সাজেকে অবরোধ: মূল সমস্যা যেভাবে আড়ালে চলে যাচ্ছে

নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারায় সাজেক থেকে ফিরে আসছেন কয়েকজন পর্যটক।ছবি: প্রথম আলো

রাঙামাটির সাজেকে কয়েক দিন ধরে ঘটে চলা ঘটনাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে হবে না। বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে অনেকে মনে করতে পারেন, এটি পার্বত্য চট্টগ্রামে বিকাশমান পর্যটনশিল্পের জন্য আইনশৃঙ্খলাজনিত একটি বড় সমস্যা। এই সমস্যার জন্য আরও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন জরুরি। কিন্তু এটি যে সমস্যা নয়; পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের বিরাজমান সমস্যার একটি উপসর্গমাত্র—সেটি বোঝা কঠিন হবে। এই সমস্যাটি রোগ নির্ণয় করে চিকিৎসা না করার ফল।

পার্বত্য চট্টগ্রামের মূল সমস্যাকে সমাধান করা হচ্ছে না, উপসর্গের সমাধানের চেষ্টায় সমস্যার ব্যবস্থাপনা দেওয়া হচ্ছে। এতে করে মূল সমস্যাটা উপসর্গের আড়ালে চলে যাচ্ছে।

দেশের অধিকাংশ মানুষের মধ্যে এমন একটি ধারণা তৈরি হচ্ছে দাঙ্গা, তৈরি হওয়া দল-উপদলের পাল্টাপাল্টি হত্যা, অপহরণ, অগ্নিসংযোগ, চাঁদাবাজি, সাজেকে সড়ক অবরোধ ঘটনাগুলোই পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা। অথচ এই সমস্ত ঘটনা মূল সমস্যারই বহুমাত্রিক উপসর্গের দৃশ্যমান প্রতিফলন মাত্র।  

আরও পড়ুন

পার্বত্য চট্টগ্রামের মূল সমস্যা কী? ১৯৮০-এর দশক থেকে জাতীয় পার্টি, বিএনপি ও আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) দফায় দফায় সংলাপ হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাকে রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে সংলাপে শনাক্ত করা হয়েছে। এই অঞ্চলের বিভিন্ন জাতিসত্তার মানুষ স্বশাসন, ভূমি মালিকানা নিরাপত্তা ও নিজেদের পরিচয়ে সাংবিধানিক স্বীকৃতি চায়।

মোগল, ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমল থেকে তারা এই অধিকার ভোগ করে এসেছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও তারা দাবিনামা উত্থাপন করেছে। তাদের এই দাবি রাজনৈতিকভাবে পূরণ করা সম্ভব। রাজনৈতিকভাবে দাবি পূরণের জন্য ১৯৯৭ সালে ২ ডিসেম্বর সরকারের সঙ্গে জেএসএসের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি হয়। যেটা দেশে ও বিদেশে শান্তিচুক্তি হিসেবে সমধিক পরিচিত।

কিন্তু ২৯ বছরেও কি পার্বত্যবাসীর বহু আশা-আকাঙ্ক্ষার পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়িত হয়েছে? জেএসএসের মতে, ১৯৯৮ সালের চুক্তির বাস্তবায়ন প্রস্তুতি হিসেবে পার্বত্য মন্ত্রণালয়, জেলা ও আঞ্চলিক পরিষদ, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন, শরণার্থী পুনর্বাসন টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। কিন্তু চুক্তি বাস্তবায়ন ওই প্রস্তুতি পর্বের মধ্যে ১৯৯৮ সালে এখনো স্থবির হয়ে রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলার ব্যবস্থা, জেলা পুলিশ, ভূমি ব্যবস্থাপনাসহ মৌলিক বিষয়গুলো বাস্তবায়িত হয়নি। ক্ষেত্রবিশেষে একদিকে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়েছে, অপর দিকে সেই চেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য অপচেষ্টার তৎপরতা দেখানো হয়েছে।

প্রায় তিন হাজার পর্যটক আতঙ্কের মধ্যে আটকে পড়েন, স্থানীয় ব্যক্তিরা স্বাভাবিক জীবনযাপনে সংকটে পড়েন। এই ঘটনাপ্রবাহ থেকে স্পষ্ট যে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন ও পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধানে সরকারের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি

চুক্তি স্বাক্ষরের শুরুতে বাস্তবায়নের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ বিভাগ জেলা পরিষদে হস্তান্তর (পার্বত্য চুক্তির ২৪ ধারায় উল্লেখ আছে, অন্য আইনে যা–ই থাকুক, পার্বত্য জেলা পুলিশের উপপরিদর্শক থেকে নিম্নস্তরের সব জনবল পরিষদের তত্ত্বাবধানে নির্ধারিত পদ্ধতিতে নিযুক্ত হবে) জরুরি ছিল। কারণ, চুক্তি বাস্তবায়নে পূর্বশর্ত চুক্তিকালীন স্থিত আইনশৃঙ্খলা ধরে রাখা।

কিন্তু ২৯ বছরে এখনো পুলিশ বিভাগ হস্তান্তরের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অথচ পুলিশ বিভাগ হস্তান্তরিত হলে জেলা পরিষদে জনগোষ্ঠীভিত্তিক সদস্যপদের আসনবিন্যাস অনুযায়ী জনবল নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হতো। ফলে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো, বম, খেয়াং, খুমিসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত মিশ্র পুলিশ বাহিনী দিয়ে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হতো।

অবরোধের কারণে রাঙামাটির বাঘাইহাটের দোকানপাট বন্ধ
ছবি: প্রথম আলো

পার্বত্য চট্টগ্রামে কাজ করার ক্ষেত্রে ভাষা একটি বড় বাধা। এখানে চাকমা, মারমাসহ ১১টি জাতিসত্তা এবং বাঙালিসহ ১২টি জাতিসত্তার ১২টি ভাষা রয়েছে। এক জাতিগোষ্ঠীর ভাষা আরেক জাতিগোষ্ঠী বোঝে না। নিরাপত্তার ব্যবস্থা ও আইনশৃঙ্খলা উন্নয়নে অন্যতম শর্ত হচ্ছে পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন। ভাষার মাধ্যমে সেটা অর্জন করা সম্ভব।

মিশ্র পুলিশ বাহিনীতে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও ভাষার সদস্য থাকলে স্থানীয় ভাষাভাষীদের সঙ্গে ভাষাগত যোগাযোগের দুর্বোধ্যতা দূর হতো। পুলিশ বহু জাতিগোষ্ঠীর বাহিনী হয়ে উঠত। বর্তমানে পার্বত্য অঞ্চলে নিয়োজিত পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যের প্রায় সবাই বাঙালি। তাঁরা পাহাড়ের কোনো জাতিগোষ্ঠীর ভাষা বোঝেন না, স্থানীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে তাঁদের পরিষ্কার ধারণা নেই, ভৌগোলিক অবস্থানও জানা নেই।

এই অবস্থায় হাজারো মানুষের সমাবেশের মধ্যে থাকলেও তাঁরা চলমান পরিবেশ ও পরিস্থিতি সম্পর্কে বুঝে উঠতে পারেন না। অপর দিকে ভাষাগত বিচ্ছিন্নতার কারণে এলাকাবাসীও তাঁদের ওপর আস্থা রাখতে পারে না। এ রকম পারস্পরিক আস্থাহীনতা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও উন্নয়নে বড় বাধা। অথচ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে পারস্পরিক আস্থা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়ন ও স্থিতিশীল রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই শর্তগুলো পূরণ না হওয়ায় চুক্তি বাস্তবায়নও প্রায় তিন দশক ধরে অধরা রয়ে গেছে। এখানে মূলত সরকারের আন্তরিকতার শিথিলতাকে দায়ী করা যায়।

আরও পড়ুন

চুক্তির আগে প্রায় আড়াই দশক ধরে অশান্ত পরিস্থিতিতে এই অঞ্চলের মানুষ শারীরিক-মানসিক ও নানাভাবে নিগ্রহের শিকার হয়েছে। শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু পুনর্বাসন টাস্কফোর্সের হিসাবে তিন পার্বত্য জেলায় বিভিন্ন জাতিসত্তার প্রায় ৯০ হাজার পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু হয়েছে। সেই সময়ে পাহাড়ি জাতিসত্তার জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ।

প্রায় ৭০ হাজার ভারতে আশ্রয় নিয়ে শরণার্থী হয়ে ফিরেছে। নিগ্রহের শিকার এই মানুষেরা ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সময়ে শান্তির আশায় বুক বেঁধে কী যে উচ্ছ্বসিত হয়েছিল, যাঁরা দেখেননি, তাঁদের বলে বোঝানো যাবে না। কিন্তু তারা পরবর্তী সময়ে যখন দেখে চুক্তি বাস্তবায়িত হচ্ছে না, চুক্তিপূর্ব সময়ের মতো আবার নানা উপসর্গ ও হরেক রকম দল, উপদল তৈরি হচ্ছে; তখন তাদের উচ্ছ্বসিত আশা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের হতাশায় পরিণত হয়ে উঠেছে।

সাজেকের সাম্প্রতিক ঘটনাকে সেখানকার জনগোষ্ঠীর হতাশার প্রতিফলন হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। সাজেকের মাচালং ও বাঘাইহাট এলাকায় দুই আঞ্চলিক সংগঠনের আধিপত্য নিয়ে সড়ক অবরোধ এবং পরবর্তী ঘটনা যৌক্তিক বা অযৌক্তিক যা-ই হোক; কিন্তু ঘটনা তো ঘটছে।

প্রায় তিন হাজার পর্যটক আতঙ্কের মধ্যে আটকে পড়েন, স্থানীয় ব্যক্তিরা স্বাভাবিক জীবনযাপনে সংকটে পড়েন। এই ঘটনাপ্রবাহ থেকে স্পষ্ট যে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন ও পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধানে সরকারের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। এই সমস্যার যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য সমাধান না হলে সাজেকের ঘটনার পুনরাবৃত্তি চলতেই থাকবে।

  • বুদ্ধজ্যোতি চাকমা প্রথম আলোর বান্দরবান প্রতিনিধি

  • মতামত লেখকের নিজস্ব