সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও শাজাহান খানের খুন্তিতত্ত্ব

সংসদ সদস্য, সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খান

সংসদ সদস্য, সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খান গণমাধ্যম তথা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সম্পর্কে নতুন একটি তত্ত্ব হাজির করেছেন। তত্ত্বটির নাম দেওয়া যেতে পারে ‘খুন্তিতত্ত্ব।’ এটি তার নিজের আবিষ্কার নয়। প্রখ্যাত ব্রিটিশ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হ্যারল্ড লাস্কি থেকে ধার করেছেন।

শনিবার জাতীয় সংসদের সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ আলোচনায় অংশ নিয়ে শাজাহান খান বলেন, যেসব দেশ অর্থনৈতিকভাবে উন্নত, শিক্ষার হার বেশি, সেসব দেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতাও উন্নত। কিন্তু যেসব দেশ অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর ও শিক্ষায় পিছিয়ে আছে, সেসব দেশে ততটা স্বাধীনতা আশা করা অন্যায়।

তিনি বলেন, ‘এ কথার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়, বাক্‌স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা বলতে বিএনপি যা বোঝায়, তা কিন্তু এটা নয়। আমরা মনে করি, আমাদের দেশে, আমাদের দেশের যে অর্থনৈতিক অবস্থা, শিক্ষিতের হার, আমাদের দেশের অগ্রগতির আজকের যে অবস্থা, তার ওপর ভিত্তি করেই বাক্‌স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা দেওয়ার কথা। তা না হলে যে কথা বলেছেন, হ্যারল্ড লাস্কি, তা হবে শিশুর হাতে লোহার খুন্তি তুলে দেওয়ার মতো।’ (প্রথম আলো, ৯ এপ্রিল ২০২৩)

আরও পড়ুন

রীতিমতো ধন্দে পড়ে গেলাম। ওপরের কথাগুলো কি আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শাজাহান খান বলেছেন, না বিএনপির কোনো নেতা? আওয়ামী লীগের নেতার তো এ কথা বলার কথা নয় যে বাংলাদেশ এখনো ‘অনগ্রসর’ একটি দেশ।

শাজাহান খান তার বক্তব্যের মাধ্যমে স্বীকার করেছেন যে, আমাদের দেশ এখনো ওই স্তরে যায়নি, যাতে করে  সংবাদপত্রের অগাধ স্বাধীনতা আশা করা যায়। তাহলে এত দিন আওয়ামী লীগের মন্ত্রীরা, নেতারা দেশবাসীকে উন্নয়নের যে বয়ান দিয়েছেন তা শুধুই কথার কথা! এক নদীতে একই সময়ে যেমন উজান-ভাটা দুটো হতে পারে না, তেমনি একই দেশ তা একই সঙ্গে ‘উন্নত’ ও ‘অনগ্রসর’ অবস্থা থাকতে পারে না।

শাজাহান খানের বক্তব্য অনুযায়ী আমরা এখনো অনগ্রসর দেশের কাতারে অবস্থান করছি। ফলে, উন্নত দেশের মানুষের যে বাক্‌স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা থাকে, সেটি এখানে থাকার কথা নয়। তিনি স্পষ্ট করেই বলেছেন যে বিএনপি উন্নত দেশের মতো বাক্‌স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা চাইলেও আওয়ামী লীগ শাসনামলে সেটি সম্ভব নয়। কেননা, বাংলাদেশে এখনো ‘অনগ্রসর’।

স্বাধীনতার ৫২ বছর পরও যে আমরা ‘অনগ্রসর’ জাতি থেকে গেলাম, সে জন্য কাকে দায়ী করা যাবে? বিএনপি ও জাতীয় পার্টির শাসনে দেশ পিছিয়ে ছিল, সে সময়ে কোনো উন্নয়ন হয়নি—এসব কথাই তো আমরা আওয়ামী লীগ নেতাদের মুখে শুনি। আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-নেতারা প্রতিদিন বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে এসব কথা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন। তাদের দাবি,  বিএনপি ও জাতীয় পার্টি দেশের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে কিছু করেনি। কিন্তু সেই আমল তো অনেক আগে বাসি হয়েছে। আওয়ামী লীগ গত ১৪ বছর একটানা দেশ শাসন করার পরও কেন আমাদের ‘অনগ্রসর’ দেশের অপবাদ শুনতে হচ্ছে।  

শাজাহান খানের তত্ত্ব আর বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন। কেবল আরএসএফ নয়, সব আন্তর্জাতিক সংস্থার জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশে গণমাধ্যম ও বাক্‌স্বাধীনতা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, অর্থনীতির সূচকে আমরা কমবেশি এগিয়ে যাচ্ছি।

শাজাহান খান বাক্‌স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার বিষয়ে যে যুক্তি দাঁড় করিয়েছিলেন, একই যুক্তিতে পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খান মৌলিক গণতন্ত্র চালু করেছিলেন। মৌলিক গণতন্ত্রে জনগণ সরাসরি সংসদ সদস্য কিংবা রাষ্ট্রপতিকে নির্বাচন করতে পারতেন না। জনগণ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বরদের নির্বাচিত করতেন। তাঁরা রাষ্ট্রপতি ও সংসদ সদস্যদের নির্বাচিত করতেন। এ কারণে তাঁরা বিডি মেম্বর হিসেবে পরিচিত ছিলেন। মৌলিক গণতন্ত্রের যুক্তি ছিল জনগণ রাজনীতিসচেতন নয়। তাই তারা সঠিক প্রতিনিধি নির্বাচন করতে সক্ষম নয়।

শাজাহান খানও আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছেন, দেশে শিক্ষার হার কম, জনগণ সচেতন নয়, ফলে তাদের যথেষ্ট বাক্‌স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা দেওয়া যায় না। কিন্তু তিনি যে সময় বিরোধী দলে ছিলেন, সে সময় কি এ যুক্তি মেনে চলতেন? শাজাহান খান চোখ-কান খোলা রাখলে দেখতে পেতেন, বাংলাদেশের চেয়ে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা অনেক দেশ বাক্‌স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় এগিয়ে আছে।

আরও পড়ুন

গত বছরের ৩ মে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (আরএসএফ) ২০২২ সালের যে প্রতিবেদন প্রকাশ করে, তাতে দেখা যায়, ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬২তম (স্কোর ৩৬ দশমিক ৬৩)। ২০২১ সালের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৫২তম (স্কোর ৫০ দশমিক ২৯)। আর ২০২০ সালের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৫১তম। অর্থাৎ, আগের দুই বছরের সূচকেও বাংলাদেশের এক ধাপ করে অবনতি হয়েছিল।

২০২২ সালের সূচকে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে মিয়ানমার ছাড়া সবার নিচে বাংলাদেশের অবস্থান। সূচকে বাংলাদেশের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে ভারত (১৫০), পাকিস্তান (১৫৭), শ্রীলঙ্কা (১৪৬), আফগানিস্তান (১৫৬), নেপাল (৭৬), মালদ্বীপ (৮৭), ভুটান (৩৩)। এর মধ্যে ভারত ছাড়া আর কোনো দেশ অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ থেকে উন্নত নয়।

এর অর্থ শাজাহান খানের তত্ত্ব আর বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন। কেবল আরএসএফ নয়, সব আন্তর্জাতিক সংস্থার জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশে গণমাধ্যম ও বাক্‌স্বাধীনতা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, অর্থনীতির সূচকে আমরা কমবেশি এগিয়ে যাচ্ছি।

এই স্ববিরোধী অবস্থানের ব্যাখ্যা কী? একটা ব্যাখ্যা হলো আমাদের কথা বলার স্বাধীনতার প্রয়োজন নেই। সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রয়োজন নেই। অর্থনৈতিক উন্নতিই একমাত্র চাওয়া। পৃথিবীতে এ রকম বহু দেশ আছে। চীন ও রাশিয়া বড় উদাহরণ। কিন্তু এই দেশগুলো যত শক্তিশালী হোক না কেন, গণতান্ত্রিক নয়।
শাজাহান খান জাতীয় সংসদের প্রভাবশালী সদস্য। একই সঙ্গে দলের নীতিনির্ধারকদের একজন। খুন্তিতত্ত্বের মধ্য দিয়ে তিনি দেশবাসীকে কী বার্তা দিলেন? অর্থনৈতিক ও বাক্‌স্বাধীনতা—দুই দিক থেকেই বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে?

একজন সাবেক মন্ত্রী ও প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতার সরল স্বীকারোক্তিই বটে!

  • সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি। ইমেইল: [email protected]