দেশ নির্বাচনের আবহাওয়ার মধ্যে ঢুকেছে। তবে এর ঠিক আগে আগে বেশ কিছু গুরুতর, গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী ঘটনার সাক্ষী হয়েছে বাংলাদেশ। এই ঘটনাগুলোর প্রভাব শুধু আগামী নির্বাচনে নয়, বরং আরও সুদূরপ্রসারী হবে বলেই মনে হয়।
নির্বাচনবিরোধী প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য একটি শক্তির সক্রিয়তা নানা সময়ে টের পাওয়া গেছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরপরই বলা যায় পরিকল্পিত এক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ও সম্ভাব্য সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী শরিফ ওসমান হাদি। তাঁর হত্যাকাণ্ড দেশের মানুষকে ক্ষুব্ধ করেছে।
এ ঘটনাকে নির্বাচনবিরোধী তৎপরতা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ আছে। কারণ, এ ধরনের ঘটনা জনমনে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তার বোধ তৈরি করে। এর উল্টো দিকে লাখ লাখ স্বতঃস্ফূর্ত মানুষ শহীদ হাদির জানাজায় হাজির হয়ে তাঁর প্রতি তাঁদের শ্রদ্ধা ও সমর্থন প্রকাশ করেছেন।
আবার একই সঙ্গে হাদির মৃত্যুর মতো এই মর্মান্তিক ঘটনাকে পুঁজি করে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার–এর মতো সংবাদমাধ্যমে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনাকেও নির্বাচনবিরোধী হিসেবে বিবেচনা করার যথেষ্ট কারণ আছে।
নির্বাচনের আগে এ ধরনের সহিংসতা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতাকেই নির্দেশ করে। শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখার সক্ষমতার সঙ্গে একটি অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের সম্পর্ক রয়েছে।
২.
নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক মেরুকরণও ঘটেছে। গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদের দল এনসিপি জামায়াতের সঙ্গে জোট করে নির্বাচনে যাচ্ছে। রাজনৈতিকভাবে দেখলে এটা সাধারণ নির্বাচনী সমঝোতার চেয়ে বড় কিছু। কারণ, এর মধ্য দিয়ে এনসিপির অবস্থানটি স্পষ্ট হয়েছে। দলটির রাজনৈতিক ধারা কী, এ নিয়ে যাঁদের কৌতূহল ছিল, তাঁরা জবাব পেয়ে গেছেন।
এনসিপির এ অবস্থানকে তাদের রাজনৈতিক ধারা অনুযায়ী ‘সঠিক গন্তব্যে’ যাত্রা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। দলটির মূল নেতাদের অনেকে তাঁদের আদর্শের জায়গাটি ইতিমধ্যেই নানাভাবে পরিষ্কার করেছেন। তা ছাড়া আলোচনায় আছে, দলটিকে সংগঠিত করতে জামায়াত নানাভাবে সহযোগিতা করেছে। বিশেষ করে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন নিশ্চিত করার জন্য সারা দেশে দ্রুত কমিটি গঠন বা এনসিপির সভা-সমাবেশে লোকবল সরবরাহ—এসব ক্ষেত্রে জামায়াতের ভূমিকার কথা নানা সূত্রে জানা যায়।
এনসিপি শেষ পর্যন্ত ‘সঠিক গন্তব্য’ বেছে নেওয়ায় কিছু নেতা-কর্মীর বিভ্রান্তিও দূর হয়েছে। দলটির মধ্যে ক্ষীণ যে বাম ও মধ্যপন্থী ধারা ছিল বা নারী ইস্যুতে এনসিপির ভূমিকায় যাঁরা বিরক্ত ছিলেন, তাঁরা ইতিমধ্যেই নিষ্ক্রিয় হয়েছেন অথবা ঘোষণা দিয়ে দল ছেড়েছেন। এই ধারা অব্যাহত আছে। এর মধ্য দিয়ে ‘পরিশুদ্ধ’ হয়ে পুরোপুরি ডানপন্থী আদর্শের দলে পরিণত হতে পারে এনসিপি।
জামায়াতের নির্বাচনী জোটে যুক্ত হয়ে এনসিপি কী লাভ করবে, অন্তত আসন পাওয়ার দিক থেকে, তা বোঝার জন্য নির্বাচনের ফলাফল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তবে রাজনৈতিকভাবে তারা সমাজের মধ্যপন্থী ও জনমতের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী একটি নাগরিক গোষ্ঠীর আস্থা যে হারিয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
রাজনৈতিক ধারার দিক থেকে দেখলে আগামী নির্বাচনের মূল লড়াইটা হবে মধ্য ও ডানপন্থার মধ্যে। কারণ, রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বাম বা মধ্যবাম ধারা বলে কোনো পক্ষ এবারের নির্বাচনে সেভাবে মাঠে নেই।
৩.
বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি হিসেবে বিবেচিত জামায়াত তার রাজনৈতিক পথচলায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি—দুই দলের সঙ্গে মিলেমিশেই এগিয়েছে, আন্দোলন করেছে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে এক হয়ে বিএনপি সরকারের বিদায় নিশ্চিত করেছে। আবার বিএনপির সঙ্গে জোট করে সরকারের অংশীদারও হয়েছে।
তবে জামায়াত তার রাজনৈতিক ইতিহাসে এখন সবচেয়ে ভালো সময় পার করছে। একাত্তরের বাংলাদেশবিরোধী অবস্থান ও অপকর্মকে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান দিয়ে ঢেকে ফেলার চেষ্টায় তারা অনেকটাই সফল হয়েছে। জামায়াতের নির্বাচনী জোটে এনসিপিকে যুক্ত করতে পারা সেই সাফল্যে নতুন পালক হিসেবেই বিবেচিত হবে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ঐতিহাসিক কারণেই গ্রহণযোগ্যতার সংকটে থাকা জামায়াত এনসিপিকে সঙ্গী করার মধ্য দিয়ে যে নিজেকে সাফসুতরা করার পথে আরও এগিয়ে গেল, তাতে সন্দেহ নেই। একই ধারাবাহিকতায় মুক্তিযুদ্ধের বীর বিক্রম কর্নেল অলির দল এলডিপিকে যুক্ত ও বিএনপির মেজর (অব) আখতারুজ্জামানকে দলে নিতে পারাও জামায়াতের বড় সাফল্য।
বোঝা যায়, জামায়াত তাদের ছাতাটি বড় করে ইসলামপন্থীদের বাইরেও নানা রাজনৈতিক শক্তিকে যুক্ত করার চেষ্টা করছে। জামায়াতের এই বৃহত্তর ছাতা বিএনপিকে কতটা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
৪.
১৭ বছর নির্বাসনে থাকা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরা এ সময়ের রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারত। ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরা ও লাখ লাখ মানুষের সমাবেশে তাঁর ‘আমার’ বা ‘আমাদের’ একটি পরিকল্পনা আছে—এ ঘোষণা দেশের রাজনীতিতে ঐতিহাসিক উপলক্ষ হিসেবেই বিবেচিত হবে।
কিন্তু দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যু এবং তাঁর জানাজায় ইতিহাসের সবচেয়ে বড় লোকসমাগম ও দলমতের বাইরে তাঁর প্রতি যে মাত্রার জনশ্রদ্ধা দেখা গেল, তা সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে।
তারেক রহমানের ফিরে আসা ও খালেদা জিয়ার মারা যাওয়ার পরের আবেগ-অনুভূতির অভাবিত ঘটনাপ্রবাহ ভোটের মাঠে বিএনপিকে অনেক এগিয়ে দিয়েছে। বিপুল জয়ের ব্যাপারে বিএনপি মধ্যে যেমন আত্মবিশ্বাস বেড়েছে, তেমনি জনমনেও এ ধারণা জোরালো হচ্ছে। নির্বাচনে ফলাফল নিয়ে যাঁদের মধ্যে ভিন্ন ধারণা আছে বা ছিল, তাঁদের হয়তো নতুন করে হিসাব-নিকাশ করতে হবে।
তবে বড় জয়ের আত্মবিশ্বাস অনেক সময় ভোটের বাক্সে গিয়ে ভেঙে যায়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনকে আমরা এ ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত মানতে পারি। আওয়ামী লীগ জিতেই গেছে, সরকার গঠন করছে—এমন আওয়াজের মধ্যে তখন জয় পায় বিএনপি।
দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে রাজনৈতিকভাবে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। দেশের রাজনীতি এখন পর্যন্ত যে জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, তাতে বিএনপি এই কৌশল কাজে দিয়েছে বলে মনে হয়। তা ছাড়া গণ-অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগবিহীন রাজনৈতিক পরিসরে বিএনপি দল হিসেবে নিজেকে মধ্যপন্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে গেছে। যদিও দলটিতে ডান ধারার লোকজনের উপস্থিতি ও প্রভাব অস্বীকার কারার উপায় নেই।
৫.
ক্ষমতায় গেলে কোন পক্ষ কীভাবে দেশ চালাবে, কতটা সুশাসন দেবে, নাগরিক অধিকার বা নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে কী করবে, তা একটা বিবেচনা। কিন্তু রাজনৈতিক ধারার দিক থেকে দেখলে আগামী নির্বাচনের মূল লড়াইটা হবে মধ্য ও ডানপন্থার মধ্যে। কারণ, রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বাম বা মধ্যবাম ধারা বলে কোনো পক্ষ এবারের নির্বাচনে সেভাবে মাঠে নেই।
ভোটারদের সম্ভবত এ দুই পক্ষ থেকেই কোনো পক্ষকে বেছে নিতে হবে। নির্বাচনে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সমর্থক ভোটারদের ভোট কোন দিকে যাবে, সেটাও এক বড় প্রশ্ন। তারা কি তাদের রাজনৈতিক বিবেচনা থেকে ‘মন্দের ভালো’ বেছে নেবে নাকি ‘নেতিবাচক’ ভোটের পথ ধরবে? আগের যেকোনো নির্বাচনের তুলনায় এবারের বাস্তবতা ও হিসাব-নিকাশ পুরো আলাদা।
নির্বাচন বলতে যা বোঝায়, তা ২০০৮ সালের পর হয়নি। সে কারণে ভোটের ফলাফল ধরে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি সমর্থনের হালনাগাদ কোনো ডেটা বা তথ্য নেই। আবার ১৭ বছর আগের ডেটাকেও বিবেচনা করা যাচ্ছে না। এর মধ্যে অনেক নতুন ভোটার হয়েছেন, যাঁরা কখনো ভোট দেননি।
এই সময়ে দেশ গেছে এক নিপীড়নমূলক স্বৈরশাসনের মধ্য দিয়ে। ২০১৮ সালে স্কুলের শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়ক আন্দোলন করে সেই শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। বলা যায়, এর ধারাবাহিকতায় সফল হয়েছে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান, যার নেতৃত্ব দিয়েছে ছাত্র ও তরুণেরা।
এই গণ-অভ্যুত্থান আমাদের সামনে এক নতুন প্রজন্মকে হাজির করেছে, যাদের চিন্তাভাবনা ও মনোজগৎ আমাদের অনেকেরই জানা-বোঝার বাইরে। আমরা কি জানি বা ধারণা করতে পারি যে তাদের ভোট কোন দিকে যাবে? তা ছাড়া প্রবাসী ভোটারেরাও এবার প্রথমবারের মতো ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। ভোটের হিসাব-নিকাশ যাঁরা করছেন, তাঁরা এই বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিচ্ছেন কি?
শুরুতে বলেছি, দেশ নির্বাচনী আবহাওয়ার মধ্যে ঢুকেছে। একই সঙ্গে এটাও বলেছি, নির্বাচনবিরোধী প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য একটি শক্তির সক্রিয়তা নানা সময়ে টের পাওয়া গেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, সেই শক্তি কি একেবারেই নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে? মনে হয় না।
কিন্তু বাংলাদেশের সামনে এখন একটিই পথ, নির্বাচন। এর বাইরে অন্য কোনো কিছু গ্রহণ করার বাস্তবতা বা সক্ষমতা বাংলাদেশের নেই। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের চ্যালেঞ্জে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারসহ দেশের সব গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তিকে বিজয়ী হতেই হবে।
এ কে এম জাকারিয়া প্রথম আলোর উপসম্পাদক। ই–মেইল: [email protected]
*মতামত লেখকের নিজস্ব
[৭ জানুয়ারি ২০২৬ প্রথম আলোর ছাপা সংস্করণে এ লেখা মধ্য ও ডানপন্থার ভোটের লড়াই—শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে।]
