আনারকলি ইস্যুতে শাহজাদা সেলিমের সঙ্গে সম্রাট আকবরের বিরাট ঝামেলা বাধল। বাপ-বেটার বাদশাহি ইগোর কারণে সেই ঝামেলা যুদ্ধে গড়াল। সম্রাট যুদ্ধের সাজ পরলেন। যুদ্ধে যাতে জয় হয়, সে জন্য রাজমহলের রেওয়াজমতো রাজমৌলভি এলেন। আরও এলেন হিন্দু রাজপুরোহিত।
দ্বীন-ই-ইলাহি নামের এক অদ্ভুত ‘ধর্ম’ চালু করা সম্রাট আকবরের বাহুতে মৌলভি সাহেব তাবিজ বেঁধে দিলেন। চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে দোয়া করলেন। তারপর ফুঁ দিলেন।
এবার রাজপুরোহিত ধান-দূর্বা, ধূপ-ধুনোসহ যাবতীয় নৈবেদ্যভরা পূজার থালা সামনে ধরলেন। তারপর সম্রাটের জয় কামনায় তাঁর কপালে চন্দনের তিলক এঁকে দিলেন।
বিড়বিড় করে ‘মহাবলী’র সুরক্ষার জন্য প্রার্থনা করলেন।
কে আসিফের পরিচালনায় পৃথ্বীরাজ কাপুরের চোখজুড়ানো অভিনয়ে এই দৃশ্য পঞ্চাশের দশকের বলিউড ক্ল্যাসিক ‘মুঘল-এ-আজম’-এ উঠে এসেছিল।
ইতিহাস বলছে, সম্রাট আকবর আর শাহজাদা সেলিমের মধ্যে এ ধরনের কোনো যুদ্ধ আদতে কোনো দিন হয়ওনি, আর যুদ্ধে জেতার জন্য মৌলভি-পুরুত ডেকে মোগল রাজাধিরাজের মাথায় ঝাড়ফুঁক নেওয়ারও দরকার হয়নি।
সিনেমায় আমরা বাপ-বেটার যে যুদ্ধ দেখি, সেটি আসলে কাহিনিকারের সিনেম্যাটিক কল্পনা।
‘জিল্লে ইলাহি’ বা ‘ঈশ্বরের প্রতিভূ’ উপাধি ধারণ করা রাজাধিরাজ জালালুদ্দিন মুহম্মদ আকবর ষোড়শ শতকের দুনিয়ায় দাঁড়িয়ে মৌলভি-পুরুত ডেকে তাবিজ-কবচ আর ফুঁ-ফাক্কা নেওয়ার তোয়াক্কা না করলেও আজকের এই একুশ শতকের দুনিয়ার ‘রাজাধিরাজ’ ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষেত্রে ভিন্ন ঘটনা দেখা যাচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি আর ইসরায়েলের বিভিন্ন শহরে যখন ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সমানে পাল্টা মার দিচ্ছিল, ঠিক সে সময় ৫ মার্চ বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে ট্রাম্পকে আমরা মুঘল-এ-আজম–এর সেই দৃশ্যের অবতারণা করতে দেখেছি।
ভারতের লোকসভা নির্বাচনের আগে আগে ‘মহর্ষি’ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যেভাবে বিভিন্ন তীর্থস্থানে গিয়ে শ খানেক ক্যামেরা ফিট করে ‘রাজনৈতিক ধ্যানে’ বসেন, অনেকটা সেই কায়দায় দেখা গেছে, ওভাল অফিসের রিজোল্যুট ডেস্কে ধ্যানী ভঙিমায় ঝিম মেরে বসে আছেন ট্রাম্প। তাঁর পেছনে লাইন ধরে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে আছেন ২০ জন লোক। তাঁদের কয়েকজন ট্রাম্পের কাঁধে ও পিঠে আলতো করে হাত রেখেছেন। বাকিরাও সামনে বাহু মেলে ধরে হাতের তালু উবু করে স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে আছেন।
ভূতের রাজার বর পাওয়া গুপী গাইন বাঘা বাইন গান শুরু করলে যেমন কেউ নড়নচড়ন করতে পারে না, তেমনিভাবে সারা ঘরের সবাই স্থির হয়ে আছেন। তাঁদের মধ্যে একজন অল্প আওয়াজ করে ধীরে ধীরে প্রার্থনার ভঙ্গিতে কিছু বলছেন; আর বাকিরা সেই কথাগুলো সমস্বরে প্রতিধ্বনি করছেন।
ভিডিওতে যাঁদের দেখা গেছে, তাঁরা সবাই ধর্মযাজক ও ধর্মীয় নেতা। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন প্যাস্টর পদমর্যাদার যাজক। বাকিরা কট্টরপন্থী বর্ণবাদী ইভানজেলিক্যাল ধর্মগুরু।
আমাদের এখানে গ্রামগঞ্জে যে কায়দায় ‘বাণ মারা-বাণ ফিরানো’ ফকির-ওঝা ডেকে গেরস্তের বালামসিবত দূর করা হয় কিংবা কপালের ‘ফাঁড়া’ কাটানো হয়, অনেকটা সেই কায়দায় ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধজনিত ফাড়া কাটানোর জন্য এই বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়।
দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকার প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, হোয়াইট হাউসের ‘ফেইথ অফিস’-এর প্রধান (যিনি কিনা দীর্ঘ সময় ধরে ট্রাম্পের আধ্যাত্মিক পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন) নারী প্যাস্টর পলা হোয়াইট উদ্যোগ নিয়ে এই যাজকদের জড়ো করেছিলেন।
তাঁদের মধ্যে ছিলেন ক্রাইস্ট ফেলোশিপ চার্চের প্রতিষ্ঠাতা প্যাস্টর টম মিউলিন্স, ক্যালিফোর্নিয়ার মেগা চার্চের প্যাস্টর গ্রেগ লরি, প্যাস্টর জেন্টেজেন ফ্র্যাঙ্কলিন ও ইভানজেলিক্যাল নেতা জনি মুরের মতো ধর্মীয় নেতারা। তাঁরা মোটেও যেনতেন ধরনের ধর্মীয় নেতা না। আমেরিকার রাজনীতিতে তাঁরা সাংঘাতিক প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর।
ভিডিওতে দেখা যায়, প্যাস্টর টম মিউলিন্স ‘যথাযথ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য’ মাখানো গলায় ঈশ্বরকে উদ্দেশ করে বলতে থাকেন, ‘আমরা প্রার্থনা করি, আপনার আশীর্বাদ ও কৃপা তাঁর (ট্রাম্পের) ওপর বর্ষিত হোক। আমরা প্রার্থনা করি, স্বর্গীয় জ্ঞান তাঁর হৃদয় ও মনকে দিকনির্দেশনা দিক, যেন আপনি এই চ্যালেঞ্জিং সময়ে তাঁর পথপ্রদর্শক হন। প্রার্থনা করি, আপনার অনুগ্রহ ও সুরক্ষা তাঁর ওপর বর্ষিত হোক…এবং আমাদের সৈন্যদের ওপরও বর্ষিত হোক। পিতা, আমরা প্রার্থনা করি, আপনি আমাদের প্রেসিডেন্টকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি দিন।...আমরা প্রার্থনা করি, যিশুর নামে আপনার স্বর্গীয় আশীর্বাদ তাঁর ওপর বর্ষিত হোক।’ মিউলিন্সের সঙ্গে বাকিরাও এই প্রার্থনাবাক্য স্তোত্রপাঠের মতো করে আবৃত্তি করেন।
যুদ্ধে জয় পাওয়ার জন্য আমেরিকার কোনো প্রেসিডেন্ট কস্মিনকালে হোয়াইট হাউসে এ ধরনের সম্মিলিত প্রার্থনার আয়োজন করেননি; কিন্তু ট্রাম্প করেছেন।
শুধু তা-ই নয়, সেই দৃশ্য যাতে সবাই দেখতে পারেন, সে জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ভিডিও ছড়ানোর ব্যবস্থাও করেছেন।
ট্রাম্পের ‘সাদাবাড়ি’র প্রার্থনাসভার তিন দিন পর, অর্থাৎ ৮ মার্চ তাঁর প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাম যুদ্ধমন্ত্রী পিট হেগসেথ সিবিএস নিউজের ‘সিক্সটি মিনিটস’ অনুষ্ঠানে আসেন।
সেখানে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইরান যুদ্ধে ঈশ্বর আমেরিকার সঙ্গে আছেন। তিনি বলেন, ‘আমেরিকার সংকল্প নিয়ে ইরানের সন্দেহ থাকা ঠিক হবে না। কারণ, আমেরিকার পেছনে মহাশক্তির সমর্থন আছে।...সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের প্রভিডেন্স আমাদের সৈন্যদের রক্ষা করছে।’
সিবিএসের সাংবাদিক মেজর গ্যারেট তখন হেগসেথের কাছে জানতে চান, তিনি কি এই যুদ্ধকে ধর্মীয় যুদ্ধ হিসেবে দেখছেন?
জবাবে হেগসেথ বলেন, ‘দেখুন, আমরা সোজাসুজিই বলেছি, আমরা এমন একটা ধর্মীয় উগ্রবাদীদের বিরুদ্ধে লড়ছি, যারা একটি ধর্মীয় “আর্মাগেডন” (বাইবেলের ভবিষ্যদ্বাণীতে উল্লেখ করা পৃথিবীর শেষ মহাযুদ্ধ) ঘটানোর লক্ষ্যে পরমাণু বোমা বানানোর চেষ্টায় আছে।’
হেগসেথ আরও বলেন, এই যুদ্ধে আমেরিকান সেনাদের সঙ্গে ‘সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের সংযোগ থাকা দরকার।’
এর দুই দিন পর, অর্থাৎ ১০ মার্চ ইরান যুদ্ধে নিহত হওয়া সেনাদের মরদেহ গ্রহণের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে পেন্টাগনে সংবাদ সম্মেলনে হেগসেথ বাইবেলের বুক অব সালমস্-এর ১৪৪ নম্বর গীতসংহিতা উদ্ধৃত করেন। সেখানে বলা আছে, ‘ধন্য সেই প্রভু, যিনি আমার অজেয় শিলা; যিনি যুদ্ধের জন্য আমার হাতকে এবং যুদ্ধকৌশলের জন্য আমার আঙুলকে প্রশিক্ষণ দেন।’
‘গ্রেটার ইসরায়েল’ বানাতে ধর্মযুদ্ধ?
গত ২০ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি বিখ্যাত মার্কিন টিভি উপস্থাপক টাকার কার্লসনের সঙ্গে পডকাস্ট আলাপচারিতায় বসেছিলেন। সেখানে এক পর্যায়ে হাকাবি বলে ফেলেন, ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যের সবটা নিয়ে নিলে ভালোই হয়; কারণ এই ভূমির প্রতিশ্রুতি তিন হাজার বছর আগেই ঈশ্বর তাঁদের দিয়ে রেখেছেন।
এ সময় উপস্থাপক কার্লসন ওল্ড টেস্টামেন্ট বা পুরাতন বাইবেলের জেনেসিস ১৫: ১৮ শ্লোক উল্লেখ করেন।
ওই শ্লোকে ঈশ্বর আব্রাহামকে (ইসলামে যিনি হজরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম) প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ‘তোমার বংশধরদের জন্য আমি নীল নদ থেকে বড় ইউফ্রেটিস নদী পর্যন্ত বিস্তৃত এই ভূমি দিয়েছি।’
কার্লসন এরপর হাকাবিকে বলেন, ‘লেভান্ট অঞ্চল অর্থাৎ ইসরায়েল, জর্ডান, সিরিয়া ও লেবাননের পাশাপাশি সৌদি আরব ও ইরাকের বড় অংশও ওই প্রতিশ্রুত এলাকার মধ্যে পড়ে যাবে।’
জবাবে হাকাবি বলেন, ‘এটা ঠিক, এতটা বড় হবে কি না, আমি নিশ্চিত নই; তবে এটা নিঃসন্দেহে একটি বড় ভূখণ্ড।’ তিনি বলেন, ‘ইসরায়েল এমন একটি ভূমি, যা ঈশ্বর আব্রাহামের মাধ্যমে তাঁর নির্বাচিত একটি জাতিকে দিয়েছেন।’
এরপর কার্লসন সরাসরি প্রশ্ন করেন, ‘ইসরায়েলের কি সেই পুরো ভূখণ্ডের ওপর অধিকার আছে?’ উত্তরে হাকাবি বলেন, ‘তারা সবটা নিতে পারলে তো ভালোই।’
অর্থাৎ ইসরায়েলে নিযুক্ত এই যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মনে করেন, পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে ইসরায়েলের গিলে ফেলার সম্পূর্ণ অধিকার আছে। আর সেই পথে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে তাঁরা আপাতত ইরানকেই দেখছেন।
ইসরায়েলের নেতারা বহু আগে থেকেই খোলাখুলি বলে আসছেন, তাঁরা শুধু ইহজাগতিক রাজনৈতিক মোক্ষলাভের জন্য রাজনীতি করেন না। ঈশ্বর তাঁদের যে ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’-এর প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছেন, তা প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনীতি করেন এবং যুদ্ধ করেন।
এই ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা যে কতখানি প্রবল, তা ২০২৪ সালে গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর গণহত্যা চালানোর সময় ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্সের (আইডিএফ) সেনাদের খাকি পোশাকে সেঁটে দেওয়া সামরিক ব্যাজের দিকে খেয়াল করলে বোঝা যাবে।
মিডল ইস্ট মনিটর-এর এক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ওই সময় আইডিএফের সেনাদের পোশাকে লাগানো ব্যাজে ইসরায়েলের পতাকার ছবির নিচে স্পষ্ট করে তাদের স্বপ্নের ‘গ্রেটার ইসরায়েল’–এর ম্যাপ আঁকা ছিল।
এটি আরব দেশগুলোর মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করেছিল। ওই সময় সরকারিভাবে আইডিএফ সদস্যদের বলে দেওয়া হয়, তাঁদের ধর্মগ্রন্থে যে মসিহ বা ত্রাতা আসবেন বলে ভবিষ্যদ্বাণী করা আছে, সেই মসিহর আগমনের প্রেক্ষাপট ও প্রতিবেশ তৈরির জন্যই তাঁরা এই যুদ্ধ করছেন।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ১৩ মার্চ শুক্রবার দেওয়া ভাষণে (যদিও এই ভাষণ আদৌ নেতানিয়াহু দিয়েছেন, নাকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বানানো ভিডিও প্রচার করা হয়েছে, তা নিয়ে এখন প্রবল সন্দেহ দেখা দিয়েছে। গুঞ্জন রটেছে, নেতানিয়াহু ইতিমধ্যে নিহত বা গুরুতর আহত হয়েছেন) বলেছেন, ‘আমরা সেই রাজ্য প্রতিষ্ঠা করব এবং মসিহর আসা নিশ্চিত করব।’
অর্থাৎ ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু এবং তাঁদের সরকারের একেবারে মাথার দিকের নেতাদের কথাবার্তা শুনলে এবং তাঁদের কাজকারবার দেখলে বোঝা যাবে, ইরান যুদ্ধকে তাঁরা নেহাত রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের ঝগড়াঝাঁটি কিংবা সামরিকভাবে একে অন্যকে দেখে নেওয়ার বিষয় হিসেবে দেখছেন না; বরং তাঁরা পুরো পরিস্থিতিকে একটি বাইবেলীয় ভবিষ্যদ্বাণীর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন এবং সেই মনোভঙ্গি থেকেই মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে রাজনৈতিক ও সামরিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
তাঁদের অনেকেই ইতিমধ্যে বলে ফেলেছেন, ওল্ড টেস্টামেন্টে ‘আর্মাগেডন’ বা ‘চূড়ান্ত যুদ্ধের’ (ইসলামের পরিভাষায় যাকে বলা হয় ‘মালহামাতুল কুবরা’ বা কিয়ামতের পূর্বে সংঘটিতব্য মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী মহাযুদ্ধ) প্রেক্ষাপট ইরান যুদ্ধের মধ্য দিয়েই সূচিত হতে যাচ্ছে।
ব্রিটিশ পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ান–এর খবরে বলা হয়েছে, ইউএস মিলিটারি রিলিজিয়াস ফ্রিডম ফাউন্ডেশন (এমআরএফএফ) ইতিমধ্যে ২০০–এর বেশি অভিযোগ পেয়েছে, যাতে বলা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর কিছু কমান্ডার তাঁদের অধীন ব্যক্তিদের বলছেন—যিশুখ্রিষ্ট ট্রাম্পকে ইরানে হামলার নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ, যিশু পৃথিবীতে ফিরে আসছেন এবং বাইবেলে যে আর্মাগেডনের কথা বলা হয়েছে, এটিই সেই যুদ্ধ। ১৫ জন মার্কিন সেনাসদস্য যৌথভাবে এমন একটি লিখিত অভিযোগ পাঠিয়েছেন। ওই সেনাসদস্যদের মধ্যে ১১ জন খ্রিষ্টান, একজন মুসলিম ও একজন ইহুদি সেনাসদস্য রয়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে যুগ যুগ ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এক সুরে গান গেয়ে আসছে। এর ‘শিকড়-কারণ’ খুঁজতে গেলে ট্রাম্প শিবির ও নেতানিয়াহু শিবির যে ধর্মীয় বয়ান বা ভাষ্যকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সামনে আনছেন, সেদিকে খেয়াল করতে হবে।
আর তারও আগে এই নেতাদের এবং তাঁদের পাত্র-মিত্র, আমির-ওমরাহ, সেপাই-সান্ত্রির ব্যক্তিগত ধর্মীয় ও দর্শনগত অবস্থানের দিকে ভালো করে নজর বুলাতে হবে।
ট্রাম্প ঈশ্বরের মনোনীত মসিহ!
রেকর্ডপত্র বলছে, ট্রাম্প নিজেকে ধর্মপ্রাণ খ্রিষ্টান হিসেবে পরিচয় দিলেও ধর্মকর্মে কোনোকালেই তেমন একটা সময় দেননি। তাঁর মা মেরি অ্যানি ট্রাম্প ছিলেন প্রেসবিটারিয়ান খ্রিষ্টান।
প্রেসবিটারিয়ান হলো প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিষ্টধর্মের একটি শাখা। ‘প্রেসবিটারিয়ান’ শব্দটি এসেছে গ্রিক ‘প্রেসবাইটেরোস’ শব্দ থেকে, যার অর্থ ‘মুরব্বি’ বা ‘জ্যেষ্ঠ নেতা’। এই মতবাদে গির্জা পরিচালনা করেন নির্বাচিত প্রবীণ সদস্যরা; শুধু একজন পুরোহিত নন। প্রেসবিটারিয়ান গির্জায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় একটি পরিষদের মাধ্যমে। সেখানে থাকে প্যাস্টর (ধর্মযাজক) ও এল্ডার বা প্রবীণ সদস্য। তাঁরা মিলেই গির্জা পরিচালনা করেন। অর্থাৎ এটি একধরনের সমষ্টিগত নেতৃত্ব।
ট্রাম্প ছোটবেলায় নিউইয়র্কের একটি প্রেসবিটারিয়ান চার্চে মাঝেমধ্যে যেতেন। তিনি নিজেকে দীর্ঘদিন এই মতাদর্শের অনুসারী বলে পরিচয়ও দিয়েছেন। তবে ২০২০ সালের দিকে তিনি ঘোষণা দেন, তিনি এখন থেকে ‘নন-ডিনোমিনেশনাল খ্রিষ্টান’। অর্থাৎ তিনি হলেন সেই খ্রিষ্টান, যিনি নির্দিষ্ট কোনো গির্জা বা সম্প্রদায়ের সঙ্গে নিজেকে আর বাঁধেন না।
ট্রাম্প গির্জায় গেলেও কখনোই নিয়মিত যাননি। একাধিক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, তিনি সাধারণত ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা চান না; কারণ তিনি মনে করেন, তিনি কোনো পাপকাজ করেন না; বরং ভালো ভালো কাজ করার চেষ্টা করেন।
ট্রাম্পের ধর্মীয় বিশ্বাস অনেকটা সাংস্কৃতিক খ্রিষ্টান পরিচয়ের ওপর দাঁড়িয়ে। অর্থাৎ তাঁর ধর্মীয় পরিচয় ব্যক্তিগত ধার্মিকতার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে বেশি যুক্ত।
ট্রাম্প বলে থাকেন, নির্দিষ্ট কোনো গির্জা বা সম্প্রদায়ের সঙ্গে তিনি নিজেকে বাঁধেন না। আদতে তা কিন্তু নয়; আদতে ইভানজেলিক্যাল খ্রিষ্টানদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ।
এর কারণ হলো আজকে ট্রাম্পের যে রাজনৈতিক শক্তিমত্তা দেখা যাচ্ছে, তার আসল খুঁটিই হলো ইভানজেলিক্যাল ক্রিশ্চিয়ানিটি। প্রতিটি নির্বাচনে তিনি শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী ইভানজেলিক্যালদের বিপুল সমর্থন পান।
এই ইভানজেলিক্যালদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে যে কয়জন ধর্মীয় নেতা বড় ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের মধ্যে প্রধান ব্যক্তি হলেন ট্রাম্পের আধ্যাত্মিক উপদেষ্টা পলা হোয়াইট (ইনিই ইরান যুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য ট্রাম্পের সমর্থনে হোয়াইট হাউসে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করেছেন)।
পলা হোয়াইট বহুবার জনসমক্ষে ট্রাম্পকে ‘ঈশ্বরের মনোনীত’ নেতা বলেছেন। অর্থাৎ ট্রাম্পকে খ্রিষ্টধর্মের মানুষের কাছে এমনভাবে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন, যিনি কিনা সম্রাট আকবরের মতো ‘জিল্লে ইলাহি’ বা ‘ঈশ্বরের প্রতিভূ’ তথা সব ধরনের সমালোচনার ঊর্ধ্বে থাকা একজন ‘সর্বদোষমুক্ত’ মানুষ।
ট্রাম্পকে ঐশ্বরিক মহিমায় মহিমান্বিত করা আরেকজন হলেন খ্রিষ্টান জায়নবাদী নেতা জন হ্যাগি। হ্যাগি বলেছেন, তিনি মনে করেন, যিশুর পুনরাগমন ঘটাতে যেসব পর্ব পার হতে হবে, তাকে ট্রাম্প ত্বরান্বিত করছেন। এই লাইনেরই আরেকজন হলেন ইভানজেলিক্যাল প্রচারক ফ্রাঙ্কলিন গ্রাহাম।
এদের প্রায় সবাই ইসরায়েলপন্থী এবং ইভানজেলিক্যাল খ্রিষ্টান। তাঁরা কখনো ট্রাম্পকে ‘ঈশ্বরের নির্বাচিত মসিহ’ আবার কখনো ‘ঈশ্বরের পরিকল্পনার অংশ’ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
ইরান যুদ্ধে জেতার জন্য ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে যে প্রার্থনাসভা বসালেন, সেটিকে ইভানজেলিক্যাল ভোটব্যাংককে সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে। কারণ, আমেরিকায় ইভানজেলিক্যাল খ্রিষ্টানরা একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক গোষ্ঠী।
যেহেতু ট্রাম্প নির্বাচনে এই গোষ্ঠীর বড় অংশের সমর্থন পেয়েছিলেন, তাই বড় নীতিগত সিদ্ধান্তের সময় তাঁদের ধর্মীয় নেতাদের উপস্থিতি দেখানো রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। এতে তাঁরা বুঝতে পারেন, ট্রাম্প তাঁদের মূল্যবোধকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
ইভানজেলিক্যাল ব্যক্তিদের মধ্যে যাঁরা যুদ্ধকে নৈতিক বা ধর্মীয় বৈধতা দিয়ে থাকেন, তাঁরা বিশ্বাস করেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বাইবেলের ভবিষ্যদ্বাণীর সঙ্গে যুক্ত। তাই ট্রাম্পের প্রার্থনা সভাটি যুদ্ধকে ‘ঈশ্বরের নির্দেশনা অনুসারে নেওয়া সিদ্ধান্ত’ হিসেবে উপস্থাপন করার প্রতীকী উপায় হিসেবে দেখাতে চেয়ে থাকতে পারে।
আবার ট্রাম্প তাঁর ব্যক্তিগত ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রদর্শন হিসেবে এই প্রার্থনাসভার আয়োজন করে থাকতে পারেন। মার্কিন প্রেসিডেন্টরা সাধারণত বড় ধরনের সংকটের সময় ‘গড ব্লেস আমেরিকা’ টাইপের ধর্মীয় ভাষা ব্যবহার করেন।
এতে সাধারণ মানুষের কাছে প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তকে নৈতিক বা আধ্যাত্মিক দায়িত্ব হিসেবে তুলে ধরা সহজ হয়। সেই সাইকোলজিক্যাল পজিশন থেকে ট্রাম্প এটি করে থাকতে পারেন।
ট্রাম্প বরাবরই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মীয় আবেগ ব্যবহার করার ব্যাপারে খুব কামেল লোক। তিনি জানেন, এতে ধর্মীয় ভোটারদের মধ্যে ‘ঈশ্বরনির্দেশিত নেতৃত্বের’ ধারণা পোক্ত হয়।
পিট হেগসেথ ‘আমেরিকান ক্রুসেড’-এর প্রবক্তা!
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী হলেও নিজেকে যুদ্ধমন্ত্রী পরিচয় দিতে বেশি পছন্দ করা পিট হেগসেথ একজন উগ্র ইসলামবিদ্বেষী এবং বামপন্থাবিদ্বেষী হিসেবে পরিচিত। তিনি ইসলাম এবং বামপন্থার বিরুদ্ধে ধর্মযুদ্ধ বা ক্রুসেডে নামার তত্ত্ব প্রচার করে আসছেন অনেক আগে থেকেই।
২০২০ সালের ১৯ মে হেগসেথের লেখা আমেরিকান ক্রুসেড: আওয়ার ফাইট টু স্টে ফ্রি নামের ৩৫২ পৃষ্ঠার একটি বই প্রকাশিত হয়েছে। ওই বইয়ে তিনি বামপন্থা এবং ইসলামকে আমেরিকাসহ পশ্চিমা দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার পক্ষে বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরেছেন।
বামপন্থীদের বিষয়ে বইটিতে হেগসেথ লিখেছেন, ‘বামপন্থীরা শেষ আঘাত হানার জন্য প্রস্তুত হয়ে সব দিক থেকে ঐতিহ্যবাহী আমেরিকান দেশপ্রেমীদের ঘিরে ফেলেছে। তারা আমাদের রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতাদের হত্যা করছে, আমাদের পতাকাকে হত্যা করছে এবং পুঁজিবাদকে হত্যা করছে।’
হেগসেথ বইটিতে লিখেছেন, ‘ইসলাম শান্তির ধর্ম নয়; এবং কখনোই ছিল না।’ তিনি দাবি করেন, ইসলামপন্থীরা জনসংখ্যাগত, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক উপায়ে ইউরোপ ও আমেরিকাকে ‘জয়’ করার পরিকল্পনা করছে এবং এই লক্ষ্যে তারা ধর্মনিরপেক্ষতার সঙ্গে একধরনের জোট গড়ে তুলে ‘আমাদের জাতির ইহুদি-খ্রিষ্টান প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস’ করতে চায়।
হেগসেথ লিখেছেন, ‘ইসলামপন্থীরা পশ্চিমে যত বেশি সম্ভব মুসলমান বসতি স্থাপন করাতে চায়। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর তুলনায় এই মুসলমানদের জন্মহার বেশি এবং তাদের সংস্কৃতি কৌশলগতভাবে অপেক্ষাকৃত অন্তর্মুখী; ফলে সেই অভিবাসী ও শরণার্থীদের ছেলেমেয়েরা স্থানীয় নাগরিকদের তুলনায় বেশি সংখ্যায় বৃদ্ধি পায়।’
হেগসেথ যুক্তরাজ্যে মুসলিম বংশোদ্ভূত জনপ্রতিনিধিদের নির্বাচিত হওয়ার বিষয় মনে করিয়ে দিয়ে সতর্ক করেন, এখনই ব্যবস্থা না নিলে যুক্তরাষ্ট্রও একই পথে এগোতে পারে।
বইয়ে হেগসেথ লিখেছেন, ‘প্রায় প্রতিটি মুসলিম শিশুই কোরআন শুনে বড় হয় এবং কোরআন পড়তে শেখে। এটিকে আমাদের ধর্মনিরপেক্ষ আমেরিকান স্কুলগুলোর সঙ্গে তুলনা করুন—যেখানে বাইবেলের কোনো স্থান নেই। তখন আপনি বুঝতে পারবেন, কেন মুসলমানদের বিশ্বদৃষ্টি আমাদের চেয়ে বেশি সুসংবদ্ধ।’
একাদশ শতকে পোপ দ্বিতীয় আরবান ও ক্যাথলিক চার্চের ডাকে ইসলামের বিরুদ্ধে যে রক্তক্ষয়ী ধর্মযুদ্ধ বা ক্রুসেড হয়েছিল, হেগসেথ তাঁর আমেরিকান ক্রুসেড বইয়ে তার অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছেন।
হেগসেথ লিখেছেন, ‘পোপ, ক্যাথলিক চার্চ এবং ইউরোপের খ্রিষ্টানরা যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এর মধ্য দিয়ে ক্রুসেডের জন্ম হয়েছিল। পোপ দ্বিতীয় আরবান ঈশ্বর-বিশ্বাসীদের প্রতি মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে বলেছিলেন যে বিখ্যাত রণহুংকার দিয়ে, তা হলো “ডিউস ভুল্ট!” অর্থাৎ “ঈশ্বর এটাই চান!”’
বইয়ের এক জায়গায় হেগসেথ পাঠককে উদ্দেশ করে লিখেছেন, ‘আপনি কি পশ্চিমা সভ্যতা উপভোগ করছেন? স্বাধীনতা? আইনের অধীনে সমান বিচার? যদি এসব উপভোগ করে থাকেন, তাহলে একজন ক্রুসেডারকে ধন্যবাদ দিন।’
তিনি লিখেছেন, ‘আমরা যুদ্ধ করতে চাই না; কিন্তু প্রয়োজন হলে হাজার বছর আগেকার খ্রিষ্টান পূর্বসূরিদের মতো আমাদেরও যুদ্ধ করতে হবে।’
ট্যাটু–কাহিনি
তরুণ বয়সে সেনাসদস্য হিসেবে ইরাক যুদ্ধে অংশ নেওয়া এবং তারপর কুখ্যাত গুয়ানতানামো বন্দিশিবিরে কারারক্ষীর দায়িত্ব পালন করার পর হেগসেথ ফক্স নিউজে হোস্ট হিসেবে কাজ করেছেন। পরে ট্রাম্পের ‘মাগা’ শিবিরে ভিড়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হন।
ট্রাম্পের প্রতিরক্ষামন্ত্রী এই হেগসেথের সারা গায়ে ট্যাটু। পশ্চিমা দুনিয়ায় শরীরে ট্যাটু করা বা উলকি আঁকা খুবই সাধারণ ব্যাপার; কিন্তু হেগসেথের গায়ে যেসব উলকি আঁকা, তা গা শিউরে ওঠার মতো।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে হেগসেথের নিজের ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করা ছবিতে দেখা গেছে, তাঁর বুক, পিঠ ও বাহুতে নানা ধরনের ধর্মীয় শব্দ ও প্রতীকের উলকি। তাঁর হাতের একটি ট্যাটুতে আরবি হরফে বড় করে লেখা ‘কাফের’।
যে মুহূর্তে ফিলিস্তিনের বায়তুল মুকাদ্দাস নিয়ে উত্তেজনা চলছিল; যে মুহূর্তে গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েল লাগাতার বোমা হামলা চালিয়ে নজিরবিহীন গণহত্যা চালাচ্ছিল; যে সময় ইসরায়েলের এই কাজে আমেরিকা অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করছিল; সেই মুহূর্তে ঠিক সেই সময় নিজের লেখা বইয়ে ইসলাম ও মুসলমান সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণের প্রয়োজনীয়তা প্রচার করা মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ এ ধরনের ট্যাটু আঁকা শরীর প্রদর্শন করায় মুসলমানদের মধ্যে নীরব আতঙ্ক তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের যুদ্ধমন্ত্রীর শরীরে ‘কাফের’ খচিত ট্যাটু দেখার পর মুসলমান সম্প্রদায়ের হকচকিয়ে যাওয়ারই কথা।
এসব দেখে শেষ জমানার শয়তান শাসক দাজ্জালের কপালে ‘কাফের’ লেখা থাকবে—হাদিসের এই ভাষ্য মুসলিম সমাজের কোনো না কোনো স্তরে আলোচ্য বিষয় হয়ে ওঠাও অস্বাভাবিক নয়।
একাদশ শতকে ক্রুসেডাররা মুসলমানদের ওপর হামলা চালানোর সময় ‘ডিউস ভুল্ট!’ বলে যে রণহুংকার দিতেন, সেই কথাটিও হেগসেথ ট্যাটু হিসেবে শরীরে এঁকেছেন। ওই সময় ক্রুসেডারদের মধ্যে যে ‘জেরুজালেম ক্রস’ জনপ্রিয় হয়েছিল, সেটির ছবিও খুব বড় করে হেগসেথ বুকে এঁকেছেন।
দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকা ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ ‘পিট হেগসেথস অ্যারাবিক ট্যাটু স্টায়ার্স কন্ট্রোভার্সি: “ক্লিয়ার সিম্বল অব ইসলামোফোবিয়া”’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
সেখানে বলা হয়, এসব ট্যাটুর ছবি নিজের ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী সমালোচিত হচ্ছেন।
অনেকেই মনে করছেন, এর মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর ইসলামবিদ্বেষের প্রকাশ ঘটিয়েছেন। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন সেনাবাহিনীতে পাঁচ থেকে ছয় হাজার ধর্মপরায়ণ মুসলমান সেনা আছেন। হেগসেথের এই ট্যাটু প্রদর্শন তাঁদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।
নিউইয়র্কার পত্রিকার এক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, হেগসেথ একবার একটি পানশালায় গিয়ে মাতাল অবস্থায় চিৎকার করে বলছিলেন, ‘কিল অল মুসলিমস!’
১৩ মার্চ সিএনএনে প্রতিরক্ষাবিষয়ক বিশ্লেষক জাখারি বি. উলফের ‘পিট হেগসেথ ওয়ান্টেড অ্যান আমেরিকান ক্রুসেড, নাউ হি ইজ লিডিং আ ওয়ার ইন দ্য মিডল ইস্ট’ শিরোনামে একটি লেখা ছাপা হয়েছে।
সেখানে তিনি বলেছেন, গাজায় ইসরায়েলের হামলা সমর্থন করা থেকে শুরু করে এখন ইরানে চলমান যুদ্ধে ভূমিকা রাখার ক্ষেত্রে হেগসেথ একাদশ শতকের ক্রুসেডের চেতনাকে ধারণ করছেন। এটি আসলে তাঁর ‘একুশ শতকের ক্রুসেড’।
ট্রাম্প, ইভানজেলিক্যাল ও জায়নবাদীরা এক কেন
ইহুদিরা বিশ্বাস করে, সারা বিশ্বে ইহুদিদের একচ্ছত্র শাসন প্রতিষ্ঠা করতে তাদের মধ্যে ঈশ্বর একজন মসিহ বা ত্রাতা পাঠাবেন; কিন্তু যতক্ষণ না কয়েক হাজার বছর আগে ধ্বংস হয়ে যাওয়া কিং সলোমনের [মুসলমানদের কাছে যিনি নবী সোলাইমান (আ.)] টেম্পল বা সোলাইমানি মন্দির পুনরায় তৈরি করা হচ্ছে, ততক্ষণ সেই ত্রাতা আবির্ভূত হবেন না।
এই সেলাইমানি মন্দিরকে বলা হচ্ছে ‘থার্ড টেম্পল’। ইহুদিদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, জেরুজালেমের বায়তুল মুকাদ্দাস কম্পাউন্ডের আল আকসা মসজিদ ভেঙে সেই থার্ড টেম্পল গড়া হবে।
ইসরায়েলের কট্টর ইহুদিদের একাধিক গোষ্ঠী মসিহর আগমনের শর্ত পূরণ করতে বহু বছর ধরে সেই ‘থার্ড টেম্পল’ বানানোর পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে।
এ বিষয়ে সব ধরনের প্রস্তুতি ইসরায়েল সরকারের দিক থেকেও নেওয়া হয়েছে। (এ বিষয়ে ‘লাল গরু এসে গেছে, আল-আকসা ভেঙে থার্ড টেম্পল গড়া হবে?’ শিরোনামের লেখায় বিশদভাবে বলা আছে)
ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, ইহুদিদের এই মসিহই দাজ্জাল, যে কিনা গোটা বিশ্ব শাসনব্যবস্থার একক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেবে।
হাদিসের ভাষ্যমতে দাজ্জালের দুঃশাসনের অবসানে ঈসা (আ.) (খ্রিষ্টান সম্প্রদায় যাঁকে যিশু বলে থাকে) আবার দুনিয়াতে আসবেন এবং দাজ্জালকে হত্যা করবেন; আর ইহুদিদের সেই মসিহ ইভানজেলিক্যালদের ভাষ্যমতে ‘অ্যান্টি–ক্রাইস্ট’ যে কিনা যিশুখ্রিষ্টকিরোধী এক শয়তানি শক্তি।
অর্থাৎ ইহুদিরা যাকে মসিহ বা ‘হিরো’ হিসেবে দেখে, ইভানজেলিক্যালদের কাছে সে শয়তান বা ভিলেন।
সেদিক থেকে বিবেচনা করলে জায়নবাদী ইহুদি ও ইভানজেলিক্যালদের মধ্যে তীব্র শত্রুতা থাকার কথা; কিন্তু তার বদলে আছে বন্ধুত্ব।
এখন প্রশ্ন হলো এর পরও এই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে কেন গভীর সম্পর্ক? এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে ইভানজেলিক্যালদের কিছু মৌলিক বিষয়ে চোখ বুলাতে হবে।
ইভানজেলিক্যাল আসলে প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিষ্টধর্মের একটি ধারা। এই ধারার অনুসারীরা ‘সেকেন্ড কামিং’ বা যিশুর পুনরাগমনে বিশ্বাস করে। তাদের বিশ্বাস, যিশু আবার জেরুজালেমে ফিরে আসবেন। তবে তার আগে কয়েকটি ঘটনা ঘটতে হবে।
ইভানজেলিক্যাল কারা?
ইভানজেলিক্যাল আসলে প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিষ্টধর্মের একটি ধারা। এই ধারার অনুসারীরা ‘সেকেন্ড কামিং’ বা যিশুর পুনরাগমনে বিশ্বাস করে। তাদের বিশ্বাস, যিশু আবার জেরুজালেমে ফিরে আসবেন। তবে তার আগে কয়েকটি ঘটনা ঘটতে হবে। সেগুলো হলো:
১. ইহুদিদের ইসরায়েলে পুনরাগমন: ইভানজেলিক্যালদের মতে, যিশুর পুনরাগমনের আগে যত বড় ঘটনা ঘটবে, তার মধ্যে প্রথমটি হলো বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ইহুদিরা আবার তাদের ঐতিহাসিক ভূমি ইসরায়েলে ফিরে আসবে। তারা মনে করে, ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এই ভবিষ্যদ্বাণীর আংশিক পূরণ হয়েছে।
২. জেরুজালেমে ইহুদি নিয়ন্ত্রণ: ইভানজেলিক্যালদের বিশ্বাস অনুযায়ী পবিত্র শহর জেরুজালেম আবার সম্পূর্ণভাবে ইহুদিদের নিয়ন্ত্রণে যাবে এবং এটি হবে পৃথিবীর শেষ সময়ের ঘটনার কেন্দ্র।
৩. থার্ড টেম্পল নির্মাণ: ইভানজেলিক্যালদের বিশ্বাস, যিশুর পুনরাগমনের শর্ত হিসেবে জেরুজালেমে প্রাচীন সলোমন মন্দিরের (বর্তমান আল-আকসা মসজিদ) জায়গায় আবার একটি তৃতীয় মন্দির নির্মিত হবে।
৪. অ্যান্টিক্রাইস্টের আবির্ভাব: ইভানজেলিক্যাল বিশ্বাসে পৃথিবীতে এক শক্তিশালী দুষ্ট নেতা আবির্ভূত হবে, যাকে তারা বলে ‘অ্যান্টিক্রাইস্ট’ (ইসলামে যাকে বলা হয় ‘দাজ্জাল’ এবং ইহুদিরা যাকে বলে ‘মসিহ’)। বুক অব রিভিলেশন অনুযায়ী, এই নেতা জেরুজালেম থেকে বিশ্বরাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করবে এবং মানুষের ওপর নিপীড়ন চালাবে।
৫. মহাবিপর্যয় বা ট্রাইবুলেশন: তারপর পৃথিবীতে শুরু হবে এক ভয়াবহ সংকটের সময়। এটিকে বলা হয় ট্রাইবুলেশন। এই সময় যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, মহামারি এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটবে।
৬. আর্মাগেডনের যুদ্ধ: শেষ দিকে একটি বড় যুদ্ধ হবে, যাকে বলা হয় ‘ব্যাটল অব আর্মাগেডন’। ইভানজেলিক্যালদের বিশ্বাস অনুযায়ী এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষ করে ইসরায়েল অঞ্চলে ঘটবে।
৭. যিশুর পুনরাগমন: ইভানজেলিক্যালরা মনে করেন, এসব ঘটনার পর যিশু আবার জেরুজালেমে ফিরে আসবেন এবং অশুভ শক্তিকে পরাজিত করে ঈশ্বরের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করবেন।
তার মানে, যিশুর ‘সেকেন্ড কামিং’ বা দ্বিরাগমন ত্বরান্বিত করতে হলে ইহুদিদের ইসরায়েলে জড়ো হওয়া, জেরুজালেমে ইহুদি নিয়ন্ত্রণ, থার্ড টেম্পল নির্মাণ, অ্যান্টিক্রাইস্টের আবির্ভাব, মহাবিপর্যয় বা ট্রাইবুলেশন এবং আর্মাগেডনের যুদ্ধ হতে হবে।
ইভানজেলিক্যালদের বিশ্বাস, ইসরায়েল তথা জায়নবাদের মাধ্যমেই এই শর্তগুলো পূরণ করা সম্ভব। আর তা করতে হলে অবধারিতভাবে তাদের ইসরায়েলের ইহুদি জায়নবাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র হতে হবে এবং ফিলিস্তিনসহ আরব তথা সমগ্র মুসলমান সমাজের বিপক্ষে অবস্থান নিতে হবে।
এ কারণেই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু নীল নদ থেকে ইউফ্রেটিস বা ফোরাত নদী পর্যন্ত দখল করে যে ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ প্রতিষ্ঠার কথা বলছেন, সেটিকে ইভানজেলিক্যালরা একবাক্যে সমর্থন করেন। কারণ, এটি ইহুদিদের ইসরায়েলে পুনরাগমন, জেরুজালেমে ইহুদি নিয়ন্ত্রণ, থার্ড টেম্পল নির্মাণ, অ্যান্টিক্রাইস্টের আবির্ভাব, মহাবিপর্যয় বা ট্রাইবুলেশন, আর্মাগেডনের যুদ্ধ, যিশুর পুনরাগমন—সবকিছুকে ত্বরান্বিত করবে।
ইভানজেলিক্যালরা কেন ট্রাম্পের পাশে
ইভানজেলিক্যালরা মনে করে, ডোনাল্ড ট্রাম্প এসব শর্ত পূরণের পরিবেশ তৈরিতে অগ্রণী ভূমিকা রাখছেন।
এ কারণে ট্রাম্প জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে যখন তেল আবিব থেকে মার্কিন দূতাবাস জেরুজালেমে সরিয়ে আনেন, তখন ইভানজেলিক্যালদের বড় অংশ সেটিকে সমর্থন করেছে।
২০১৬ সাল থেকে ইভানজেলিক্যাল ভোটারদের ৮০ শতাংশের বেশি ট্রাম্পকে সমর্থন দিয়ে আসছে। শুধু তা-ই নয়, তাদের একটি অংশ বিশ্বাস করে, ডোনাল্ড ট্রাম্প হচ্ছেন ঈশ্বরের মনোনীত নেতা।
ইরান যুদ্ধ শুরু করার মধ্য দিয়ে তিনি আসলে আর্মাগেডনের যুদ্ধের দিকে দুনিয়াকে এগিয়ে নিচ্ছেন। অর্থাৎ ‘সেকেন্ড কামিং’ বা যিশুখ্রিষ্টের পুনরাগমনের পথ বের করছেন।
ইভানজেলিক্যালরা ট্রাম্পকে ‘ঈশ্বরের মনোনীত নেতা’ বানানোর কারণে ট্রাম্প বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কাজকর্ম দেখে মনে হতে পারে, তিনি নিজেও এই কথায় বিশ্বাস করা শুরু করেছেন। কোনো দুর্নাম–বদনামকেই তিনি পাত্তা দিচ্ছেন না।
এপস্টেইন কেলেঙ্কারিতে নাম আসায় বহু ক্ষমতাধরের পদস্খলন হয়েছে। অনেকে লজ্জার মুখে পড়েছেন। অনেকের জনপ্রিয়তা কমেছে; কিন্তু আমেরিকার প্রোটেস্ট্যান্ট ও ইভানজেলিক্যাল খ্রিষ্টান সমাজে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা একটুও কমেনি। কারণ, তিনি ‘ঈশ্বরের মনোনীত নেতা’। তিনি যে ‘জিল্লে ইলাহি’, সেটি সাধারণ আমেরিকানদের মনে করিয়ে দিতেই হয়তো ওভাল অফিসে প্রার্থনা সভার আয়োজন করা হয়েছিল।
ট্রাম্প জানেন, আর্মাগেডনের যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী বলে যাঁরা বিশ্বাস করেন, তাঁদের সমর্থন তিনি পাবেনই। সম্ভবত সেই ভরসাতেই তিনি নেতানিয়াহুকে সঙ্গে নিয়ে ইরান নামক ভিমরুলের চাকে খোঁচা মেরেছেন। আর ইরানও ভয়ানক হয়ে উঠেছে।
এখন দুই পক্ষ যেভাবে ক্ষেপণাস্ত্র ও বোমা ছুড়ছে এবং তাতে তেলক্ষেত্রগুলোতে আগুন ধরে যেভাবে আকাশ ধোঁয়ায় অন্ধকার করে ফেলছে, তাতে সাধারণ বিশ্ববাসী আতঙ্কগ্রস্ত হচ্ছে।
কিন্তু এর মধ্যেও নিয়তিবাদী ইভানজেলিক্যাল আর জায়নবাদীরা সম্ভবত এই ভেবে খুশি হচ্ছে যে ‘আর্মাগেডন’ শুরু হতে আর দেরি নেই। আর সেদিকে পুরো পরিস্থিতি নিয়ে যাচ্ছেন ট্রাম্প আর ইসরায়েলের জায়নবাদী সরকার।
দাজ্জাল নিয়ে রোমে কেন পিটার থিয়েলের সিরিজ বক্তৃতা
ইরান যুদ্ধকে ঘিরে ‘মসিহ’, ‘অ্যান্টিক্রাইস্ট’, ‘দাজ্জাল’, ‘আর্মাগেডন’—এই শব্দগুলো ক্ষমতাধর রাজনীতিক ও ধর্মীয় নেতাদের আলোচনায় যখন বারবার উঠে আসছে, ঠিক সেই সময়ই এক অদ্ভুত সমাপতন ঘটেছে ইতালির রোম শহরে।
ভ্যাটিকানের একেবারে কাছাকাছি, এক রুদ্ধদ্বার সভাকক্ষে শুরু হয়েছে অ্যান্টিক্রাইস্ট বা দাজ্জালের আগমন নিয়ে ধারাবাহিক বক্তৃতা। বক্তা সিলিকন ভ্যালির বহুচর্চিত প্রযুক্তি ধনকুবের পিটার থিয়েল।
চার দিনের এই বক্তৃতামালা শুরু হয়েছে ১৫ মার্চ রোববার। চলবে ১৮ মার্চ বুধবার পর্যন্ত। এতে উপস্থিত থাকছেন প্রযুক্তি, একাডেমিক ও ধর্মীয় মহলের নির্বাচিত ব্যক্তিরা। তবে পুরো আয়োজনটি চলছে বন্ধ দরজার আড়ালে—সেখানে কোনো সাংবাদিকের প্রবেশাধিকার নেই।
প্রযুক্তি দুনিয়ার প্রভাবশালী চরিত্র
পিটার থিয়েল শুধু প্রযুক্তি উদ্যোক্তা নন, তিনি আজকের বিশ্বরাজনীতিরও এক প্রভাবশালী চরিত্র। অনলাইন পেমেন্ট–ব্যবস্থার বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান ‘পেপাল’-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা তিনি।
একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণকারী সফটওয়্যার কোম্পানি ‘প্যালান্টির টেকনোলজিস’-এরও সহপ্রতিষ্ঠাতা। ট্রাম্প অভিবাসীদের বিরুদ্ধে যে কঠোর অভিযান চালাচ্ছেন, সেই অভিযানে তথ্য বিশ্লেষণের কাজে প্যালান্টির প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে আসছে।
থিয়েলের প্রভাব শুধু প্রযুক্তি খাতেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জায়ান্ট ফেসবুকের প্রথম বড় ‘আউটসাইড ইনভেস্টর’দের একজন। পরে তিনি ‘ফাউন্ডার্স ফান্ড’ নামে একটি ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন, যার বিনিয়োগ গেছে ইলন মাস্কের স্পেস এক্সের মতো কোম্পানিতে।
রাজনীতিতেও থিয়েলের তাঁর প্রভাব কম নয়। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের রাজনৈতিক জীবনের শুরুর দিকের অন্যতম বড় দাতা ছিলেন তিনি।
ওয়াশিংটনের ক্ষমতার করিডরেও থিয়েলের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
অ্যান্টিক্রাইস্টের ধারণা নিয়ে থিয়েলের দীর্ঘদিনের আগ্রহ রয়েছে। এ বিষয়ে তিনি বহু বছর ধরে লিখছেন এবং বিভিন্ন সভা-সেমিনারে বক্তৃতা দিচ্ছেন।
তবে ইরান যুদ্ধ যখন চলছে, ঠিক তখন খোদ ভ্যাটিকানের দোরগোড়ায় বিশ্বের প্রভাবশালী লোকদের মধে৵ তাঁর অ্যান্টিক্রাইস্টের আগমন–সংক্রান্ত সিরিজ বক্তৃতা নিয়ে ক্যাথলিক ধর্মতত্ত্ববিদদের একাংশ উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে।
থিয়েলের বক্তৃতায় কী বলা হয়েছে?
গত বছর সান ফ্রান্সিসকোতেও থিয়েল একই ধরনের বক্তৃতামালার আয়োজন করেছিলেন। সেখানে তাঁর আলোচনার কেন্দ্রীয় প্রশ্ন ছিল—অ্যান্টিক্রাইস্ট কি বিশ্বমঞ্চে আবির্ভূত হতে যাচ্ছেন? সেই আলোচনাই রোমের সেমিনারে তিনি উপস্থাপন করছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সান ফ্রান্সিসকোর আলোচনায় থিয়েল বলেছিলেন, তাঁর আশঙ্কা—কোনো এক অ্যান্টিক্রাইস্ট ভবিষ্যতে পুরো বিশ্বের জন্য একটি একক সরকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে পারে। তাঁর এই ধারণার সঙ্গে ইসলাম ধর্মে বর্ণিত দাজ্জালের ধারণার মিল পাওয়া যায়। কারণ, ইসলামি ভাষ্যেও বলা আছে, দাজ্জাল বা অ্যান্টিক্রাইস্ট সারা বিশ্বের একক নিয়ন্ত্রণ নেবে।
ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য গার্ডিয়ান থিয়েলের সান ফ্রান্সিসকোর বক্তৃতাগুলোর উল্লেখযোগ্য অংশ উদ্ধৃতি ও বিশ্লেষণসহ প্রকাশ করছে। সেটি পড়ে প্রযুক্তি ও রাজনীতির এই প্রভাবশালী ব্যক্তি বন্ধ দরজার ভেতরে কী বলছেন, সে বিষয়ে কিছুটা আন্দাজ করা যায়।
থিয়েলের ধারণা, এক অ্যান্টিক্রাইস্ট-সদৃশ ব্যক্তিত্ব শেষ পর্যন্ত পৃথিবীকে আর্মাগেডনের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাঁর মতে, এই ব্যক্তি পারমাণবিক যুদ্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কিংবা জলবায়ু বিপর্যয়ের মতো ভয়াবহ সংকট সামনে আনবে। এতে মানুষের মনে ভয় তৈরি হবে এবং তখন সে মানুষকে সেই বিপর্যয় ঠেকানোর প্রতিশ্রুতি দেবে।
মানুষকে বোঝানো হবে—তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ এড়াতে যা করার দরকার, তা-ই করতে হবে। সেই লক্ষ্যে একটি ‘ওয়ান ওয়ার্ল্ড অর্ডার’ বা একক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার ধারণা সবার মেনে নিতে হবে। এই ব্যবস্থার কাজ হবে মানবজাতিকে সম্ভাব্য মহাপ্রলয় থেকে রক্ষা করা; কিন্তু তার বিনিময়ে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হতে পারে।
থিয়েলের মতে, এই প্রক্রিয়ার কিছু লক্ষণ ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ট্যাক্স হ্যাভেনে সম্পদ গোপন করা ক্রমে কঠিন করে তুলছে।
থিয়েলের ব্যাখ্যায় অ্যান্টিক্রাইস্টের কৌশল হলো নিরন্তর আর্মাগেডনের কথা বলে মানুষের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করা। যখন সবাই বিশ্বাস করবে যে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ভয়াবহ ও অন্যায় হবে, তখন মানুষ যেকোনো মূল্যে শান্তি চাইতে শুরু করবে। সেই শান্তি ন্যায়সংগত হবে কি না, সেটা নিয়ে কেউ খুব বেশি ভাবার অবকাশ পাবে না। থিয়েলের মতে, সেখানেই তৈরি হতে পারে ‘অন্যায্য শান্তি’। তাঁর দাবি, বাইবেলের ১ থেসালোনীয় ৫: ৩-এ যে ‘শান্তি ও নিরাপত্তা’র কথা বলা হয়েছে, সেটিই অ্যান্টিক্রাইস্ট তথা দাজ্জালের স্লোগান হয়ে উঠতে পারে।
অ্যান্টিক্রাইস্ট কে হতে পারে বা ঠিক কীভাবে আর্মাগেডন ঘটবে, সে বিষয়ে থিয়েল সুনির্দিষ্ট করে বলেননি। তাঁর মতে, বর্তমান ভূরাজনীতির দিকে তাকালে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
পশ্চিমা বিশ্ব ও চীনের এই সংঘাত শেষ পর্যন্ত কোন পথে যাবে, তা এখনো অনিশ্চিত। এটি কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে রূপ নেবে, নাকি নতুন এক ঠান্ডা যুদ্ধ শুরু হবে—সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে উঠেছে।
থিয়েলের মতে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ছিল এক অর্থে ‘অন্যায় যুদ্ধ’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি ন্যায়সংগত।
কিন্তু যদি ভবিষ্যতে পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পূর্ণাঙ্গ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়, তাহলে তা হবে সম্পূর্ণ অন্যায় ও ধ্বংসাত্মক সংঘাত—যা শেষ পর্যন্ত মানবসভ্যতার জন্য সর্বনাশা বিপর্যয়ে পরিণত হতে পারে। সেটিই হয়তো আর্মাগেডনের বাস্তব রূপ।
ওভাল অফিসে ৫ মার্চ ট্রাম্পের জন্য ২০ জন প্যাস্টর ও ইভানজেলিক্যাল ধর্মগুরু যে ভাষায় প্রার্থনা করেছেন; মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ যেভাবে ইরানে হামলাকে ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে তুলে ধরছেন; নেতানিয়াহুর মতো ইসরায়েলের নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতও যেভাবে নীলনদ থেকে ইউফ্রেটিস নদী পর্যন্ত দখল করে ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ প্রতিষ্ঠার কথা বলছেন; তখন বাইবেলীয় আর্মাগেডনের আতঙ্ক যে বিশ্বকে অস্থির করবে, তাতে আর অবাক হওয়ার কী আছে।
সারফুদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক
ই–মেইল: [email protected]মতামত লেখকের নিজস্ব
