ইরানজুড়ে শুরু হওয়া বিক্ষোভের প্রায় দুই সপ্তাহ পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর পছন্দের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথে একটি বার্তা দেন। তিনি লেখেন, ‘ইরান এমন এক স্বাধীনতার দিকে তাকিয়ে আছে, যা (ইরান) আগে কখনো দেখেনি। যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য করতে প্রস্তুত। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে. ট্রাম্প।’
বরাবরের মতোই ট্রাম্পের লেখাটিতে ছিল বড় হাতের অক্ষর ব্যবহার আর অতিরিক্ত বিস্ময়সূচক চিহ্ন, যা কোনো পরাশক্তির নেতার চেয়ে বরং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর লেখাই বেশি মনে হয়। কিন্তু এর চেয়ে গুরুতর সমস্যা হলো তাঁর ‘সাহায্য’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি।
প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে ‘সাহায্য’ খুব একটা গৌরবের বিষয় নয়, বিশেষ করে সেই ব্যক্তির নেতৃত্বে, যিনি গত গ্রীষ্মেই ইরানে বোমা হামলা চালিয়েছিলেন। ক্ষমতায় ফেরার সময় তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে বিদেশি যুদ্ধ থেকে দূরে রাখবেন।
এর ওপর ট্রাম্পই ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থা বজায় রেখেছেন, যা দেশটিতে ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি বাড়িয়েছে এবং বর্তমান বিক্ষোভের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ধরনের অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের ফলে সাধারণত সবচেয়ে বেশি ভোগে সাধারণ মানুষ, অভিজাত শ্রেণি নয়। ইরানেও তা–ই হয়েছে।
এটি যেমন ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক, তেমনি ইরানকে ঘিরে তাঁর বক্তব্যের ক্ষেত্রেও একধরনের পরিবর্তন। আগে ট্রাম্পের ভাষণে ইরানের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ ছিল পারমাণবিক অস্ত্র ও রাসায়নিক কিংবা জীবাণু অস্ত্রবাহী ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির চেষ্টা। এসবকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যেমন হুমকি হিসেবে তুলে ধরা হতো, তেমনি ইসরায়েলের জন্যও বিপজ্জনক বলে প্রচার করা হতো।
কিন্তু এখন ট্রাম্প নিজেকে ‘ত্রাতা’ হিসেবে তুলে ধরছেন। চলতি মাসে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ইরান যদি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালায় এবং সহিংসভাবে হত্যা করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানিদের উদ্ধার করতে এগিয়ে আসবে।
মঙ্গলবার ট্রাম্প ইরানের বিক্ষোভকারীদের আশ্বস্ত করে বলেন, ‘সাহায্য আসছে।’ তবে এই সাহায্য কী ধরনের, সে বিষয়ে তিনি কোনো ব্যাখ্যা দেননি। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ডানপন্থী গণমাধ্যমগুলো উৎসাহব্যঞ্জক শিরোনাম দিয়ে বিষয়টি আরও উসকে দিয়েছে।
এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন বলেছেন, ইসরায়েল ইরানের বিক্ষোভকারীদের স্বাধীনতাসংগ্রামকে সমর্থন করে এবং নিরপরাধ বেসামরিক মানুষদের ‘গণহত্যা’র তীব্র নিন্দা জানায়। কথাটি এসেছে এমন একজন মানুষের মুখ থেকে, যিনি নিজে দুই বছরের বেশি সময় ধরে ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান গণহত্যার নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন।
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এই সাহায্যের প্রতিশ্রুতি শুনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, তিনি কি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের পুরোনো নীতির বই থেকেই পাতা ওলটাচ্ছেন না! বুশ ছিলেন তথাকথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’-এর মুখপাত্র। তিনি এমন এক প্রশাসনের প্রধান, যারা নব্য রক্ষণশীল মতাদর্শ ছড়িয়ে দিতে নিবেদিত ছিল। ট্রাম্প ওই মতাদর্শের বিরোধিতা দীর্ঘদিন ধরে করে এসেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে সাহায্য করতে ‘প্রস্তুত’, তখন ইরানে মার্কিন ‘সাহায্যে’র অতীত উদাহরণগুলো মনে করা জরুরি। যেমন ১৯৫৩ সালে সিআইএ গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেকের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিল। ওই ঘটনার ফলেই নির্যাতনপ্রবণ ইরানের শাহর দীর্ঘ শাসনের পথ খুলে যায়, যার অবসান ঘটে ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবে।
নব্য রক্ষণশীলদের লক্ষ্য হলো গণতন্ত্র প্রচার কিংবা জুতসই অজুহাত বানিয়ে বিশ্বজুড়ে সামরিক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো এবং সাম্রাজ্যবাদী বিস্তার ঘটানো। ট্রাম্প একসময় বহু মার্কিন ভোটারকে আকৃষ্ট করেছিলেন এই বলে যে তিনি দূরদেশের এমন অভিযান ত্যাগ করবেন এবং পুরো মনোযোগ দেবেন ‘আমেরিকাকে আবার মহান’ বানানোর কাজে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, নব্য রক্ষণশীল প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসা এত সহজ নয়।
সত্যি বলতে, ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির সঙ্গে বুশের সময়ের মিল একাধিক জায়গায় পাওয়া যায়। দুজনেরই আচরণ অনেকটা ভাঁড়ামিপূর্ণ। ইংরেজি ব্যাকরণ ও বানানের সঙ্গে তাঁদের অদ্ভুত সম্পর্কও আছে। এসব বিষয় হাস্যকরই লাগত, যদি না তাঁদের শাসনামলে এত ব্যাপক রক্তপাত ঘটত। একইভাবে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে ঈশ্বরকে নিজের পক্ষে টানার প্রবণতাও দুজনের মধ্যেই অস্বাভাবিকভাবে বেশি দেখা গেছে।
শাসন পরিবর্তনের নীতির এবং ইরাক ও আফগানিস্তানে বুশ আমলের হস্তক্ষেপের বিরোধিতা ট্রাম্প বহুবার করেছেন। কিন্তু ক্ষমতায় ফিরে প্রথম বছরেই তিনি একের পর এক দেশে বোমা হামলা চালিয়েছেন। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে অপহরণ করার ঘটনাও তিনিই ঘটিয়েছেন।
এদিকে ফ্লোরিডার কংগ্রেসম্যান র্যান্ডি ফাইন সম্প্রতি ট্রাম্পকে গ্রিনল্যান্ড দখলের অনুমতি দেওয়ার একটি বিল উত্থাপন করেছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘আমাদের হয়তো খামেনিকে মাদুরো করা উচিত।’ এখানে ‘খামেনি’ বলতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিকে বোঝানো হয়েছে, আর ‘মাদুরো’ শব্দটি কার্যত একটি নতুন ক্রিয়াপদে পরিণত হয়েছে, যার অর্থ কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের নেতাকে অপহরণ করা।
এমন প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প যখন আবার বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে সাহায্য করতে ‘প্রস্তুত’, তখন ইরানে মার্কিন ‘সাহায্যে’র অতীত উদাহরণগুলো মনে করা জরুরি। যেমন ১৯৫৩ সালে সিআইএ গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেকের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিল। ওই ঘটনার ফলেই নির্যাতনপ্রবণ ইরানের শাহর দীর্ঘ শাসনের পথ খুলে যায়, যার অবসান ঘটে ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবে।
মজার বিষয় হলো, প্রয়াত শাহর ছেলে এখন ওয়াশিংটন ডিসির বাইরে বিলাসী নির্বাসিত জীবনে বসে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের পক্ষে সক্রিয়ভাবে প্রচার চালাচ্ছেন।
অন্যদিকে ট্রাম্প হয়তো বুঝে ফেলেছেন যে বিদেশে মানুষকে ‘সাহায্য’ করার কথা বলে দেশের ভেতরের কিছু গভীরভাবে অগণতান্ত্রিক বাস্তবতা থেকে মনোযোগ সরানো যায়। যেমন যুক্তরাষ্ট্র কার্যত একটি পূর্ণাঙ্গ পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, যেখানে অভিবাসন কর্মকর্তারা নির্বিঘ্নে মার্কিন নাগরিকদের হত্যাও করতে পারছেন।
সব মিলিয়ে ট্রাম্প যখন ক্রমেই বুশের ছায়ায় হাঁটছেন, তখন ইরানিদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের এই তথাকথিত ‘উদ্ধার’ সম্ভবত সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয় বিষয়গুলোর একটি।
বেলেন ফার্নান্দেজ লেখক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক
আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত