ভারতের সাম্প্রতিক ‘তেলাপোকা’দের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গত চার বছরের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার চারটি দেশ বড় ধরনের সরকারবিরোধী আন্দোলন ও অভ্যুত্থানের সাক্ষী হলো। এর মধ্যে শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালের আন্দোলন সরাসরি সরকারের পতন ঘটিয়েছে। ভারতে সে তুলনায় কেবল শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের মধ্য দিয়েই আন্দোলনের ইতি ঘটেছে।
প্রতিবাদের অভিনব ভাষা ও কৌশলের কারণে ‘জেন-জি’ বর্গ বিশেষ আলোচনায় এসেছে সত্য, তবে এই আলোচনা আদতে নতুন প্রজন্মের প্রতি স্বাভাবিক উচ্চাশার বহিঃপ্রকাশ বলেও চিহ্নিত করা যায়। নতুন প্রজন্মের প্রতি রবি ঠাকুরের বাক্যটাই ইয়াদ করা যেতে পারে, ‘ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা,/ ওরে সবুজ, ওরে অবুঝ, আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা।’ জেন-জি বর্গের প্রতি সমাজের উচ্চাশার ধরনও এমন!
সমসাময়িক বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যেভাবে আন্দোলন-সংগ্রাম সংঘটিত হচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ার এই চার ঘটনাও সমরূপী। স্থানিক ভিন্নতা সত্ত্বেও সংগঠিত হওয়ার ধরন, কৌশল এবং ভাষা প্রকাশের মাধ্যম বিবেচনায় এগুলো নতুন জামানার আন্দোলনের যাবতীয় বৈশিষ্ট্য ধারণ করছে।
২০০৬-২০ পর্যন্ত পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে সংঘটিত আন্দোলনের এক জরিপ অনুযায়ী, এ সময়ের আন্দোলনের দাবিদাওয়াগুলোকে মোটাদাগে চারটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। প্রথমত রয়েছে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ব্যর্থতা। এশিয়া, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার জনগণ মনে করছে, বিদ্যমান ব্যবস্থা তাদের ধারণ করতে পারছে না। ফলে গণতান্ত্রিক পশ্চাৎ–যাত্রার বৈশ্বিক প্রবণতার প্রতিক্রিয়ায় একধরনের ‘রিয়েল’ বা আসল গণতন্ত্রের দাবি এ সময়ের অধিকাংশ আন্দোলনের মুখ্য দাবিতে পরিণত হয়।
দ্বিতীয় ইস্যু হচ্ছে অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। নয়া উদারনীতিবাদী নীতি গ্রহণের ফলে যেভাবে অর্থনীতিকে সংকুচিত করা হয়েছে, এর ফলে বৈষম্য যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে বেকারত্বও। অর্থনৈতিক প্রশ্নটিও তাই ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। তৃতীয় গুরুতর বিষয় ছিল নাগরিক অধিকার। বিভিন্ন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নানাভাবে নাগরিক অধিকারসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপক অভিযোগ ছিল।
জনগণের মাঠে নেমে আসার পেছনে এই দাবি বড় ভূমিকা পালন করেছিল। চতুর্থ বিষয়টি হচ্ছে গ্লোবাল জাস্টিস বা বৈশ্বিক ইনসাফের ধারণা। সাধারণত জলবায়ু পরিবর্তন ও বিশ্বায়ন ছিল ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
সহজ ভাষায় বললে, কয়েক দশক ধরে চলা নয়া উদারনীতিবাদী নীতির কারণে সমাজে বৈষম্য বেড়েছে। এর ধাক্কায় নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের আয় ও সরকারি সুযোগ-সুবিধা কমে গেছে। অকার্যকর রাজনীতি, আর্থসামাজিক উন্নয়নে ব্যর্থতা আর সরকারের ওপর আস্থা হারিয়ে মানুষের হতাশার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এসব আন্দোলন-প্রতিবাদের মাধ্যমে। উল্লেখ্য, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এ প্রতিবাদ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটেছে, কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে ঘটেনি।
দক্ষিণ এশিয়ার চারটি দেশের ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রশ্ন বড় আকারে হাজির হচ্ছে। মাত্রাগত পার্থক্য থাকলেও এটা মোটেও অবাক হওয়ার বিষয় নয় যে বাংলাদেশ ও ভারতে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ার মূল সূত্র ছিল চাকরিজনিত ইস্যু: বাংলাদেশে কোটা সংস্কার, ভারতে চাকরি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস। শ্রীলঙ্কা ও নেপালে তীব্র অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক নেতাদের দুর্নীতি ছিল বড় ইস্যু। আবার বাংলাদেশের শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের অসম্ভাব্যতা যেমন ছিল, ভারতের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক নির্বাচনী অভিজ্ঞতাও ভূমিকা পালন করেছিল। এসব হচ্ছে মোটাদাগের মিলের কথা।
অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের মাত্রাই বাংলাদেশের ঘটনাবলিকে দক্ষিণ এশিয়ার বাকি দেশগুলোর ঘটনাবলি থেকে পৃথক করে দিয়েছে। আন্দোলন-পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহেও এর রেশ রয়ে যায়। প্রথমত, রাষ্ট্রীয় সহিংসতার এমন তীব্র মাত্রা, যেমন রীতিমতো যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করে ফেলেছিল, তেমনি এর প্রতিক্রিয়ায় অভ্যুত্থান-পরবর্তী সহিংস ঘটনাবলিরও জন্ম দিয়েছিল। জুলাই মাসের রাষ্ট্রীয় সহিংসতা আমাদের কালেকটিভ বা সামষ্টিক ট্রমার উৎস হয়ে আছে।
অন্যদিকে সাম্প্রতিক আন্দোলনগুলো বাংলাদেশের সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার বাকি তিনটি দেশের একটি বড় অমিলও হাজির করেছে—রাষ্ট্রীয় সহিংসতা বা রাষ্ট্রের প্রাণঘাতী চেহারা। আরও অনেক অমিল থাকলেও এই এক অমিলই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের এক হতাশাজনক চিত্রও তুলে ধরে আমাদের সামনে।
শ্রীলঙ্কার আন্দোলনে বা আরাগালায়ায় প্রাণ হারিয়েছেন ১০-১২ জন, নেপালের আন্দোলনে ৭৬ জন। আবার ভারতের ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনে অনেকে আহত হলেও কোনো প্রাণহানি ঘটেনি। এর বিপরীতে বাংলাদেশের চিত্র দেখেন। পুলিশসহ রাষ্ট্রীয় বাহিনী হাতে মাত্র ২০ দিনেই প্রায় এক হাজার নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। আহত বেশুমার।
এই রাষ্ট্রীয় সহিংসতা ও পুলিশি বর্বরতাই বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার বাকি দেশগুলো থেকে আলাদা করে দিয়েছে। এই পার্থক্য বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রাণঘাতী চেহারাও স্পষ্ট করে। ভারতেও সশস্ত্র আন্দোলন মোকাবিলায় দেশটির সহিংস চেহারা দেখা যায়, এর প্রচুর সমালোচনা ভারত ও ভারতের বাইরেও হয় এবং হচ্ছে। কিন্তু একটি শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে বাংলাদেশে যে মাত্রার লেথাল ওয়েপন বা প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার হয়েছে, তার নজির মেলা ভার।
আন্দোলন চলাকালেই ভারতীয় পত্রিকা দ্য ওয়ার কিছু প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিল, ‘কেন জলকামান ব্যবহার করা হয়নি? কেন পেরেক মারা লাঠি ব্যবহার করা হয়েছিল?’ এ প্রশ্ন ও পরিস্থিতির বিপরীতে চিন্তা করলেই বাংলাদেশের অবস্থান দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে যায়। আমাদের পরিস্থিতি এতই করুণ যে ভারতের এই আলাপকে ‘বিলাসিতা’ বলেই মনে হচ্ছে।
বাংলাদেশে যেকোনো আন্দোলনে পুলিশের প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার মোটামুটি রেওয়াজে পরিণত হয়েছিল। বিগত শাসনামলকে ‘ফ্যাসিবাদী’, ‘স্বৈরাচারী’, ‘দোআঁশলা’, ‘কর্তৃত্ববাদী’ ইত্যাদি অভিধায় ভূষিত করা হলেও পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত হওয়াটা যে এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল, সে বিষয়ে সবাই একমত। মিছিল ও সমাবেশে পুলিশের প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহারের নজির আগেও ছিল, কিন্তু বিগত আওয়ামী লীগের শাসনামলে এটা পদ্ধতিগতভাবে পৌঁছেছিল সর্বোচ্চ পর্যায়ে।
ছোট একটা পরিসংখ্যানই এ পার্থক্য স্পষ্ট করে দেয়। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, নব্বইয়ের গণ-আন্দোলন—কোনো পর্যায়েই রাজপথে এত লোক প্রাণ হারায়নি, যা চব্বিশের জুলাইয়ে ঘটেছে। এমনকি আওয়ামী শাসনামলে অন্যান্য আন্দোলনের ক্ষেত্রেও যে মাত্রায় বলপ্রয়োগের ঘটনা ঘটেছে, তা খোদ বাংলাদেশের ইতিহাসেই বিরল।
সম্প্রতি দ্য ডেইলি স্টার পুলিশের অস্ত্র কেনার নথি পর্যালোচনা করে জানিয়েছিল, ২০২১-২৩ সালের দিকে পুলিশ বাহিনী অপ্রাণঘাতী অস্ত্রের চেয়ে সাত গুণ বেশি প্রাণঘাতী অস্ত্র কিনেছিল। ২০১৩ সালের পর থেকে পুলিশ বাহিনীর সামরিকায়নও ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল। ফলে পুলিশকে প্রাণঘাতী অস্ত্রে সজ্জিতকরণ, অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, গুম এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের কারণে এই রাষ্ট্রের বাসিন্দাদের ‘হায়াত-মউত’ রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে চলে গিয়েছিল। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ইচ্ছামাফিক নাগরিকের প্রাণ হরণের চূড়ান্ত নমুনা ২০২৪ সালের জুলাই মাসে দেখা গেছে।
এই রাষ্ট্রীয় সহিংসতা অথবা আরও নির্দিষ্ট অর্থে বললে শান্তিপূর্ণ সমাবেশে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের মাত্রাই বাংলাদেশের ঘটনাবলিকে দক্ষিণ এশিয়ার বাকি দেশগুলোর ঘটনাবলি থেকে পৃথক করে দিয়েছে। আন্দোলন-পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহেও এর রেশ রয়ে যায়। প্রথমত, রাষ্ট্রীয় সহিংসতার এমন তীব্র মাত্রা, যেমন রীতিমতো যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করে ফেলেছিল, তেমনি এর প্রতিক্রিয়ায় অভ্যুত্থান-পরবর্তী সহিংস ঘটনাবলিরও জন্ম দিয়েছিল। জুলাই মাসের রাষ্ট্রীয় সহিংসতা আমাদের কালেকটিভ বা সামষ্টিক ট্রমার উৎস হয়ে আছে।
দ্বিতীয়ত, অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে যে বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার তথা রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্ন মুখ্য হয়ে উঠেছিল, সেখানেও এই সহিংস অভিজ্ঞতা মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার যেমন অন্যতম মুখ্য ইস্যুতে পরিণত হয়েছিল, তেমনি ট্রানজিশনাল জাস্টিস বা ক্রান্তিকালীন ইনসাফের আলোচনাও উঠেছে।
আমার সবার আগে প্রয়োজন ছিল পুলিশসহ রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সংস্কার। কিন্তু পুলিশের সংস্কার তো হলোই না, উল্টো যে পোশাকি পরিবর্তন করা হয়েছিল, সেটিও আবার পুরোনো হালতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অন্যদিকে র্যাবের মতো পদ্ধতিগত মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী বাহিনীর যেখানে বিলুপ্ত করার কথা ছিল, সেখানে ভিন্ন নামে সেটিকে রাখার আলাপও শুরু হয়েছে।
অভ্যুত্থানের পর অন্তত রাষ্ট্রের অভিমুখটা আদৌ পরিবর্তনকামী হলো কি না, এটিও বড় প্রশ্ন হিসেবে রয়ে গেল। আর কিছু না হোক, নাগরিকের জান ও মাল হেফাজতের নিশ্চয়তা যদি না করা যায়, তার চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর কিছু হতে পারে না।
● সহুল আহমদ লেখক ও গবেষক
* মতামত লেখকের নিজস্ব
