বিজয়ী বিএনপিকে যেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে

নতুন নির্বাচিত সরকারের কাছে দেশের মানুষের আরও অনেক প্রত্যাশা রয়েছে। গণ–অভ্যুত্থানের পর প্রথম নির্বাচিত সরকার হিসেবে বিএনপির ওপর দায়িত্ব হলো দেশের মানুষের এই বিপুল প্রত্যাশা পূরণ। দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর কতটা টেকসই হবে, তা মূলত এর ওপরই নির্ভর করছে। বিএনপিকে যেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে, তা নিয়ে লিখেছেন কল্লোল মোস্তফা

নির্বাচন–পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান (মাঝে)। শনিবার রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলেছবি: প্রথম আলো

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই–তৃতীয়াংশের বেশি আসনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয়ী হয়েছে বিএনপি। বিএনপি ও তার সমর্থক শুভানুধ্যায়ীদের জন্য এই নিরঙ্কুশ বিজয় নিশ্চয়ই ভীষণ আনন্দের ব্যাপার। তবে বাস্তবতা হলো বিএনপির আসল চ্যালেঞ্জের শুরুও আসলে এখান থেকে। বিএনপির সমর্থক শুভানুধ্যায়ীদের জন্যও একই কথা প্রযোজ্য।

২.

২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দুই–তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ করেছিল। তার পরের ইতিহাস সবার জানা। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে স্বৈরশাসন কায়েম করেছিল দলটি।

তৎকালীন প্রধান বিরোধী পক্ষ বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় চলে আসবে ভেবে আওয়ামী লীগের সমর্থক শুভানুধ্যায়ীরা পরবর্তী সময়গুলোতে আওয়ামী লীগের কার্যকর সমালোচনা থেকে বিরত থেকেছিলেন। উন্নয়নের নামে স্বৈরশাসনে সমর্থন জুগিয়েছিলেন।

এর খেসারত শুধু আওয়ামী লীগ নয়, সারা দেশের মানুষকে দিতে হয়েছে। বিএনপি ও তার সমর্থকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো।

ব্যাপারটা মুখে বলা যত সহজ, বাস্তবায়ন করা তত কঠিন। শুধু ‘সেলফ রেগুলেশন’ বা আত্মনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে স্বৈরাচারী প্রবণতা ঠেকানো যায় না। এর জন্য কাঠামোগতভাবে নির্বাহী ক্ষমতায় ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ বা ভারসাম্য তৈরি করতে হয়।

জুলাই সনদের মাধ্যমে ঠিক এই কাজই করার চেষ্টা করা হয়েছে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়লাভ করায় বিএনপির দায়িত্ব হবে জুলাই সনদের সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করা।

আরও পড়ুন

৩.

মুশকিল হলো, জুলাই সনদে গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাঠামোগত সংস্কার প্রস্তাবে বিএনপি ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়ে রেখেছে। আনুপাতিক উচ্চকক্ষ ও বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগপদ্ধতির সংস্কার যার উদাহরণ।

জুলাই সনদে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হলেও উচ্চকক্ষের নির্বাচনপদ্ধতি নিয়ে ঐকমত্য হয়নি। সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব ছিল—সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে অর্থাৎ রাজনৈতিক দলের প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে উচ্চকক্ষে আসন বণ্টন করা হবে; কিন্তু বিএনপি ভোটের অনুপাতের বদলে নিম্নকক্ষের আসনের অনুপাতে উচ্চকক্ষ গঠনের পক্ষে। নির্বাচনী ইশতেহারেও বিএনপি এ কথা লিখে রেখেছে।

কিন্তু জুলাই সনদ অনুসারে উচ্চকক্ষের আইন প্রণয়নের কোনো ক্ষমতা থাকবে না, নিম্নকক্ষ প্রণীত কোনো আইন স্থায়ীভাবে আটকাতেও পারবে না। তবে উচ্চকক্ষ যে কাজটি পারবে, তা হলো সংবিধান সংশোধন এবং জাতীয় স্বার্থ বা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা প্রভাবিত করে এরূপ আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুমোদনের ক্ষেত্রে সংসদে এক দলের নিরঙ্কুশ আধিপত্য হ্রাস।

এখন গণভোটে হ্যাঁ জয়লাভ করায় এই নোট অব ডিসেন্টগুলো আর কার্যকর থাকার কথা নয়। ফলে বিএনপির উচিত গণভোটের রায়কে সম্মান জানিয়ে এই চেক অ্যান্ড ব্যালেন্সের সংস্কারগুলো জুলাই সনদ অনুযায়ী বাস্তবায়ন করা; কিন্তু বিএনপি কি তা করবে?

কিন্তু বিএনপির প্রস্তাব অনুসারে, আনুপাতিক পদ্ধতির বদলে প্রাপ্ত আসনের অনুপাতে উচ্চকক্ষ গঠন করা হলে তা নিম্নকক্ষের অনুরূপ হবে এবং তার ফলে উচ্চকক্ষ গঠনের উদ্দেশ্য সফল হবে না।

লক্ষণীয় বিষয় হলো, সংবিধান সংশোধন ও আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পাদনের ক্ষেত্রে আইনসভার উভয় কক্ষের অনুমোদনের প্রস্তাবেও নোট অব ডিসেন্ট বা ভিন্নমত রয়েছে বিএনপির।

ক্ষমতার ভারসাম্য আনতে বাছাই কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) ও ন্যায়পাল নিয়োগের বিধান সংবিধানে যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে জুলাই সনদে।

এর মধ্যে নির্বাচন কমিশনে নিয়োগের বিষয়ে মোটামুটি একমত হলেও বাকি চারটি প্রতিষ্ঠানে বাছাই কমিটির মাধ্যমে নিয়োগের পদ্ধতি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে বিএনপির ভিন্নমত রয়েছে।

৪.

এখন গণভোটে হ্যাঁ জয়লাভ করায় এই নোট অব ডিসেন্টগুলো আর কার্যকর থাকার কথা নয়। ফলে বিএনপির উচিত গণভোটের রায়কে সম্মান জানিয়ে এই চেক অ্যান্ড ব্যালেন্সের সংস্কারগুলো জুলাই সনদ অনুযায়ী বাস্তবায়ন করা; কিন্তু বিএনপি কি তা করবে?

বিএনপির সমর্থক শুভানুধ্যায়ীরা কি তা বাস্তবায়নে বিএনপিকে চাপ দিতে রাজি হবেন? নাকি এসব সংস্কার বিরোধী দল জামায়াতকে সুবিধা দেবে—এই আশঙ্কায় কাঠামোগত সংস্কারগুলো না করতে বিএনপিকে সমর্থন জোগাবেন?

বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ও তার সমর্থক শুভানুধ্যায়ীদের মতো জামায়াত সুবিধা পাবে ভেবে বিএনপিকে যদি শুরুতেই ছাড় দেওয়া হয়, তাহলে গণতান্ত্রিক রূপান্তর টেকসই হবে না, বাংলাদেশ আবারও বিপদে পড়বে।

দলগত অবস্থান বাদ দিয়ে অর্থপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার করতে বিএনপিকে বাধ্য করার কাজটা কিন্তু সহজ নয়। এ জন্যই শুরুতে বলেছিলাম, বিএনপি ও তার সমর্থকদের সামনে আসল চ্যালেঞ্জ শুরু এখন।

৫.

জুলাইদ সনদে উল্লেখিত রাজনৈতিক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বাস্তবায়ন ছাড়াও বিএনপির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দেশের মানুষকে অর্থনৈতিকভাবে স্বস্তি দেওয়া।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, সেই রূপান্তরগুলোই টেকসই হয়, যখন রাজনৈতিক স্বাধীনতার সঙ্গে অর্থনৈতিক অধিকারের যোগসূত্র থাকে।

ইসোবেল কোলম্যান ও টেরা লসন-রেমার সম্পাদিত পাথ ওয়েস টু ফ্রিডম: পলিটিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক লেসনস ফ্রম ডেমোক্রেটিক ট্রানজিশন’ শীর্ষক পুস্তকে বিশ্বের আটটি দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করা হয়েছে।

পুস্তকটিতে এ ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিতের গুরুত্ব সম্পর্কে বলা হয়েছে—

‘রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুযোগ পাওয়ার প্রত্যাশা বাড়িয়ে দেয়। উদীয়মান গণতন্ত্রগুলোর গতিপথ মূলত নির্ভর করে রাজনৈতিক গণতন্ত্রীকরণ কতটা সবার জন্য সমান সুযোগ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারে এবং মানুষের জীবনযাত্রায় বাস্তব উন্নতি ঘটাতে পারে তার ওপর। শুধু ভোটাধিকার এবং বাজারে অংশগ্রহণের মতো প্রক্রিয়াগত স্বাধীনতা দীর্ঘমেয়াদে নবগঠিত গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট নয়।

‘নাগরিকদের, বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে, এমন বাস্তব সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দিতে হবে, যা তাদের পূর্ণ ও অর্থবহ জীবনযাপনের সক্ষমতা তৈরি করে। যখন তারা এ ধরনের সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং উন্নত জীবনমান উপভোগ করে, তখন তারা সেই রাজনীতিবিদদের সমর্থন করে, যারা এসব সুবিধা নিশ্চিত করে। ফলে একটি শক্তিশালী ফিডব্যাক লুপ তৈরি হয়, যা গণতন্ত্রকে আরও সুসংহত করতে সাহায্য করে। অন্যদিকে যদি গণতান্ত্রিক রূপান্তর মানুষের বাস্তব জীবনে সুফল দিতে ব্যর্থ হয়, তবে জনতুষ্টিবাদী স্বৈরশাসনের মাধ্যমে আবারও স্বৈরতন্ত্রে ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়ে।’

আরও পড়ুন

৬.

জুলাই সনদের একটি বড় ঘাটতি ছিল অর্থনৈতিক সংস্কার। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার সেই ঘাটতি কিছুটা হলেও পূরণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সেখানে দেশের মানুষকে যেসব অর্থনৈতিক সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, কৃষিঋণ মওকুফ, ই-হেলথ কার্ড, নারীদের জন্য মাস্টার্স পর্যন্ত বিনা মূল্যের শিক্ষা, শিক্ষা-স্বাস্থ্যে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ, এক কোটি কর্মসংস্থান, বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বেসরকারি সার্ভিস রুল, পেনশন ফান্ড গঠন ও বেকার ভাতা চালু ইত্যাদি।

বিএনপির এই প্রতিশ্রুতিগুলো ব্রাজিলের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের অভিজ্ঞতার কথা মনে করিয়ে দেয়। সামরিক স্বৈরশাসন থেকে ব্রাজিলের গণতান্ত্রিক রূপান্তর সফল হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় সামাজিকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়নকে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নত করতে ব্রাজিল মূলত দুটি কৌশল গ্রহণ করেছিল।

প্রথমত, ‘বলসা ফ্যামিলিয়া’র মতো কর্মসূচির আওতায় পরিবারের নারী প্রধানদের ‘সিটিজেন কার্ডের’ মাধ্যমে নগদ সহায়তা দেওয়া হয়,
যা ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও বৈষম্য দূর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং শ্রম সুরক্ষার মতো সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার সর্বজনীনভাবে নিশ্চিত করা হয়, যাতে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত গোষ্ঠীও এর আওতায় আসতে পারে।

 বিএনপির দায়িত্ব হলো, ব্রাজিলের এই অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখে দেশে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোকে সফল করা।

৭.

তবে নতুন নির্বাচিত সরকারের কাছে দেশের মানুষের আরও অনেক প্রত্যাশা রয়েছে। প্রথম আলোর উদ্যোগে করা জাতীয় জনমত জরিপ ২০২৫–এ দেখা যায়, ৮টি ক্ষেত্রে নির্বাচিত সরকারের সফলতার আশা করছেন ৫০ শতাংশের বেশি মানুষ।

এ বিষয়গুলো হলো: আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, নারীর নিশ্চিন্তে চলাফেরা ও নিরাপত্তার পরিবেশ নিশ্চিত করা, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ও সুষ্ঠু ভোটের পরিবেশ তৈরি, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ঘটা নির্যাতন ও নিপীড়নের বিচার, লুটপাট ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিচার এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি।

গণ–অভ্যুত্থানের পর প্রথম নির্বাচিত সরকার হিসেবে বিএনপির ওপর দায়িত্ব হলো দেশের মানুষের এই বিপুল প্রত্যাশা পূরণ। দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর কতটা টেকসই হবে, তা মূলত এর ওপরই নির্ভর করছে।

  • কল্লোল মোস্তফা লেখক ও গবেষক

    *মতামত লেখকের নিজস্ব