অভ্যন্তরীণ নীতির ক্ষেত্রে মতবিরোধ থাকলেও বাইডেনের বিদেশনীতির বড় অংশটাই তাঁর পূর্বসূরি ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতিরই ধারাবাহিকতা। এ ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান নেতৃত্ব এক পথেই হেঁটেছে। কিন্তু রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধকে ঘিরে বাইডেন ও ট্রাম্পের বিদেশনীতি বড় পার্থক্য চোখে পড়ে। বিদেশনীতি বিষয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে এখন প্রধান একটি অ্যাজেন্ডা হলো, ইউক্রেনকে যে পরিমাণ সহায়তা দিতে যুক্তরাষ্ট্র অঙ্গীকার করেছে, সেটা কি ওয়াশিংটন অব্যাহত রাখতে পারবে?

গত ফেব্রুয়ারি মাসে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত মার্কিন কংগ্রেস বা আইনসভা ৪০ বিলিয়ন ডলারের সামরিক ও মানবিক সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে; যদিও মার্জরি টেইলর গ্রিনদের মতো আইনসভার উগ্র ডানপন্থী সদস্যরা অঙ্গীকার করেছিলেন, ‘এক পয়সাও ইউক্রেনে যাবে না।’ এই ধরনের ভাবনা নতুন আইনসভার খুব কম অংশই পোষণ করবে। কেননা, ট্রাম্পের সমর্থক কট্টরপন্থী রিপাবলিকানরা নির্বাচনে বাজে ফল করেছেন। তাঁদের অনেকেই জিততে পারেননি।
বাইডেনের ইউক্রেন–নীতির বেশির ভাগ বিরোধিতা এসেছে ট্রাম্প অনুসারী অতি ডানপন্থী শিবির থেকে। সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, আইনসভার ছোট এই প্রতিনিধিদল ট্রাম্পের প্রথম অভিশংসনের ক্ষেত্রে ভ্লাদিমির পুতিনের যুক্ততার কারণে তাঁকে ক্ষমা করতে পারেনি।

চীনের প্রতি ওয়াশিংটনের কঠোর নীতির ধারাবাহিকতা, তাইওয়ানে চীনের যেকোনো আগ্রাসন রুখে দিতে বাইডেনের প্রতিশ্রুতি, হংকংয়ের গণতন্ত্রের ওপর দমনপীড়নের সমালোচনা—এসব ক্ষেত্রে ডেমোক্রেট ও রিপাবলিকান দুই দলের আইনপ্রণেতাদের সমর্থন পাবেন বাইডেন। অনেক বিশ্লেষকের ভাষ্য হচ্ছে, বাইডেনের চীন–নীতি বরং দুই দলের মধ্যে শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে তুলতে সহযোগিতা করছে।

যদিও সম্প্রতি সিনেটের একজন সদস্য বলেছেন, ইউক্রেনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দুই দলেরই শক্ত সমর্থন রয়েছে। রিপাবলিকান সিনেটর রব পোর্টম্যান এবং ডেমোক্রেটিক সিনেটর ক্রিস কুনস একসঙ্গে ইউক্রেন সফরে গিয়ে ভলোদিমির জেলেনস্কিকে আশ্বস্তও করে এসেছেন। ট্রাম্পের অনুগত কয়েকজন সিনেটর খারাপ ফল করায় এবং দক্ষিণ ক্যারোলিনার ন্যান্সি মেসের মতো রিপাবলিকান সিনেটর নির্বাচিত হওয়ায় কট্টরপন্থীরা তাঁদের আগের অবস্থান থেকে সরে আসতে পারেন।

মার্কিন প্রতিনিধি সভায় রিপাবলিকান সদস্যরা এখন নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে অভিবাসন ইস্যুতে বাইডেনের নীতি পরিবর্তনে কাজে লাগাতে পারেন। নির্বাচনী প্রচারণাকালে মেক্সিকো সীমান্তসহ অভিবাসন ছিল রিপাবলিকানদের প্রধান একটি ইস্যু। ইউক্রেনের তহবিল স্থগিত করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে তাঁরা বাইডেনকে মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা থেকে অভিবাসী আসার সংখ্যা কমানোর মতো সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করতে পারেন। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগের মুহূর্তে খুব নাটকীয়ভাবে বাইডেন বলেন, নতুন কংগ্রেসে তার নীতি বাস্তবায়নের জন্য রিপাবলিকানদের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করতে তিনি প্রস্তুত।

রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত প্রতিনিধিসভা বাইডেনের চীন–নীতি সমর্থন করতে পারে। চীনের প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের নেওয়া শুল্কনীতির ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে বাইডেন প্রশাসন। যদিও চীনের দিকে ট্রাম্পের মতো বুনো অভিযোগ তোলেননি বাইডেন। ক্ষমতায় থাকাকালে ট্রাম্পের অভিযোগ ছিল যুক্তরাষ্ট্রে কর্মসংস্থান (বিশেষ করে উৎপাদন শিল্পে) হারানোর জন্য চীন দায়ী। কোভিড মহামারির জন্যও তিনি বারবার চীনকে দায়ী করেছিলেন।

২০২১ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে এ পর্যন্ত বাইডেন চীনের পণ্য আমদানির ওপর শুল্কনীতি বজায় রেখে চলেছে। এ বছরের শুরুতে একটি সংবাদ সম্মেলনে বাইডেন বলেছিলেন, ২০২০ সালে বেইজিং ও ট্রাম্পের মধ্যে যে চুক্তি হয়েছিল, তার প্রথম পর্যায়ে যে প্রতিশ্রুতি চীন দিয়েছিল, তা পূরণ করেনি। চুক্তিটি চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বাণিজ্য–যুদ্ধের ক্ষেত্র স্বল্প মেয়াদে হলেও একটি স্বস্তির জায়গা তৈরি করে দিয়েছে। চুক্তির একটি শর্ত ছিল, চীন যদি মার্কিন পণ্য আমদানি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি করে, তাহলে ওয়াশিংটন শুল্কের সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করতে পারে।

চীনের প্রতি ওয়াশিংটনের কঠোর নীতির ধারাবাহিকতা, তাইওয়ানে চীনের যেকোনো আগ্রাসন রুখে দিতে বাইডেনের প্রতিশ্রুতি, হংকংয়ের গণতন্ত্রের ওপর দমনপীড়নের সমালোচনা—এসব ক্ষেত্রে ডেমোক্রেট ও রিপাবলিকান দুই দলের আইনপ্রণেতাদের সমর্থন পাবেন বাইডেন। অনেক বিশ্লেষকের ভাষ্য হচ্ছে, বাইডেনের চীন–নীতি বরং দুই দলের মধ্যে শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে তুলতে সহযোগিতা করছে।

জলবায়ু সম্মেলনে (কপ-২৭) যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তিতে অনুসমর্থন করে, তাহলে তাতে প্রতিনিধিসভার সদস্যদের অনুসমর্থন পাওয়া তার জন্য এখন কঠিন হবে। দেশের ভেতরে হোক আর বাইরে হোক পরিবেশনীতিতে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। পূর্বসূরি ডোনাল্ড ট্রাম্প প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে নিয়ে এসেছিলেন। হোয়াইট হাউসে প্রথম কর্মদিবসেই বাইডেন আবার সেই চুক্তিতে ফিরে আসেন।

জলবায়ু ও পরিবেশ ইস্যুতে রিপাবলিকান বন্ধুদের কাছে পাওয়া বাইডেনের জন্য কঠিন; যদিও বাইডেনের জলবায়ু দূত ও সাবকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি দাবি করেছেন, জলবায়ু নিয়ে আলোচনা ‘মতাদর্শিক কোনো চর্চা নয়’। জলবায়ু ইস্যুকে ভিত্তি করে যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভা বেশ কিছু আইন প্রণয়ন করেছে। কিন্তু রিপাবলিকান–নিয়ন্ত্রিত আইনসভায় জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সেসব আইন নতুন করে এগিয়ে নেওয়া কঠিন হতে পারে। রিপাবলিকানরা দাবি করেন, বাইডেনের পরিবেশনীতি একেবারে ‘গোড়া সবুজ অ্যাজেন্ডা’। রিপাবলিকানরা অঙ্গীকার করেছেন, তাঁরা আইনসভার নিয়ন্ত্রণ পেলে এটা বন্ধ করে দেবেন।

যা–ই হোক, জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে গত দুই বছরে পাস করা আইনের যে সুফল ভোগ করছে মানুষ, তাতে রিপাবলিকান–নিয়ন্ত্রিত অঙ্গরাজ্যগুলোর আইনপ্রণেতাদের কাছেই বিরোধিতার মুখে পড়তে হবে প্রতিনিধিসভার রিপাবলিকান সদস্যদের। প্রতিনিধিসভায় সামান্য ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া রিপাবলিকানরা ২০২৪ সালের নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে জলবায়ুকেন্দ্রিক কোনো আইনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিতীয়বারের মতো ভাববেন।

সবকিছু বিবেচনায় মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকানদের মধ্যে যে দুর্বলতা দেখা গেল, তাতে আগামী দুই বছর বাইডেনের বিদেশনীতি খুব অল্পই বিরোধিতার মুখে পড়বে।

  • ডাফেড টাউনলি পোর্টসমাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিষয়ে টিচিং ফেলো

    এশিয়া টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত