যেকোনো যুদ্ধে শুধু অস্ত্র নয়, সময়ও একটি বড় শক্তি। ক্যালেন্ডার অনেক সময় কামানের চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলে। উপসাগরজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের চলমান সংঘাতেও এ বাস্তবতা স্পষ্ট। এখানে তিনটি দেশ শুধু একে অপরের বিরুদ্ধে লড়ছে না, তারা লড়ছে সময়ের সঙ্গেও। প্রতিটি পক্ষের নিজস্ব রাজনৈতিক সময়সীমা আছে, আর সেই সময়সীমাই তাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে।
ওয়াশিংটনের জন্য সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতায় ফিরে এসে ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্রুত কূটনীতির পথে হাঁটার চেষ্টা করেন। যুদ্ধ নয়, দ্রুত সমঝোতা—এটাই ছিল তাঁর কৌশল। তিনি স্টিভ উইটকফকে ওমানে পাঠান এবং ৬০ দিনের একটি সময়সীমা নির্ধারণ করেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, দ্রুত ও শক্তিশালী আঘাত দিলে ইরানের নেতৃত্ব ভেঙে পড়বে। এই ধারণা নাকি ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ এবং দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মূল্যায়ন থেকেও শক্তি পেয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি।
দ্রুত ফল না আসায় যুক্তরাষ্ট্র এক দীর্ঘ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এ ধরনের যুদ্ধে সময় সাধারণত দুর্বল পক্ষের পক্ষে কাজ করে, আর এখানে সেই সুবিধা পাচ্ছে ইরান।
শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক জন মিয়ারশেইমার সরাসরি বলেন, ট্রাম্প একটি বড় ভুল করেছেন। সমস্যাটি কাঠামোগত। ইরান হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় প্রভাব বিস্তার করতে পারে। পাশাপাশি তারা উপসাগরীয় দেশ ও ইসরায়েলের প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় আঘাত হানার সক্ষমতা এখনো ধরে রেখেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে পরিষ্কার কোনো প্রস্থানপথ নেই।
এরই মধ্যে দেশের ভেতরে রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। যুদ্ধ শুরুর আগে যে তেলের দাম ছিল, তা দ্রুত বেড়ে গেছে। অপরিশোধিত তেলের দাম ৯০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে, যা যুদ্ধের আগের দিনের ৬৭ ডলারের তুলনায় অনেক বেশি। মার্চ মাসে মুদ্রাস্ফীতি দাঁড়িয়েছে বার্ষিক ৩ দশমিক ৩ শতাংশে। পেট্রলের দাম বেড়েছে ২১ দশমিক ২ শতাংশ। ভোক্তা মূল্য সূচকের মাসিক বৃদ্ধির প্রায় তিন-চতুর্থাংশই এসেছে জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে।
এই যুদ্ধে সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে সময় নিজেই। সময়কে বোমা দিয়ে ধ্বংস করা যায় না, নিষেধাজ্ঞা দিয়ে থামানো যায় না। যে পক্ষ এই বাস্তবতা বুঝতে পারবে এবং রাজনৈতিকভাবে তা মোকাবিলা করতে পারবে, তারাই যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি নির্ধারণ করবে।
ট্রাম্পের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় জনসমর্থন নেমে এসেছে ২৯ শতাংশে, যা তাঁর জন্য সর্বনিম্ন। এমনকি রিপাবলিকানদের ৪০ শতাংশও এখন তাঁর মুদ্রাস্ফীতি মোকাবিলার সক্ষমতা নিয়ে অসন্তুষ্ট। মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে। হাতে সময় কম। যুদ্ধ যদি দ্রুত শেষ না হয়, তবে ভোটারদের ক্ষোভ আরও বাড়বে। যে নেতা দ্রব্যমূল্য কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তাঁর সময়েই বড় জ্বালানিসংকট তৈরি হয়েছে—এ বাস্তবতা এখন তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করছে।
তেহরানের হিসাব একেবারে ভিন্ন। তাদের কৌশল দ্রুত জয় নয়; বরং টিকে থাকা। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধে ইরান বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি নিহত হয়েছেন। উচ্চপর্যায়ের সামরিক কর্মকর্তারা মারা গেছেন। পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অর্থনীতিও বড় ধাক্কা খেয়েছে। তবু রাষ্ট্র ভেঙে পড়েনি।
মিয়ারশেইমারের মতে, ইরানের বিশাল ভূখণ্ড এবং ছড়িয়ে থাকা সামরিক স্থাপনাগুলোর কারণে দ্রুত আঘাতে তাদের পুরোপুরি দুর্বল করা কঠিন। দীর্ঘমেয়াদি হামলাতেও তাদের সামরিক সক্ষমতা সম্পূর্ণ ভেঙে দেওয়া সহজ নয়। তাদের কাছে এখনো ক্ষেপণাস্ত্রশক্তি রয়েছে। পাশাপাশি আঞ্চলিক মিত্রদের একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্কও আছে, যা তাদের দীর্ঘ সময় ধরে লড়াই চালিয়ে যেতে সাহায্য করছে।
আরেক বিশ্লেষক জেফরি ডি স্যাক্স এই যুদ্ধকে শুরু থেকেই কৌশলগতভাবে ভুল বলে মনে করেন। তাঁর মতে, ট্রাম্প আগের পারমাণবিক চুক্তি ভেঙে দেন, যা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করেছিল। এরপর এমন এক ধর্মীয় নেতাকে হত্যা করা হয়, যিনি দীর্ঘদিন ধরে পারমাণবিক অস্ত্রকে ইসলামবিরোধী বলে ঘোষণা করে আসছিলেন। এর ফলেই আজকের এই আঞ্চলিক সংঘাত তৈরি হয়েছে।
ইরানের অবস্থা যেন জ্বলন্ত কয়লা হাতে ধরে থাকার মতো। যন্ত্রণা অসহনীয়, কিন্তু হাত ছেড়ে দিলে সব হারাতে হবে। তাই তারা সহ্য করছে। তাদের লক্ষ্য একটাই—সময় পার করা। যত দিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ বাড়বে, ততই ইরানের অবস্থান শক্তিশালী হবে। তেলের দাম যদি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে ১৫০ ডলারের দিকে যায়, তবে ট্রাম্পের সমঝোতার ক্ষমতা আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
এ প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালি একটি বড় ঝুঁকির জায়গা। বিশ্বের মোট তেল–বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথে হয়। তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ৩০ শতাংশও এখান দিয়ে পরিবাহিত হয়। এটি বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ব অর্থনীতিতে নজিরবিহীন জ্বালানিসংকট তৈরি হবে।
তেল আবিবের অবস্থান আবার সম্পূর্ণ আলাদা। নেতানিয়াহুর জন্য যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়াই রাজনৈতিকভাবে লাভজনক। দেশে তাঁর বিরুদ্ধে আইনি মামলা চলছে। সামনে নির্বাচনও আছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি তাঁকে রাজনৈতিক সুরক্ষা দেয়। এতে সমালোচকেরা পিছিয়ে যায়, জনমত একত্র হয়।
এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি হলেও ইসরায়েল স্পষ্ট করে দিয়েছে, তা লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করে না। অর্থাৎ সংঘাত অন্য জায়গায় চলতেই পারে।
ইসরায়েলের বিশ্লেষক গিডিয়ন লেভি বহুদিন ধরে বলে আসছেন, সেখানে যুদ্ধ একটি স্থায়ী রাজনৈতিক প্রবণতা। এটি শুধু কৌশল নয়; বরং একটি মানসিকতা। সেখানে কূটনীতির চেয়ে সামরিক সমাধানকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে জনমতও যুদ্ধের পক্ষেই রয়েছে।
সাবেক শান্তি আলোচক দানিয়েল লেভি মনে করেন, নেতানিয়াহুর লক্ষ্য আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তার করা। তাঁর কৌশল হলো সুযোগ থাকতেই শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করা। প্রয়োজনে এতে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন কমে গেলেও তিনি সেই পথেই এগোতে প্রস্তুত।
সব মিলিয়ে এই যুদ্ধে তিনটি ঘড়ি তিন দিকে চলছে। ট্রাম্প দ্রুত সমাধান চান। ইরান সময় টেনে নিতে চায়। আর নেতানিয়াহু চান যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হোক। এই ভিন্ন ভিন্ন সময়চাপই সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলছে।
শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধে সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে সময় নিজেই। সময়কে বোমা দিয়ে ধ্বংস করা যায় না, নিষেধাজ্ঞা দিয়ে থামানো যায় না। যে পক্ষ এই বাস্তবতা বুঝতে পারবে এবং রাজনৈতিকভাবে তা মোকাবিলা করতে পারবে, তারাই যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি নির্ধারণ করবে।
জাসিম আল-আজ্জাভি সংবাদ উপস্থাপক, অনুষ্ঠান সঞ্চালক ও মিডিয়া প্রশিক্ষক। তিনি আল–জাজিরাতে ‘ইনসাইড ইরাক’ নামে একটি সাপ্তাহিক অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করতেন।
আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ