সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি একসময় সীমান্ত, সেনাবাহিনী ও জাতীয় পতাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু ডিজিটাল যুগে সেই প্রশ্নের নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। আজ একটি রাষ্ট্রের স্বাধীনতা অনেকাংশে নির্ভর করে তার নাগরিকদের তথ্য কোথায় সংরক্ষিত হচ্ছে, তার সরকারি যোগাযোগ কতটা নিরাপদ এবং তার ডিজিটাল ভবিষ্যতের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে রয়েছে তার ওপর। এ কারণেই বিশ্বজুড়ে ক্রমে গুরুত্ব পাচ্ছে একটি নতুন ধারণা—ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব।
ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের সংজ্ঞা হলো, একটি রাষ্ট্রের নিজস্ব তথ্য, ডিজিটাল অবকাঠামো, যোগাযোগব্যবস্থা এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত সম্পদের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা। অর্থাৎ দেশের নাগরিকদের তথ্য কোথায় সংরক্ষিত হবে, কীভাবে ব্যবহার হবে এবং কার আইনের আওতায় থাকবে—সে বিষয়ে চূড়ান্ত কর্তৃত্ব দেশের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ও আইনি কাঠামোর হাতে থাকা।
এই ধারণা হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। এই শতকের শুরু থেকে এই ধারণা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল। ২০১৩ সালে এডওয়ার্ড স্নোডেনের তথ্য ফাঁসের পর আন্তর্জাতিক নেতারা বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতারা উপলব্ধি করেন যে ডিজিটাল প্রযুক্তি শুধু উন্নয়ন ও সংযোগের মাধ্যম নয়; এটি নজরদারি, প্রভাব বিস্তার এবং কৌশলগত ক্ষমতারও হাতিয়ার হতে পারে। তখন প্রকাশ পায় যে তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধা ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান, কূটনীতিক ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ওপর নজরদারি চালিয়েছে।
এরপর ইউরোপের দেশগুলো নতুন করে ভাবতে শুরু করে—ডেটা কোথায় থাকবে, কীভাবে আদান-প্রদান হবে, ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে এবং গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপর তাদের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ কতটুকু।
ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের দ্রুত বিস্তার এই প্রশ্নগুলোকে আরও জোরালো করে তোলে। কারণ, সরকারি তথ্য, নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর তথ্য ক্রমশ বহুজাতিক প্রযুক্তি কোম্পানির সার্ভারে স্থানান্তরিত হচ্ছিল। এই প্রেক্ষাপটেই ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব ধারণাটি নতুন গুরুত্ব পেতে শুরু করে।
এর ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন জেনারেল ডেটা প্রোটেকশন রেগুলেশন (জিডিপিআর) কার্যকর করে। জিডিপিআরের উদ্দেশ্য শুধু ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা নয়; বরং ইউরোপের নাগরিকদের তথ্যের ওপর তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং বহুজাতিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনা।
সম্প্রতি ডেনমার্কের ঘটনাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে দেশটির সরকারি তথ্যপ্রযুক্তিব্যবস্থার বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সফটওয়্যারের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু গ্রিনল্যান্ডকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ডেনমার্ককে একটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে—যে প্রযুক্তির ওপর রাষ্ট্র পরিচালনা নির্ভর করছে, তার নিয়ন্ত্রণ আসলে কার হাতে?
বাংলাদেশের জন্য ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের প্রথম কারণ জাতীয় নিরাপত্তা। বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ, আর্থিক ব্যবস্থা, নির্বাচন, জননিরাপত্তা এবং সরকারি প্রশাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাত এখন ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর। এসব ব্যবস্থার তথ্য ও অবকাঠামোর ওপর পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণ না থাকলে সাইবার হামলা, তথ্য চুরি কিংবা বহিরাগত প্রভাবের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
ফলাফল হিসেবে দেশটির বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান ওপেন সোর্স প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর দিকে এগোচ্ছে। লিনাক্স, লিব্রে অফিসসহ বিভিন্ন উন্মুক্ত প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশি যোগাযোগ প্ল্যাটফর্মের বিকল্প নিয়েও ভাবা হচ্ছে। ফ্রান্সও কয়েক বছর আগে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য নিজস্ব নিরাপদ মেসেজিং ব্যবস্থা চালু করেছে। এসব উদ্যোগের পেছনে মূল দর্শন একটাই—রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপর রাষ্ট্রের নিজের নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে।
আমরা যখন কোনো অ্যাপ ব্যবহার করি, তখন শুধু একটি সফটওয়্যার ব্যবহার করি না; আমরা আমাদের ব্যক্তিগত তথ্য, যোগাযোগ, অবস্থান, অভ্যাস ও আচরণ সম্পর্কিত বিপুল পরিমাণ তথ্যও সেই প্ল্যাটফর্মের কাছে তুলে দিই।
উদাহরণ হিসেবে হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক, টিকটক বা অন্য কোনো জনপ্রিয় অ্যাপের কথা ধরা যেতে পারে। একজন সাধারণ ব্যবহারকারী জানেন না তাঁর তথ্য কোথায় সংরক্ষিত হচ্ছে, কারা তা বিশ্লেষণ করছে, কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে বা ভবিষ্যতে কোথায় ব্যবহৃত হতে পারে। সাধারণ নাগরিকের ক্ষেত্রে এটি ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রশ্ন।
কিন্তু একই প্ল্যাটফর্ম যদি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা, সামরিক বাহিনীর সদস্য, কূটনীতিক, বিচারক কিংবা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ব্যবহার করেন, তখন বিষয়টি জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে রূপ নেয়। সেখান থেকেই ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের গুরুত্ব শুরু।
বাংলাদেশ গত এক দশকে ডিজিটাল রূপান্তরে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। সরকারি সেবা, ব্যাংকিং, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের বড় অংশ এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরশীল।
বর্তমানে বাংলাদেশের বিপুল পরিমাণ তথ্য বিদেশি ক্লাউড, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি কোম্পানির প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষিত ও প্রক্রিয়াজাত হয়। ফলে কোনো আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তের কারণে যদি এসব সেবায় বিঘ্ন ঘটে, তাহলে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সেবাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। সেই সঙ্গে একটি মৌলিক প্রশ্ন এখন সামনে আসছে: এই ডিজিটাল ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ কি সত্যিই আমাদের হাতে আছে?
বাংলাদেশের জন্য ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের প্রথম কারণ জাতীয় নিরাপত্তা। বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ, আর্থিক ব্যবস্থা, নির্বাচন, জননিরাপত্তা এবং সরকারি প্রশাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাত এখন ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর। এসব ব্যবস্থার তথ্য ও অবকাঠামোর ওপর পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণ না থাকলে সাইবার হামলা, তথ্য চুরি কিংবা বহিরাগত প্রভাবের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
দ্বিতীয়ত, এটি অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলোর একটি হলো ডেটা। নাগরিক, ব্যবসা ও সরকারের উৎপাদিত তথ্য ভবিষ্যতের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গবেষণা এবং উদ্ভাবনের মূল জ্বালানি। যদি এই তথ্যের অধিকাংশ মূল্য বিদেশি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দেশের বাইরে চলে যায়, তাহলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতের ডিজিটাল অর্থনীতিতে কেবল ভোক্তা হিসেবেই থেকে যাবে। অন্যদিকে স্থানীয় ডেটা সেন্টার, ক্লাউড অবকাঠামো, সফটওয়্যার শিল্প এবং এআই গবেষণার বিকাশ নতুন কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
তৃতীয়ত, এটি নাগরিকের অধিকার, গোপনীয়তা ও তথ্যের মালিকানার প্রশ্ন। ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার, অননুমোদিত নজরদারি ও তথ্যফাঁসের ঘটনা বিশ্বজুড়ে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব নাগরিকের তথ্যের ওপর তার অধিকারকে শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
চতুর্থত, ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ভবিষ্যতের অর্থনীতিতে এআই-সক্ষমতা একটি দেশের উৎপাদনশীলতা, গবেষণা, শিক্ষা ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা নির্ধারণ করবে। বর্তমানে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশ বিদেশি এআই প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরশীল। প্রতিটি প্রশ্ন, বিশ্লেষণ কিংবা স্বয়ংক্রিয় কাজের জন্য মূলত বিদেশি কম্পিউটিং অবকাঠামো ব্যবহার করা হচ্ছে, যার বিনিময়ে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে।
দীর্ঘ মেয়াদে দেশীয় এআই অবকাঠামো, বাংলা ভাষাভিত্তিক মডেল এবং স্থানীয় কম্পিউটিং সক্ষমতা গড়ে তুলতে না পারলে আমরা এআই প্রযুক্তির ব্যবহারকারী হয়ে থাকব, নির্মাতা নয়। ফলে ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন এখন শুধু ডেটা সুরক্ষার নয়; এটি ভবিষ্যতের এআই অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান নির্ধারণেরও প্রশ্ন।
অস্ট্রেলিয়ার সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত বিষয়টিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। দেশটি ১৬ বছরের নিচে শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।
প্রশ্ন হলো, অস্ট্রেলিয়া যেহেতু বৈশ্বিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর এমন নীতি প্রয়োগ করতে পারে, বাংলাদেশ, ভারত বা পাকিস্তানের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো কি একই ধরনের অবস্থান নিতে সক্ষম? আমাদের কি সেই নীতিগত শক্তি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং দর-কষাকষির ক্ষমতা রয়েছে?
এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। কারণ, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের চ্যালেঞ্জ দ্বিমুখী। একদিকে তাদের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে হবে, অন্যদিকে প্রযুক্তিগত নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। তাদের বৈশ্বিক প্রযুক্তি ব্যবস্থার অংশও থাকতে হবে, আবার জাতীয় স্বার্থও রক্ষা করতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য এখন প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব কৌশল। এর মধ্যে থাকতে হবে স্থানীয় ক্লাউড ও ডেটা সেন্টার শক্তিশালী করা, দেশীয় সফটওয়্যার ও এআই শিল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, সাইবার নিরাপত্তাসক্ষমতা উন্নয়ন, ওপেন স্ট্যান্ডার্ড ও ওপেন সোর্স প্রযুক্তির ব্যবহার উৎসাহিত করা এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা।
তবে ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব মানেই বিশ্বের প্রযুক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া নয়। এটি কোনো ডিজিটাল দেয়াল নির্মাণের ধারণা নয়। বরং এর লক্ষ্য হলো বৈশ্বিক প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা ও তথ্যের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা।
সম্প্রতি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল যে ভবিষ্যতের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা শুধু সড়ক, সেতু কিংবা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভর করবে না; বরং নির্ভর করবে তথ্য, সফটওয়্যার, ক্লাউড, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপর নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতার ওপর। প্রশ্ন হলো, আমরা কি এখন থেকেই সেই ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি?
রূপায়ন চৌধুরী তথ্যপ্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও কোফাউন্ডার, সিনেসিস আইটি।