ইসরায়েলিরা যুদ্ধের বিষাক্ত নেশায় বুঁদ হয়ে গেছে

ইরানে ইসরায়েলের হামলাফাইল ছবি: এএফপি

আবারও যুদ্ধ। আবারও সেই যুদ্ধ, যা ইসরায়েলের অস্তিত্বের সংকটকে একেবারে চিরতরে সমাধান করার জন্য হচ্ছে! আবার প্রথমেই ঘোষিত হবে যে এক চমকপ্রদ বিজয় অর্জিত হচ্ছে।

সবাই এতে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠবে। ইসরায়েলের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়াইর লাপিড লিখবেন, আমরা এক শক্তিশালী ও একতাবদ্ধ জাতি। বিশ্লেষকেরাও প্রতিযোগিতায় নামবেন, ইসরায়েলের বীরত্বগাথা কে কত বেশি করে তুলে ধরতে পারেন। আর এসবই চলবে ততক্ষণ, যতক্ষণ না পরবর্তী আরেকটি অভিযান শুরু হয়।

প্রায় সব ইসরায়েলি আবারও এটা বিশ্বাস করছে যে এই যুদ্ধের মতো আর কোনো ন্যায়সংগত যুদ্ধ নেই, এটার মতো সফল যুদ্ধও হয়নি। তারা প্রায় সমস্বরে পাল্টা প্রশ্ন করছে, ‘আমাদের আর কী বিকল্প ছিল?’ কিংবা ‘তাহলে আপনার প্রস্তাবটা কী?’

এর আগে ইসরায়েলের সব যুদ্ধেই আমরা এসব প্রশ্ন উঠতে দেখেছি। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় বিভিন্ন টেলিভিশনে প্যানেল আলোচকদের তো রীতিমতো মুখিয়ে থাকতে দেখা গেল এমন মুহূর্তের জন্য, যেন তাঁরা সবাই ত্রাণকর্তা মসিহর অপেক্ষায় আছেন। আর কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তটা এল শনিবার [যেদিন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালাল]।

ইসরায়েলের ইতিহাসে বিভিন্ন যুদ্ধের মধ্যবর্তীকালীন কয়েক বছর শান্ত সময় কাটতে দেখা গেছে। ১৯৪৮ সালের পর ১৯৫৬ সালে সিনাই অভিযানের মাঝে আট বছর, সিনাই অভিযান থেকে ১৯৬৭ সালে ছয় দিনের যুদ্ধের মাঝে ১১ বছর, এর পর থেকে ইয়ম কিপ্পুর যুদ্ধের মাঝে ছয় বছর। এরপর ১৯৮২ সালে প্রথম লেবানন যুদ্ধের আগপর্যন্ত ৯ বছর এবং তার পর থেকে দ্বিতীয় লেবানন যুদ্ধের মাঝে ২৪ বছর।

কিন্তু এখন আমরা এক যুদ্ধ থেকে আরেক যুদ্ধের মধ্যে বিরতি পাচ্ছি মাত্র কয়েক মাস। আর প্রতিটি যুদ্ধের পর আকাশচুম্বী প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, যুদ্ধবাজ ও যুদ্ধসমর্থকেরা খুশিতে বগল বাজায়। প্রায় প্রত্যেক ইসরায়েলিই তো এই কাতারে পড়ে।
প্রথম লেবানন যুদ্ধ শেষে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মেনশাম বেগিন বড়াই করে বলেছিলেন, ‘আমাদের ওপর আর কোনো বোমা পড়বে না, পড়বে না কোনো কাতিউশা রকেট।’ আর দ্বিতীয় লেবানন যুদ্ধের পর প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্টের দাবি ছিল, ‘রক্ত বৃথা যায়নি।’

আরও পড়ুন

আট মাসে আগে, গত বছর জুন মাসে, ইরানের ওপর পূর্ণ বিজয় অর্জনের ঘোষণা করেছিল। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দম্ভোক্তি করে বলেছিলেন যে ইরানে আঘাত হানার সূচনাটা ইসরায়েলের সেনাবাহিনীতে ইতিহাস হয়ে থাকবে, সারা দুনিয়ার সেনাবাহিনীর জন্য অধ্যয়নের বিষয় হবে। তাঁর ভাষায়, ‘ক্রান্তিকালে সিংহের মতো একটি জাতি জেগে ওঠে। (হিব্রুতে যুদ্ধকে বলা হয় গর্জনকারী সিংহ)। আমাদের গর্জনে তেহরান ভয়ে জড়সড় হয়ে যায়। আর সারা দুনিয়ায় এই গর্জন প্রতিধ্বনিত হয়ে ফেরে।’ বাস্তবে সিংহের এই গর্জন দ্রুতই ইঁদুরের চিঁ চিঁ শব্দে রূপান্তরিত হয়।

কথিত ‘ঐতিহাসিক জয়ের’ মাধ্যমে ‘ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য দুই হুমকি—পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক মিসাইল’ অপসারণের দাবি তো এক প্রজাপতির জীবনের মতো ক্ষণস্থায়ী হয়। ঐতিহাসিক জয়ের কয়েক মাসের মধ্যেই আমাদের আরেকটি নতুন যুদ্ধ প্রয়োজন হলো। আমরা তো এখনো অপারেশন রাইজিং লায়নের ধকল সামলে উঠতে পারিনি। তার মধ্যে চলে এল অপারেশন রোয়ারিং লায়ন। মাঝেমধ্যে মনে হয়, আমাদের আসলে যুদ্ধের এমন কিছু গালভরা নামকরণ দরকার, যার মাধ্যমে এসবের অবধারিত ব্যর্থতার পূর্বানুমান করা যায়।

গাজায় আড়াই বছর ধরে ব্যর্থ প্রয়াসের পর, প্রায় একই সময় ধরে লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সীমিত সাফল্য অর্জনের পর, ইরানে অর্জনহীন আক্রমণের আট মাস পর এখন আসলে সময় এসেছে যুদ্ধের বিষাক্ত উন্মত্ততা ও তার অর্থহীন প্রতিশ্রুতি থেকে মুক্ত হওয়ার।

প্রথমটি বাদ দিলে ইসরায়েলের ইতিহাসে কোনো যুদ্ধই দীর্ঘমেয়াদি কোনো ফল বয়ে আনেনি, একটিও নয়। যা ফল এনেছে, তা হলো শূন্য। বেশির ভাগ যুদ্ধই ছিল যেচে পড়ে বাধানো। তাতে সব সময় নিকৃষ্ট পরিণতি ঘটেছে। গত শনিবার যে যুদ্ধ শুরু করা হলো, তাকে অভিহিত করা হয়েছে ‘আগাম প্রতিরোধমূলক আঘাত’ (প্রিএমটিভ স্ট্রাইক)। কিন্তু প্রতিরোধমূলক আঘাত তাকেই করা হয়, যে আপনাকে আঘাত করতে উদ্যত হয়। ইরান সে রকম কিছু করেনি। সন্দেহ নেই, দেশটির শাসকগোষ্ঠী খুব নিষ্ঠুর। এটাও সত্যি যে বছরের পর বছর ধরে ইসরায়েল ও এই অঞ্চলের জন্য ইরান খুব বড় একটা বিপদ হয়ে উঠেছিল।

কিন্তু ইসরায়েলে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়, ইরান সেভাবে কখনোই ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য বিপজ্জনক কিছু হয়নি। যে কেউ এটা আশা করতে পারেন যে এবারের সময়টা ভিন্ন রকম হবে, যেমনটা আমরা অতীতের সব যুদ্ধ শুরুর সময় করে এসেছি। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা ভিন্ন রকম কিছু হওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখায় না। যদি তেহরানের শাসকগোষ্ঠীর পতন ঘটে আর ইরান সুইজারল্যান্ডের মতো শান্তিময় হয়ে ওঠে, যদি ইসরায়েলের সঙ্গে অনন্তকালের জন্য দেশটির একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, তারপরও ইসরায়েল আরেকটি কাল্পনিক পুতুল খুঁজে বের করবে যে কিনা আমাদের ওপর ঝামেলা করছে।

আরও পড়ুন

দাবিকৃত বা প্রতিশ্রুত ‘একদা ও চিরকালের জন্য’ কখনোই তরবারি দিয়ে অর্জিত হবে না, হবে না এফ-৩৫ জঙ্গি বিমান দিয়েও। হয়তো এমনটা বলতে অনেক দেরি হয়ে গেছে। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত দখলদারি বজায় থাকবে, যতক্ষণ পর্যন্ত [ইসরায়েল] নিজে চরমভাবে ‘একদা ও চিরকালের জন্য’ এখানে থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত অন্য কোনো ‘একদা ও চিরকালের জন্য’ কিছু হবে না।

গাজায় আড়াই বছর ধরে ব্যর্থ প্রয়াসের পর, প্রায় একই সময় ধরে লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সীমিত সাফল্য অর্জনের পর, ইরানে অর্জনহীন আক্রমণের আট মাস পর এখন আসলে সময় এসেছে যুদ্ধের বিষাক্ত উন্মত্ততা ও তার অর্থহীন প্রতিশ্রুতি থেকে মুক্ত হওয়ার।

এই যুদ্ধ চলা মানে পানির মতো রক্ত প্রবাহিত হওয়া। সেটাই হবে। আমেরিকা এটা কখনোই ভুলে যাবে না, আমরা তাদের এই যুদ্ধে ঠেলে দিয়েছি। আর যুদ্ধ শেষে আমরা আরেকটি পুরোনো সকালে জেগে উঠব।

  • গিডিয়ন লেভি ইসরায়েলি জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও লেখক।

    হারেৎজ থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ: আসজাদুল কিবরিয়া