১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবে ইরানে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির ৪০ বছরের শাসনের পতন ঘটে। তখন তাঁর বড় ছেলে রেজা পাহলভির বয়স ছিল মাত্র ১৬ বছর। তেলসমৃদ্ধ হাজার বছরের পুরোনো সেই সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী হিসেবে তিনিই ছিলেন প্রথম সারিতে। নিজের ‘জন্মগত অধিকার’ হারানোর প্রায় অর্ধশতাব্দী পর ৬৫ বছর বয়সে এসে পাহলভির অপেক্ষার প্রহর হয়তো শেষ হতে চলেছে।
‘এটিই শেষ লড়াই। পাহলভি ফিরবেন!’—গত বৃহস্পতিবার রাতে ইরানজুড়ে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভের অন্যতম প্রধান স্লোগান ছিল এটি। নির্বাসিত সাবেক ক্রাউন প্রিন্স (যুবরাজ) তাঁর স্বদেশবাসীকে রাজপথে নেমে আসার আহ্বান জানানোর পর এই স্লোগান প্রতিধ্বনিত হয়। বিক্ষোভকারীদের অনেকে চিৎকার করে বলছিলেন, ‘জাভিদ...শাহ’ (রাজা জিন্দাবাদ)! এবং ‘রেজা শাহ, আল্লাহ তোমার আত্মাকে শান্তি দিন!’
বৃহস্পতির এই বিক্ষোভ ছিল মূলত কয়েক দিনের লাগাতার আন্দোলনের চূড়ান্ত রূপ। এটি তেহরানের গ্র্যান্ড বাজার এলাকায় দেশটিতে অর্থনৈতিক দুর্দশার প্রতিবাদে শুরু হলেও দ্রুত সরকারবিরোধী আন্দোলনের দিকে মোড় নেয়। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত পাহলভি নিজেকে এই আন্দোলনের ডিফ্যাক্টো লিডার বা ‘কার্যত নেতা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছেন।
ইরানে ক্ষমতাচ্যুত রাজতন্ত্রের প্রতি সমর্থন জানানো একটি ‘ট্যাবু’ এবং ফৌজদারি অপরাধ। তাছাড়া যে সমাজ একসময় শাহের একনায়কতন্ত্রকে হঠাতে গণ-অভ্যুত্থান করেছিল, সেখানে এ ধরনের রাজকীয় মনোভাবকে দীর্ঘকাল ধরেই বাঁকা চোখে দেখা হতো।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, নির্বাসিত এই রাজপরিবার এবং এর প্রধানকে ঘিরে নতুন করে কেন এই উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে, তা এখনও অস্পষ্ট। ইরানিরা কি আসলেই রাজতন্ত্রের পুনর্বহাল চায়, নাকি তারা কেবল বর্তমান দমনমূলক থিওক্র্যাসি (ধর্মতন্ত্র) থেকে মুক্তি পেতে চায়?
‘রেজা পাহলভি নিঃসন্দেহে তাঁর প্রভাব বৃদ্ধি করেছেন এবং নিজেকে বিরোধী রাজনীতির সামনের সারিতে নিয়ে এসেছেন।’—বলেছেন আরশ আজিজি, যিনি ‘হোয়াট ইরানিয়ান্স ওয়ান্ট’ বইয়ের লেখক। তিনি আরও যোগ করেন, ‘তবে তাঁর (পাহলভি) অনেক সমস্যাও রয়েছে। তিনি সমাজে বিভাজন সৃষ্টিকারী ব্যক্তিত্ব, সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করার মতো নেতা নন।’
ইসলামিক রিপাবলিক দশকের পর দশক ধরে ইরানের ভেতরের বিরোধীদের কণ্ঠরোধ করে রেখেছে, এমনকি সাবেক প্রেসিডেন্টদেরও কারাগারে পাঠিয়েছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নির্বাচিত সরকারের ব্যক্তিবর্গের ক্ষমতা সীমিত করে রেখেছেন এবং নিজেকে এই শাসনের অভিভাবক মনে করেন, যা যেকোনো চ্যালেঞ্জকে কঠোরভাবে দমন করে।
দেশের ভেতরের বিরোধীদের এই দশা বাইরের বিরোধীদের শক্তিশালী করেছে, বিশেষ করে বিশাল ইরানি প্রবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে থেকে পাহলভির মতো ব্যক্তিত্বরা আড়াল থেকে সামনে উঠে এসেছেন।
পাহলভি সরাসরি লড়াইয়ে নামার বিষয়ে এখনও অস্পষ্ট। তিনি জানিয়েছেন, যদি এই বিক্ষোভকারীরা বর্তমান শাসনকে হঠাতে সফল হয়, তবে তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে নেতৃত্ব দিতে ইচ্ছুক। গত এক দশকে এটি পঞ্চম বড় ধরনের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ। তবে তাঁর পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্যের অভাব রয়েছে এবং সমালোচকেরা বলছেন, তাঁর অভিজ্ঞতাহীনতা দ্রুতই তাঁর বিরুদ্ধে যেতে পারে।
২০২০ সালে তেহরান থেকে ইউক্রেনগামী একটি যাত্রীবাহী বিমান ভুলবশত ইরান গুলি করে ভূপাতিত করার পর পাহলভি প্রথম আলোচনায় আসেন। সেই ঘটনা দেশের বাইরের বিরোধীদের ঐক্যবদ্ধ করে একটি কাউন্সিল গঠনে উদ্বুদ্ধ করেছিল, যেখানে পাহলভি ছিলেন একজন বিশিষ্ট সদস্য।
বিরোধীদের সেই জোড়াতালির কাউন্সিলটি অভ্যন্তরীণ কোন্দলে দ্রুতই ভেঙে যায়। তবে পাহলভি বিরোধী শিবিরের সবচেয়ে পরিচিত মুখ হিসেবে টিকে থাকেন। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাঁর সবচেয়ে প্রভাবশালী সমর্থক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। এই জোটটি ইরানিদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে (বিশেষ করে গত জুনে দুই দেশের ১২ দিনের যুদ্ধে ইসরায়েলি হামলায় ইরানের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর)।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যেভাবে ক্ষমতাচ্যুত করেছেন, তা হয়তো ইরানের বিরোধীদেরও আশাবাদী করেছে যে খুব দ্রুত বর্তমান শাসনের পতন ঘটবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ফুটেজে দেখা গেছে, একজন বিক্ষোভকারী একটি রাস্তার নাম বদলে ‘ট্রাম্প স্ট্রিট’ রেখেছেন।
তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই আশা হয়তো বাড়াবাড়ি। আজিজি মনে করেন, ট্রাম্প ‘বিকল্পগুলো বিবেচনা করছেন কিন্তু কেউ নিজেকে জয়ী হিসেবে প্রমাণ করার আগে তাঁকে বৈধতা দেওয়ার কোনো ইচ্ছা ট্রাম্পের নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘পাহলভির ব্যক্তিগত গুণাবলি ট্রাম্পের পছন্দ হওয়ার মতো নয়। তিনি বইপত্র নিয়ে থাকা মানুষ, ট্রাম্পের মতো ব্যক্তিত্বকে আকর্ষণ করার মতো সহজাত ক্যারিশমা তাঁর নেই। ট্রাম্পকে তুষ্ট করা তাঁর জন্য কঠিন হবে।’
পাহলভি সরাসরি লড়াইয়ে নামার বিষয়ে এখনও অস্পষ্ট। তিনি জানিয়েছেন, যদি এই বিক্ষোভকারীরা বর্তমান শাসনকে হঠাতে সফল হয়, তবে তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে নেতৃত্ব দিতে ইচ্ছুক। গত এক দশকে এটি পঞ্চম বড় ধরনের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ। তবে তাঁর পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্যের অভাব রয়েছে এবং সমালোচকেরা বলছেন, তাঁর অভিজ্ঞতাহীনতা দ্রুতই তাঁর বিরুদ্ধে যেতে পারে।
জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং ইরান বিশেষজ্ঞ ওয়ালি নাসর বলেন, ‘তিনি (পাহলভি) অন্তর্বর্তীকালীন নেতা এবং অন্তর্বর্তী পরিষদের কথা বলেন, কিন্তু সেই সরকারে কারা থাকবে, কারা নির্বাচনে দাঁড়াবে, প্রার্থী কারা—এসবের কোনো উত্তর নেই। ভিড় দেখে শাহের যুগে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবা এক জিনিস, কিন্তু বাস্তবে তিনি তা কীভাবে করবেন?’
বিশ্লেষকদের মতে, পাহলভিকে ঘিরে এই ঐক্যবদ্ধ হওয়া এটাই প্রমাণ করে যে, ইরানের ইসলামিক রিপাবলিক একটি কানাগলিতে এসে ঠেকেছে। দুর্নীতি ও বছরের পর বছর ধরে চলা নিষেধাজ্ঞায় অর্থনীতি ধসে পড়েছে এবং বেশ কিছু সংস্কারবাদী সরকার চেষ্টা করেও দেশটিকে একঘরে দশা থেকে মুক্তি দিতে পারেনি।
ইরানের তরুণ সমাজ রক্ষণশীল শাসন ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার অভাবে হাঁপিয়ে উঠেছে। আর সরকার যদি আগের মতো এবারও সহিংসভাবে বিদ্রোহ দমনে নামে, তবে তারা ট্রাম্পের রোষানলে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে।
ওয়ালি নাসর বলেন, ‘ইরানিরা পাহলভিকে বেছে নিচ্ছে কারণ তারা বর্তমান অবস্থা নিয়ে হতাশ, পাহলভি তাদের মাঝে খুব জনপ্রিয় বলে নয়।’
পাহলভি ইসলামিক রিপাবলিক পূর্ববর্তী যুগের সেই নস্টালজিয়াকে কাজে লাগাচ্ছেন। এ সপ্তাহে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে তিনি বলেন, ‘অনেক বয়স্ক ইরানি আজও আমার জন্মের সেই দিনটির কথা মনে করেন, যখন দেশজুড়ে উন্মাদনা ছিল। এখন ৬৫ বছর বয়সে… তরুণ ইরানিরা আমাকে বাবা বলে ডাকে। আর এটিই সবচেয়ে বড় পাওয়া।’
তামারা কিবলাভি সিএনএন-এর লন্ডন ব্যুরোর জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক
সিএনএন থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ: রাফসান গালিব