রাজনৈতিক গুজব: যে হাতিয়ারে রাজনীতিক-জনগণ সবার ক্ষতি

গণতন্ত্রের ওপর রাজনৈতিক গুজব ও অপতথ্যের নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে সম্প্রতি প্রচুর আলোচনা হচ্ছে। সংবাদমাধ্যম ও বিশেষজ্ঞরা কুতথ্যকে মিথ্যা বলে প্রমাণ করার পরও রাজনৈতিক গুজব এবং অপতথ্য জনমনে স্থায়ী হয়ে থাকে।

ইন্টারনেটের ব্যবহার ‘বিকল্প সত্য’ ও ষড়যন্ত্রতত্ত্বের প্রবক্তাদের কাজ সহজ করে দিয়েছে। বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সম্ভাব্য কোটি কোটি শ্রোতার কাছে ব্যক্তিগত ও মনগড়া তত্ত্ব সম্প্রচার করতে পারে।

যার ফলে সমমনা সংশয়বাদীদের সঙ্গে একটি ভার্চ্যুয়াল সম্প্রদায় গড়ে ওঠে। গুণমানহীন তথ্য এভাবে তাৎক্ষণিক বিশ্বাসযোগ্যতার একটি ভ্রান্ত ধারণা সৃষ্টি করে।

আরও পড়ুন

রাজনৈতিক পরিবেশে গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বলে গুজব গণতন্ত্রের কার্যকারিতার জন্য খুবই বিপজ্জনক। এর ফলে রাজনৈতিক কট্টরপন্থীদের গোঁড়ামির ভিত সুসংহত হয়, কেবল তা-ই নয়, বরং রাজনীতির সাধারণ দর্শকদের ওপরও কুতথ্য প্রবল প্রভাব বিস্তার করে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, গুজব কিছু মানুষকে রাজনৈতিক সহিংসতায় জড়াতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে।

যদি কোনো ষড়যন্ত্রতত্ত্বের অনুসারীদের একটি ছোট অংশ তাদের ভ্রান্ত বিশ্বাসের ভিত্তিতে কাজ করে, তাহলে সে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীও সমাজে গুরুতর ক্ষতির কারণ হতে পারে।

আরও পড়ুন

২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি শত শত বিক্ষোভকারীর যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটলে সহিংস হামলা চালিয়ে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ভোট গণনা বন্ধ করার চেষ্টা করে প্রমাণ করে কীভাবে গুজবে বিশ্বাসী লোকদের কারণে বড় আকারের সহিংসতার ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এর মূল হোতা ছিল কিউআনোন নামের একটি উগ্রপন্থী আন্দোলন আর তাদের কল্পনাপ্রসূত উদ্ভট দাবি।

কিউআনোনের অনুসারীরা মনে করে, গোটা বিশ্ব শয়তান পূজারিদের দ্বারা পরিচালিত হয়; আর শীর্ষ ডেমোক্র্যাট রাজনীতিবিদেরা এদের মধ্যে অন্যতম। যুক্তরাষ্ট্রে কিউআনোনের নাটকীয় উত্থান আমেরিকার গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত।

গবেষণায় দেখা গেছে, সে দেশে এক-পঞ্চমাংশ মানুষ অপ্রমাণিত ও ভিত্তিহীন কুতথ্যে কান দেন।

আরও পড়ুন

মানুষ গুজবে কেন বিশ্বাস করে, তা বোঝার জন্য এবং এর প্রতিকারের জন্য আমাদের রাজনৈতিক গুজবকে আরও ভালোভাবে বুঝতে হবে। গুজব কোনো ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বিশ্বাস বা তাদের মধ্যে কেন্দ্রীভূত থাকে না। সামাজিক সংক্রমণের মাধ্যমে এটি ক্ষমতা অর্জন করে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ে।

গুজব স্থায়ী হওয়ার পেছনে একটাই কারণ: এর ভিত্তিহীন তথ্যে বিশ্বাসীদের আস্থা। একটি গুজবকে গুজব পরিণত করে তোলে কেবল এর পেছনের ভুয়া দাবি নয়; বরং স্বতন্ত্র নাগরিকদের ও বৃহত্তর সামাজিক পরিমণ্ডলে এর গ্রহণযোগ্যতা।

গুজব প্রচার সাধারণত শুরু হয় একদল ব্যক্তির মাধ্যমে। যাঁরা এর ‘স্রষ্টা’ তাঁরা একটি নির্দিষ্ট গুজবের উৎপাদন এবং প্রচার শুরু করেন।

রূপক অর্থে বলা যেতে পারে, এই স্রষ্টারা জলাশয়ের পানিতে নুড়ি ফেলে ঢেউয়ের সৃষ্টি করেন, যা ধীরে ধীরে জলাশয়ের চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। গুজব সৃষ্টিকারীরা পানিতে পাথর ছুড়ে মারলে এর ফলে একের পর এক ঘটনাপরম্পরায় ঘটে চলতে থাকে।

এভাবে গুজব এই মূল উৎস থেকে ছড়িয়ে পড়ে। এটি যত বাইরের দিকে ছড়িয়ে পড়ে এর তীব্রতায় হ্রাস পেতে থাকে। হয়তো ভুল তথ্যের এই ঢেউ শেষ পর্যন্ত বিলীন হয়ে যেতে পারে, কিন্তু এই ঢেউয়ের পেছনে গণতন্ত্রের বড় ক্ষতি সাধন করে দিয়ে যায়।

যদিও কিছু গুজব স্বতঃস্ফূর্তভাবে জন্ম নিয়েছে বলে আপাতদৃষ্টে মনে হয়; কিন্তু গুজবের অধিকাংশই কোনো না কোনো ‘ষড়যন্ত্র উদ্যোক্তার’ প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে শক্তি অর্জন করে। এর মধ্যে কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আন্তরিকভাবে এসব গুজবে আস্থা রাখেন।

তবে বাকিরা রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক লাভের আশায় গুজব সৃষ্টিতে অনুপ্রাণিত হওয়ার প্রমাণ সবখানেই দেখা যায়।

আরও পড়ুন

ওহাইও স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কেলি গ্যারেট ও রবার্ট বন্ডের ২০১৯ সালে পরিচালিত একটি গবেষণায় সবচেয়ে ভাইরাল ভুয়া খবর দুই সপ্তাহ পরপর ছয় মাস পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করেন।

তাঁরা লক্ষ করেন, ভাইরাল গুজবের ৪৬ শতাংশ কোনো না কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে উপকৃত করেছে। অপরদিকে ২৩ শতাংশ ভুয়া রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদে প্রতিপক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তাই দেখা যায়, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রাজনৈতিক গুজবে কোনো কোনো গোষ্ঠী একতরফাভাবে বেশি লাভবান হয়। অন্যান্য দেশেও রাজনৈতিক গুজবের এমন নেতিবাচক ও সমান প্রভাব আছে।

গুজবে ব্যাপক বিশ্বাস কি জনসাধারণের জ্ঞানের অভাব বা রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার প্রতিফলন? নাকি এই গুজবে আস্থা নাগরিকেরা কীভাবে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে সম্পর্কিত তার কোনো গভীর সমস্যার লক্ষণ?

আরও পড়ুন

আমাদের চারপাশে এমন মানুষ অবশ্যই আছেন, যাঁরা কোনো ধরনের ষড়যন্ত্রতত্ত্বকে বিশ্বাসযোগ্যতা দিতে রাজি নন। কিন্তু এই জাতীয় মানুষের অবস্থান এই ধারাবাহিকতার (continuum) শেষ প্রান্তে।

এর অন্য প্রান্তে আছেন সেই ব্যক্তিরা যাঁরা সব ধরনের ষড়যন্ত্রতত্ত্ব সহজেই গ্রহণ করে ফেলেন, তা যতই হাস্যকর শোনাক না কেন।

পক্ষপাতদুষ্ট ব্যক্তির সম্ভাবনা সবচেয়ে কম যে তিনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দোষী সাব্যস্ত করে এমন অপতথ্য ও গুজবের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এই কন্টিনিউয়াম বা ধারাবাহিকতার মাঝখানে অবস্থান করেন অনেক মানুষ, যাঁদের মনে সংশয় থেকেই যায়।

এই প্রবণতা অজ্ঞতার প্রতিফলন নয়, অথবা যুক্তিযুক্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর অক্ষমতাও নয়।

এ জন্য আমাদের একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। কাজটি বিশেষ করে কঠিন কারণ রাজনৈতিক নেতারা গুজব ছড়ানোর মাধ্যমে লাভবান হন। রাজনীতিবিদদের কখনোই তাঁদের মিথ্যাচারের জন্য বড় মূল্য দিতে হয় না।

একটি গুজবকে যাচাই না করে শুরুতেই সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে উড়িয়ে দেওয়া অতটা সহজ কাজ নয়। গুজব শেষ পর্যন্ত সত্য বা মিথ্যা প্রমাণিত হতে পারে। তবে এগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্যটি হলো সত্যতা যাচাই না করে মানুষ তা প্রচার করে।

এমনও হতে পারে, গুজবের সমর্থনে প্রমাণ কোথাও আছে কিন্তু এখনো তা সামনে আসেনি। তাই বলা যেতে পারে, গুজবের সত্যতা অনিশ্চয়তার রাজ্যে বাস করে।

এমআইটির অধ্যাপক অ্যাডাম বেরিনস্কি তাঁর বইতে লিখেছেন, কোনো ব্যক্তি গুজব খণ্ডন করছেন আর গুজবটি কীভাবে খণ্ডন করা হলো—দুটি বিষয়ই সমান গুরুত্বপূর্ণ।

অপতথ্যে যাঁদের আপাতরাজনৈতিক স্বার্থ আছে, তাঁরাই যখন গুজব খণ্ডনে সহায়তা করেন, তা সবচেয়ে ফলপ্রসূ হতে পারে। কিন্তু এমন হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।

এমনকি এটি সর্বোত্তম পন্থা না-ও হতে পারে। বা সেই কৌশল প্রতিটি ক্ষেত্রে কাজ না-ও করতে পারে।

এ জন্য আমাদের একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। কাজটি বিশেষ করে কঠিন কারণ রাজনৈতিক নেতারা গুজব ছড়ানোর মাধ্যমে লাভবান হন। রাজনীতিবিদদের কখনোই তাঁদের মিথ্যাচারের জন্য বড় মূল্য দিতে হয় না।

এমনকি যখন গুজব ভুল প্রমাণিত হয় এবং মানুষ অনেক পরে সঠিক তথ্য মেনে নেয়; ভুল তথ্য ছড়ানোর পেছনে দায়ী রাজনীতিবিদদের সম্পর্কে তাদের সামগ্রিক মূল্যায়ন মূলত অপরিবর্তিত থেকে যায়।

কোভিড-১৯ মহামারির বিস্তার রোধে কিছু ভাইরোলজিস্ট একটি ‘সুইস পনির মডেল’ নীতি চালুর কথা বলেন। এই মডেলে ধরে নেওয়া হয় কোভিড-১৯ যেকোনো একটি সুরক্ষার স্তর দ্বারা প্রতিরোধ করা অসম্ভব।

এ জন্য সমাজে একাধিক স্তরের প্রতিরক্ষাবলয় সৃষ্টি করতে হবে, যেমন মাস্ক ব্যবহার, সামাজিক দূরত্ব, বায়ু নির্গমনের যথাযথ ব্যবস্থা, ভাইরাস পরীক্ষা ও ট্রেসিং।

ওপরের যেকোনো একটি সুরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে ভাইরাস বেরিয়ে গেলেও পরের স্তরে তা প্রতিহত করা যাবে।

এটা অনেকটা পনিরের একটি টুকরার মতো যাতে অনেক ফাঁকফোকর থাকে। কিন্তু যদি পনিরের টুকরাকে পাশাপাশি রেখে একাধিক স্তর করা হয়, তাহলে প্রতিটি গর্ত কিছু গলে বের হয়ে গেলেও এর পার্শ্ববর্তী প্রতিবন্ধকতায় তা আটকে যাবে। গুজব মোকাবিলার ক্ষেত্রেও এমন নীতির বিকল্প নেই।

  • নাজমুল আরিফীন অটোয়াভিত্তিক কলেজেস অ্যান্ড ইনস্টিটিউটস কানাডা-এর সরকারি সম্পর্ক ও নীতিবিষয়ক কর্মকর্তা।