আমেরিকা ও ইরানের সংঘর্ষ আবারও আরব উপসাগরীয় দেশগুলোর বড় দুর্বলতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।
যে জলপথ দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহন করা হয়, সেই হরমুজ প্রণালি ইরান ও আমেরিকার দ্বন্দ্বে কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে।
ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে। উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের দেশগুলোর তেল-গ্যাস রপ্তানি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তবে এই ক্ষতি সব দেশের ক্ষেত্রে একরকম হয়নি। কাতার, বাহরাইন ও কুয়েত সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে। কারণ তাদের রপ্তানির প্রায় পুরোটাই হরমুজের ওপর নির্ভরশীল।
অন্যদিকে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত কিছুটা চাপ সামলাতে পেরেছে। তারা যথাক্রমে ইয়ানবু ও ফুজাইরাহ বন্দরের মাধ্যমে বিকল্প পথে কিছু তেল সরিয়ে নিতে পেরেছে। কিন্তু এই পথগুলোর ক্ষমতা সীমিত। হরমুজের সম্পূর্ণ বিকল্প হওয়ার মতো শক্তি তাদের নেই।
সংঘর্ষ শেষ হয়ে গেলেও সমস্যার শেষ হচ্ছে না। ভবিষ্যতে আবার এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে উপসাগরীয় দেশগুলো নিশ্চিত করে বলতে পারবে না যে তারা নিরবচ্ছিন্নভাবে জ্বালানি সরবরাহ করতে পারবে।
কারণ সাম্প্রতিক সংঘর্ষে পরিষ্কার হয়ে গেছে, হরমুজ প্রণালি ইরানের কৌশলগত অস্ত্রের অন্যতম ভিত্তি। আমেরিকার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে এই পথকে ইরান ভবিষ্যতেও ব্যবহার করবে, এমন সম্ভাবনাই প্রবল।
এই অনিশ্চয়তাকেই এখন ‘হরমুজ সংকট’ বলা হচ্ছে। এই সংকট শুধু উপসাগরীয় দেশগুলোর সংকট নয়, এটি এশিয়ার জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোর মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে। তাই বিকল্প ভাবনা শুরু হয়েছে।
কোথাও কৌশলগত তেল মজুত বাড়ানোর কথা ভাবা হচ্ছে। কোথাও নতুন বাজার ও নতুন সরবরাহপথ খোঁজা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতেই পাকিস্তান একটি নতুন প্রস্তাব সামনে আনতে পারে। তারা উপসাগরীয় দেশগুলোকে নিজেদের ভূখণ্ডে তেল ও গ্যাস সংরক্ষণের সুবিধা ভাড়া দেওয়ার কথা ভাবছে। এর মূল লক্ষ্য, হরমুজ বন্ধ থাকলেও যাতে ক্রেতারা বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি পেতে পারে।
পরিকল্পনাটি এমন—কাতারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস, আমিরাতের তেল, বাহরাইনের পেট্রোলিয়াম পণ্য, এমনকি সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেলও পাকিস্তানের উপকূলবর্তী অঞ্চলে সংরক্ষণ করা হবে।
প্রয়োজন হলে সেগুলো গওয়াদার, পোর্ট কাসিম বা অন্য জ্বালানি কেন্দ্র থেকে সরবরাহ করা যাবে।
দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, চিনের মতো বড় এশীয় ক্রেতাদের কাছে এটি এক ধরনের নিরাপত্তা বলয় তৈরি করবে। ভবিষ্যতে হরমুজ ঘিরে সংঘাত হলেও তারা সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হবে না। পাকিস্তানে থাকা এই মজুত যেন এক ধরনের বিমার মতো কাজ করবে।
পাকিস্তানের অবস্থান এই পরিকল্পনার জন্য বিশেষ সুবিধাজনক। সাম্প্রতিক এক শরও বেশি দিনের সংঘর্ষে দেখা গেছে, তারা ইরান ও উপসাগরীয় দেশ—দু’পক্ষের সঙ্গেই সুসম্পর্ক বজায় রাখতে পেরেছে।
ফলে ভবিষ্যতে কোনো সংঘাত হলেও ইরান পাকিস্তানের ভেতরে থাকা এই মজুতকে সহজে লক্ষ্যবস্তু করবে না, এমন ধারণা করা যায়। কূটনৈতিক ভারসাম্য ও প্রতিরোধ ক্ষমতার নিরিখে পাকিস্তান একটি গ্রহণযোগ্য ভরসাস্থল হতে পারে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য এই ব্যবস্থা অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। এতে তারা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আশ্বস্ত করতে পারবে যে, হরমুজে সমস্যা হলেও সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হবে না। চুক্তি রক্ষা করা সহজ হবে।
অতীতে যেমন বাধ্য হয়ে অনেক দেশ ‘ফোর্স মাজোর’ ঘোষণা করেছিল, সেই পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা, এতে সংঘর্ষের অঞ্চলের বাইরে একটি দ্বিতীয় রপ্তানি প্ল্যাটফর্ম তৈরি হবে। জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আসবে। একটিমাত্র জলপথের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে।
পাকিস্তানের দিক থেকেও লাভ কম নয়। এতে তাদের উপসাগরীয় দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্ক নতুন মাত্রা পাবে।
শুধু নিরাপত্তা নয়, জ্বালানি, অবকাঠামো, বন্দর ব্যবস্থাপনা ও সামুদ্রিক সহযোগিতার মতো ক্ষেত্রেও সহযোগিতা বাড়বে। পাকিস্তান নিজেকে একটি পূর্ণাঙ্গ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারবে।
সব মিলিয়ে হরমুজের সংকট শুধু একটি বিপদ নয়, নতুন চিন্তার সুযোগও তৈরি করেছে। হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের প্রধান ধমনি হিসেবেই থাকবে, কিন্তু একে ঘিরে নির্ভরশীলতা যে ঝুঁকিপূর্ণ, তা সাম্প্রতিক ঘটনাই প্রমাণ করেছে।
এই পরিকল্পনা পাকিস্তানের বৃহত্তর ভূ-অর্থনৈতিক লক্ষ্যের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিদেশি বিনিয়োগ আসতে পারে। গওয়াদার বন্দর একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
সংরক্ষণাগার, পাইপলাইন, পরিশোধনাগার—সব মিলিয়ে নতুন শিল্প পরিকাঠামো তৈরি হবে। কর্মসংস্থান বাড়বে। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুন পথ খুলবে। সিন্ধু ও বেলুচিস্তানের মতো অঞ্চলেও অর্থনৈতিক গতি আসতে পারে।
তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য জমি, পরিকল্পনা, অনুমোদন ও কেন্দ্র-প্রদেশের সমন্বয়—সবই প্রয়োজন। অতীতে পাকিস্তানের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বহু বড় প্রকল্পকে ধীর করে দিয়েছে। এই সমস্যা কাটিয়ে ওঠাই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
সব মিলিয়ে হরমুজের সংকট শুধু একটি বিপদ নয়, নতুন চিন্তার সুযোগও তৈরি করেছে। হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের প্রধান ধমনি হিসেবেই থাকবে, কিন্তু একে ঘিরে নির্ভরশীলতা যে ঝুঁকিপূর্ণ, তা সাম্প্রতিক ঘটনাই প্রমাণ করেছে।
এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তান যদি নিজেদের ভূখণ্ডকে কৌশলগত সংরক্ষণকেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরতে পারে, তবে তা একসঙ্গে উপসাগরীয় দেশ, এশীয় ক্রেতা এবং পাকিস্তান—তিন পক্ষেরই উপকারে আসতে পারে।
খুররম আব্বাস আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক।
ডন থেকে নেওয়া
ইংরেজি থেকে অনূদিত।