দশকের পর দশক ধরে পাকিস্তানি পাসপোর্টে একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ বাক্য লেখা থাকত: ‘ইসরায়েল ছাড়া বিশ্বের সব দেশের জন্য বৈধ।’ এই অবস্থান কেবল একটি কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের অন্যতম মৌলিক পররাষ্ট্রনীতির প্রতিফলন: পাকিস্তান ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয় না।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই নীতির শিকড় গড়ে উঠেছে। গভীর ধর্মীয় অনুভূতি, সংবেদনশীল গণমাধ্যম পরিবেশ, ধারাবাহিকভাবে সরকারগুলোর এ বিষয়ে চ্যালেঞ্জ না করার প্রবণতা এবং ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাতকে একটি ঐতিহাসিক অবিচার হিসেবে দেখার জাতীয় ঐকমত্য—সব মিলিয়ে এই নীতি আরও দৃঢ় হয়েছে। কিন্তু এখন এই দীর্ঘস্থায়ী ঐকমত্য একটি নজিরবিহীন বাহ্যিক পরীক্ষার মুখোমুখি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের অবসান ঘটানোর জন্য প্রস্তাবিত একটি শান্তিচুক্তির সঙ্গে আব্রাহাম চুক্তির বাধ্যতামূলক ও ব্যাপক সম্প্রসারণের বিষয়টি যুক্ত করেছেন। আব্রাহাম চুক্তি ছিল ইসরায়েল এবং কয়েকটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের একগুচ্ছ সমঝোতা, যার মধ্যে ছিল সংযুক্ত আরব আমিরতা ও বাহরাইন। ২০২০ সালে ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসনের সময় যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় এসব চুক্তি সম্পন্ন হয়। পরে মরক্কো ও সুদান এই কাঠামোয় যোগ দেয়।
পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানসহ আঞ্চলিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন যে পাকিস্তান, সৌদি আরব, কাতার, তুরস্কসহ অন্যান্য দেশকে ‘একযোগে’ আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ দিতে হবে, যাতে একটি ঐতিহাসিক আঞ্চলিক সমঝোতা সুসংহত হয়। ট্রাম্প লিখেছেন, ‘এটি শুরু হওয়া উচিত সৌদি আরব ও কাতারের তাৎক্ষণিক স্বাক্ষরের মাধ্যমে, এরপর অন্য সবাইকে একই পথ অনুসরণ করতে হবে।’
ইসলামাবাদ দ্রুত এই ধারণা প্রত্যাখ্যান করে। ২৬ মে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মোহাম্মদ আসিফ বলেন, পাকিস্তান এমন কোনো ব্যবস্থার অংশ হতে পারে না, যা তার ‘মৌলিক আদর্শের’ সঙ্গে সাংঘর্ষিক। একটি পাকিস্তানি টেলিভিশন চ্যানেলকে তিনি বলেন, ‘এ মুহূর্তে এ বিষয়ে আমরা কোনো উদ্যোগ নিইনি এবং কেউ আমাদের কাছে এ ধরনের কোনো অনুরোধও করেনি।’
এ ঘটনা পাকিস্তানে দীর্ঘদিন ধরে মাঝেমধ্যে আলোচিত হলেও খুব কমই রাজনৈতিক গতি পাওয়া একটি বিতর্ককে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে: ইসলামাবাদ কি কখনো ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিতে পারে এবং দিলে কোন পরিস্থিতিতে?
পাকিস্তান কেন ‘না’ বলে
রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে ইসরায়েল প্রশ্নে পাকিস্তানের অবস্থান প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। বেসামরিক ও সামরিক—উভয় ধরনের সরকারই ধারাবাহিকভাবে বলে এসেছে যে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার পূর্বশর্ত হলো ১৯৬৭ সালের পূর্ববর্তী সীমান্তের ভিত্তিতে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, যার রাজধানী হবে পূর্ব জেরুজালেম। পররাষ্ট্রনীতির অনেক বিষয়ে সরকারগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও এই প্রশ্নে উল্লেখযোগ্য ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে।
জানুয়ারিতে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দরাবি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ‘বোর্ড অব পিস’ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে আবার ইসলামাবাদের অবস্থান তুলে ধরেন। এই বোর্ডের উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধপরবর্তী গাজার তদারকি করা। আন্দরাবি বলেন, ‘কোন দেশ আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ দেবে বা দেবে না, তা নিয়ে আমাদের কোনো সমস্যা নেই। আমরা বিষয়টিকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি।’
বিশ্লেষকদের মতে, এই নীতি কেবল কূটনৈতিক বিবেচনায় নয়, বরং শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতার দ্বারাও নির্ধারিত। ইসলামাবাদভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চ কাউন্সিল ফর রিলিজিয়াস অ্যাফেয়ার্সের প্রধান মোহাম্মদ ইসরার মাদানি মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই–কে বলেন, ‘আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ দেওয়া উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর বিপরীতে পাকিস্তান একটি অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশে পরিচালিত হয়, যেখানে জনমত, ইসলামপন্থী দল, জিহাদি গোষ্ঠী, সংসদ, নাগরিক সমাজ এবং সক্রিয় গণমাধ্যম—সবাই পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বিতর্কে প্রভাব বিস্তার করে।’
ইসলামের পবিত্রতম স্থানগুলোর তত্ত্বাবধায়ক এবং পাকিস্তানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে রিয়াদের পদক্ষেপ ইসলামাবাদে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব বহন করে। এই সম্পর্ক কেবল কূটনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানকে আর্থিক সহায়তা, বিনিয়োগ, লাখো পাকিস্তানি শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং ব্যাপক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা প্রদান করে আসছে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের রাজনৈতিক মূল্য ‘বেশির ভাগ আরব দেশের তুলনায় পাকিস্তানে অনেক বেশি।’ তিনি বলেন, ‘যেকোনো সরকারকে যদি ফিলিস্তিনি আন্দোলন পরিত্যাগ করেছে বলে মনে করা হয়, তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল এবং জনসাধারণের বড় একটি অংশের প্রতিরোধের মুখে পড়তে হবে।’
বিষয়টি আরও জটিল হয়ে ওঠে কাশ্মীর প্রশ্নে পাকিস্তানের অবস্থানের কারণে। দশকের পর দশক ধরে পাকিস্তানি নীতিনির্ধারকেরা ফিলিস্তিনি ও কাশ্মীরি জনগণের সংগ্রামের মধ্যে সাদৃশ্য টেনে আসছেন। উভয় বিষয়কেই তারা আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। অনেক বিশ্লেষকের মতে, ফিলিস্তিনি প্রশ্নের কোনো সমাধান ছাড়াই ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিলে ইসলামাবাদকে নীতিগত অসংগতির অভিযোগের মুখে পড়তে হবে এবং তাদের কূটনৈতিক বয়ানের অন্যতম প্রধান ভিত্তি দুর্বল হয়ে যাবে।
ওয়াশিংটনের চাপ
ট্রাম্পের সর্বশেষ প্রস্তাব আরও এক ধাপ এগিয়ে গেছে। তিনি ভবিষ্যতের আঞ্চলিক কূটনীতি, যার মধ্যে ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতাও রয়েছে, সেটাকে একটি সম্প্রসারিত সম্পর্ক-স্বাভাবিকীকরণ কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করেছেন। বিশেষ করে গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যা নিয়ে চলমান ক্ষোভের প্রেক্ষাপটে মুসলিম বিশ্বের বড় অংশ এই প্রস্তাবকে সন্দেহের চোখে দেখেছে।
আব্রাহাম চুক্তি ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ থেকেই তাঁর মধ্যপ্রাচ্য কৌশলের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এই উদ্যোগের সবচেয়ে জোরালো সমর্থকদের একজন হলেন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম, যিনি কংগ্রেসে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্রদের একজন। গ্রাহাম প্রকাশ্যে যুক্তি দিয়েছেন যে সৌদি আরব, কাতার ও পাকিস্তানের আব্রাহাম চুক্তিকে সমর্থন করা উচিত। তিনি এই চুক্তির সম্প্রসারণকে ‘অঞ্চল এবং বিশ্বের জন্য রূপান্তরমূলক পরিবর্তনেরও ঊর্ধ্বে’ বলে বর্ণনা করেছেন।
২৪ মে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে গ্রাহাম সতর্ক করে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রস্তাবিত এই পথে যদি আপনারা যেতে অস্বীকার করেন, তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ওপর এর গুরুতর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং এই শান্তি প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য থাকবে না। এ ছাড়া ইতিহাসও এটিকে একটি বড় ধরনের ভুল সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করবে।’
এই বিতর্ক এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান সম্পর্ক একটি সংবেদনশীল পর্যায়ে রয়েছে। ইসলামাবাদ একদিকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে কূটনৈতিক সেতুবন্ধ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে সৌদি আরব ও চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও বজায় রাখছে। সিনেটর গ্রাহামের মতো কিছু মার্কিন আইনপ্রণেতা ও বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলেছেন, পাকিস্তান ইসরায়েলের বিরোধিতায় অনড় থেকে কীভাবে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে পারে।
তবে পাকিস্তানি নীতিনির্ধারকদের কাছে আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ দেওয়া নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করবে। ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিলে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক জটিল হয়ে উঠতে পারে, দেশে অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে এবং ইসলামাবাদের অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে গড়ে তোলা আঞ্চলিক কূটনৈতিক ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত আসিফ দুররানি বলেন, ‘জবরদস্তি বা লেনদেনভিত্তিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে আব্রাহাম চুক্তিকে টেকসই করা সম্ভব নয়।’ দুররানির মতে, দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক শান্তির জন্য প্রয়োজন ‘বিশ্বাসযোগ্য কূটনীতি, পারস্পরিক নিরাপত্তা নিশ্চয়তা, ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা হ্রাস এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নে অর্থবহ অগ্রগতি;’ চাপ প্রয়োগ বা আঞ্চলিক অংশীদারদের ওপর দায় চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা নয়।
প্রবীণ পাকিস্তানি সাংবাদিক হামিদ মীরও এক্সে মন্তব্য করেছেন যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ দিতে অস্বীকৃতির কারণে তিনি অসন্তুষ্ট। তবে কিছু বিশ্লেষক সতর্ক করেছেন যে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক উষ্ণ হওয়ার অর্থ এই নয় যে পাকিস্তান ইসরায়েল বিষয়ে তার নীতি পরিবর্তন করবে। তাঁরা উল্লেখ করেন, চীন, আফগানিস্তান ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ইস্যুতে ওয়াশিংটনের চাপ থাকা সত্ত্বেও ইসলামাবাদ ঐতিহাসিকভাবে স্বাধীন অবস্থান বজায় রেখেছে।
ইসলামাবাদভিত্তিক এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এসব সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে অবগত। সম্ভবত এ কারণেই তিনি স্বীকার করেছেন যে শেষ পর্যন্ত এক বা দুটি দেশ আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। পাকিস্তানকে এমন সম্ভাব্য দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম হিসেবে দেখা হচ্ছে।’
সৌদি আরবের প্রভাব
পাকিস্তান জোর দিয়ে বলে যে তার পররাষ্ট্রনীতি স্বাধীন ও সার্বভৌম সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। তবে বিশ্লেষকদের ব্যাপক মত হলো, ইসরায়েল বিষয়ে ভবিষ্যতে কোনো পরিবর্তন এলে তা সৌদি আরবের অবস্থানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত হবে। ইসলামের পবিত্রতম স্থানগুলোর তত্ত্বাবধায়ক এবং পাকিস্তানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে রিয়াদের পদক্ষেপ ইসলামাবাদে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব বহন করে। এই সম্পর্ক কেবল কূটনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানকে আর্থিক সহায়তা, বিনিয়োগ, লাখো পাকিস্তানি শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং ব্যাপক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা প্রদান করে আসছে।
গত সেপ্টেম্বরে স্বাক্ষরিত একটি নিরাপত্তা চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশ তাদের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করেছে। ওই চুক্তিতে বলা হয়েছে, একটি দেশের ওপর হামলাকে উভয় দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। যদিও এই অঙ্গীকারের বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে বিভিন্ন ব্যাখ্যার সুযোগ রয়েছে, তবু এটি তাদের কৌশলগত অংশীদারত্বের গভীরতাকেই তুলে ধরে।
এই প্রেক্ষাপটে অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, ইসরায়েল প্রশ্নে সৌদি আরবের অবস্থান পাকিস্তানে সম্ভাব্য সম্পর্ক-স্বাভাবিকীকরণ নিয়ে যেকোনো বিতর্ককে গভীরভাবে প্রভাবিত করবে। আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন যে রিয়াদ যদি আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ দেয়, তাহলে পাকিস্তান ‘অবস্থান পুনর্বিবেচনার চাপ অনুভব করতে পারে’। তবে তিনি এক্সে সতর্ক করে লিখেছেন, ‘বর্তমান জনমতের অবস্থান বিবেচনায় নিলে, কোনো পাকিস্তানি সরকার যদি এই চুক্তিতে যোগ দেয়, তাহলে তা কার্যত রাজনৈতিক আত্মহত্যার ঝুঁকি নেবে।’
এমন পরিস্থিতিতেও সৌদি আরব এখনো জোর দিয়ে বলছে যে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণকে অবশ্যই দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের একটি বিশ্বাসযোগ্য পথের সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে। এই অবস্থান মূলত পাকিস্তানের নিজস্ব অবস্থানেরই প্রতিফলন।
গাজা-সংক্রান্ত প্রভাব
২০২৩ সালের অক্টোবরের আগে যদি ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ রাজনৈতিকভাবে কঠিন হয়ে থাকে, তাহলে গাজা যুদ্ধ সেটিকে আরও অনেক বেশি কঠিন করে তুলেছে। সংঘাত শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্র সক্রিয়ভাবে সৌদি আরবকে আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ দেওয়ার জন্য উৎসাহিত করছিল। অনেক বিশ্লেষক মনে করছিলেন যে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা ক্রমশ বাড়ছে। এমন কোনো অগ্রগতি ঘটলে মুসলিম বিশ্বে রিয়াদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রভাবের কারণে পাকিস্তানের ওপরও ইসরায়েল বিষয়ে নিজের অবস্থান পুনর্বিবেচনার জন্য উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি হতো।
কিন্তু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরায়েলে হামাসের নেতৃত্বে পরিচালিত হামলা এবং এরপর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান সেই সম্ভাবনাকে নাটকীয়ভাবে বদলে দেয়। যুদ্ধ কার্যত সৌদি-ইসরায়েল সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ নিয়ে চলমান আলোচনা স্থগিত করে দেয়। গাজায় বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা বাড়তে থাকায় এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের দৃশ্য আঞ্চলিক গণমাধ্যমে প্রধান স্থান দখল করায় মুসলিম বিশ্বের বড় অংশে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রতি সমর্থন দ্রুত কমে যায়।
এই সংঘাত পাকিস্তানেও জনমতকে আরও কঠোর করে তোলে। ২০২৩ সালে পরিচালিত ‘গ্যালাপ পাকিস্তান’ জরিপ অনুযায়ী, ৯১ শতাংশ পাকিস্তানি গাজার ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেন, যেখানে মাত্র ২ শতাংশ ইসরায়েলের প্রতি সহানুভূতি দেখান। ধর্মীয় সংগঠন, মূলধারার রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজের বিভিন্ন সংগঠন এই যুদ্ধকে এমন একটি প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছে যে একটি কার্যকর ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নিশ্চয়তা ছাড়া ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ নৈতিক ও রাজনৈতিক—উভয় দিক থেকেই অগ্রহণযোগ্য হবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে পাকিস্তান তার অবস্থান পরিবর্তন করবে বলে মনে হয় না।
সম্প্রসারিত আব্রাহাম চুক্তি কাঠামো নিয়ে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক আহ্বান এবারই প্রথম নয় যে ইসলামাবাদকে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে। আঞ্চলিক ভূরাজনীতির পরিবর্তন এবং সময়ে সময়ে নীতিগত পরিবর্তনের জল্পনা সৃষ্টি হলেও সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে বজায় থাকা পাকিস্তানের এই ‘রেডলাইন’ এখনো দৃঢ়ভাবে অটুট রয়েছে।
জিয়া উর রহমান ইসলামাবাদভিত্তিক সাংবাদিক
মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ।