অনেক ত্রুটি সত্ত্বেও গণতান্ত্রিক একটি ব্যবস্থা বহু বছর বজায় রেখেছিল ভারত। এ জন্য গোটা বিশ্বে শ্রদ্ধাও পেয়েছিল। মোটামুটি নিরপেক্ষ নির্বাচন হতো, সরকার গঠিত হতো, সাধারণ মানুষ রাজ্য ও কেন্দ্রের আইনসভায় বিভিন্ন দলের প্রতিনিধিত্ব করতেন।
বহু দেশ থেকে মানুষ এসেছেন, সমীক্ষা করেছেন বহুত্ববাদী এ প্রক্রিয়া নিয়ে, যে প্রক্রিয়া প্রায় দেড় শ কোটি মানুষকে অসংখ্য দলের হয়ে ধর্ম-বর্ণ-জাতি-গোষ্ঠীনির্বিশেষে আইনসভায় প্রতিনিধিত্বের সুযোগ করে দিয়েছে। বহু পণ্ডিত বলেছেন, স্বাধীনতা–উত্তর ভারতে গণতন্ত্র সফল হয়েছে।
এ কথা এখন আর বলা যাবে না। এখন বলতে হবে, এ প্রক্রিয়া ধ্বংস হয়ে অন্য কিছু হতে চলেছে। এখন প্রায় নিয়মিতভাবেই গণমাধ্যমে দেখা যায়, একটি দল ভেঙে প্রধান ক্ষমতাসীন দল বিজেপিতে মিশে গেল বা কোনো দল সিদ্ধান্ত নিল, বিরোধী দল হওয়া সত্ত্বেও তারা কেন্দ্রীয় আইনসভায় বিজেপিকেই সমর্থন দেবে।
এখন বিজেপিবিরোধী নেতারা খোলাখুলিই বলছেন, তাঁদের কাছে আর্থিক কেলেঙ্কারির কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) বা কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (সিবিআই) ফোন এসেছিল, তাই তাঁরা তাঁদের দল ছেড়ে দিলেন। দিন কয়েক আগেই পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের এক প্রবীণ নেতা মদন মিত্র ‘নতুন’ তৃণমূল কংগ্রেসে চলে গেলেন ‘পুরোনো’ অর্থাৎ মমতাপন্থী তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে। কারণ, ১৪ জুলাই তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকে পাঠিয়েছিল ইডি আর ১৫ জুলাই দল পাল্টে ফেললেন মদন।
গত সপ্তাহে সকালে বিজেপিতে যোগ দিয়ে বিকেলে রাজ্যসভায় বিজেপির মনোনয়ন পেয়ে গেলেন তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার তিন সংসদ সদস্য সুখেন্দুশেখর রায়, সুস্মিতা দেব ও প্রকাশ চিক বরাইক। বিষয়টি এতটাই ন্যক্কারজনক যে বিজেপির ভেতরের একাংশ গণমাধ্যমে বলছেন, এটা মেনে নেওয়া সম্ভব নয় যে যাঁদের বিরুদ্ধে তাঁরা লড়েছেন, তাঁরাই বিজেপির দখল নিচ্ছেন। তাঁদের শান্ত করতে রাজ্যের নেতৃত্ব বলেছে, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্দেশে বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা-নেত্রীদের নিজেদের দিকে আনতে হচ্ছে। এর দুটি কারণ আছে—একটি কেন্দ্রের জন্য প্রযোজ্য, অপরটি রাজ্যের জন্য।
কেন্দ্রে পার্লামেন্টের দুই কক্ষে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএর (ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স) এক্ষুনি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা চাই। কারণ, তারা পার্লামেন্টের আসন্ন অধিবেশনে সংবিধান সংশোধনী বিল পাস করাতে চায়, যে জন্য দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন। এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা এনডিএর নেই। তাই তৃণমূল কংগ্রেস ভেঙে রাতারাতি নতুন দলে তৃণমূলের এমপিদের যোগ দেওয়াতে হচ্ছে। বিষয়টি হাস্যকর জায়গায় পৌঁছেছে।
ভারতের লোকসভা সচিবালয় ইতিমধ্যে বলেছে, তৃণমূল কংগ্রেসের এমপি সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে যে ২০ জন ২০২৩ সালে পশ্চিমবঙ্গে নথিভুক্ত সম্পূর্ণ অজানা দল ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টি অব ইন্ডিয়ায় (এনসিপিআই) যোগ দিয়েছেন, তাঁরা মমতাপন্থী তৃণমূল কংগ্রেসে এখনো থাকা তাঁদের সাবেক ৮ সহকর্মীর থেকে কিছুটা দূরে বসবেন লোকসভায়। অর্থাৎ তাঁরা কার্যত স্বীকৃতি পেলেন। তাঁরা যে ভবিষ্যতে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএকে ভারতের লোকসভায় বিল পাস করাতে সাহায্য করবেন, তা বলা বাহুল্য। কারণ, তাঁদের সাহায্যেই সুদীপ-গোষ্ঠী আজ এনডিএর শরিক।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে এখনো আছেন, এমন এক এমপি সম্প্রতি টেলিফোনে আমাকে বললেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে এমএলএদের দর যাচ্ছে মোটামুটি ২০ থেকে ৪০ কোটি, এমপিদের দর উঠেছে ৫০ থেকে ৭০ কোটি। আমি এখনো যাইনি, কিন্তু আমাকে ১০০ কোটি “অফার” করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আপনিই বলুন, এ অবস্থায় কেন কেউ কোনো দল ভাঙবে না?’
অথচ কস্মিনকালে ভারতে কেউ এনসিপিআই দলের নাম শোনেনি। সপ্তাহ কয়েক আগে শুনল; কারণ তৃণমূল কংগ্রেসের এমপিরা ওই দলে যোগ দিলেন। বিষয়টি এতটাই হাস্যকর যে অনেকে সামাজিক মাধ্যমে রসিকতা করে লিখেছেন, ‘এত দিন “শেল কোম্পানি” বা গোপন কোম্পানির কথা শুনেছি, এখন “শেল” রাজনৈতিক দলের কথাও শুনছি।’
আবার রাজ্যস্তরে একটি ‘নতুন’ তৃণমূল রাতারাতি গঠিত হয়ে গেল। এই তৃণমূলের নেতাই রাজ্যের আইনসভায় বিরোধীদলীয় নেতা হয়ে গেলেন। আদালত সেটি আপাতত মেনেও নিলেন। অর্থাৎ যে তৃণমূল কংগ্রেস ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠা করে এত দিন লড়াই করলেন এবং মুখ্যমন্ত্রী রইলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সেই দল আর তাঁর দল রইল না, সেটি একসময় সিপিআই-এম থেকে বহিষ্কৃত এক নেতার দল হয়ে গেল।
পশ্চিমবঙ্গে যে দল ৪১ শতাংশ ভোট পেয়েছে, সেই দলকে তার প্রতিষ্ঠাতার কাছ থেকে নিয়ে নেওয়া হলো। এটাকে ইংরেজিতে বলে ‘ব্যানানা রিপাবলিক’। অর্থাৎ একেবারে নিয়মশৃঙ্খলাহীন রাষ্ট্র ছাড়া আর কোথাও এটা হয় কি? এটা করা হলো, যাতে পশ্চিমবঙ্গ বিরোধীশূন্য করে তা শাসন করতে পারে বিজেপি।
এ ঘটনা যে শুধু পশ্চিমবঙ্গে ঘটছে তা নয়, কোনো না কোনোভাবে গোটা ভারতে ঘটছে। প্রায় প্রতিটি রাজ্যে বিজেপিবিরোধী দলগুলো ভেঙে টুকরা টুকরা হয়ে যাচ্ছে। দিল্লিতে আম আদমি পার্টি ভেঙে নেতারা সদলবল বিজেপিতে যোগ দিলেন। মহারাষ্ট্রে শিবসেনা ভেঙে গেল। এখন বলা হচ্ছে, মহারাষ্ট্রের অন্যতম প্রভাবশালী বিরোধীদলীয় নেতা শারদ পাওয়ার, যিনি এখন পর্যন্ত বিজেপিবিরোধী কেন্দ্রীয় জোট ‘ইন্ডিয়া’র কাগজে-কলমে শরিক, তিনি আসন্ন বিলে এনডিএর পক্ষে দাঁড়াবেন।
আর এসব ঘটনার প্রচারমাধ্যমে একধরনের ‘সেলিব্রেশন’ বা উৎসব চলছে। ঘণ্টায় ঘণ্টায় খবর আসছে, বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট অন্য দল ভাঙিয়ে এখন ৩০৫ থেকে ৩১০ বা ৩১০ থেকে ৩২০–এ পৌঁছে গেল। এটা যেন একটি টি-টুয়েন্টি ম্যাচ—লাফিয়ে লাফিয়ে স্কোর বাড়ছে আর এনডিএ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার দিকে এগোচ্ছে।
সারাক্ষণ গণমাধ্যমে নানান ‘স্পেকুলেশন’ বা জল্পনাও চলছে—আজ কি উত্তর প্রদেশের সমাজবাদী পার্টি ভেঙে তাদের এমপিরা বিজেপিতে চলে যাবেন, নাকি সপ্তাহের শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে? তামিলনাড়ুর প্রধান বিরোধী দ্রাবিড় মুনেত্র খাজাগম কাল ভাঙবে, না আগামী সপ্তাহে বিল পেশের আগে?
দুইভাবে দলগুলোকে ভাঙা হচ্ছে। হয় সরাসরি টাকা দেওয়া হচ্ছে, যেমনটা মহারাষ্ট্রে বলেছেন উদ্ধব ঠাকরেপন্থী শিবসেনা নেতা সঞ্জয় রাউত। অভিযোগ, সেখানে মোটামুটি ১৫ থেকে ৫০ কোটি দেওয়া হয়েছে এমপিপিছু; যদিও এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শিবসেনার অপর অংশের নেতা একনাথ শিন্ডে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে এখনো আছেন, এমন এক এমপি সম্প্রতি টেলিফোনে আমাকে বললেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে এমএলএদের দর যাচ্ছে মোটামুটি ২০ থেকে ৪০ কোটি, এমপিদের দর উঠেছে ৫০ থেকে ৭০ কোটি। আমি এখনো যাইনি, কিন্তু আমাকে ১০০ কোটি “অফার” করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আপনিই বলুন, এ অবস্থায় কেন কেউ কোনো দল ভাঙবে না?’
ভারতে এমএলএ–এমপি কেনাবেচা অতীতে হয়নি, তা নয়। অসংখ্যবার হয়েছে এবং তা নিয়ে তদন্তও হয়েছে। কংগ্রেসের নরসীমা রাও প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে ১৯৯৩ সালে সংসদ সদস্য কেনাবেচা করে অনাস্থা প্রস্তাব থেকে তাঁর সরকারকে বাঁচিয়েছিলেন। কিন্তু এসবই ছিল ব্যতিক্রম।
ঢালাওভাবে দল ভেঙে দেওয়া হয়নি বা প্রতিষ্ঠাতার থেকে নিয়ে নেওয়া হয়নি, ক্ষমতাসীন দলে যেতে বাধ্য করা হয়নি বা না গেলে গ্রেপ্তার করা হয়নি ইত্যাদি। সবচেয়ে বড় কথা, এই অনৈতিক কাজের সামাজিক স্বীকৃতি ছিল না। সাধারণভাবে মানুষ এই বেচাকেনা পছন্দ করতেন না, যে কারণে বলা হতো, ভারতের গণতন্ত্রে ভুলত্রুটি থাকলেও মানুষ চেষ্টা করছেন এটিকে উন্নত করার।
এখন আর এ আচরণের কোনো সমালোচনা হয় না। এ ধরনের ঘটনা ঘিরে সমাজে ও মাঠপর্যায়ে আন্দোলন হয় না। বিষয়টি সয়ে গিয়েছে; বরং একধরনের ‘সেলিব্রেশন’ চোখে পড়ছে। একটা ‘কী, বিজেপি কেমন সবাইকে বোকা বানিয়ে দিল’ গোছের আস্ফালন দেখা যাচ্ছে।
মমতাকে কেমন শিক্ষা দেওয়া গেল, পশ্চিমে শিবসেনাকে ভেঙে টুকরা টুকরা করা গেল বা এবার দক্ষিণে ডিএমকে এবং উত্তরে সমাজবাদী পার্টিকে করা যাবে, এ নিয়ে একটা ‘সেলিব্রেশন’ রয়েছে, আস্ফালন রয়েছে, একটা সার্কাস, একটা টি-টুয়েন্টি, একটা রসিকতা রয়েছে। হ্যাঁ, সেটাই। ভারতে গণতন্ত্র রসিকতায় পরিণত হয়েছে।
আর রসিকতায় যেমনটা হয়, একজন হাসায়, অন্যরা হাসে, সেটাই হচ্ছে। একটি দল হাসাচ্ছে, পাবলিক হাসছে। কারণ, তারা জানে, সবকিছুই একটি দলের—মাঠ তাদের, রেফারি তাদের, দুই পক্ষের প্লেয়ারও তাদের। হাসা ছাড়া দর্শকদের আপাতত আর কিছু করার নেই। ভারতে তাই আজ নির্দিষ্ট দল যখন নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার দ্বারপ্রান্তে, তখন গণতন্ত্র নামের বস্তুটি শূন্য থেকে মহাশূন্য হয়ে মহাকালে বিলীয়মান।
শুভজিৎ বাগচী প্রথম আলোর কলকাতা সংবাদদাতা
মতামত লেখকের নিজস্ব
