অরুন্ধতি রায়ের সাক্ষাৎকার

ককরোচরা মোদির ‘তিলে তিলে’ গড়া ভাবমূর্তি চুরমার করে দিয়েছে

ভারতের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বুকার পুরস্কার পাওয়া লেখক অরুন্ধতী রায় কথা বলেছেন আল জাজিরার সঙ্গে। ভিডিও কনফারেন্সে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সাংবাদিক ইমরান খান। সাক্ষাৎকারটি প্রথম আলোর পাঠকদের জন্য অনুবাদ করেছেন সারফুদ্দিন আহমেদ।

প্রশ্ন:

অরুন্ধতী রায়, আল জাজিরার সঙ্গে কথা বলার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার প্রথম উপন্যাসটি মর্যাদাপূর্ণ বুকার পুরস্কার জিতেছিল। তারপর থেকে আপনি প্রশংসিত উপন্যাস, প্রভাববিস্তারী রাজনৈতিক লেখা এবং প্রবন্ধের সংকলন লিখেছেন। আপনি নিজেকে কীভাবে বর্ণনা করবেন: ঔপন্যাসিক, লেখক নাকি রাজনৈতিক কর্মী? নাকি আপনি এই সীমানাগুলো নিয়ে সত্যিই ভাবেন না?

অরুন্ধতী রায়: আচ্ছা, আমি আসলে নিজের ব্যাপারে বর্ণনা করা থেকে বিরত থাকতে পছন্দ করি। আমি এর ভার অন্যান্য মানুষের ওপর ছেড়ে দেব; কারণ আপনারা জানেনই। ফলে কেন আমরা নিজেদের ব্যাপারে বর্ণনা করতে যাব? আর নিজেদের কোনো একটা শ্রেণিতে ফেলতে যাব? এটা তো অন্যদের কাজ।

প্রশ্ন:

আপনার কাজের সব ভিন্ন দিকের সঙ্গে যা যুক্ত, তা হলো ব্যঙ্গের ধারণা। আপনি প্রধানত একজন ব্যঙ্গ রচয়িতা নন, তবে দ্য গড অব স্মল থিংস এবং দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস-এ আপনি ধ্বংসাত্মক প্রভাব সৃষ্টি করতে ব্যঙ্গ ব্যবহার করেছেন। তবে এটি সর্বদা রাজনীতি কেন্দ্রিক বলে মনে হয়। এটা কি কোনো সুচিন্তিত পছন্দ?

অরুন্ধতী রায়: আমি তা মনে করি না। মানে, এক অর্থে রাজনীতিকে আপনি কীভাবে সংজ্ঞায়িত করছেন তার ওপর এটি নির্ভর করে, তাই না? আমার কাছে এমনকি একটি রূপকথাও কোনো না কোনোভাবে রাজনৈতিক, তবে তা ‘হাতুড়ি দিয়ে মাথায় আঘাত করা’ কিংবা ‘নিজের ইশতেহার প্রদর্শন করা’ ধরনের রাজনীতি নয়। আমার বইগুলো থেকে এবং আমি যেভাবে বেড়ে উঠেছি সেখান থেকে আপনার প্রশ্নের সম্ভাব্য উত্তর হতে পারে—ব্যক্তিগত ক্ষেত্র এবং পাবলিক স্পেসের মধ্যে আসলে কোনো পার্থক্য নেই।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
প্রশ্ন:

আসুন ভারত এবং এর রাজনৈতিক আবহাওয়া নিয়ে কথা বলি। আপনি সিজিপি (সিজেপি) আন্দোলন নিয়ে লিখেছেন। এটি তরুণদের দ্বারা চালিত একটি তৃণমূল আন্দোলন, যারা নিজেদের ‘ককরোচ’ (তেলাপোকা) বলে দেওয়া একটি গালাগালিকে ইতিবাচকভাবে নিজেদের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেছে।

আপনি আপনার প্রবন্ধটি শুরু করেছিলেন যখন আশা হারিয়ে গিয়েছিল বলে মনে হচ্ছিল, তখন বৃষ্টিতে চড়ে এই তরুণ ‘ককরোচ’রা উঠে এল। ওই ‘ককরোচ’কে ‘একজন বিচারক এবং একটি কৌতুকের অপবিত্র মিলনের সন্তান’ বলে বর্ণনা করেছেন। ঠিক কী জিনিস আপনাকে এই নির্দিষ্ট আন্দোলনের দিকে টেনেছিল?

অরুন্ধতী রায়: বিষয়টা হলো, আমরা যখন এই মুহূর্তে কথা বলছি, তখন একটি বিশাল সংকট তৈরি হচ্ছে। ককরোচরা ফিরে এসেছে এবং বলছে যে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে তারা সারা দেশে বিক্ষোভ করতে যাচ্ছে। কারণ একটি নির্দিষ্ট সংবাদপত্র এমন একটি কেলেঙ্কারি উন্মোচন করেছে যে ভারতের নির্বাচন এখন পুরোপুরি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

এটি আমরা বছরের পর বছর ধরে জানি এবং এ নিয়ে লিখে এসেছি। কিন্তু এখন এক ধরনের শক্ত প্রমাণ সামনে এসেছে। সুতরাং যা আমাকে এটির দিকে টেনেছিল তা হলো তরুণদের এই আন্দোলন। এই আন্দোলন ছিল আনন্দে ভরা এবং অস্বাভাবিক রসে ভরপুর। আমাকে টেনেছে তাদের ইনস্টাগ্রাম, রিল ইত্যাদির মাধ্যমে ছড়ানো বার্তার এই নতুন পদ্ধতি। এটি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তিল তিল করে গড়ে তোলা ভাবমূর্তিকে ধসিয়ে দিয়েছে।

ভিডিও কনফারেন্সে আল জাজিরার ইমরান খানকে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন অরুন্ধতি রায়।
ছবি: আল জাজিরার ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া।
প্রশ্ন:

এটা কি মোদির পক্ষ থেকে একটি ভুল হিসাব ছিল? সোশ্যাল মিডিয়া না বোঝা, তরুণদের প্রযুক্তির ব্যবহার না বোঝা? এবং এটি কি ভারতে কোনো প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে?

অরুন্ধতী রায়: না, আমি মোটেও মনে করি না এটা তার না বোঝা। তিনি এবং বিজেপিই প্রথম সোশ্যাল মিডিয়ার ক্ষেত্রে প্রবেশ করেছিলেন, তাই অন্য যে কারও আগেই তারা সেখানে ছিলেন। তবে আমার মনে হয় পর পর অনেকগুলো ঘটনা ঘটছিল। আর কোনোভাবে এই আন্দোলনটি শেষ ধাক্কা হিসেবে কাজ করেছিল। এটি শুরু হয়েছিল ২০২৪ সালের নির্বাচনে মোদী পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাননি সেই সত্য থেকে...নির্বাচন নিয়ে কেলেঙ্কারি রয়েছে, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের কেলেঙ্কারি রয়েছে, ব্যাপক বেকারত্ব রয়েছে। সুতরাং এই সবকিছু এক সঙ্গে মিলে এই ধরনের এক অশ্রদ্ধাশীল কিন্তু গুরুতর বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। রাজার আসল রূপ উন্মোচিত হয়ে গেছে, এবং তিনি তার শক্তি হারিয়েছেন।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
প্রশ্ন:

ভারত প্রকাশ্যে বলে থাকে, তারা একটি অর্থনৈতিক সাফল্যের গল্প, তারা জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শক। কিন্তু আপনার কাছে আধুনিক ভারত আসলে কী?

অরুন্ধতী রায়: দেখুন, আধুনিক ভারত হলো অত্যন্ত দরিদ্র মানুষে ভরা একটি অত্যন্ত ধনী দেশ। মানে, আমার মনে হয় না পৃথিবীতে এমন অনেক দেশ আছে যেখানে মানুষ এত গভীর দারিদ্র্যে, এমন চরম অপমানজনক পরিস্থিতিতে বসবাস করে। আর এটি নিয়ে কোনো দেশের একটি সুপার অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে বড়াই করাটা লজ্জাজনক; কারণ আমি বারবার যা বলি, এটি আসলে চরম দরিদ্র একটি দেশ। অবশ্যই এখানে অত্যন্ত ধনী মানুষ আছে, অত্যন্ত ধনী শিল্পপতিরা রয়েছে যারা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে, কিন্তু তার খুব কমই দরিদ্রদের কাছে গিয়ে পৌঁছায়...তাই জনগণকে এভাবে ক্ষমতাহীন করে রেখে ভারতকে একটি সুপার পাওয়ার বা অর্থনৈতিক শক্তি বলাটা একটা কেলেঙ্কারি ছাড়া কিছুই নয়।

আমাদের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ভয় দেখানো হচ্ছে। গত স্বাধীনতা দিবসে লাল কেল্লার প্রাচীর থেকে মোদী বলেছিলেন, সবচেয়ে বিপজ্জনক মানুষ হলো ‘দিমাগি নকশাল’, যার অর্থ বুদ্ধিবৃত্তিক মাওবাদী; আর তার মধ্যে অবশ্যই আমরা সবাই অন্তর্ভুক্ত! এবং আমাদের নাকি একঘরে করে রাখতে হবে।
প্রশ্ন:

কিন্তু এসব সমস্যার অধিকাংশের জন্য প্রায়শই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনকে দায়ী করা হয়। সেই যুক্তির প্রতি আপনার কি কোনো সহানুভূতি আছে?

আমাদের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ভয় দেখানো হচ্ছে। গত স্বাধীনতা দিবসে লাল কেল্লার প্রাচীর থেকে মোদী বলেছিলেন, সবচেয়ে বিপজ্জনক মানুষ হলো ‘দিমাগি নকশাল’, যার অর্থ বুদ্ধিবৃত্তিক মাওবাদী; আর তার মধ্যে অবশ্যই আমরা সবাই অন্তর্ভুক্ত! এবং আমাদের নাকি একঘরে করে রাখতে হবে।

অরুন্ধতী রায়: আর একদমই না। একটা সময় ছিল যখন এটা সত্যি ছিল। কিন্তু এখন আমরা এমন একটা সরকার দেখছি যা স্বাধীনতার ধারণাসহ সবকিছুকে আরও অনেক বেশি খারাপ করে তুলছে।

আমি কয়েকজন তরুণ-তরুণীর সঙ্গে কথা বলছিলাম, তখন আমি বলেছিলাম যে ব্রিটিশ আমলে (মহাত্মা) গান্ধী, (ভীমরাও) আম্বেদকর, মাওলানা (আবুল কালাম) আজাদ এবং (জওহরলাল) নেহেরুসহ এই সব মানুষ যা যা বলেছিলেন এবং লিখেছিলেন, আজকে কেউ সে কথা বলতে পারবে না, কারণ বললে তাদের জেলে যেতে হবে। বহু মানুষ, বহু শিক্ষার্থী, বহু অ্যাকটিভিস্ট এবং আইনজীবী প্রতিনিয়ত জেল খাটছেন। আমাদের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ভয় দেখানো হচ্ছে। গত স্বাধীনতা দিবসে লাল কেল্লার প্রাচীর থেকে মোদী বলেছিলেন, সবচেয়ে বিপজ্জনক মানুষ হলো ‘দিমাগি নকশাল’, যার অর্থ বুদ্ধিবৃত্তিক মাওবাদী; আর তার মধ্যে অবশ্যই আমরা সবাই অন্তর্ভুক্ত! এবং আমাদের নাকি একঘরে করে রাখতে হবে। তাই আমার মনে হয় ঔপনিবেশিক শাসনকে দায়ী করাটা এখন একটা জরাজীর্ণ অশ্বকে চাবুক মারার মতো পুরোনো অহেতুক বাহানা।

ভোটার তালিকায় জালিয়াতি করার অভিযোগে দেশটির প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে ৩ অক্টোবর আয়োজিত বিক্ষোভ থেকে অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (আইসা)-এর সভাপতি নেহা বোড়াকে (মাঝে) আটক করা হয়। পরে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
ছবি: এএফপি
প্রশ্ন:

আপনি মাওবাদীদের কথা উল্লেখ করেছেন বলে আমি আনন্দিত। এই বছরের শুরুতে ভারত ছয় দশক ধরে চলা মাওবাদী বিদ্রোহ আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত বলে ঘোষণা করেছে। কিন্তু নকশালরা যেসব সমস্যার জন্য লড়াই করছিল, তার সবই তো রয়ে গেছে, তাই না?

অরুন্ধতী রায়: হ্যাঁ, একদমই তাই। মানে, নকশাল কারা? তারা কিসের বিরুদ্ধে লড়ছিল? আর বাস্তবতা হলো সরকার বারবার এটিকে শেষ বলে ঘোষণা করে, কিন্তু এটি কোথাও না কোথাও আবার ভেসে ওঠে; কারণ আপনি এত মানুষকে এভাবে দাবিয়ে রাখতে এবং তাদের জীবন ধ্বংস করে দিতে পারেন না। কিছু মানুষ তো নিজেদের হাতে আইন তুলে নেবেই। তাই এসব ঘোষণার সঙ্গে আমরা অভ্যস্ত, জানেনই তো।
কংগ্রেস শাসনের সময়ে, আমার মনে হয় ২০১২ বা ২০১৩ সালের দিকে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং আদিবাসীদের মাতৃভূমি বড় বড় অবকাঠামো কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করার চুক্তিতে সই করেছিলেন। অনেক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। আর তারপর তারা ‘অপারেশন গ্রিন হান্ট’ নামের একটি অভিযান ঘোষণা করে। তারা নিরাপত্তা বাহিনী দিয়ে জঙ্গল ভরিয়ে ফেলে। একের পর এক গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছিল; নারীরা ধর্ষিত হচ্ছিল; গ্রামের মানুষ এই ভয়ে ঘরে থাকতে পারছিল না যে তাদের ঘিরে ধরে পুড়িয়ে মারা হবে। আর মিডিয়া এই সব গরিব মানুষকে ‘সন্ত্রাসবাদী’ বলে ডাকছিল।...যখন জঙ্গলের মাঝখানে হাজার হাজার নিরাপত্তা কর্মী এসে আপনার বাড়ি ঘিরে ফেলে, তখন আপনি কী করবেন?

প্রশ্ন:

লেখকদের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বা নিরপেক্ষ থাকা উচিত—এই ধারণাটি আপনি সব সময় প্রত্যাখ্যান করেছেন। কাশ্মীরকে ভারতের ‘অবিচ্ছেদ্য অংশ নয়’ বলা সংক্রান্ত আপনার অবস্থানের কথা মনে পড়ে। এত স্পষ্টভাবে কথা বলার ব্যক্তিগত মূল্য বা খেসারত নিয়ে আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাই। আপনি কীভাবে এটির মুখোমুখি হন?

অরুন্ধতী রায়: দেখুন, ২০১৯ সালের পর কেউ আর ওভাবে বলতে পারে না কারণ এটিকে ভারতের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ বানিয়ে ফেলা হয়েছে এবং ভারতীয় সংবিধানের সেই অনুচ্ছেদটি রদ করা হয়েছে। তবে সত্যি বলতে, আমি এমন একজন মানুষ নই যে লেখকদের জন্য নিয়ম বানিয়ে দেব যে তাদের রাজনৈতিক হওয়া উচিত কি উচিত নয় বা তাদের কেমন হওয়া উচিত। আমার কাছে তার কোনো রেসিপি নেই। আমি শুধু জানি, যে জিনিসটি আমাকে সত্যিই নাড়া দেয় তা নিয়ে যদি আমি না লিখি, তবে তারা আমাকে জেলে পাঠানোর আগেই তা হবে নিজেকে নিজে জেলে পুরে ফেলার মতো।

আমি আমার স্মৃতিকথায় যেমনটা বলেছি, এটি কোনো মাইন পেতে রাখা নাচের মঞ্চে নৃত্য পরিবেশন করার মতো। কেউ জানে না কখন বোমাগুলো ফেটে যাবে। কিন্তু আমার যা করার তা আমাকে করতেই হবে, আর আমি একা নই। আরও অনেক মানুষ আছেন যারা অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে রুখে দাঁড়িয়েছেন এবং বিশাল মূল্য চুকিয়েছেন। কিসের জন্য? তারা যা বিশ্বাস করেন তা করা বা বলার জন্য। তাই আমি এখানে নিজেকে কোনো শহীদ হিসেবে জাহির করতে চাই না।

প্রশ্ন:

কিন্তু ভারতে কি এমন কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন রয়েছে যার একটি শক্তিশালী কণ্ঠস্বর রয়েছে এবং যা শোনা হচ্ছে, নাকি রাজনীতির চিৎকার-চেঁচামেচিতে তা ডুবে যাচ্ছে?

অরুন্ধতী রায়: প্রকৃতপক্ষে, সেই আন্দোলন সব সময়ই ছিল। এটি অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল, যদিও ২০১৪ সাল থেকে বিভিন্ন করপোরেটের মালিকানাধীন ২৪ ঘণ্টার টেলিভিশন নিউজ চ্যানেলগুলো সবাইকে চিৎকার করে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে সেটিকে পিষে ফেলার চেষ্টা করেছে। তাই মোদী যতবার নির্বাচনে জেতেন, তিনি সামনে এসে আমাদের অসুর হিসেবে তুলে ধরার এবং দমানোর চেষ্টা করেন।

বহু বছর ধরেই ছাত্র ও সাধারণ মানুষের বিভিন্ন আন্দোলনে শামিল হয়ে তাঁদের সঙ্গে একাত্মতা জানিয়ে আসছেন অরুন্ধতি রায়।
ফাইল ছবি: সংগৃহীত
প্রশ্ন:

ভারত কি এখনো বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র—যা উদ্‌যাপন করার মতো কিছু? নাকি আপনি মনে করেন এটি একটি লোকদেখানো ভুয়া গণতন্ত্র?

অরুন্ধতী রায়: ঠিক এই জায়গাটিতেই আঘাতটা হানা হয়েছে। মোদী সরকার নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়াটাই বদলে দিয়েছে। তিনি নিজে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ করেছেন। পূর্বে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনে বিরোধী দল এবং প্রধান বিচারপতির একটি ভূমিকা থাকত, কিন্তু এখন আর তা নেই। এখন যেভাবে নির্বাচন পরিচালনা করা হয়েছে তা নিয়ে পুরোপুরি স্ক্যান্ডাল তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সালের নির্বাচন থেকে শুরু করে মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার এবং গোয়ার (আঞ্চলিক) নির্বাচন পর্যন্ত। আপনি এমন একটি পরিস্থিতি দেখতে পাচ্ছেন যেখানে হাজার হাজার নির্বাচনী কর্মকর্তার কাছে ভোটারদের তথ্য থাকার কথা, তাদের বের করে দেওয়া হয়েছে এবং সবকিছু নতুন দিল্লি থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। আর ভোটারদের—বিশেষ করে সংখ্যালঘু বা বিজেপি-বিরোধী হিসেবে পরিচিত ভোটারদের—সরাসরি ভোট দিতে দেওয়া হয়নি। আর আমি লাখ লাখ মানুষের সংখ্যার কথা বলছি...আমরা সবসময় বলি যে কেবল নির্বাচনই গণতন্ত্রের প্রমাণ নয়। আপনার একটি সংবিধান প্রয়োজন, অন্যান্য প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, ক্ষমতার ভারসাম্য প্রয়োজন। সেগুলোর সবই ফাঁপা করে ফেলা হয়েছিল। এখন নির্বাচন প্রক্রিয়া নিজেই প্রশ্নবিদ্ধ। আর আপনি দেখতে পাবেন, সামনের কয়েক মাসে এই দেশে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হতে যাচ্ছে, কারণ আমরা ২০২৯ সালের নির্বাচনের দিকে যত এগিয়ে যাব।

এই ‘ককরোচ’ অভ্যুত্থানের পর আপনি ভারতে যা দেখছেন তা হলো সবাইকে সতর্ক বার্তা পৌঁছে দেওয়া গেছে। তাই মোদী শাসনের অধীনে যারা একরকম ভেঙে পড়েছিল এবং কেঁপে উঠছিল, তারা হঠাৎ করে শিরদাঁড়া না হলেও অন্তত কয়েকটি মেরুদণ্ডের হাড় খুঁজে পাচ্ছে এবং এটি ছোট ছোট স্পেস তৈরি করছে।
প্রশ্ন:

এই সাক্ষাৎকারের আগে, আমি ইসরায়েলে থাকা আমার আরেক লেখক বন্ধুর সঙ্গে কথা বলছিলাম। তিনি বলেছিলেন, মিস রায়কে আপনার যে প্রশ্নগুলো অবশ্যই করা উচিত তার একটি হলো—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সোশ্যাল মিডিয়ার অস্ত্রায়ন যেভাবে গণতন্ত্রবিরোধী আন্দোলন এবং সরকারের কর্তৃত্ববাদকে ইন্ধন দিচ্ছে। এই বিষয়ে আপনার অবস্থান কী?

অরুন্ধতী রায়: আমি মনে করি এটি ধ্বংসের সূচনা। আর এটি হলো মানব প্রচেষ্টা ও সভ্যতার ব্যক্তিমালিকানাধীনকরণ। প্রতিরক্ষায়, রাজনীতিতে এবং ব্যক্তিগত জীবনে এটি কীভাবে কাজ করে এবং এর পেছনের অন্ধকারকে ঢেকে রাখতে এটি যে চকচকে উপহারগুলো অফার করে—তা নিয়ে আমাদের ভাবা উচিত। এটি এমন একটি বিষয় যা নিয়ে আমি এখন লিখছি।

প্রশ্ন:

আধুনিক ভারতের বা পুরো বিশ্বের এমনকি কিছু আছে যা আপনাকে আশা যোগায়?

অরুন্ধতী রায়: হ্যাঁ, অবশ্যই। যেমনটা আমি বলেছি, ভারত এমন একটি দেশ যেখানে প্রতিরোধের, বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তাভাবনার, ভিন্নধর্মী চিন্তার এবং অনন্য ধরনের ভিন্নমতের অনেক গভীর সংস্কৃতি রয়েছে। সুতরাং কীভাবে আপনার আশা না থেকে পারে?