সরকারি চাকরিজীবীদের পে স্কেল ১১ বছর ধরে অপরিবর্তিত অবস্থায় রয়েছে। বাংলাদেশে দুটি পে স্কেলের মধ্যে এত দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান আর ঘটেনি। এ ছাড়া প্রায় চার বছর ধরে চলা টানা উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় মিলিয়ে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের যৌক্তিকতা রয়েছে। বিশেষ করে নিচের স্তরের চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা জীবনযাত্রার ব্যয়ের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই স্তরের চাকরিজীবীরা যে বেতন পান, ঢাকা কিংবা বড় শহরের জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলে তাদের আয়ের সিংহভাগই চলে যায় বাসাভাড়ার পেছনে।
বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেছেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর কারণে দুর্নীতি কমবে। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, এই যুক্তির সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল থাকে না। দুই দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি। পাসপোর্ট, পুলিশ, স্বাস্থ্য, ভূমি থেকে শুরু করে যেকোনো সরকারি সেবা নিতে গেলে নাগরিকদের ঘুষ দিতে হয়। জনপ্রশাসন ও সরকারি সেবার প্রতিটি স্তরে ঘুষ-দুর্নীতি এতটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে যে ‘অভাব থাকলে দুর্নীতির প্রবণতা থাকে’ অর্থমন্ত্রীর এমন নিষ্কলুষ বক্তব্য কতটা অর্থ বহন করে?
দুই.
বাংলাদেশে প্রায় সব সরকারের আমলে সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতনকাঠামো দেওয়ার একটি রেওয়াজ চালু আছে। সাধারণত নতুন সরকার আসার শুরুতে কিংবা শেষ দিকে নতুন পে স্কেল ঘোষণা করা হয়। এর পেছনে অর্থনৈতিক বাস্তবতা যে থাকে না, তেমনটা নয়; তবে অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক চিন্তা মুখ্য উদ্দেশ্য হিসেবে কাজ করে। ১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় পে স্কেল ঘোষণার পর ২০১৫ সাল পর্যন্ত আটটি পে স্কেল হয়েছে। শেখ মুজিবুর রহমান (১৯৭৩), জিয়াউর রহমান (১৯৭৭), এইচ এম এরশাদ (১৯৮৫), খালেদা জিয়া (১৯৯১), শেখ হাসিনা (১৯৯৭), খালেদা জিয়া (২০০৫) ও শেখ হাসিনা (২০০৯ ও ২০১৩)—সব আমলেই আগের পে স্কেলের জায়গায় নতুন পে স্কেল এসেছে। সর্বশেষ ২০১৫ সালের অষ্টম জাতীয় পে স্কেল ছিল স্বাধীনতার পর সবচেয়ে বড় বেতন পুনর্গঠন। সে সময় সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছিল। যুক্তি দেওয়া হয়েছিল আকর্ষণীয় বেতনকাঠামোর সরকারি চাকরির প্রতি ‘যোগ্য ও দক্ষদের’ আকর্ষণ বাড়বে, দুর্নীতি কমবে।
বাস্তবতা কিন্তু এই যুক্তির ধারেকাছেও মিলছে না। ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতির ধারণাসূচকে বাংলাদেশের স্কোর ২৮ থেকে ২৩-এর মধ্যে ঘোরাফেরা করেছে। এর অর্থ, দুর্নীতির দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষে থাকা দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। ২০১৫ সালে বেতন বাড়ানোর পর ২০১৬ ও ২০১৭ সালে কিছুটা উন্নতি হলেও এরপর অবনতি হয়ে চার বছর স্থির অবস্থানে থাকে। ২০২১ সালের পর ধারাবাহিকভাবে অবনতি হতে থাকে।
সর্বশেষ ২০২৫ সালের রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান দাঁড়িয়েছে ১৩তম। ১৮২টি দেশের মধ্যে ১০০-এর স্কেলে বাংলাদেশের স্কোর ২৪, যা বৈশ্বিক গড় স্কোরের (৪২) চেয়ে অনেক নিচে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভুটান ৭১ স্কোর নিয়ে দুর্নীতি কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে অনেক বেশি এগিয়ে রয়েছে। ভারত ও মালদ্বীপের ৩৯, শ্রীলঙ্কার ৩৫, নেপালের ৩৪, পাকিস্তান ২৮ স্কোর নিয়ে বাংলাদেশের থেকে এগিয়ে রয়েছে। একমাত্র যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের স্কোর (১৬) বাংলাদেশের নিচে।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর মানুষ এই পরিবর্তনের একটা স্বপ্ন দেখেছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই জনপ্রশাসন সংস্কারের প্রশ্নটি মুখ থুবড়ে পড়েছিল আমলাদের বিরোধিতার মুখে। পুলিশ ও দুদক সংস্কারের উদ্যোগও আমলাতন্ত্রের চাপে কাটছাঁট করে বনসাই বানানো হয়েছিল। নির্বাচিত সরকার এসে দুদক, বিচার বিভাগ সংস্কার উদ্যোগ আপাতত ‘ডিপ ফ্রিজে’ তুলে রেখেছে। অন্যদিকে সাড়ে তিন মাসের বেশি সময় ধরে কমিশনহীন দুদক।
তিন.
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করা হয়। সেই কমিশন গ্রেড ভেদে ৮০-১৪০ শতাংশ বেতন-ভাতা বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল। বিএনপি দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে দেয়। কমিটি তিন অর্থবছরে তিন ধাপে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন করা; প্রথম দুই অর্থবছরে দেওয়া হবে ৫০ শতাংশ করে মূল বেতন; আর তৃতীয় অর্থবছরে দেওয়া হবে ভাতা।
নতুন বেতনকাঠামো আংশিক বাস্তবায়নে সরকারের নতুন বছরে বাড়তি কত টাকা ব্যয় হবে, সেটা স্পষ্ট করে বাজেটে বলা হয়নি। তবে আগামী ১ জুলাই থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন শুরু হচ্ছে। এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে জনপ্রশাসনে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা। এ হিসাবে গতবারের তুলনায় জনপ্রশাসনে বরাদ্দ বাড়ছে প্রায় ৫৫ হাজার কোটি টাকা।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতনকাঠামো আংশিক বাস্তবায়নের জন্য যে বাড়তি টাকা দরকার, সেটা আসবে কোথা থেকে? তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার প্রথম বাজেট দিয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার। বিশাল এই বাজেটের বিপরীতে ঘাটতিটাও বিপুল।
প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার। প্রশ্ন হচ্ছে যে এনবিআর শেষ হতে যাওয়া অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ১ লাখ কোটি টাকা কম রাজস্ব আদায় করতে পেরেছে, যে দেশে কর-জিডিপি বছরের পর বছর ধরে ৮ শতাংশের নিচে আটকে রয়েছে, সেখানে নতুন অর্থবছরে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের আশা করাটা স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর মতো ‘মিরাকল’ ছাড়া আর কি হতে পারে। এর বাইরে সরকার বাজেটঘাটতি মেটাতে বিদেশি উৎস থেকে ১ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা ঋণ ও ৬ হাজার ১৫০ কোটি টাকা অনুদান পাওয়ার আশা করছে।
যেখানে রাজনৈতিক ও সামাজিক অনিশ্চয়তা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে দেশি বিনিয়োগকারীরা তাঁদের পকেটের টাকা বের করতে ভরসা পাচ্ছেন না, সেখানে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এত বিপুল বিনিয়োগ করতে কতটা ভরসা পাবেন? তাহলে কি ঋণ করে ঘি খাওয়ার সেই তত্ত্বের মতো আবারও নতুন মেগা প্রকল্পের পথে হাঁটবে? এরই মধ্যে চীন থেকে ঋণ নিয়ে দ্বিতীয় পদ্মা, দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের চিন্তা করছে সরকার। আওয়ামী লীগ আমলে করা মেগা প্রকল্পসহ অন্যান্য ঋণের সুদ শোধ করতেই বাজেটের সাড়ে সাত ভাগের এক ভাগ (১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা) চলে যাবে।
খুব স্বাভাবিকভাবেই সরকারকে দেশের ব্যাংকগুলো থেকে আরও বেশি টাকা ঋণ নিতে হবে। এমনিতেই বাজেটে দেশের ব্যাংকগুলো থেকে সরকার ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিতে চায়। সরকার পরিচালনায় ব্যাংক থেকে নতুন করে আরও ঋণ নেওয়ার অর্থ হচ্ছে, বেসরকারি খাত প্রয়োজনীয় ঋণ পাবে না। বেসরকারি খাত ঋণ না পাওয়ার অর্থ কর্মসংস্থান হবে না, মানুষের আয় বাড়বে না এবং নতুন করে মূল্যস্ফীতির ঢেউ আছড়ে পড়বে।
সরকারকে এটা মনে রাখা জরুরি যে চব্বিশের অভ্যুত্থানে তরুণদের বেকারত্ব ও কর্মসংস্থানের দাবির সঙ্গে আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে না পারা মানুষের জীবন বদলানোর প্রত্যাশাও এক বিন্দুতে এসে মিশেছিল। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বলছে, দেশে প্রতিবছর ২৪ লাখ তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করেন। বাস্তবতা হলো, ২৪ লাখের ২৪ হাজারের জন্যও একটি ডিসেন্ট চাকরির সুযোগ হচ্ছে না।
সরকারি চাকরিতে বড়জোর ২-৩ শতাংশ তরুণের চাকরি হচ্ছে। বাকি তরুণদের একটি অংশ বৈধ-অবৈধ পথে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। দেশে থেকে যাওয়া তরুণদের মধ্যে সামান্য একটি অংশ ব্যাংক, এনজিও, করপোরেট প্রতিষ্ঠানে ভালো বেতনে চাকরি পাচ্ছেন। বাকিরা?
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হয়ে বের হতে হতে একেকজনের ৭–২০ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। অথচ পাস করে তাঁরা ১৫ হাজার টাকার চাকরিই জোটাতে পারছেন না। প্রাতিষ্ঠানিক আর অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত, কৃষক ও শ্রমজীবীদের অবস্থা আরও করুণ। কায়দা করে বেঁচেবর্তে থাকার শেষ সীমানায় তাঁরা পৌঁছে গেছেন। টানা উচ্চ মূল্যস্ফীতির আঁচ থেকে এই মানুষগুলোকে বাঁচাবে কে?
বাজেটে কিন্তু সেই সুরক্ষার সুনির্দিষ্ট কোনো প্রতিশ্রুতি কিংবা পথরেখা নেই; বরং আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, ঘাটতি বাজেটের টাকা তুলতে যদি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা খাতের বরাদ্দ কাটছাঁট করা হয়, তাহলে সীমিত আয়ের মানুষেরা আরও বেশি সংকটে পড়বে। আবার বাজেটে টান পড়লে ভর্তুকি কমানোর নামে তেল-বিদ্যুৎ-গ্যাসের দাম বাড়ানোর সহজ সমাধান তো আছেই। ফলে সরকারের ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের অঙ্কের ব্যবধান যত বেশি থেকে যাবে, তার মাশুল তত সাধারণ মানুষকেই গুনতে হবে।
চার.
ব্রিটিশ ও পাকিস্তান পর্বের ঔপনিবেশিক শাসনকাঠামোর সঙ্গে বাংলাদেশ পর্বের যে অনুদার গণতন্ত্র এবং দীর্ঘ সামরিক-বেসামরিক কর্তৃত্ববাদী শাসন, সেখানে দুর্নীতির শিকড় অনেক গভীর ও প্রাচীন। হাসিনা আমলে এই ব্যবস্থাটি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র মিলেমিশেই এখানে স্বজনতোষী ও চোরতন্ত্রের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে শ্বেতপত্র কমিটির হিসাব বলছে, হাসিনা আমলের সাড়ে ১৫ বছরে দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ প্রায় ২৭ লাখ কোটি টাকা। এই দুর্নীতি, লুটপাট ও পাচারের সঙ্গে রাজনীতিবিদেরা যেমন দায়ী, একইভাবে আমলাতন্ত্র ও ব্যবসায়ীরাও দায়ী। ফলে এই ব্যবস্থার পরিবর্তন না করে দুর্নীতি কমানোর আশা করাটা নিছক ‘দিনের স্বপ্ন’ ছাড়া আর কিছু নয়।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর মানুষ এই পরিবর্তনের একটা স্বপ্ন দেখেছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই জনপ্রশাসন সংস্কারের প্রশ্নটি মুখ থুবড়ে পড়েছিল আমলাদের বিরোধিতার মুখে। পুলিশ ও দুদক সংস্কারের উদ্যোগও আমলাতন্ত্রের চাপে কাটছাঁট করে বনসাই বানানো হয়েছিল। নির্বাচিত সরকার এসে দুদক, বিচার বিভাগ সংস্কার উদ্যোগ আপাতত ‘ডিপ ফ্রিজে’ তুলে রেখেছে। অন্যদিকে সাড়ে তিন মাসের বেশি সময় ধরে কমিশনহীন দুদক।
প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার ফারাক থাকলে আস্থাটা ক্রমে ফিকে হয়ে আসে।
মনোজ দে, প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী
* মতামত লেখকের নিজস্ব