একটি ফটোকার্ড ধরে প্রথম আলোকে হেনস্তা কেন

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে করা মামলায় আদালতে নেওয়া হচ্ছে সাভারে কর্মরত প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক শামসুজ্জামানকে
ছবি : এএফপি

প্রথম আলোর অনলাইন প্রতিবেদন থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের জন্য তৈরি একটি ফটোকার্ডের ছবি ও উদ্ধৃতি নিয়ে সারা বাংলাদেশ এখন সরগরম। স্বাধীনতা দিবসে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদন থেকে ছবি ও উদ্ধৃতি নিয়ে কার্ডটি করা হয়েছিল। কার্ডটির ছবিটি ছিল জাতীয় স্মৃতিসৌধের সামনে দাঁড়ানো একটি শিশুর আর উদ্ধৃতিটি ছিল একজন দিনমজুরের মন্তব্য। এতে বিভ্রান্তি তৈরির ঝুঁকি থাকায় প্রথম আলো কর্তৃপক্ষ দ্রুতই ফেসবুক থেকে কার্ডটি সরিয়ে ফলে। অনলাইনের প্রতিবেদনে শিশু ও দিনমজুর দুজনের কথাই নামসহ আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, তাদের উদ্ধৃতিও আছে আলাদাভাবে। কার্ডটি সরিয়ে ফেলার সঙ্গে সঙ্গে বিভ্রান্তি এড়ানোর জন্য মূল প্রতিবেদনের সঙ্গে একটি সংশোধনীও যুক্ত করা হয়। এরপরও ফটোকার্ডটি ঘিরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিপন্ন, দেশের ভাবমূর্তি বিনষ্ট ইত্যাদি নানা অভিযোগ উঠেছে। ইতিমধ্যে একজন সাংবাদিক গ্রেপ্তার হয়েছেন। সম্পাদকের নামেও মামলা করা হয়েছে।

একজনের ছবি ও অন্যজনের উদ্ধৃতির কারণে ভুল–বোঝাবুঝি বিষয়টি প্রথম আলো স্বীকার করেছে এবং সংশোধনী দিয়েছে। মূল খবরে কোনো ভুল নেই, শুধু ফটোকার্ডের এই গরমিলটুকু ছাড়া। যাঁরা অনলাইন সাংবাদিকতা বিষয়ে সামান্য খোঁজখবর রাখেন, তাঁরা জানেন, কী প্রচণ্ড চাপের মুখে সংবাদপত্রকর্মীদের কাজ করতে হয়। প্রতিমুহূর্তে নতুন নতুন খবর আসছে, সে খবর পাঠকের কাছে সময়মতো পৌঁছে দেওয়ার জন্য রীতিমতো ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে হয় প্রতিবেদকদের, ব্যস্ত থাকতে হয় সম্পাদনা ডেস্কের কর্মীদের। অনলাইনের প্রতিটি খবর, ছবি, ক্যাপশন খোদ সম্পাদক বা বার্তা সম্পাদকের যাচাই-বাছাই করার সুযোগও থাকে না অনেক সময়। ফলে সেখানে সংবাদপত্রকর্মীদের যেকোনো মুহূর্তে ভুল হয়ে যেতে পারে। সেটি সংশোধন, দায় স্বীকারের সুযোগ আছে।

ছোট-বড় সব সংবাদপত্রই বার্তা পরিবেশনে ভুল করে থাকে। এর কোনোটি সাংবাদিকের ভুল, কোনোটি যার সূত্র উদ্ধৃত করে খবর পরিবেশিত হচ্ছে, তার ভুল। নিজের ভুল স্বীকার করা প্রতিটি সৎ সংবাদপত্রের দায়িত্ব। অনলাইন হলে ব্যাখ্যাসহ খবরটি প্রত্যাহার বা সংশোধনী অথবা মুদ্রিত কাগজে হলে ভ্রম সংশোধন, এটাই নিয়ম। সেখানে সঠিক দায়িত্বই পালন করেছে প্রথম আলো

উদাহরণ হিসেবে নিউইয়র্ক টাইমস–এর কথা ভাবা যাক। এটি সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় ও নির্ভরযোগ্য সংবাদপত্রের একটি। তো সেই টাইমস প্রতিদিন মূল পত্রিকায় কত–কী ভুল ছাপা হয়েছে, এক দিন পরের পত্রিকার পাতায় তার সবিস্তার বিবরণসহ ভ্রম সংশোধন প্রকাশ করে থাকে। যেমন আজকের (২৯ মার্চের) পত্রিকার ২৩ নম্বর পাতায় আন্তর্জাতিক থেকে মৃত্যুসংবাদে মোট ছয়টি ভুল স্বীকার করে সংশোধনী ছাপা হয়েছে।

একটি ফটোকার্ডকে পুঁজি করে প্রথম আলোর সম্পাদক ও সাংবাদিকের বিরুদ্ধে যে আইনের ভিত্তিতে মামলা হয়েছে, তা বাংলাদেশের সবচেয়ে বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে। দেশের ভেতরে-বাইরে অনেকেই এই আইনের সমালোচনা করেছেন।

যেসব ভুলের কথা বলা হচ্ছে, তার কোনোটাই আকাশ ভেঙে পড়ার মতো নয়। বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতায় বিজয়ী ঘোড়ার নাম কান্ট্রি হাউস, আর টাইমস ভুল করে লিখেছিল কান্ট্রি হর্স। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রথম স্ত্রীর নাম ইভাঙ্কা বলে তারা ছেপে দিয়েছিল, যদিও সে নাম হবে ইভানা। কিছুদিন আগে তারা জানিয়েছিল প্রতিটি টয়লেট সিটে প্রতি বর্গইঞ্চিতে ক্ষতিকর এমন ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা ৫০ মিলিয়ন। এক দিন পর ভ্রম সংশোধনের পর জানা গেল সঠিক সংখ্যা হবে ৫০।

মোদ্দা কথা, ভুল সবাই করে। গুরুত্বপূর্ণ হলো জানামাত্র সে ভুল সংশোধন করা হলো কি না। প্রথম আলো সঙ্গে সঙ্গে পদক্ষেপ নিয়েছে। এই ফটোকার্ডের কারণে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় কীভাবে? বাংলাদেশের ভাবমূর্তি এতই ঠুনকো?

আরও পড়ুন

২.

একটি ফটোকার্ডকে পুঁজি করে প্রথম আলোর সম্পাদক ও সাংবাদিকের বিরুদ্ধে যে আইনের ভিত্তিতে মামলা হয়েছে, তা বাংলাদেশের সবচেয়ে বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে। দেশের ভেতরে-বাইরে অনেকেই এই আইনের সমালোচনা করেছেন। এই আইনের আওতায় একজন লেখক পুলিশের হেফাজতে থাকা অবস্থায় মারা গেলে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক কমিশনার আইনটি সংশোধনের দাবি তোলেন। মানবাধিকার নিয়ে কাজ করে এমন একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থা এই আইনের বাতিল দাবি করেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের ২০২২ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে লিখেছে, সরকারের সমালোচনা করে এমন সাংবাদিক, লেখক বা রাজনৈতিক কর্মীদের ‘হয়রানি’ করার উদ্দেশ্যেই আইনটি ব্যবহৃত হয়। আল-জাজিরা বলেছে, এই আইনের উদ্দেশ্য সাংবাদিকদের ‘অপরাধী’ সাব্যস্ত করা।

 এই আইনের অধীন সবচেয়ে বেশি মামলার শিকার হয়েছেন রাজনীতিকেরা, তারপরই দেশের সংবাদমাধ্যমের কর্মীরা। সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ নামে একটি সংস্থা, যারা এই আইনের অপব্যবহারের হিসাব রাখে, তারা জানিয়েছে ২০২০-২১ সালে এই আইনের মাধ্যমে হয়রানির শিকার এমন রাজনীতিক ও সাংবাদিকের সংখ্যা, যথাক্রমে, ১৬৭ ও ১৬০। ঢাকার আইন ও সালিশ কেন্দ্র হিসাব করে বলছে, চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে ডিজিটাল আইনে হয়রানির সম্মুখীন হয়েছেন, এমন সাংবাদিকের সংখ্যা ২১ (https://www.askbd.org/ask/2023/03/06/journalist-harassment-jan-feb-2023/)।

আইনটি এমনভাবে তৈরি, যাতে চাইলে যেকোনো ব্যক্তি বা সংস্থার বিরুদ্ধে এর প্রয়োগ সম্ভব হয়। এই আইনের ২৫ ধারা খুবই বিপজ্জনক। সেখানে বলা আছে, দেশের ভাবমূর্তি বা সুনাম ক্ষুণ্ন হয় অথবা বিভ্রান্তির কারণ ঘটে, এমন তথ্য প্রচারের জন্য যে কেউ দোষী সাব্যস্ত হতে পারেন। এই দুই ধারার ভাষা থেকেই স্পষ্ট বিরোধী রাজনীতিক ছাড়া লেখক, বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিক—এই আইনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। বস্তুত, কাউকে হয়রানি করা যদি কারও উদ্দেশ্য হয়, এর চেয়ে ভালো অস্ত্র আর হতে পারে না। যিনি ‘ক্ষতিগ্রস্ত’ বোধ করছেন বা যঁার ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে, তাঁকে মামলা ঠুকতেও হবে না। যে কেউ সে তথ্য ব্যবহার করে মামলা ঠুকে দিতে পারেন। ঠিক যে কাজটি হয়েছে প্রথম আলোর গ্রেপ্তার করা সাংবাদিক শামসুজ্জামানের বিরুদ্ধে।

বাংলাদেশে নাগরিক অধিকার সংকুচিত হয়ে আসছে, এ কথা এখন অনেকেই বলেন। সংবাদপত্রকর্মীদের ওপর এই হামলা সেখানে বাক্‌স্বাধীনতার ওপর সর্বশেষ আঘাত। সংবাদপত্রের কাজ যাঁরা ক্ষমতাধর, তঁাদের কাজের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। অগ্রসর ও পরিণত গণতন্ত্রের দেশে এই দায়িত্ব পালনের সুযোগ বেশি। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের শাসনতন্ত্রের প্রথম সংশোধনীতেই মতপ্রকাশের ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ঘোষিত হয়েছে। দুর্বল গণতন্ত্রের দেশেও এই স্বাধীনতার স্বীকৃতি রয়েছে, কিন্তু সে স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার বাহানাও সে জানে। ভারতে, মতপ্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা শাসনতন্ত্রে স্বীকৃত হলেও সে স্বাধীনতা খর্বের লক্ষ্যে সন্ত্রাসবাদ ও রাষ্ট্রদ্রোহ নিয়ন্ত্রণের নামে এত আইন করে রেখেছে যার একটাই লক্ষ্য, কথা বলা ও মতপ্রকাশের অধিকার কেড়ে নেওয়া। ফল হয়েছে এই যে ভারত এখন সাংবাদিকদের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক একটি দেশ। ফ্রিডম হাউসের তালিকায় ভারত ‘অংশত মুক্ত’ একটি দেশ। বাংলাদেশের অবস্থা ভারতের চেয়েও খারাপ। ফ্রিডম হাউসের হিসাবে, ভারত যেখানে ১০০-এর ভেতর পেয়েছে ৬০ নম্বর, সেখানে আমাদের জুটেছে ৪৩।

আরও পড়ুন

আমাকে ঢাকার একজন নামজাদা সম্পাদক বলেছিলেন, এই আইনের কারণে তাঁদের সারাক্ষণ তটস্থ থাকতে হয়। এখন নিজের ছায়াটিকেও তিনি ভয় করেন। অন্য কথায়, এই আইনের উদ্দেশ্য যদি ভীতি সৃষ্টি হয়, তাহলে সে সফল। কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তা বা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সংরক্ষণ যদি এর উদ্দেশ্য হয়, তাহলে তা যে মোটেই পূরণ হচ্ছে না, তা বলাবাহুল্য। আগেই বলেছি, এই আইনের দুই প্রধান টার্গেট বিরোধী রাজনীতিক ও সংবাদপত্র। রাজনীতিকের জন্য এই আইন, বলা যায়, ‘প্রফেশনাল হ্যাজার্ড’। যে পেশা তিনি বেছে নিয়েছেন, তাতে জেল-জুলুম-মামলা আছে জেনেই তিনি রাজনীতি করেন। হয়রানির শিকার হলে তিনি ও তাঁর দল প্রতিবাদ সভা করতে পারেন, হরতাল ডাকতে পারেন, দেশজুড়ে তুলকালাম কাণ্ড করতে পারেন।

কিন্তু সাংবাদিক কী করবেন? 

৩১ মার্চ ২০২৩, নিউইয়র্ক

l হাসান ফেরদৌস প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন