১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদের নির্বাচন ও গণভোট হতে যাচ্ছে। এ নিয়ে সরকার বিপুল আয়োজন করছে। তার একটি হলো, প্রায় ৭২ কোটি টাকা খরচ করে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো হবে (প্রথম আলো, ২১ জানুয়ারি ২০২৬)। এটি একটি সংবাদ।
প্রশ্ন হলো, ঝুঁকিপূর্ণ বলতে আমরা কী বুঝব। সহজে যে অর্থটি দাঁড়ায়, তা হচ্ছে এসব কেন্দ্রে গোলমাল হতে পারে। তাতে ভোট ভন্ডুল হওয়ার আশঙ্কা। সেটি ঠেকাতে কড়া নজরদারি থাকবে। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে গোলমালের ধরন এবং গোলমালকারীদের শনাক্ত করা যাবে। মনে হচ্ছে সরকার চায় একটা শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হোক। নাগরিকেরাও তা-ই চান। তাহলে কারা চান না? নিশ্চয়ই কিছু লোক আছেন, যাঁরা চান না আমরা শান্তিতে থাকি।
নির্বাচন একটা যুদ্ধ। যুদ্ধে নিয়মনীতির বালাই থাকে না। জাতিসংঘের একাধিক সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ বেধে গেলে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী তার সালিস-মীমাংসা হয়। এ জন্য আছে নানা সনদ। অবশ্য সবাই সেটি মানে না। যাদের গায়ের জোর বেশি, তারা চাইলেও অন্যের ওপর চড়াও হতে পারে। তখন জাতিসংঘ চেয়ে চেয়ে দেখে আর বিবৃতি দেয়।
নির্বাচনী যুদ্ধও অনেকটা সে রকম। যাঁর জোর বেশি, তিনি কমজোরিদের ওপর চড়াও হন। ভোটকেন্দ্র দখলে নেওয়া, প্রতিপক্ষ প্রার্থীর এজেন্টকে কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া অথবা কেন্দ্রে ঢুকতে না দেওয়া, নিজের লোক দিয়ে ইচ্ছেমতো ব্যালট পেপারে নিজের মার্কায় সিল দিয়ে বাক্স ভর্তি করা, বাধা দিলে কেন্দ্রে দায়িত্বরত কর্মকর্তাকে হুমকি–ধমকি দেওয়া কিংবা পেটানো, ভোটের বাক্স মাথায় নিয়ে দৌড় দেওয়া, প্রয়োজনে প্রতিপক্ষের কর্মী বা সমর্থককে পিটিয়ে, কুপিয়ে বা গুলি করে মেরে ফেলা—সবই সম্ভব।
অতীতের নির্বাচনগুলো সে রকমই বলে। তো এ রকম হওয়ার সম্ভাবনা যেসব কেন্দ্রে বেশি, সেগুলোকে নির্বাচন কমিশন ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা দিয়েছে। সেসব কেন্দ্র সিসিটিভি ক্যামেরা দিয়ে নিরাপত্তার চাদরে ঢাকার একটা চেষ্টা হচ্ছে। এর আগে শুনেছি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বডি ক্যামেরা দেওয়া হবে। টেলিভিশনে ও সিনেমায় দেখি, পশ্চিমের কিছু দেশের সৈন্যদের হেলমেটে ক্যামেরা থাকে। অনেকটা সে রকম হবে হয়তো। এগুলোর নিশ্চয়ই অনেক খরচ।
একটা ছিমছাম সুন্দর নির্বাচন হতে পারে। সেখানে একটি ‘যদি’ আছে। যদি সব প্রার্থী সভ্য আচরণ করেন, তাহলে ভালো নির্বাচন না হওয়ার কারণ দেখি না। তাঁরা জবরদস্তি বা মারামারি না করলে কোনো ক্যামেরা-সিসিটিভির দরকার হয় না। কিন্তু এ তো আকাশকুসুম কল্পনা।
নির্বাচনে তো প্রার্থীদের কোটি কোটি টাকা উড়ছে। সেই টাকা গাছ থেকে পাড়া হচ্ছে না। আসমান থেকেও টুপ করে পড়ছে না। সেই টাকা আসছে পাবলিকের কাছ থেকে। হয় ব্যাংক থেকে পাবলিকের জমানো টাকা ঋণ নিয়ে মেরে দেওয়া হচ্ছে অথবা জবরদস্তি করে চাঁদা তোলা হচ্ছে। ঋণ নিয়ে যে টাকা ফেরত দেয় না, আমরা তাকে বলি ঋণখেলাপি। সোজা কথায় ব্যাংক লুটেরা। কয়েকজন ঋণখেলাপির নাম বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। নির্বাচন কমিশনে তাঁদের প্রার্থিতা কীভাবে টিকে গেল, তা নিয়ে কথা উঠেছে। দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়েও কিছু দল প্রশ্ন তুলেছে, আমাদের লোকদের আটকে দিল অথচ ওদেরগুলোকে ছাড় দিল—এ কেমন বিচার?
বডি ক্যামেরা আর সিসিটিভি ক্যামেরা কিনতে গুচ্ছের টাকা খরচ হবে। সেই টাকার জোগান প্রার্থীরা দেবেন না। টাকা দেবে সরকার। সরকারের টাকা বানানোর কারখানা নেই। সেই টাকা আসবে জনগণের কাছ থেকে। অর্থাৎ প্রার্থীর লোকজন ভোটকেন্দ্রে মাস্তানি করবেন, ভোট ডাকাতি করবেন। আর সেটি কীভাবে হলো, তা দেখার জন্য ভোটাররা ক্যামেরার জোগান দেবেন। আচ্ছা, ভোট ডাকাতেরা যদি সিসিটিভি ভেঙে ফেলে বা সেটি খুলে নিয়ে দৌড় দেয়, তাহলে কী হবে! পুলিশ-মিলিটারি তাদের ধরবে? পুলিশ-মিলিটারির ভয় থাকলে ক্যামেরা-টিভির দরকার কী। আসলে পুলিশ-মিলিটারির ভয় এসব ডাকাতের নেই। থাকলে গত সাড়ে পাঁচ দশকে নির্বাচনের নামে এই অনাচার হতো না। এ প্রসঙ্গে একটি উদাহরণ দিচ্ছি।
স্বাধীনতার পর এ দেশে প্রথম ভোট হয় ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ। সেদিনের একটি বিবরণ পরের দিন পত্রিকায় ছাপা হয়। সংবাদটি সংক্ষেপে এ রকম:
‘ঢাকা শহরের অধিকাংশ ভোটকেন্দ্র বেলা ১১টার মধ্যে ফাঁকা হয়ে যায়। সন্ত্রাসের মুখে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোটদাতারা ভোটদানে বিরত থাকেন। কিন্তু একই মুখ বারবার ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হয়েছেন নির্বিঘ্নে। কোহিনুর কেমিক্যালের স্টোর বিভাগের শ্রমিক মিজানুর রহমান ভোট দিয়েছেন চারবার। মহাখালী-৩ ভোটকেন্দ্রে এই প্রতিনিধির স্বল্পকালীন উপস্থিতিতে একই ব্যক্তি বীর বিক্রমে ২৩২, ২৩৩, ২৩৪, ২৩৫, ২৩৬, ৮৪, ৪১৩ ও ১১৯ নম্বর (ব্যালটে বা ভোটার তালিকা) ভোট দিয়ে যাওয়ার পর প্রিসাইডিং অফিসার আমার জিজ্ঞাসার জবাবে জানান, বিরোধী দলের পোলিং এজেন্ট নিশ্চুপ, আমার ঘাড়ে তো মাথা একটিই, কেন অনর্থক এই আর্থিক দুর্দিনে পরিবার পরিজনকে অনাথ করা ভাই!’ (গণকণ্ঠ, ৯ মার্চ ১৯৭৩)
এ তো গেল অসংখ্য ভোটকেন্দ্রের মধ্যে একটির খণ্ডকালীন ছবি। ক্যামেরা দিয়ে সেটি না হয় দেখা যাবে, যদি সেই ক্যামেরা শেষতক অক্ষত থাকে। কিন্তু ভোটকেন্দ্রে যাওয়া-আসার পথে যেসব ঝামেলা হয়, তা মনিটর করা হবে কীভাবে? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা টহল দেবেন? তাঁদের দেখে মাস্তানেরা ভয়ে পালাবে? তাঁরা কি সব জায়গায় চব্বিশ ঘণ্টা টহল দেবেন? এটা কি সম্ভব? তাহলে মাস্তান ঠেকানো যাবে কীভাবে?
অতীতের নির্বাচনগুলোতে দেখেছি, মারামারি, খুনোখুনি বেশির ভাগ হয় নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পর। যে হেরে যায়, সে খেপে গিয়ে প্রতিপক্ষের সমর্থকদের ওপর চড়াও হয়। যে জিতে যায়, সে-ও প্রতিপক্ষের লোকদের ওপর চড়াও হয় ক্ষমতার দম্ভ দেখাতে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাদের নৃশংসতার শিকার হন নারী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা। সংখ্যালঘুরা তো এমনিতেই কুঁকড়ে আছেন। নির্বাচন এলে তাঁদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। ভোট দিলেও বিপদ, না দিলেও বিপদ।
একবার এক নির্বাচনে এক প্রার্থী তাঁর এলাকার সংখ্যালঘু নেতাদের ডেকে বললেন, ‘আপনারা কি আমাকে ভোট দেবেন?’ তাঁরা সবাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করছেন। মুখের ওপর ‘না’ বলার সাহস নেই। সবাই সমস্বরে বললেন, ‘আপনাকেই তো ভোট দেব।’ ওই প্রার্থী মুচকি হেসে বললেন, ‘এই তো, আপনাদের ভোট পেয়ে গেছি। আমাকেই যখন ভোট দেবেন, তাহলে আপনাদের আর কষ্ট করে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার দরকার নেই।’ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যরা আর ভোটকেন্দ্রে যাননি। তাঁদের ভোট সবই পড়েছে ওই প্রার্থীর পক্ষে।
নারীদের অবস্থাও অনেকটা সে রকম কিংবা তার চেয়েও খারাপ। সমাজপতিদের একটা প্রচার আছে, সতী নারীর তো ঘরের চৌকাঠ পেরোনো নিষেধ। পত্রিকায় খবর ছাপা হয়, অমুক জেলার ছাব্বিশটি গ্রামের নারীরা এই প্রথমবার ভোট দিলেন কিংবা তমুক জেলার বত্রিশটি গ্রামের নারীরা ভোটকেন্দ্রে যাননি। একুশ শতকের সিকিভাগ পার হয়ে যাওয়ার পরও এই পোড়ার দেশে এটি সংবাদ শিরোনাম হয়।
একটা ছিমছাম সুন্দর নির্বাচন হতে পারে। সেখানে একটি ‘যদি’ আছে। যদি সব প্রার্থী সভ্য আচরণ করেন, তাহলে ভালো নির্বাচন না হওয়ার কারণ দেখি না। তাঁরা জবরদস্তি বা মারামারি না করলে কোনো ক্যামেরা-সিসিটিভির দরকার হয় না। কিন্তু এ তো আকাশকুসুম কল্পনা।
জিততেই হবে—এই পণ করে বীরেরা ময়দানে নেমেছেন। দলের টিকিট চেয়েও না পেয়ে স্বতন্ত্র দাঁড়িয়ে গেছেন কেউ কেউ। সংসদ সদস্য হওয়ার খোয়াব দেখছেন অনেক দিন ধরে। আগে যাঁরা সংসদে ছিলেন, তাঁরা জানেন এখানে কী মধু আছে। যাঁরা যাননি, তাঁরাও জানেন তাঁদের জন্যও অপেক্ষা করছে মধুর চাক। সেটি চেটেপুটে খাওয়ার জন্য শরীর চনমন করছে।
মহিউদ্দিন আহমদ লেখক ও গবেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব
