গত শনিবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানে চালানো হামলার বিরুদ্ধে অবস্থা নিয়েছেন বেশির ভাগ মার্কিন নাগরিক। এমনটাই উঠে এসেছে পত্রপত্রিকার জনমত জরিপগুলোয়।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইপসোসের নতুন এক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বোমা হামলাকে সমর্থন করেছেন মাত্র ২৭ শতাংশ মার্কিন নাগরিক। বিপক্ষে মত দিয়েছেন ৪৩ শতাংশ। জরিপটি করা হয়েছিল সপ্তাহের শুরুতে, ইরানের পাল্টা হামলায় ছয়জন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার খবর প্রকাশের আগেই। একই ধরনের ফল পাওয়া গেছে অন্য জরিপগুলোতেও।
গত সোম ও মঙ্গলবার পরিচালিত সিবিএসের আরেকটি জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ১ হাজার ৪০০ মার্কিন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে ৬০ শতাংশের বেশি বলেছেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য কী, তা ট্রাম্প প্রশাসন পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেনি।
ইরাননীতি নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়ায় সমালোচনাও তৈরি হয়েছে।
৮১ শতাংশ রিপাবলিকান সামরিক পদক্ষেপকে সমর্থন করেছেন, আর ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে মাত্র ৯ শতাংশ তা সমর্থন করেছেন। বিপরীতে ৮৭ শতাংশ ডেমোক্র্যাট হামলার বিরোধিতা করেছেন। স্বতন্ত্র ভোটারদের মধ্যে ২৮ শতাংশ হামলাকে সমর্থন করেছেন, আর ৫৯ শতাংশ বিরোধিতা করেছেন।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন হওয়ার কয়েক মাস আগে। তাই এই সংঘাত নির্বাচনের একটি বড় ইস্যু হয়ে উঠতে পারে। কারণ, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারে শান্তির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং দাবি করেছিলেন যে তিনি আটটি যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটিয়েছেন। অথচ এখন তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানের অভিযান কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত চলতে পারে এবং প্রয়োজনে স্থলবাহিনীও পাঠানো হতে পারে।
সিবিএস জরিপে আরও দেখা গেছে, ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধ কত দিন চলতে পারে, তা নিয়ে মার্কিন নাগরিকদের মত বিভক্ত। কেউ মনে করেন কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ, কেউ বলেন কয়েক মাস বা বছর। তবে যুদ্ধ দীর্ঘ হলে জনসমর্থন দ্রুত কমে যেতে পারে। প্রায় ৭০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে যেতে হলে ট্রাম্পের কংগ্রেসের অনুমোদন নেওয়া প্রয়োজন, যা এখনো তাঁর নেই।
প্রতিনিধি পরিষদের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির ডেমোক্র্যাট সদস্যরা গত সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ট্রাম্প যুদ্ধ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। অথচ আধুনিক আমেরিকার ইতিহাসে অন্য যেকোনো প্রেসিডেন্টের তুলনায় তিনি বেশি যুদ্ধ শুরু করেছেন। সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা ও নিত্যপণ্যের পরিবর্তে এখন মার্কিন জনগণকে ট্রাম্পের বিদেশি যুদ্ধের জন্য বিলিয়ন ডলারের খরচ বহন করতে হচ্ছে।
গত জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ট্রাম্প সাতটি দেশের বিরুদ্ধে সামরিক হামলার নির্দেশ দিয়েছেন, যা আধুনিক যুগের কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের চেয়েও বেশি। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করার ঘটনাটিও ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক দ্বিতীয় বড় শাসন পরিবর্তনের উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে গ্রেপ্তার করে যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণ করা হয়েছিল।
এ পদক্ষেপ জনপ্রিয় নয় বলে যে ধারণা তৈরি হয়েছে, ট্রাম্প তা গুরুত্ব দিতে চাননি। সোমবার নিউইয়র্ক পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, জরিপে ফল ভালোই হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন, তবে তিনি জরিপ নিয়ে ভাবেন না। তাঁর ভাষায়, তাঁকে সঠিক কাজটিই করতে হবে, আর এ কাজ অনেক আগেই করা উচিত ছিল।
ট্রাম্প আরও বলেন, জরিপের ফল কম হোক বা বেশি হোক, তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। ইরানের মতো একটি দেশকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সুযোগ দেওয়া যায় না। তাঁর মতে, অনেক মানুষ আসলে যা ঘটছে, তাতে মুগ্ধ। ট্রাম্পের ভাষায়, এটি একধরনের নীরব সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন।
সিএনএনের জন্য এসএসআরএস পরিচালিত আরেকটি জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৫৯ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ট্রাম্পের ইরানে হামলার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেন না। বিপরীতে ৪১ শতাংশ এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন।
তবে এই জরিপে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে দলীয় বিভাজন। ৮০ শতাংশের বেশি ডেমোক্র্যাট হামলার বিরোধিতা করেছেন, আর রিপাবলিকানদের মধ্যে মাত্র ২৩ শতাংশ এ পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছেন। ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ২০ শতাংশেরও কম সামরিক পদক্ষেপকে সমর্থন করেছেন, বিপরীতে ৭৭ শতাংশ রিপাবলিকান এ সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়েছেন। স্বতন্ত্র ভোটারদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ হামলার বিরোধিতা করেছেন এবং ৩২ শতাংশ সমর্থন করেছেন।
ওয়াশিংটন পোস্টের জরিপেও একই ধরনের বিভাজন দেখা গেছে। সেখানে ৮১ শতাংশ রিপাবলিকান সামরিক পদক্ষেপকে সমর্থন করেছেন, আর ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে মাত্র ৯ শতাংশ তা সমর্থন করেছেন। বিপরীতে ৮৭ শতাংশ ডেমোক্র্যাট হামলার বিরোধিতা করেছেন। স্বতন্ত্র ভোটারদের মধ্যে ২৮ শতাংশ হামলাকে সমর্থন করেছেন, আর ৫৯ শতাংশ বিরোধিতা করেছেন।
ওয়াশিংটন পোস্টের জরিপে সামগ্রিকভাবে ৫২ শতাংশ উত্তরদাতা ট্রাম্পের হামলার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন। ৩৯ শতাংশ সমর্থন জানিয়েছেন এবং ৯ শতাংশ বলেছেন, তাঁরা এ বিষয়ে নিশ্চিত নন। সিবিএস জরিপেও একই ধরনের দলীয় বিভাজন দেখা গেছে। বেশির ভাগ রিপাবলিকান ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপকে সমর্থন করেছেন এবং মনে করেন, এতে যুক্তরাষ্ট্র আরও নিরাপদ হবে। তবে সব দলের ভোটারদের সম্মিলিত হিসাবে বেশির ভাগ মার্কিন নাগরিক এ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছেন।
দ্য ইকোনমিস্ট ও ইউগভের এক জরিপে দেখা গেছে, গত সপ্তাহের তুলনায় রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও বেড়েছে। গত সপ্তাহে সম্ভাব্য হামলা সম্পর্কে জানতে চাইলে ২৭ শতাংশ সমর্থন জানিয়েছিলেন এবং ৩৯ শতাংশ বিরোধিতা করেছিলেন। গত শুক্র থেকে সোমবার পর্যন্ত পরিচালিত নতুন জরিপে দেখা যায়, ৩২ শতাংশ সামরিক পদক্ষেপকে সমর্থন করেছেন এবং ৪৫ শতাংশ বিরোধিতা করেছেন। এই পরিবর্তনের প্রধান কারণ ছিল ডেমোক্র্যাট ও স্বতন্ত্র ভোটারদের সমর্থন কমে যাওয়া এবং রিপাবলিকানদের সমর্থন বাড়া।
এ বিভাজনের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে রাস্তাঘাটেও। আটলান্টা, বাল্টিমোর, বোস্টন, শিকাগো, সিনসিনাটি, ডেনভার, লাস ভেগাস, লস অ্যাঞ্জেলেস, মায়ামি, মিনিয়াপোলিস, নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন শহরে অনেক আমেরিকান যুদ্ধের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছেন। আবার অন্যদিকে কেউ কেউ খামেনির মৃত্যুকে উদ্যাপন করেও সমাবেশ করেছেন।
শ্যান্তেল লি ও মিরান্ডা জেয়ারেটনাম আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও জনমতবিষয়ক সাংবাদিক।
টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত