ইউনূস সরকার স্পষ্ট বলে দিয়েছে, নির্বাচনের পরপরই তাদের মেয়াদ শেষ। এরই মধ্যে কয়েকজন উপদেষ্টা কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দিয়ে সাধারণ পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেছেন। বলা যায়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বাকি সময় সম্ভবত দিন দিয়ে গোনা হবে, সপ্তাহ বা মাসে নয়।
২০২৫ সালের মার্চে আমরা ইউনূস সরকারের সাফল্য ও ব্যর্থতা নিয়ে একটা মধ্যকালীন রিপোর্ট প্রকাশ করেছিলাম। এখন সম্ভবত উপযুক্ত সময় একটা ফাইনাল রিপোর্ট নিয়ে কথা বলার।
সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে খোলাখুলি আলাপ করা আমাদের রাজনৈতিক সরকারগুলো পছন্দ করত না। এখনো ভয়ভীতি এবং বাইরের আতঙ্ক আছে। তবে সমালোচনার ক্ষেত্রে সরকারের সহনশীলতা আগের চেয়েও অনেক ভালো, এই প্রশংসাটা ইউনূস সরকারেরই পাওনা।
মোটাদাগে বলতে গেলে, সরকারের দিগ্দর্শন ও গতিধারা গত কয়েক মাসে খুব পরিবর্তিত হয়নি। আগের রিপোর্টে যে বিষয়গুলোতে ঘাটতি ছিল যেমন আইনশৃঙ্খলা ও বৈদেশিক নীতি, সেগুলোতে ঘাটতি আরও বেড়েছে। তেমনি সাফল্যগুলোও ধারাবাহিকভাবে আরও দৃঢ় হয়েছে। সরকারের সময় শেষ হওয়ার প্রাক্কালে তার সাফল্য ও ব্যর্থতা নিয়ে একটা খোলামেলা আলোচনা হতে পারে। অনেক বিষয়ে ভিন্নমত থাকতে পারে, আমি নিশ্চিত সেগুলোও বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশ পাবে; আর ননস্টপ টক শোগুলোতো আছেই।
গণতান্ত্রিক ভিত্তি ও শাসনতান্ত্রিক কাঠামো
আমরা আগেই বলেছি, একদলীয় শাসনব্যবস্থা, দলীয় সরকারের অধীন নির্বাচন ও বিচার বিভাগের কাজে সরকারের হস্তক্ষেপ—এগুলোর বিরুদ্ধে প্রফেসর ইউনূস শক্ত অবস্থান নিয়েছিলেন। এগুলোকে প্রতিহত করার জন্য একটা সনদ প্রণয়ন করা হয়েছে। গণভোটের রায় যা-ই হোক না কেন, এ বিষয়গুলো আমাদের সংবিধানে শিগগির স্থান পাবে অথবা জাতীয় সংলাপের মাঝে আবর্তিত হবে।
বাংলাদেশ যদি নির্দলীয় সরকারের মাধ্যমে প্রতি পাঁচ বছর পর একটা নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে পারে এবং সাংবিধানিকভাবে একটা স্বাধীন বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারে, সেই কৃতিত্বটা প্রফেসর ইউনূসের নামে লেখা থাকবে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নিয়মতান্ত্রিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। আশা করা যায় এই নির্বাচনটা ভবিষ্যতের জন্য একটা বেঞ্চমার্ক তৈরি করবে। সামনের নির্বাচন হবে নিশ্চয় আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং আরও পরিপক্ব। অনেকে মনে করেন ভোটের দিনেই নির্বাচনটি সংঘাতপূর্ণ হয়ে যেতে পারে। আমরা আশা করি, এ রকম কিছু হবে না এবং আমাদের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার যাত্রাটা শুভ হবে।
অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা
সরকারের অর্থনৈতিক দল কিছু অর্থনৈতিক বিপর্যয় ভালোভাবে সামাল দিয়েছে। দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূত করে দাঁড় করানোর চেষ্টা হয়েছে। অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ অর্থনীতি নিয়ে কোনো কপটতার আশ্রয় নেননি এবং রাজনীতি করতে চেষ্টা করেননি। দেশে পণ্যদ্রব্য সরবরাহে যেন কোনো ঘাটতি না থাকে তার জন্য যথাসময়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিয়েছেন। ভারত থেকে চাল আমদানিতেও তিনি পিছপা হননি। তিনি বলেছেন, অন্য দেশ থেকে চাল আমদানি করতে গেলে, আমাদের প্রতি কেজিতে ১০ টাকা বেশি দামে চাল কিনতে হবে।
অর্থনীতি গত এক বছরে কোনো বড় ঝুঁকি নেয়নি। তবে সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামো এখন প্রকাশ করার কোনো প্রয়োজন ছিল না, এটা নতুন সরকারকে দারুণ চাপে ফেলবে। মন্ত্রীদের জন্য ৯০৩০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট বানানোর কথা ভাবাও একটা অসুস্থ চিন্তা।
দেশে মুদ্রাস্ফীতির চাপ বাড়ছে। রাষ্ট্রীয় ঋণের পরিমাণও ক্রমাগত বাড়ছে। দেশে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে।
গতিহীন বৈদেশিক নীতি
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এখনো গতিহীন। ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক তলানিতে পৌঁছেছে। ক্ষতিটা আমাদেরই হচ্ছে। আমদানিতে আমরা ভারতকে যে বিপুল অর্থ সরবরাহ করি, তার বিপরীতে আমরা তাদের বিদ্যুতের দাম কমাতে চাপ দিতে পারি, আমাদের দেশ থেকে আরও বেশি পণ্য আমদানি করতে বাধ্য করতে পারি—আমরা এসব সুযোগ হারাচ্ছি। অন্যদিকে সরকার পাকিস্তানের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও বাণিজ্য বাড়াতে চেষ্টা করছে।
বড় বড় দেশগুলোও ট্রাম্পের হুংকারে কাঁপছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা করে ইউনূস সরকার আমাদের অর্থনীতি ও গার্মেন্টসশিল্পকে রক্ষা করেছেন। তবে চুক্তিগুলো প্রকাশ করা হয়নি। অনেকেই বলছেন, প্রকাশ পেলে অনেক বিস্ফোরণ অপেক্ষা করছে। পোর্টের চুক্তি নিয়ে সামান্য প্রতিবাদ হচ্ছে। সরকারের কৃতিত্ব, এই নিয়ে দেশে বড় ধরনের ঝামেলা হয়নি। প্রতিবাদকারীরা এখনো ভারতীয় ‘আগ্রাসনের’ প্রতিবাদে ব্যস্ত।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ইউনূস সরকারের অবস্থান পরিবর্তন হয়নি। আসলে কী ধরনের পুলিশ বাহিনী আমাদের প্রয়োজন, সেটা নির্ণয়ে সরকার প্রথম থেকেই ভুল করেছে। এ যেন ‘দন্তবিহীন বাঘ’। এখন আমাদের পুলিশেরা অনেক সময় দুর্বৃত্ত ও ভুক্তভোগীর মধ্যে মীমাংসা করে। পুলিশ বাহিনী কোনো রিস্ক নিতে চায় না। দেশে আইনের শাসনের প্রতি জনগণের আস্থাহীনতা বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে জনগণ নিজ হাতে আইন তুলে নিয়ে প্রতিকার খুঁজছে।
আর কারা দুর্বৃত্ত, সেই সংজ্ঞাটাও আইন রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে পরিষ্কার ছিল না। যারা একজন নাগরিককে পিটিয়ে থানায় নিয়ে আসে তারা দুর্বৃত্ত, না যে লোকটাকে রক্তাক্ত করা হলো সেই দুর্বৃত্ত? আওয়ামী লীগের লোক হলেই কি দুর্বৃত্ত? এসব ধোঁয়াশার জন্য আমাদের আইনশৃঙ্খলা কাজ দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
তিন ঘটনার কলঙ্ক
শরিফ ওসমান হাদির হত্যার ঘটনা সরকারের অসহায়তাকে নানাভাবে জনগণের সামনে প্রকাশ করেছে। যখন ‘ডেভিল হান্টের’ দ্বিতীয় পর্যায় কার্যকর, তখন বেআইনি ঘোষিত দলের একজন শুটারের হাতে হাদির মৃত্যু পুরা জাতিকে স্তম্ভিত ও ক্রোধান্বিত করেছে। এক দিনের মধ্যে ঘাতকের পালিয়ে যাওয়া ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বড় গাফিলতি। পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহও ছিল সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
গত দেড় বছরে মবের গতিরোধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকায় আগুন ধরানো ছিল মবকারীদের সবচেয়ে বড় কীর্তি। সেদিন সরকারের কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এই ব্যর্থতা ইউনূস সরকারের একটা বড় কলঙ্ক হয়ে থাকবে।
আমাদের দেশে মব বিকাশের ধারাবাহিকতায় আরেকটি চরম অমানুষিক মৃত্যু হয়েছে—ময়মনসিংহ জেলার ভালুকায় হিন্দু ধর্মাবলম্বী একজন পোশাকশ্রমিকের। ধর্ম নিয়ে কটূক্তির মিথ্যা অভিযোগ তুলে দলবদ্ধ হয়ে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে সাতাশ বছর বয়সী দীপু চন্দ্র দাসকে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, ফ্যাক্টরি রক্ষায় তাঁকে বাইরে মবের মাঝে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
এই ঘটনা যে আমাদের জাতীয় বিবেককে আরও সজোরে নাড়া দেয়নি সেই দায়ভার শুধু সরকারের নয়, আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও বর্তাবে।
এই ঘটনা তিনটি সরকারের ইতিহাসে কালো দাগ হয়ে থাকবে।
উপদেষ্টাদের ভূমিকা
উপদেষ্টারা সবাই চেষ্টা করেছেন নিজ নিজ মেধা দিয়ে সরকারে কাজ করতে। যেসব উপদেষ্টা কাজে চোখ রেখে পেশাদারি মনোভাব নিয়ে নিজের কাজ করে গেছেন, তাঁরাই ভালো প্রশংসা কুড়িয়েছেন। যাঁরা আন্দোলিত তরুণদের কাছে নিজেদের জনপ্রিয়তা বাড়াতে চেষ্টা করেছেন, তাঁরা বড় বড় ভুল করেছেন।
আগেও বলেছি, প্রফেসর ইউনূসের উপস্থিতি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে দেশ-বিদেশে গ্রহণযোগ্য করেছিল এবং ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নিয়ে একটা আশাবাদের সৃষ্টি করেছে। আমাদের দেশে একটা বাজে রীতি আছে, সমালোচনাকে হেনস্তায় রূপ দেওয়ার। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় একটা সরকার বিদায় নেবেন, সরকারের নেতারা আবার বেসরকারি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাবেন; এটাই স্বাভাবিক। ইউনূস সরকারের উপদেষ্টাদের অবসর যেন স্বাভাবিক হয় সেটাই প্রত্যাশিত। তাঁদের জন্য আমাদের শুভ কামনা রইল।
সালেহ উদ্দিন আহমদ শিক্ষক, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
ই-মেইল: salehpublic 711 @gmail. com
