শুরুতেই এই ডিসক্লেইমার দিচ্ছি বা এটা পরিষ্কার করে নিচ্ছি যে ঢাকা শহরের রাস্তাঘাট হকাররা যেভাবে দখল করে নিয়েছে, তা শহরটিতে নৈরাজ্য তৈরি করেছে এবং এর বিহিত, নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা দরকার। এখন যেভাবে চলছে, তা চলতে পারে না, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।
সুনির্দিষ্টভাবে মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরকে বিবেচনায় নিলেও বলতে হয়, হকাররা সেখানে যেভাবে ফুটপাত ও রাস্তায় তাদের দখলদারি কায়েম করেছে, যান চলাচলে যে অচলাবস্থা ও বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছে এবং এর জন্য জনগণকে প্রতিদিন যে ভোগান্তির মধ্যে পড়তে হচ্ছে, তার অবসান দরকার। গোলচত্বরটিসহ চারদিকের রাস্তাগুলো অবৈধ স্থাপনামুক্ত করা জরুরি।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কীভাবে কাজটি হবে? আমরা দেখলাম, গতকাল বুধবার ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) উদ্যোগে যা করা হলো, সেখানে হকার উচ্ছেদের নামে পুরোনো কৌশলই নেওয়া হলো। অতীতের অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি, এ ধরনের অভিযান খুব একটা কাজে দেয় না। সবচেয়ে বড় কথা, এ ধরনের অভিযানের পেছনে কতটা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল, সেই প্রশ্ন ওঠে।
হকাররা এ ধরনের অভিযানের বিরোধিতা করবে, এটাই স্বাভাবিক। তারপরও এক্সকাভেটর দিয়ে অবৈধ স্থাপনা ভাঙতে গিয়ে দোকানে আগুন না লাগলে পরিস্থিতি এতটা খারাপ না–ও হতে পারত। এরপর এলাকাজুড়ে পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের কর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান হকাররা। আগুন দেওয়া হয় সিটি করপোরেশনের গাড়িতে। ভাঙচুর হয় পুলিশের গাড়ি। হামলার শিকার হয়েছেন গণমাধ্যমকর্মীরাও। এলাকায় যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল দীর্ঘ সময়। বন্ধ হয়ে যায় যান চলাচল। হকারদের তুলনায় পুলিশের সংখ্যা কম হওয়ায় পুলিশ সুবিধা করতে পারেনি।
আমরা ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় নানা সময়ে একই কায়দার উচ্ছেদ অভিযান দেখেছি। এর ফলাফল কী, তা–ও আমাদের জানা। কারওয়ান বাজারে সকালে সিটি করপোরেশনের অভিযানের ঘণ্টাখানেকের মধ্যে আবার দোকান বসতে দেখেছি। গুলিস্তান এলাকায় সাম্প্রতিক হকার উচ্ছেদ অভিযানের অভিজ্ঞতাও তা–ই। এগুলো কি আসলেই উচ্ছেদ অভিযান? নাকি উচ্ছেদ-উচ্ছেদ খেলা।
মিরপুরের উচ্ছেদ অভিযানের ফলাফল শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়াবে, তা আমরা জানি না। তবে অভিজ্ঞতা বলে অতীতে এভাবে হকার উচ্ছেদের চেষ্টা কাজে দেয়নি। আর বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতাও এভাবে ঢালাও হকার উচ্ছেদের পক্ষে যায় না।
মাঝে যেটা হলো, তা হচ্ছে সিটি করপোরেশনের তিনটি গাড়ি ও কিছু দোকান পুড়ল, পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর হলো, সংঘর্ষে রাস্তা বন্ধ থাকল, অনেকে আহত হলো, অনেক মানুষ এই গরমে রাস্তায় আটকে দুর্ভোগে পড়ল। পুরোনো কায়দায় এবং অকার্যকর হিসেবে প্রমাণিত এ ধরনের অভিযান পরিচালনা নির্বুদ্ধিতা ছাড়া কিছু নয়।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ঢাকা শহরের ফুটপাত বা রাস্তা হকাররা যেভাবে দখল করে রেখেছে, সেভাবেই থাকবে? এই বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি কি আমাদের মেনে নিতে হবে? নিশ্চয়ই না। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে যে এই নিয়ন্ত্রণহীন পরিস্থিতি একদিনে হয়নি।
আমাদের সরকারগুলো, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো, সিটি করপোরেশনগুলো এবং রাজনৈতিক দল ও তাদের অঙ্গসংগঠনগুলোর ছত্রচ্ছায়া বা নিষ্ক্রিয়তায় দিনে দিনে শুধু ফুটপাত নয়, রাস্তায়ও হকারদের দখলদারি কায়েম হয়েছে। এবং তা সব সীমা ও মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে।
ফুটপাত বা রাস্তা দখল করে যারা ব্যবসা করে, তাদের পেছনে কারা আছে বা থাকে, তারা কাদের পয়সা দেয় এবং এর ভাগ কোন পর্যন্ত পৌঁছায়, তা কি খুব গোপন কিছু? ভাগ-বাঁটোয়ারার এই চক্র অনেক বিস্তৃত ও শক্তিশালী। এর শিকড়ও অনেক গভীরে, পুলিশ নিয়ে একটি অভিযান বা এক্সক্যাভেটর দিয়ে কিছু দোকানপাট ভেঙে যা ওপড়ানো অসম্ভব। সবচেয়ে বড় কথা এর সঙ্গে অনেক মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত।
ফলে হকার ইস্যুতে কিছু করতে গেলে দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে বিবেচনায় রাখতে হবে। বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই ফুটপাতে হকার থাকে, কিন্তু এর একটা নিয়মশৃঙ্খলা থাকে। আমাদের পরিস্থিতি কার্যত নৈরাজ্যকর হয়ে পড়ায় দরকার শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা। এর জন্য দরকার বাস্তবসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। হঠাৎ উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা নয়।
কীভাবে শুরু করতে পারি আমরা? ধরুন, প্রথমে ঢাকা শহরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ১০টি মোড় চিহ্নিত করা হলো। এর মধ্য থেকে দুটি মোড়কে কেন্দ্র করে পরিকল্পনা করা যেতে পারে। প্রথম বিষয় হচ্ছে, কোনো অবস্থাতেই রাস্তায় কোনো দোকান বসতে পারবে না। আর ফুটপাতের মাপ বিবেচনায় নিয়ে এমনভাবে দোকান বসানো যাবে, যাতে মানুষের চলাচলে কোনো সমস্যা না হয়। যেখানে ফুটপাত সরু সেখানে কোনো দোকান বসানো যাবে না। সিটি করপোরেশন দাগ দিয়ে সীমানা ঠিক করে দিতে পারে।
নগর–পরিকল্পনাবিদ ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করে মডেলটি তৈরি করা যেতে পারে। পাইলট প্রকল্প হিসেবে যদি দুটি মোড়কে ছয় মাস সফলভাবে পরিচালনা করা যায় এরপর বাকি ১০টি মোড়ে বা পর্যায়ক্রমে শহরজুড়ে তা কার্যকর করা যাবে। এক-দুই বছরের মধ্যেই কিছু দৃশ্যমান পরিবর্তন নিশ্চিত করা যাবে।
মেট্রোরেলের স্টেশন ধরেও একটি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। আমরা জানি যে মেট্রোরেলের মতো গণপরিবহন মানুষকে তার গন্তব্যের দোরগোড়ায় পৌঁছায় না, কাছাকাছি স্টেশনে নেমে গন্তব্য যেতে হয়। সে কারণে স্টেশনের চারপাশের ফুটপাত ও সড়কগুলো হকারমুক্ত রাখা জরুরি। উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত সব কটি মেট্রোরেল স্টেশনের একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ফুটপাতগুলো হকারমুক্ত ঘোষণা এবং তা বাস্তবায়ন করার মধ্য দিয়েও হকার শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার একটি উদ্যোগে সূচনা ঘটানো যায়।
সরকার বা সিটি করপোরেশনকে এটা মনে রাখতে হবে যে ঢাকার হকার সমস্যা বিশৃঙ্খলা ও নিয়ন্ত্রণহীনতার যে মাত্রায় পৌঁছেছে, তার কোনো তড়িঘড়ি সমাধান নেই। পরিকল্পনা করে যে উদ্যোগই নেওয়া হোক, তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে পর্যায়ক্রমে, ধারাবাহিকভাবে এবং সময় নিয়ে। এসব নিয়ে নিয়মিত প্রচার–প্রচারণাও চালাতে হবে। জনগণকে যুক্ত করতে হবে।
যে উদ্যোগই নেওয়া হোক বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নিয়মিত তদারকির বিষয়টি খুব জরুরি। যেমন ধরুন, যদি মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরের চারপাশে রাস্তা ঘিরে হকার ব্যবস্থাপনার একটি পরিকল্পনা নেওয়া হয়, তাহলে নির্ধারিত বা চিহ্নিত জায়গার বাইরে যাতে কোনো দোকান বসতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না। নির্দিষ্ট জায়গার বাইরের দোকান উচ্ছেদ করা হলে তখন মিরপুরের মতো ঝামেলার ঝুঁকি অনেক কমে আসবে।
এখন প্রশ্ন আসবে, নির্দিষ্ট জায়গায় কারা দোকান বসাতে পারবে? কে তা ঠিক করবে? প্রকৃত হকার বা ব্যবসায়ীরা বসতে পারবে তো? এখানে দলীয় প্রভাব, দুর্নীতি বা জোরজবরদস্তি কাজ করবে না তো?
এখানেই সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে কাজটি কঠিনও নয়।
এ কে এম জাকারিয়া প্রথম আলোর উপসম্পাদক
মতামত লেখকের নিজস্ব
