১৯৭০–এর নির্বাচন হয় এ ধরনের একটি কমিশনের আওতায়। বলা প্রাসঙ্গিক, সে কমিশনের আওতায় হওয়া নিরপেক্ষ নির্বাচনের ফলাফল বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার প্রধান আইনি ভিত্তি হয়েছিল। আর স্বাধীনতার পর সংবিধান এবং নির্বাচন কমিশন গঠনসহ বহুবিধ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরও নির্বাচন ব্যবস্থাটিকে আমরা গ্রহণযোগ্যতা দিতে পারিনি। দুটো সামরিক শাসন গেছে। তারা মনগড়া নির্বাচন করেছে। রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় থেকে পরিচালিত নির্বাচনেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। তাই দিনে দিনে নির্বাচন পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ছে। অর্ধশতকে চারবার নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারকে ক্ষমতায় রেখে নির্বাচন হয়েছে। সে সময়েও সরকার ও কমিশনের জন্য নির্বাচন পরিচালনা একেবারে সহজ ছিল না। তবে তারা পক্ষপাতহীনভাবে আইনানুগ পদ্ধতিতে সেসব নির্বাচন পরিচালনা করেছে। ফলাফলে পরাজিত পক্ষ আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি অনুসারে কিছু আপত্তি জানিয়েছিল। তবে দেশে ও বিদেশে সেসব নির্বাচন ব্যাপক মান্যতা পেয়েছিল। এর সর্বশেষটি হয় ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর। এতে বিশাল জয় পায় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট। ক্ষমতায় এসে তারা সুপ্রিম কোর্টের একটি বিভক্ত রায়কে ভিত্তি ধরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দেয়। বিষয়টি তাদের জন্য আপাতমধুর হলেও নতুন নতুন সংকট সৃষ্টি হতে থাকে। আর এখন এগুলোরই মোকাবিলা করছে বর্তমান কমিশন।

অবশ্য এর মাঝে ২০১৪ ও ২০১৮ সালে দুটি নির্বাচন গেছে। এসব নির্বাচনে ক্ষমতায় থাকা সরকার পরাজিত হয় না। ২০১৪ সালে অর্ধেকের বেশি আসনে নির্বাচন হয়ে যায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। অবশিষ্টগুলোতেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল লোকদেখানো। এরপর ২০১৮ সালের শেষের নির্বাচনটিতে সংলাপ করে সব দল অংশ নিয়েছিল। তবে ক্ষমতায় থাকা সরকার ও তাদের নেতা–কর্মীরা বিরোধীদলীয় প্রার্থীদের প্রচার–প্রচারণার পরিসর প্রায় শূন্য করে ফেলে। প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় বিরোধীদলীয় প্রার্থীদের কর্মী–সমর্থকেরা গ্রেপ্তার হন অথবা তাঁদের এলাকা ছাড়া করা হয়। আর সে নির্বাচনটি ব্যাপকভাবে ‘মধ্যরাতের নির্বাচন’ বলে পরিচিতি পায়। আরও দুর্ভাগ্যজনক যে রাজনৈতিক দলের এ কাজের অংশীদার ছিলেন প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা। মূলত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ওই নির্বাচনের কুখ্যাতি এতটাই ছড়িয়েছে যে সম্প্রতি বর্তমান সিইসি বলেছেন, তিনি ২০১৮ ধরনের নির্বাচন হতে দেবেন না। তাঁর এ বক্তব্য থেকে আমাদের মধ্যে আশাবাদ জাগ্রত হওয়া স্বাভাবিক।

আগামী নির্বাচনে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের নির্বাচন (মার্কিন রাষ্ট্রদূতের মন্তব্য) করতে হবে। সরকার ও কমিশন একটি বিশ্বাসের ক্ষেত্র তৈরি করুক। এটা দৃশ্যমান হতে হবে। নির্বাচন অনুষ্ঠানের কঠিন কাজটি করার জন্য কমিশনের এত মর্যাদা, ক্ষমতা ও সুযোগ-সুবিধা। তাই কঠিন কাজটিও তাদেরই করতে হবে।

অবশ্য সিইসি এমন কথাও স্থানান্তরে বলেছেন যে সরকারের সহযোগিতা ছাড়া নির্বাচন পরিচালনা অসম্ভব। বলা হতে পারে সংবিধান কমিশনকে নির্বাচনকালীন প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচালনার জন্য ব্যাপকতর ক্ষমতা দিয়েছে। কিন্তু সরকার ভিন্নমুখো হলে কমিশনের পক্ষে এ দায়িত্ব পালন একরকম অসম্ভব। এ জন্য নির্বাচনকালীন সরকার বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি উঠেছে। হতে পারে বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের আওতায় নেই। ভোটারবিহীন নির্বাচন করাও তাদের দায়িত্বে পড়ে না। কেননা, গত দুটি নির্বাচনে জনগণের যে অংশগ্রহণ ছিল না, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। এ ক্ষেত্রে সরকারি দলের এ দাবি সত্য যে জনগণ যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী না হতো, তাহলে প্রতিবাদ, প্রতিরোধে তাদের এগিয়ে আসার কথা ছিল। তেমন কিছু হয়নি। এ ক্ষেত্রে এর দায়ভার বিরোধী দলসমূহের ওপর বর্তায়। জনগণকে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন, প্রয়োজনে প্রতিবাদী ও সংগঠিত করতে তারা দীর্ঘদিন ব্যর্থ হচ্ছে। হতে পারে নেতৃত্ব–সংকট আর সরকারের দমন–পীড়নের তারা তেমন কিছু করতে পারছে না। কিন্তু এ ধরনের অবস্থাতেই তাঁদের প্রতিপক্ষরা মাঠেই ছিলেন। তাঁদের ওপর দিয়েও পাকিস্তান সময়কাল থেকে নানা ধরনের দমন–পীড়ন কম হয়নি। যাহোক, সচেতন মানুষ একটি প্রতিনিধিত্বশীল সংসদের অভাব বোধ করছে প্রকটভাবে।

এখন আলোচনায় থাকে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য কমিশন ও সরকারের কী করণীয় আছে। কতটুকুই–বা এগোতে পারে বেঁকে বসা বিরোধী দলগুলো। সত্যি বটে, নির্বাচন কমিশনকে সংবিধান ও আইনে তাদের দায়িত্ব পরিচালনার জন্য প্রভূত ক্ষমতা দিয়েছে। কিন্তু দেখা গেছে, সরকার আইনত সব সহযোগিতা দিতে বাধ্য থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তা দেয় না। আর এর জন্য কিছু হয়ও না সংশ্লিষ্ট কারও। ১৯৯১ সালের নির্বাচন সফলভাবে পরিচালনাকারী সিইসিকে পরে মাগুরা উপনির্বাচনস্থল অরক্ষিত রেখে ঢাকায় ফিরতে হয়েছে। ঠিক তেমনি ১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচন যথার্থভাবে পরিচালনার পরও তখনকার সিইসি কিছুই করতে পারেননি টাঙ্গাইলের একটি উপনির্বাচনে। আর দলীয় সরকারের আওতায় অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে কমিশন সরকারি দলের নীরব সহযোগী কিংবা অসহায় দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে, এমনটা আমরা দেখতে অভ্যস্ত। এসব অভিজ্ঞতা থেকেই এগোতে হবে সামনের দিকে।

প্রাসঙ্গিকভাবে বলতে হয়, অংশীজনের কোনো মতামত না নিয়েই কমিশন আগামী নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের বিতর্কিত সিদ্ধান্তটি নিয়ে ফেলেছে কিংবা ঝুলিয়ে রেখেছে। এমনিতেই নির্বাচন নিয়ে নানা বিতর্ক। সেখানে এটি নিয়ে কমিশনের অবস্থান তাদের গ্রহণযোগ্যতাকে দুর্বল করে। এরপর আসছে নির্বাচনকালীন সরকার প্রসঙ্গ। এখানে সরকারের অবস্থান, ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী’। তারা সংবিধানের কথা বলছে আর বিএনপিসহ বেশ কিছু দলের বক্তব্য সরকারকে ক্ষমতায় রেখে নির্বাচন করবে না। এবারও যেনতেন একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্যোগ দেশের জন্য বহুবিধ অকল্যাণ ডেকে আনবে। এ সমস্যার সমাধান করতে হবে রাজনীতিকদের। পাশ্চাত্যের কূটনীতিকদের আমাদের নির্বাচনসংক্রান্ত বিষয়ে বিভিন্ন মন্তব্যে সরকার অসহিষ্ণু প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে। অথচ এ ধরনের অবস্থায় তারা কতবার বিদেশি রাষ্ট্র, কমনওয়েলথ এমনকি জাতিসংঘকে ডেকে এনেছে, সেটা আমরা ভুলিনি। আগামী নির্বাচনে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের নির্বাচন (মার্কিন রাষ্ট্রদূতের মন্তব্য) করতে হবে। সরকার ও কমিশন একটি বিশ্বাসের ক্ষেত্র তৈরি করুক। এটা দৃশ্যমান হতে হবে। নির্বাচন অনুষ্ঠানের কঠিন কাজটি করার জন্য কমিশনের এত মর্যাদা, ক্ষমতা ও সুযোগ-সুবিধা। তাই কঠিন কাজটিও তাদেরই করতে হবে।

আলী ইমাম মজুমদার সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব

[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন