আমরা এমন এক সময়ে বসবাস করছি, যখন তথ্যের অবাধ প্রবাহের চেয়ে সঠিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তথ্যের বিস্তৃত এই জগৎ প্রতিনিয়ত যেমন বড় হচ্ছে, তেমনি এর জটিলতাও বাড়ছে; বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রসারের ফলে। ফলে কোনটি সত্য তথ্য আর কোনটি অপতথ্য, তা নির্ধারণ করা আজ এক কঠিন প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
‘মিসইনফরমেশন’ বা ‘অপতথ্য’ শব্দটি অনেক সময় সাধারণ ভুল তথ্য হিসেবে মনে হলেও বাস্তবে এটি তার চেয়েও বেশি গভীর ও প্রভাবশালী। ডিজিটাল যুগে তথ্য শুধু তথ্য নয়, এটি একটি বয়ান তৈরি করে, জনমত গঠন করে এবং কখনো কখনো ইতিহাসের গতিপথও বদলে দেয়।
উদাহরণ হিসেবে ইরাকের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র থাকার তথাকথিত তথ্য আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছিল এবং সামরিক হস্তক্ষেপের যৌক্তিকতা তৈরিতে ভূমিকা রেখেছিল।
যদিও সেই তথ্য পরে প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তবু তার প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী।
তথ্যের অবাধ প্রবাহ নীতিগতভাবে একটি গণতান্ত্রিক অধিকার এবং তা কাম্য। তবে এই উন্মুক্ততাই অপতথ্য ছড়িয়ে পড়ার সুযোগও তৈরি করে। বৈশ্বিক রাজনীতি, অর্থনীতি, সামরিক কৌশল বা বিনোদন, সব ক্ষেত্রেই সত্য তথ্যের পাশাপাশি অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে বিভিন্ন স্বার্থে।
অর্ধসত্য যেমন পুরো মিথ্যার চেয়েও বিপজ্জনক হতে পারে, তেমনি অপতথ্য মানুষের মতামতকে প্রভাবিত করে এবং ভিন্নধর্মী ধারণা তৈরি করতে সক্ষম।
সাম্প্রতিক প্রযুক্তিগত অগ্রগতি যোগাযোগের ধরনকে আমূল বদলে দিয়েছে। এখন হাতের মুঠোয় তথ্যভান্ডার, এবং মুহূর্তেই তা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় প্রযুক্তি শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সরবরাহব্যবস্থাকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবে একই সঙ্গে এই সময় অপতথ্যের ব্যাপক বিস্তার পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে—ভুল ও ভিত্তিহীন তথ্য জনমনে বিভ্রান্তি, অবিশ্বাস ও বিতর্ক সৃষ্টি করে।
ভুল তথ্য ও অপতথ্যের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। অপতথ্য সাধারণত ইচ্ছাকৃতভাবে ছড়ানো হয়, যার লক্ষ্য থাকে প্রতারণা, বিভ্রান্তি সৃষ্টি বা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কিংবা কৌশলগত উদ্দেশ্য অর্জন।
এটি মানবাধিকার, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও সংবেদনশীল বিষয়ে গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করতে পারে।
অপতথ্য কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সহজেই সীমানা অতিক্রম করে অন্য দেশ বা অঞ্চলেও অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
অপতথ্যের কোনো একক ও সর্বজনস্বীকৃত সংজ্ঞা না থাকলেও এর প্রভাব সুস্পষ্ট। নির্বাচনপ্রক্রিয়া, জনস্বাস্থ্য, সশস্ত্র সংঘাত বা জলবায়ু পরিবর্তন—সব ক্ষেত্রেই অপতথ্য প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই সংজ্ঞার চেয়ে এর বৈশিষ্ট্য ও প্রভাব বোঝা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করাও জরুরি, কারণ অপতথ্য মোকাবিলার নামে সমালোচনামূলক মতামতকে দমন করা হলে তা উল্টো অপপ্রচারের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতে, অপতথ্য হলো এমন বিকৃত বা বিভ্রান্তিকর তথ্য, যা ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষের ধারণা প্রভাবিত করতে বা বিভ্রান্ত করতে তৈরি ও প্রচার করা হয়।
এটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা কমায়, জনআলোচনাকে বিকৃত করে, সামাজিক মেরুকরণ বাড়ায় এবং নাগরিকদের সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে।
অপতথ্য প্রতিরোধে ব্যক্তিপর্যায়ে সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আকর্ষণীয় বা চাঞ্চল্যকর শিরোনাম দেখে বিভ্রান্ত না হয়ে সংবাদের মূল বিষয়বস্তু যাচাই করা জরুরি। আবেগপ্রবণ ভাষা, অস্পষ্ট তথ্য বা অজ্ঞাত সূত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। নির্ভরযোগ্য ও যাচাইকৃত তথ্যই গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত।
তথ্যের উৎস যাচাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো তথ্য শেয়ার করার আগে তার সত্যতা যাচাই না করলে তা অপতথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত শেয়ার করার প্রবণতা অনেক সময় ব্যক্তিগত বিশ্বাসযোগ্যতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। তাই তথ্য শেয়ার করার আগে একাধিক নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
অপতথ্য শুধু লিখিত তথ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; ছবি, ভিডিও বা অন্যান্য মাল্টিমিডিয়া কনটেন্টও বিভ্রান্তি ছড়াতে ব্যবহৃত হতে পারে।
অপতথ্য রোধে আইনগত কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা অবশ্যই আন্তর্জাতিক মানসম্মত হতে হবে এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন না করে প্রয়োগ করতে হবে। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সীমিত বিধিনিষেধ আরোপ করা যেতে পারে, তবে তা যেন স্বচ্ছ, যুক্তিসংগত এবং আইনি সুরক্ষাসম্পন্ন হয়।
বিকৃত বা প্রসঙ্গবিচ্যুত ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট আবেগ তৈরি করে এবং মানুষকে সহজেই বিভ্রান্ত করে। তাই ভিজ্যুয়াল তথ্যের ক্ষেত্রেও সমান সতর্কতা প্রয়োজন।
অপতথ্য মোকাবিলায় শিক্ষিত ও সমালোচনামূলক চিন্তাশীল নাগরিক গড়ে তোলা অপরিহার্য। মানুষকে তথ্য যাচাইয়ের কৌশল শেখানো, মিডিয়া লিটারেসি বৃদ্ধি করা এবং সচেতন আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
সন্দেহজনক বা মিথ্যা তথ্য–সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মে রিপোর্ট করাও একটি কার্যকর পদক্ষেপ।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো অপতথ্য মোকাবিলায় নীতিমালা প্রণয়ন করা এবং এতে নাগরিক সমাজকে সম্পৃক্ত করা। তবে অস্পষ্ট সংজ্ঞার ভিত্তিতে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ বা বৈধ মতামতকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ বৃদ্ধি করা এবং বহুমাত্রিক গণমাধ্যমকে উৎসাহিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইন্টারনেট বন্ধ বা গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের মতো পদক্ষেপ অনেক সময় পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করতে পারে।
সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব হলো সঠিক ও সময়োপযোগী তথ্য প্রদান নিশ্চিত করা এবং মিথ্যা তথ্য প্রচারকারীদের জবাবদিহির আওতায় আনা।
অন্যদিকে প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও তাদের প্ল্যাটফর্মে অপতথ্যের প্রভাব কমাতে স্বচ্ছতা বাড়ানো, নীতিমালা উন্নয়ন এবং দায়িত্বশীল কনটেন্ট ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
অপতথ্য রোধে আইনগত কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা অবশ্যই আন্তর্জাতিক মানসম্মত হতে হবে এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন না করে প্রয়োগ করতে হবে। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সীমিত বিধিনিষেধ আরোপ করা যেতে পারে, তবে তা যেন স্বচ্ছ, যুক্তিসংগত এবং আইনি সুরক্ষাসম্পন্ন হয়।
সর্বোপরি, অপতথ্য মোকাবিলা একটি সম্মিলিত দায়িত্ব। ব্যক্তি, রাষ্ট্র এবং প্রতিষ্ঠান—সবার সমন্বিত প্রচেষ্টা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর নীতিমালার মাধ্যমেই এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব। দ্রুত পরিবর্তনশীল এই বাস্তবতায় টেকসই কাঠামো গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
ড. এ কে এম তাজকির-উজ-জামান, লেখক ও সরকারি কর্মকর্তা