দিল্লিতে মে-জুন মাস মানেই আগুন। সেখানকার গড় তাপমাত্রা যখন ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়, তখনও রাস্তাঘাট পুড়ে যায়। কিন্তু কয়েক মাস আগে ১৬ই মে যখন আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তখন পারদ ছুঁয়েছিল ৪৩.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর মে-জুনের প্রখর দাবদাহে সেটা কখনো কখনো ৪৫ ডিগ্রিতেও ওঠে। সেই তীব্র সূর্যতাপ উপেক্ষা করে রাস্তায় নেমে এসেছিল হাজার হাজার তরুণ- তরুণী। তাদের গলায় স্লোগান, সেই স্লোগানের তেজ ছিল যেন ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি।
তবে এই তেজ শুধু দিল্লির রাজপথে সীমাবদ্ধ ছিল না; দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য প্রান্তে মুহূর্তের মধ্যে পৌঁছে গিয়েছিল সেই আগুনের দাবদাহ। ককরোচ আন্দোলন—যে নামটা ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে।
শব্দের রয়েছে এক অসীম শক্তি। যা অপমান হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল, তাই হয়ে উঠল প্রতিবাদের প্রতীক। ভারতের সাম্প্রতিক ককরোজ আন্দোলন সেই অসাধারণ শক্তিরই প্রমাণ। তেলাপোকা, যে পোকাটিকে সবাই ঘৃণা করে, সেই নামেই এক নতুন রাজনৈতিক চেতনার জন্ম। সেই নামেই গড়ে উঠল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ —একটি ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, যা শেষ পর্যন্ত ভারতের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী ছাত্র-যুব আন্দোলনে রূপ নিল।
এই আন্দোলনের সূত্রপাত কিন্তু নতুন নয়। ২০২৪ সালেও ধর্মেন্দ্র প্রধান একই ধরনের অভিযোগের মুখে পড়েছিলেন। কিন্তু তখন তার গদি নড়েনি। এই গ্রীষ্মে এক বিশাল জন আন্দোলনের মুখে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন। কিন্তু কেন এই পদত্যাগ?
উত্তর খুঁজতে তিনটি বিশেষ কারণের দিকে তাকাতে হবে। প্রথমত, তকমা দাগানোর পুরোনো কৌশল এবার ব্যর্থ হয়েছে। বিজেপি শাসনের অন্যতম প্রধান অস্ত্র ছিল বিভিন্ন প্রতিবাদকে ‘দেশবিরোধী’, ‘আরবান নকশাল’, ‘খালিস্তানি অনুপ্রবেশ’-এর মতো তকমা দিয়ে প্রান্তিক করে ফেলা। কিন্তু ককরোচ আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল কোচিং সেন্টারের ছাত্র, ছোট শহরের চাকরিপ্রত্যাশী, নতুন স্নাতক—মধ্যবিত্ত তরুণরা। তাদের ‘জিহাদি’ বা ‘বাম ষড়যন্ত্র’ বলে আখ্যা দেওয়া সম্ভব ছিল না। তারা ডিজিটাল প্রজন্মের প্রতিনিধি, যাদের বিরুদ্ধে পুরোনো অস্ত্র কোনো কাজেই আসেনি।
দ্বিতীয়ত, দৃশ্য-সংস্কৃতি ও তথ্যের স্বচ্ছতা। সিজেপি শুরু থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নির্ভর সংগঠন। প্রতিটি মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি করা হয়েছে। প্রতিটি পুলিশি হামলা ক্যামেরার সামনে ধরা পড়েছে, যা উল্টো সরকারের বিরুদ্ধে সহানুভূতি তৈরি করেছে। যখন সরকার বলল সিজেপির অনুসারীরা বিদেশি, তখন প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে ঘণ্টা কয়েকের মধ্যে তথ্য দিয়ে দেখালেন ৯৫ শতাংশ অনুসারীই ভারতীয়। তৃতীয়ত, বেকারত্বের নির্মম বাস্তবতা। ২০২৬ সালের জুনে ভারতের তরুণ বেকারত্বের হার দাঁড়িয়েছে ১৬.২ শতাংশে। ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও স্থায়ী চাকরি পান মাত্র ৭ শতাংশের কম। এই বাস্তবতা আন্দোলনকে নৈতিক ভিত্তি জুগিয়েছে।
সোনম ওয়াংচুকের উদাহরণটি সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি ২০২৪ সালেও ২১ দিন অনশন করেছিনেল লাদাখের পরিবেশ রক্ষা ও সাংবিধানিক অধিকার আদায়ের জন্য। পরের বছর ২০২৫ সালে লাদাখের স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে ৩৫ দিনের জন্য অনশনে বসেন কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভিন্ন মোড় নিলে ১৪ দিনের মাথায় অনশন ভেঙ্গে ফেলেন। এবার সিজেপির পাশে দাঁড়িয়ে মাত্র ২৬ দিনের অনশনে কেন্দ্রীয় দাবি বাস্তবায়িত হলো।
এই তফাতটি কৌশলের: দীর্ঘ, একলা, আত্মত্যাগনির্ভর রাজনীতি বনাম দ্রুত, সমষ্টিগত, তথ্যনির্ভর ও ব্যঙ্গাত্মক রাজনীতি। তরুণরা বুঝতে শিখেছে কীভাবে তাদের ক্ষোভকে সংগঠিত করতে হয়, কীভাবে সরকারের ভীতি প্রদর্শনের রাজনীতিকে অকার্যকর করে তুলতে হয়।
শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পর সিজেপি আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন: ‘লড়াই শেষ হয়নি’। আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ এবং পুলিশি নির্যাতনের দায়ীদের শাস্তি—এই দাবিগুলো এখনও অমীমাংসিত। তিনি আরও বলেন, ‘মনে রাখবেন, তেলাপোকাকে নিয়ে খেলবেন না’। অরুন্ধতী রায় তাঁর কলামে লিখেছেন, ‘তেলাপোকাদের লড়াইয়ের পরিধি এখন অনেক বড়’। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এখন খুব সামান্য এক দাবি—লড়াই এখন গোটা শাসনব্যবস্থার পচনের বিরুদ্ধে।
কিন্তু এই আন্দোলনের গুরুত্ব শুধু ভারতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ককরোচ আন্দোলন দক্ষিণ এশিয়ায় এক নতুন ধারার সূচনা করেছে। ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কায় তরুণদের আন্দোলনে সরকার পতন হয়। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ছাত্র গণ–অভ্যুত্থান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য করে। ২০২৫ সালে নেপালের জেন-জি বিক্ষোভে প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলি পদত্যাগ করেন। এই সবগুলো আন্দোলনের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো—এগুলো রাজনৈতিক দলনির্ভর ছিল না। তরুণরা দলমত নির্বিশেষে একত্রিত হয়েছে। প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলো এ ধরনের আন্দোলনে প্রভাব বিস্তার করতে ব্যর্থ হয়েছে।
তবে ভারতের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ বা নেপালের তুলনায় ভারত অনেক বড় এবং জটিল। সেখানে ১৫০ কোটির বেশি জনসংখ্যা, বিচিত্র সামাজিক ও ধর্মীয় বৈচিত্র্য। নরেন্দ্র মোদি এ পর্যন্ত শুধু শিক্ষামন্ত্রীকে বিসর্জন দিয়ে নিজের আসন রক্ষা করেছেন। কিন্তু আগামী দিনগুলোতে কী অপেক্ষা করছে, তা কেউ জানে না। সিজেপি ইতিমধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পদত্যাগের দাবি তুলেছে। আন্দোলনের পরিধি ক্রমশ বাড়ছে।
এখানেই জেন-জির রাজনৈতিক চরিত্র আলাদা। এই প্রজন্ম রাজনৈতিকভাবে উদাসীন নয়; বরং তারা প্রচলিত দলীয় আনুগত্যে বিশ্বাসী নয়। তারা ব্যক্তির চেয়ে নীতিকে, দলের চেয়ে ইস্যুকে এবং স্লোগানের চেয়ে ফলাফলকে বেশি গুরুত্ব দেয়। তারা প্রশ্ন করে, তথ্য খোঁজে এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দাবি করে। গণতন্ত্রে এটিই নাগরিক সচেতনতার লক্ষণ। কিন্তু এখানেই সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ সরকার এখনো সেই পুরোনো রাজনৈতিক মানসিকতা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেনি, যেখানে নির্বাচনে জয় মানেই পাঁচ বছরের জন্য রাজনৈতিক বৈধতা নিশ্চিত। বাস্তবতা এখন ভিন্ন। জনগণ, বিশেষ করে তরুণরা, নির্বাচনের পরও সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্ত পর্যবেক্ষণ করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একটি বিষয় জাতীয় আলোচনায় পরিণত হতে পারে। ফলে শুধুমাত্র প্রশাসনিক ক্ষমতা দিয়ে এই নতুন বাস্তবতা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।
ককরোচ আন্দোলন দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিয়ে এসেছে। প্রথম, রাজনীতিতে স্বচ্ছতার প্রয়োজন। তরুণরা এখন তথ্য-প্রতিরোধের যুগে বড় হয়েছে। মিথ্যা তথ্য দিয়ে তাদের বিভ্রান্ত করা সম্ভব নয়। দ্বিতীয়, সহনশীলতার প্রয়োজন। তরুণদের দাবির প্রতি সরকারকে সহনশীল হতে হবে। দমন-পীড়ন উল্টো সহানুভূতি তৈরি করে। তৃতীয়, সুশাসনের প্রয়োজন। দুর্নীতি, চাকরির সংকট, শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতা—এসব ইস্যুতে সরকারকে জবাবদিহি করতে হবে। চতুর্থ, নতুন রাজনৈতিক ব্যাকরণ। কৌতুক, তথ্য-স্বচ্ছতা ও স্বাধীন দৃশ্য-সাংবাদিকতার মিশেলে যে নতুন রাজনৈতিক ব্যাকরণ তৈরি হয়েছে, তা মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি বহু আন্দোলনের মুখোমুখি হয়েছেন। কিন্তু ককরোচ আন্দোলন দেখিয়ে দিল, ডিজিটাল যুগে তরুণদের স্বতঃস্ফূর্ত সংগঠনকে অবহেলা করা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। আন্দোলনের পর সরকারের পক্ষ থেকে সমঝোতার ভাষা, পরীক্ষা সংস্কারের উদ্যোগ এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ—সবই ইঙ্গিত দেয় যে জনমতের চাপকে উপেক্ষা করা সম্ভব হয়নি।
একটি সফল আন্দোলন সবসময় সফল রাজনৈতিক বিকল্প তৈরি করতে পারে না। ইতিহাস বলে, ক্ষোভকে সংগঠিত করা যত সহজ, সেই শক্তিকে দীর্ঘমেয়াদি নীতি ও প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়া তত কঠিন। তাই ককরোচ আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে তারা শুধুমাত্র প্রতিবাদের রাজনীতি করবে, নাকি বিকল্প নীতি, নেতৃত্ব এবং সাংগঠনিক কাঠামোও গড়ে তুলতে পারবে।
প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোরও আত্মসমালোচনার সময় এসেছে। কেন তরুণরা তাদের ওপর আস্থা হারাচ্ছে? কেন তারা দলীয় প্ল্যাটফর্মের বাইরে নতুন সংগঠন গড়ে তুলছে? কেন একটি ডিজিটাল আন্দোলন কয়েক সপ্তাহের মধ্যে লক্ষ মানুষের সমর্থন পাচ্ছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে না পারলে ভবিষ্যতের রাজনীতিতে বড় মূল্য দিতে হতে পারে।
সরকারগুলোর জন্যও বার্তা স্পষ্ট। তরুণদের কণ্ঠকে নিরাপত্তা সমস্যার চোখে দেখলে চলবে না। তাদের অভিযোগ শুনতে হবে, তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। গণতন্ত্রের শক্তি দমন নয়; সংলাপ, আস্থা ও জবাবদিহির মধ্যেই নিহিত।
সবশেষে বলা যায়, ককরোচ আন্দোলনের প্রকৃত গুরুত্ব একজন মন্ত্রীর পদত্যাগে নয়। এর গুরুত্ব নিহিত রয়েছে একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায়। সেই বাস্তবতা হলো—দক্ষিণ এশিয়ার তরুণরা আর কেবল ভবিষ্যতের নাগরিক নয়; তারা বর্তমানের রাজনৈতিক শক্তি। তারা প্রশ্ন করবে, প্রতিবাদ করবে এবং প্রয়োজনে ক্ষমতাকেও নতি স্বীকার করতে বাধ্য করবে। যে রাজনৈতিক দল এই পরিবর্তনকে বুঝতে পারবে, ভবিষ্যৎ তারই। আর যারা এটিকে সাময়িক আবেগ বলে উড়িয়ে দেবে, তারা হয়তো আগামী দিনের রাজনীতিতে নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা হারাবে।
ককরোচ আন্দোলন প্রমাণ করেছে যে প্রযুক্তি, কৌতুক ও সমষ্টিগত ক্ষোভ—এই তিনের মিশেলেই রাষ্ট্রের পুরোনো তকমানির্ভর ও ভয়নির্ভর রাজনীতিকে অকার্যকর করে দেওয়া সম্ভব। এটি এমন এক নতুন রাজনৈতিক ব্যাকরণ তৈরি করেছে, যেখানে তথ্যের স্বচ্ছতা, ব্যঙ্গ-কৌতুক এবং গণ-সংগঠনের শক্তি একত্রিত হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশ গুলোতে যারা সরকারে রয়েছে, এবং ভবিষ্যতে যারা সরকারে থাকবে—তাদের এই বিষয়গুলো মাথায় রেখেই এগোতে হবে।
ভোট পেয়ে পাঁচ বছর সুন্দরভাবে রাষ্ট্রপরিচালনা করার দিন শেষ। নতুন প্রজন্ম সরকারকে চ্যালেঞ্জ করতে শিখেছে, তাদের সমস্যাকে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। সময়ই সব বলে দেবে। কিন্তু এটা নিশ্চিত—তরুণরা রাজনৈতিক সচেতন হয়ে উঠছে, এবং দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি আর কখনো আগের মতো থাকবে না। এখান থেকেই শুরু হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির নতুন অধ্যায় । যে অধ্যায়ের প্রধান চরিত্র তরুণরা।
ড. মো. সাহাবুল হক অধ্যাপক, পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট
