এ বছরের ২ অক্টোবর ছিল অন্য রকম। ‘ভোট চুরি’র বিরুদ্ধে আন্দোলন নরেন্দ্র মোদি সরকারকে বড় ধাক্কা দিয়েছে। এতে এই সরকারের একনিষ্ঠ সমর্থকেরা বেশ অস্বস্তিতে পড়েছেন।
২০১৪ সালের মে মাসে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী ‘জাতির জনক’কে কার্যত স্বচ্ছ ভারত অভিযানের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রেখেছেন। এই প্রচারাভিযানে মহাত্মা গান্ধীর যে প্রতীকী অবয়ব ব্যবহার করা হয়েছে, তা দিয়ে তাঁর একটি দিক তুলে ধরা হয়েছে, আড়াল করা হয়েছে তাঁর অন্য অবদানগুলো।
কিন্তু এবার বিরোধীরা মহাত্মার জন্মবার্ষিকীকে অন্য ধরনের ‘স্বচ্ছতা অভিযান’ চালানোর উপলক্ষ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। বিতর্কিত প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিতে চলমান আন্দোলনকে এই দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখা উচিত।
জ্ঞানেশ কুমারকে সরানো না হলে পরবর্তী লক্ষ্য হতে পারেন মোদি
বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ ও জেন–জির বার্তা স্পষ্ট: প্রধানমন্ত্রী মোদির মনোনীত ব্যক্তিরা ভারতের নির্বাচন কমিশন নিয়ন্ত্রণ করতে থাকলে দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। দিল্লির যন্তর মন্তর ও মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্কের বিক্ষোভ থেকে যে বার্তা পাওয়া যাচ্ছে, তা হলো প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে দ্রুত সরানো না হলে পরবর্তী লক্ষ্য হবেন মোদি।
বস্তুত, বিরোধীরা ‘জ্ঞানেশগেট’কে মোদির জন্য ওয়াটারগেটে পরিণত করতে চান। তাঁদের দৃঢ় বিশ্বাস, এই ঘটনায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার যদি ‘সহ–অভিযুক্ত’ হন, তাহলে মোদি ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ হলেন ‘প্রধান অভিযুক্ত’। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির জেরে রিচার্ড নিক্সনকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল। এখন পর্যন্ত তিনিই পদত্যাগ করা একমাত্র মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
মানুষের বিশ্বাস, মহারাষ্ট্র, দিল্লি, বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনগুলো ‘সাজানো’ হয়েছিল। এতে প্রমাণিত হয়েছে, বিশ্বের বৃহত্তম দল হওয়ার গর্ব করলেও ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি শুধু নিজেদের কর্মী বাহিনী, অর্থ ও বিভাজনের কৌশলের ওপর নির্ভর করে নির্বাচনে জিততে পারে না।
ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদাঙ্ক অনুসরণ না করা পর্যন্ত জ্ঞানেশ কুমার এই সরকারের দুর্বলতম জায়গা হয়ে থাকবেন। কয়েক মাস আগে ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে প্রধানকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী মোদি বুঝতে পেরেছিলেন, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে তাঁর নিজের গলাতেই ফাঁস আরও শক্ত হয়ে আসবে।
এখন হতবুদ্ধি মোদি বুঝে উঠতে পারছেন না, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের তৈরি করা সমস্যাগুলো কীভাবে সামাল দেবেন। এসব সমস্যা হঠাৎ করেই প্রধানমন্ত্রীর দুর্বলতা অনেক বেশি স্পষ্ট করে তুলেছে। তাঁর সরকারের ওপর বোমার মতো আছড়ে পড়া এই নজিরবিহীন বিতর্কের জবাব দিতে এখন পর্যন্ত মোদি ও শাহ—দুজনই ব্যর্থ হয়েছেন। এতে বোঝা যায়, এই ঘটনায় তাঁরা কতটা হতবিহ্বল।
অন্য দুই নির্বাচন কমিশনার এস এস সান্ধু ও বিবেক যোশির সঙ্গে জ্ঞানেশ কুমারের বৈঠকের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনে ‘সবকিছু ঠিক আছে’ দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু সেই চেষ্টা বরং নিশ্চিত করেছে, তাঁদের আপত্তির বিষয়ে প্রকাশিত খবরগুলো সত্য ছিল; নিছক জল্পনা ছিল না।
‘নির্বাচন কমিশনের বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলো যদি পুরো কমিশনের সিদ্ধান্ত না হয়ে শুধু জ্ঞানেশ কুমারের কাজ হয়, তাহলে মহারাষ্ট্র থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজ্যের সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলো প্রকৃত নির্বাচন ছিল—এই দাবির ভিত্তিই ভেঙে পড়ে।’ কুমার নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বিরোধী শিবির এখন এই যুক্তিসংগত অবস্থান নিয়েই লড়াই করছে।
বিরোধীদের অবস্থান প্রধানমন্ত্রীকে অস্বস্তিতে ফেলছে
বিরোধীদের এই অবস্থান মোদিকে অস্বস্তিতে ফেলছে—এভাবে বললেও কম বলা হয়। আরও স্পষ্ট করে বললে, এর অর্থ হলো জ্ঞানেশ কুমার দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন এবং মোদি সরকার তাঁর সঙ্গে যোগসাজশে রয়েছে। স্বাধীন ভারতে কোনো ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে এই প্রথম এমন গুরুতর অভিযোগ তোলা হলো।
পরিস্থিতি সামাল দিতে জ্ঞানেশ কুমারের চেষ্টা বরং এই ধারণা তৈরি করেছে যে তাঁর গোপন করার মতো অনেক কিছু আছে। সাংবিধানিক পদে আসার আগে তিনি কার্যত কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ডান হাত ছিলেন।
বিষয়টি বোঝা কঠিন নয়। পদত্যাগের দাবি উপেক্ষা করে জ্ঞানেশ কুমার যত বেশি নিজের অবস্থানে অনড় থাকবেন, মোদি ও ক্ষমতাসীন বিজেপির জন্য পরিস্থিতি তত কঠিন হবে। বিতর্কিত প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে রক্ষা করতে গিয়ে বিজেপি অবশ্য ওপরে ওপরে সাহসী ভাব দেখাচ্ছে।
কিছু বিরোধী নেতা প্রতিবেশী বাংলাদেশের প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পরিণতি স্মরণ করছেন। তাঁর পৃষ্ঠপোষক শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছাড়ার পর তাঁকে মারধর করা হয়েছিল এবং জুতার মালা পরতে বাধ্য করা হয়েছিল।
মোদি সরকারকে আরও বেকায়দায় ফেলছে এই বিষয়টি যে ২০২৩ সালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য নির্বাচন কমিশনারদের দাপ্তরিক সিদ্ধান্তের জন্য দায়মুক্তি দেওয়ার আইন পাসে এ সরকারই নেতৃত্ব দিয়েছিল।
এই দায়মুক্তির সুরক্ষা পেয়ে জ্ঞানেশ কুমার বিরোধীদের জন্য আতঙ্ক হয়ে উঠেছিলেন। তাঁদের আপত্তি যত যৌক্তিকই হোক, তিনি সেসবের কোনো তোয়াক্কা করতেন না। রাজনৈতিক মহলে এই ধারণা ছড়িয়ে পড়েছিল যে মোদির আশীর্বাদই কুমারকে নির্বাচন কমিশনে প্রবল ক্ষমতাধর করে তুলেছে। কমিশন যেন তার স্বাধীন চরিত্র হারিয়ে ক্ষমতাসীন দলের একটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
বিজেপির কয়েকজন মুখ্যমন্ত্রী প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পক্ষে সক্রিয় হয়ে ওঠায় মনে হচ্ছে, দলের শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশে সমন্বিতভাবেই এই কাজ চলছে। ক্ষমতাসীন দলকে সাহায্য করার বদলে এটি বরং তাঁদের জন্য বোঝা হয়ে উঠছে।
কেরলমের সাবেক এক মুখ্য সচিবের সাম্প্রতিক দাবিও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ভাবমূর্তির জন্য সুখকর নয়। তাঁর দাবি, তিনি রাজি হলে জ্ঞানেশ কুমার তাঁকে নির্বাচনে বিজেপির মনোনয়ন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। দাবিটি সত্য হোক বা মিথ্যা, তা জ্ঞানেশ কুমারকে অস্বস্তিতে ফেলেছে।
বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী জ্ঞানেশ কুমারকে ‘রাজসাক্ষী’ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে মোদি ও শাহর জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল করেছেন। জ্ঞানেশ কুমারের সামনে এমন প্রলোভন তুলে ধরার মধ্যে গভীর রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। এটি বিপর্যস্ত বিরোধী শিবিরের রাজনৈতিক পরিণতি অর্জনের ইঙ্গিতও দেয়। তারা ধীরে ধীরে বুঝতে পারছে, কতটা কূটকৌশলী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে।
বিজেপির কয়েকজন মুখ্যমন্ত্রী প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পক্ষে সক্রিয় হয়ে ওঠায় মনে হচ্ছে, দলের শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশে সমন্বিতভাবেই এই কাজ চলছে। ক্ষমতাসীন দলকে সাহায্য করার বদলে এটি বরং তাঁদের জন্য বোঝা হয়ে উঠছে। কিন্তু কেন্দ্রীভূত নেতৃত্বের দলগুলো সাধারণত বিষয়টি বুঝতে পারে না। ভুল বোঝার আশঙ্কায় কেউ তাদের তা বলারও সাহস করে না।
এই ইস্যুতে শীর্ষ কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা প্রধানমন্ত্রীর সহায়তায় এগিয়ে না আসায় এমন বার্তা যাচ্ছে যে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তাঁরা নিজেদের নিরাপদ রাখতে চাইছেন।
আদালত ‘জ্ঞানেশগেট’ ধামাচাপা দিতে পারবেন না
প্রধান নির্বাচন কমিশনার কুমারের কার্যক্রমের ‘বিরুদ্ধে’ এখন বিভিন্ন হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টে একাধিক আবেদন করা হচ্ছে। ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপির অবস্থান হলো: ‘জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে নতুন আবেদনগুলো আদালত যতবার ইচ্ছা শুনুন। যে আদেশ দিতে চান, দিন। কিন্তু জ্ঞানেশ কুমারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার আমাদের গণতান্ত্রিক দাবি আদালতের হাতে ছেড়ে দেওয়া হবে না। জনগণই সিদ্ধান্ত নেবে।’
এই অবস্থান থেকে বোঝা যায়, আদালতকে ‘জ্ঞানেশগেট’ ধামাচাপা দিতে দেওয়া হবে না। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআরের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়লেও আদালত এই প্রক্রিয়ায় আপত্তি জানাননি। অথচ এত ব্যাপকভাবে নাম বাদ দেওয়ার বিষয়টি উপেক্ষা করা কঠিন হয়ে উঠেছিল। বিরোধীদের বক্তব্য, এই প্রক্রিয়া স্পষ্টতই বিজেপিকে সুবিধা দিয়েছে এবং কার্যত ক্ষমতাসীন দলের স্বার্থ পূরণ করেছে।
ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটি মানুষের নাম বাদ দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে বিরোধীরা বলছেন, অবৈধভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার দায় নির্বাচন কমিশনকেই নিতে হবে। তাঁদের দাবি, এসআইআর প্রক্রিয়া ধাপে ধাপে ‘প্রতারণা’ হিসেবে উন্মোচিত হচ্ছে। তাই অবিলম্বে এটি স্থগিত করতে হবে এবং ভোটাধিকার হারানো মানুষদের প্রতিকার দেওয়ার উপায় খুঁজে বের করতে হবে।
মনে মনে জ্ঞানেশ কুমারও ফ্রান্সের পঞ্চদশ লুইয়ের মতো জানেন: ‘আমার পরে আসবে মহাপ্লাবন।’
সুনীল গাটাডে ও ভেঙ্কটেশ কেসরি নয়াদিল্লিভিত্তিক সাংবাদিক।
দ্য ওয়্যার থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত।