নরেন্দ্র মোদি সরকার এবং ভারতীয় জনতা পার্টি যেভাবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে সুরক্ষা দিয়েছে এবং তাকে বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের কাছে পৌঁছানোর অযোগ্য করে তুলেছে, তা দেশকে এক অসাধারণ সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন ধারণা ও সৃজনশীলতার প্রয়োজন। এই অসাংবিধানিক সুরক্ষা জ্ঞানেশ কুমারকে আরও দুর্বল করলেও বিরোধী দলগুলোর জন্য কাজটিকে বেশি চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছে। সম্প্রতি দেশজুড়ে যে প্রতিবাদ দেখা যাচ্ছে, তাকে এই পটভূমিতেই দেখতে হবে।
প্রশ্ন হলো, কেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার মোদি সরকারের বিরোধীদের সঙ্গে দেখা করতে অস্বীকার করছেন? এই প্রথম নির্বাচন কমিশন বিরোধী নেতাদের সঙ্গে দেখা করতে প্রটোকল বা শিষ্টাচারের অজুহাত দিয়েছে। জ্ঞানেশ কুমার তাদের নির্দিষ্ট প্রতিনিধি পাঠাতে বলেছেন এবং সাক্ষাতের জন্য একাধিক শর্ত দিয়েছেন। বিরোধী নেতাদের সঙ্গে দেখা করতে তাঁর এই অনীহা কমিশনকে মোদি-শাহ নেতৃত্বের অধীনে থাকা কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার অংশ বলে প্রমাণ করে।
যখন রাজনৈতিক দলের প্রধান এবং বিরোধী দলনেতাসহ প্রায় তিন শ সংসদ সদস্য রাস্তায় ছিলেন, তখন কমিশন পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করার কথা জানাতে দ্বিধা করেনি। যেন পুলিশ নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে প্রধান অংশীদারদের মধ্যস্থতা করতে পারে।
এই মনোভাব দেখায় যে ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটি ভোটার বাদ দেওয়া কেবল একটি বিচ্ছিন্ন দুর্নীতি নয়; কমিশন হিন্দুত্ববাদী শক্তির কর্তৃত্ববাদী লক্ষ্য অর্জনে সাহায্য করছে। মুসলিম, নারী ও বঞ্চিত সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করতে তথ্যপ্রযুক্তির বড় আকারের ব্যবহার ইঙ্গিত দেয়, স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর একটি প্রযুক্তি-ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র তৈরির চেষ্টা।
অনেকে মনে করেন, মুসলিমদের বাদ দেওয়া কেবল বিজেপির নির্বাচনী হিসাবের অংশ। এটি একটি ফ্যাসিবাদী চক্রান্তের অত্যন্ত সরল বিশ্লেষণ। মূল উদ্দেশ্য হলো এই সম্প্রদায়কে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করা। এটি মুসলিমদের নিজ দেশে পরবাসী করার হিন্দুত্ববাদী প্রকল্পের অংশ।
এই শব্দটির মাধ্যমে এমন একটি ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রকে বোঝানো হয়, যেখানে স্বৈরাচারী শাসকেরা অদৃশ্য থাকেন এবং প্রযুক্তি মূল কাজ পরিচালনা করে। কম্পিউটার সাধারণ কাজগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেয়।
এ অবস্থা কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়, তা নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন ওঠে। কেবল জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করে কি এই শাসনের বিরুদ্ধে উপযুক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব? রাজপথের উত্তাপ কি প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রভাবিত করতে পারবে? শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ তাঁদের কতটা কম প্রভাবিত করেছিল তা আমরা দেখেছি। তাঁদের কাজের ধরন বা উপায়ে খুব কম পরিবর্তন এসেছে।
বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে পেলেট গান ব্যবহারের বিষয়ে জবাব দিতে না চাওয়ায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পুরো সংসদ অধিবেশন এড়িয়ে গেছেন। বিচার বিভাগও খুব একটা সাহায্য করতে পারেনি। মোদি সহজেই জ্ঞানেশ কুমারকে সরে যেতে বলতে পারেন। এতে একজন ছোট খেলোয়াড়কে বলি দিয়ে তাঁরা বেঁচে যাবেন। বিক্ষোভকারীদের আসল চ্যালেঞ্জ হলো এই শাসনের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলা।
কিছু রাজনৈতিক দল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পদত্যাগ দাবি করতে দ্বিধা করছে। তবে কমিউনিস্ট এবং কংগ্রেসের মধ্যে কোনো বিভ্রান্তি নেই। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে ইতিমধ্যে লোকসভা ও রাজ্য বিধানসভাগুলো ভেঙে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীন সব নির্বাচনই অবৈধ। বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর বক্তব্য শাসনব্যবস্থার অভিনব উপস্থাপনের জন্য মনোযোগ পাওয়ার যোগ্য।
তিনি এই শাসনকে ভারতীয় গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী একটি গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই গোষ্ঠীতে রয়েছে করপোরেট সংস্থা গৌতম আদানি, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের মোহন ভাগবত, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ধরে রাখা নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ ও অজিত দোভাল এবং সংবিধানের একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের প্রধান জ্ঞানেশ কুমার।
হিন্দুত্ববাদী শক্তির দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে জ্ঞানেশ কুমার দৃঢ়তার সঙ্গে কাজ করেছেন। তাঁরা ভারতীয় রাজনীতিকে এমনভাবে গঠন করতে চেয়েছিলেন, যাতে মুসলিমদের কোনো কণ্ঠস্বর না থাকে। হিন্দু মহাসভা এবং অন্যান্য হিন্দুত্ববাদী সংগঠন সর্বজনীন ভোটাধিকারের বিরোধিতা করেছিল। স্বাধীন ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের আগে তারা ভোটার নিবন্ধনের আগে কঠোর যাচাইয়ের দাবি করেছিল। এটি বিনায়ক দামোদর সাভারকরের আদর্শ থেকে এসেছে। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ সংখ্যালঘুদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করার এজেন্ডা কখনোই ত্যাগ করেনি। মোদি সরকার জ্ঞানেশ কুমারের সাহায্যে গোপনে এই এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছিল।
সংবিধান মানার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী মোদির দ্বিধাদ্বন্দ্বপূর্ণ আচরণ থেকে তাঁর আসল উদ্দেশ্য বোঝা যায়। নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনকে নিয়ন্ত্রণ করার সিদ্ধান্তকে কেবল নির্বাচনী সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এটি ছিল নির্বাচনের ফলাফল ইচ্ছামতো তৈরি করার জন্য পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করার একটি পরিকল্পিত পদক্ষেপ। তিনি প্রতিটি নির্বাচনের ফলাফলকে জনগণের সমর্থন হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তবে তিনি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বৈধতা চেয়েছেন। লোকসভায় ধর্মীয় তাৎপর্যপূর্ণ রাজদণ্ড সেঙ্গল স্থাপন করার ঘটনা আমরা দেখেছি। এটি সংবিধানের স্পষ্ট লঙ্ঘন হলেও তিনি তা ঢাকঢোল পিটিয়ে করেছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী কেন একটি প্রাচীন ধর্মীয় প্রতীক থেকে তার কর্তৃত্ব খুঁজবেন? তাঁর কাছে নির্বাচন একটি দ্বিতীয় পর্যায়ের বৈধতামাত্র।
এসআইআর এবং নির্বাচনপ্রক্রিয়ার অন্যান্য বিকৃতির শিকড় ঔপনিবেশিক আমলে রয়েছে। ঔপনিবেশিক শাসকেরা কখনো সর্বজনীন ভোটাধিকার পছন্দ করেননি। তাঁরা কেবল অনুগত অল্প কিছু মানুষকে ভোটাধিকার দিয়েছিলেন। যোগ্যতা নির্ধারণ করা হতো সম্পত্তি, কর দেওয়ার ক্ষমতা এবং শিক্ষার ভিত্তিতে।
মুসলিম লীগ এবং হিন্দু মহাসভার মতো সাম্প্রদায়িক সংগঠনগুলো কখনো প্রকৃত অর্থে প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার সমর্থন করেনি। লীগ যদি হিন্দু আধিপত্যের আশঙ্কায় ধর্মীয় ভিত্তিতে সুরক্ষার দাবি করে থাকে, তবে হিন্দু মহাসভা তথাকথিত মুসলিম তোষণের বিরুদ্ধে প্রচার চালিয়েছিল। তারা সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার প্রতিটি চেষ্টার বিরোধিতা করেছিল।
এসআইআর ও ঔপনিবেশিক গণনা প্রক্রিয়ার মধ্যে অনেক মিল রয়েছে। ভোটার তালিকায় প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় দলিলের তালিকা দেখলে এটি স্পষ্ট হয়। উভয় প্রক্রিয়াই সম্পত্তি ও শিক্ষাভিত্তিক যোগ্যতা তৈরি করে। প্রাথমিক পর্যায়ে আধার কার্ড বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত সন্দেহ তৈরি করে যে কমিশন দরিদ্র ও গৃহহীন মানুষকে তালিকার বাইরে রাখতে চেয়েছিল। কারণ, আধার কার্ডই তাঁদের কাছে সহজে পাওয়া একমাত্র দলিল ছিল। দিল্লি, মুম্বাই, চেন্নাই এবং উত্তর কলকাতায় ভোটার বাদ পড়ার হার ছিল যথাক্রমে ৩৩, ৩৫, ৩৫ ও ২৬ শতাংশ।
এসআইআর যেভাবে মুসলিমদের লক্ষ্য করেছে, তা ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। দেশজুড়ে ভোটার তালিকা থেকে মুসলিমদের পরিকল্পিতভাবে বাদ দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে। মূলত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাগুলোকে লক্ষ্য করা হয়েছে। অনুপ্রবেশকারীদের হটানোর কথা বলে নির্বাচন কমিশন ভাষা ব্যবহার করেছে, যা ভারতীয় জনতা পার্টি ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের ভাষারই প্রতিফলন। বিহার বা পশ্চিমবঙ্গে উল্লেখযোগ্য কোনো অনুপ্রবেশকারী পাওয়া যায়নি। তবু এই অজুহাতে মুসলিমদের বাদ দেওয়া হয়েছে।
অনেকে মনে করেন, মুসলিমদের বাদ দেওয়া কেবল বিজেপির নির্বাচনী হিসাবের অংশ। এটি একটি ফ্যাসিবাদী চক্রান্তের অত্যন্ত সরল বিশ্লেষণ। মূল উদ্দেশ্য হলো এই সম্প্রদায়কে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করা। এটি মুসলিমদের নিজ দেশে পরবাসী করার হিন্দুত্ববাদী প্রকল্পের অংশ।
এ কারণে প্রশ্ন উঠছে, একটি প্রযুক্তি-ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে কেবল নির্বাচন কমিশনারের অপসারণের দাবি তুলে কি জয় পাওয়া সম্ভব?
অনিল সিনহা ভারতের একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক
দ্য ওয়্যার থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত।