন তা কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারে না। আর প্রথম মেয়াদের মতো তাঁকে ঘিরে রাখার মানুষও এখন নেই। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ যে তাঁকে গ্রিনল্যান্ডে পতাকা গেড়ে দেওয়ার আদেশ থেকে বিরত করবেন এমন আশা করাও কঠিন।
সাবেক ন্যাটো সুপ্রিম কমান্ডার অ্যাডমিরাল জেমস স্ট্যাভরিডিস সিএনএনকে বলেন, ‘ডেনিশরা কঠিন মানুষ। তারা মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে সামরিক শক্তি পাঠালে আমি অবাক হব না।’
ইউরোপ ক্রমেই আতঙ্কিত
ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, পোল্যান্ড, স্পেন ও যুক্তরাজ্যের নেতারা ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেনের সঙ্গে এক কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন—‘গ্রিনল্যান্ড গ্রিনল্যান্ডের জনগণের।’
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি (যাঁর দেশের গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে স্থল ও সামুদ্রিক সীমান্ত রয়েছে) আগামী মাসে উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছেন।
গ্রিনল্যান্ড দখলের যেকোনো প্রচেষ্টার ভূরাজনৈতিক প্রভাব হবে ভয়াবহ।
ফ্রেডেরিকসেন আগেই সতর্ক করেছেন—বলপ্রয়োগে গ্রিনল্যান্ড নেওয়ার চেষ্টা ন্যাটোকে ধ্বংস করে দেবে।
ডেনমার্ক ছোট দেশ হলেও আফগানিস্তান ও ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে তারা অসামান্য আত্মত্যাগ করেছে। এমন বন্ধুদের অপমানের পর ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের ডাকে তারা সাড়া দেবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু হোয়াইট হাউস ক্ষমতা প্রয়োগ করছে—কারণ তারা তা পারে।
ইউরোপের নিরাপত্তা নির্ভরতা ট্রাম্পকে বড় সুবিধা দিয়েছে। বাস্তবতা হলো—গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ করলে ইউরোপীয় বা ডেনিশ বাহিনীর পক্ষে তা প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। মিলারের ভাষায়, ‘গ্রিনল্যান্ডের জন্য কেউ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে যাবে না।’
সব মিলিয়ে, গ্রিনল্যান্ড প্রশ্নটি শুধু একটি দ্বীপ নয়—এটি বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে এক গভীর সংকেত।
স্টিফেন কলিনসন সিএনএন পলিটিক্সের একজন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক। তিনি হোয়াইট হাউসসহ যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বজুড়ে রাজনীতি বিষয়ক খবর কভার করেন।
সিএনএন থেকে নেওয়া, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ