আমার মনে হয়েছে, গাইবান্ধা-৫ উপনির্বাচন সম্পূর্ণ বন্ধ করে ইতিহাস সৃষ্টি করলেও রাজনৈতিক অঙ্গনের বিতর্ক হয়তো কমিশনকে কিছুটা হলেও বিব্রত করেছে। হয়তো সংলাপ আয়োজনের পেছনে এ বিষয়টি মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল। আমি এর আগে আমার একটি লেখায় গাইবান্ধা উপনির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাকে দারুণভাবে সাধুবাদ জানিয়েছি। সংলাপে উপস্থিত সবাই এ ধরনের বলিষ্ঠ পদক্ষেপের জন্য কমিশনকে সাধুবাদ জানান।

সংলাপে উপস্থিত হয়ে আমার নির্বাচন কমিশনে দায়িত্ব পালনের দিনগুলোর কথা মনে পড়েছে। মাঝেমধ্যে আমাদের অসহায় মনে হতো। কেননা আমাদের সঠিক সহায়তা করার কেউ ছিল না। আউয়াল কমিশন সেদিক থেকে ভাগ্যবান। কারণ, এখন সাবেকেরা রয়েছেন, যাঁরা প্রয়োজনে তাঁদের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করতে পারেন। তথাপি সিদ্ধান্ত একান্তই নির্বাচন কমিশনের। প্রথম দর্শনে আমার কমিশনকে আন্তরিক মনে হয়েছে। আশা করি, তাঁরা তাঁদের কাজে আরও আন্তরিক থাকবেন। নির্বাচন কমিশন সবাইকে খুশি করতে পারবে না। এটা তাদের কাছে আশা করাও উচিত নয়।

ওই সংলাপে আমার উত্থাপিত দু–একটি বিষয় পাঠকদের উদ্দেশে তুলে ধরতে চাই। মোটাদাগে, আমার কাছে কয়েকটি বিষয় বিবেচ্য বলে মনে হয়েছে। এর মধ্যে প্রথমটি হলো ইভিএম নিয়ে বিতর্ক এড়িয়ে নির্বাচনের ওপরে অধিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা কীভাবে সম্ভব।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৩ সালে। সেই নির্বাচন থেকে জেলা প্রশাসকদের রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার আইনগত বাধ্যবাধকতা না থাকলেও তা রেওয়াজ পরিণত হয়েছে। বলা হয়ে থাকে, একজন জেলা প্রশাসককে গড়পড়তা চার–পাঁচটি আসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

নির্বাচন কমিশন সবাইকে খুশি করতে পারে না এবং সে চেষ্টাও তাদের পক্ষে করা হয় না। তবে নির্বাচনে যাতে সবাই অংশগ্রহণ করতে আগ্রহী হয়, তেমন পরিবেশ তৈরি করা এবং নির্বাচনকে শক্তভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা থাকতে হবে। যেসব রাজনৈতিক দল নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত, এর প্রতিটিকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে সব ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হয়। অযথা বিতর্ক নয়, সবার মতামতের প্রতি মনোযোগী হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

তবে বাস্তবে এমন নয়। চার অথবা চারের কম সংসদীয় আসন মাত্র কয়েকটি জেলাতেই রয়েছে। তা ছাড়া প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটারসংখ্যা ছিল সাড়ে তিন কোটি, আর বর্তমানে ভোটারসংখ্যা প্রায় ১১ কোটি। এ ছাড়া ১৭টি থেকে ৬৪ জেলা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ১৯টি জেলায় আসনসংখ্যা ১১ থেকে ২০ পর্যন্ত। যেমন ঢাকায় ২০টি, চট্টগ্রামে ১৬, ময়মনসিংহে ১১টি ও কুমিল্লায় ১১টি।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে একজন আরও (রিটার্নিং অফিসার) দিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এমনকি নির্বাচন কমিশনের পক্ষেও তাঁদের নিয়ন্ত্রণে অসুবিধা হয়। কেননা, বড় আমলা থেকে জেলা প্রশাসকেরাও সরকার পরিচালনাকারী দলের প্রভাবের বাইরে নেই। এর কিছুটা আঁচ করা গেছে ৮ অক্টোবর নির্বাচন কমিশনের আয়োজনে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তাঁদের উদ্ধত আচরণ থেকে।

অধিকতর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আমার সুপারিশ হলো নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব লোকবল বিষয়ে। নির্বাচন কমিশন নিজেদের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের কাজ ভাগাভাগি করে দিতে পারে। স্মরণযোগ্য যে শামসুল হুদা কমিশন প্রথমে স্থানীয় বড় ও ছোট নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তা পদে নিজেদের কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছিল। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য তাঁদের প্রস্তুত করতে আবাসিক আধুনিক প্রশিক্ষণকেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছিল।

আজকের নির্বাচন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন। এটাকে আন্তর্জাতিক স্তরে উন্নত করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। অনেক চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও সে সময়কার নির্বাচন কমিশন সার্বিকভাবে জটিল নির্বাচনে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করতে পেরেছিল। বিষয়টি বর্তমান নির্বাচন কমিশন অবশ্যই গভীরভাবে ভেবে দেখতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক জেলা প্রশাসক নির্বাচন পরিচালনা করতে বিব্রত বোধ করতে পারেন।

শুধু সিসিটিভি দিয়ে নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ ছাড়াও আমার এ লেখায় আর দু–একটি সুপারিশ করতে চাই। বাংলাদেশে নির্বাচনের পরিবেশ অস্থির হওয়ার আরেকটি বড় কারণ মাত্রাতিরিক্ত নির্বাচনী খরচ। এই হিসাব কখনোই কমিশন সঠিকভাবে পায় না। প্রার্থীদের দাখিলকৃত হিসাব বেশির ভাগ বাস্তবসম্মত বা সঠিক নয়। কিন্তু এর নিরীক্ষণ নির্বাচন কমিশনের পক্ষে সম্ভব হয় না। অথচ গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ (আরপিও) অধ্যায় ৩-ক–এ নির্বাচনী ব্যয়বিষয়ক বিধিতে নির্বাচনে খরচের এবং নির্বাচনান্তে নির্ধারিত অর্থ ব্যবহারের মধ্যেই খরচের বিবরণ নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা আবশ্যক। এ বিবরণ সব প্রার্থীর—বিজয়ী বা বিজিত—দাখিল করা অবশ্যকরণীয়। এর অন্যথা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। 

যা–ই হোক, নির্বাচনী শিডিউল, বিশেষ করে মনোনয়ন গৃহীত হওয়ার পর থেকে প্রত্যেক বৈধ প্রার্থীর খরচের ওপর নজর না রাখতে পারলে নির্বাচন কমিশন কখনোই সঠিক তথ্য পাবে না। তাই আমার সুপারিশ, প্রথম থেকেই নির্বাচন কমিশনকে এক্সপেনডিচার অবজারভার বা নির্বাচনী ব্যয় পর্যবেক্ষক নিয়োগ করতে পারে।

যাদের কাজ হবে ন্যূনতম পক্ষে প্রতি সপ্তাহে প্রত্যেক প্রার্থীর কাছ থেকে ওই সময়ের খরচের বিশদ বিবরণ নেওয়া। শুধু বিবরণ নেওয়াই নয়, প্রয়োজনে নিরীক্ষণ করা। নির্বাচন শেষে এসব কাগজ কমিশনে দাখিল করা, যাতে করে কমিশন প্রার্থী প্রদত্ত সার্বিক নির্বাচনী ব্যয়ের বিবরণের সঙ্গে মিলিয়ে নিরীক্ষণ করা সহজতর হয়।

স্মরণযোগ্য যে শামসুল হুদা কমিশন ২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এ পদ্ধতিতে (এক্সপেনডিচার অবজারভার) পর্যবেক্ষক দল গঠন করে ভালো নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই ভবিষ্যতের জন্য আমার এ সুপারিশ। আশা করি কমিশন নজরে নেবে।

নির্বাচন কমিশন সবাইকে খুশি করতে পারে না এবং সে চেষ্টাও তাদের পক্ষে করা হয় না। তবে নির্বাচনে যাতে সবাই অংশগ্রহণ করতে আগ্রহী হয়, তেমন পরিবেশ তৈরি করা এবং নির্বাচনকে শক্তভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা থাকতে হবে। যেসব রাজনৈতিক দল নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত, এর প্রতিটিকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে সব ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হয়। অযথা বিতর্ক নয়, সবার মতামতের প্রতি মনোযোগী হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। সর্বোপরি ভোটারদের ভোট রক্ষার গুরুদায়িত্ব একমাত্র নির্বাচন কমিশনের। আশা করি, বর্তমান নির্বাচন কমিশন অতীত থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবে।

  • ড. এম সাখাওয়াত হোসেন নির্বাচন বিশ্লেষক, সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং এসআইপিজির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো (এনএসইউ) [email protected]